শাহাদাতে কারবালার দর্শন

আ ব ম খোরশিদ আলম খান

মঙ্গলবার , ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৬:২৫ পূর্বাহ্ণ
55

আরবি হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। বারোটি মাসের মধ্যে চারটি মাস মহিমান্বিত বলে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে। চার মাস বলতে মহররম, রজব, জিলকদ, জিলহজ মাসকে বুঝানো হলেও মহররম মাসের বিশেষ ফজিলত, মাহাত্ম্য ও গভীর তাৎপর্য রয়েছে। এ মাসের দশম তারিখ ‘আশুরা’ দিনটি অত্যন্ত ঘটনাবহুল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বহু কারণে। ‘আশুরা’ মানে দশম বা দশমী। মহররমের দশ তারিখে সৃষ্টিজগতের সূচনা হয়েছে। একদিন এই সৃষ্টিজগতের বিলয় ঘটবে আশুরা দিবসে। দুনিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মন্তুদ, হৃদয়বিদারক, পীড়াদায়ক কারবালা ট্রাজেডিও সংঘটিত হয়েছে মহররমের এই আশুরা দিবসে। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (র.) সহ নবী পরিবার তথা আহলে বায়তে রাসূলের (দ.) ৭২জন সদস্য (৬৮০ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে) কারবালা ময়দানে নরাধম পাষণ্ড ইয়াজিদি গোষ্ঠির হাতে নির্মমভাবে শাহাদত বরণ করেন। মূলত সকল ঘটনা-দুর্ঘটনাকে ছাপিয়ে কারবালা ট্রাজেডির কারণে এই দশই মহররম বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নবী পরিবারের অবুঝ নিষ্পাপ দুগ্ধপোষ্য শিশু পর্যন্ত ইয়াজিদি নৃশংসতা বর্বরতা থেকে সেদিন রেহাই পায়নি। মধ্যযুগের চেঙ্গিস খান-হালাকু খান, সভ্য দুনিয়ার হিটলারকেও হার মানিয়েছে এই কারবালা ট্রাজেডি। যতদিন এই পৃথিবী টিকে থাকবে, কারবালা প্রান্তরে আহলে বায়তে রাসূল (দ.) সদস্যদের ওপর ইয়াজিদের জঘন্য নির্মমতা ও বর্বরতার কথা জেনে ঈমানদার জনতার হৃদয় হাহাকার করে উঠবে। তীব্র ঘৃণা ও ধিক্কারের সঙ্গে উচ্চারিত হবে ইয়াজিদের নাম।
পৃথিবীর শুরু থেকে হক-বাতিলের দ্বন্দ্ব, সত্য-মিথ্যার সংঘাত চলছেই। সত্য-মিথ্যার মধ্যে সংঘাত-দ্বন্দ্ব চিরন্তন। সকল যুগে সকল দেশে সত্য-মিথ্যার মধ্যে দ্বন্দ্ব লড়াইয় এক মুহূর্তের জন্য থেমে থাকেনি। তেমনি সত্য ন্যায় ইনসাফ ও মানবিক গণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে গেছেন হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর নেতৃত্বে নবী পরিবারের সদস্যগণ। নরপিশাচ পাষণ্ড ইয়াজিদ অন্যায়ভাবে মসনদে বসে জনগণের ওপর সীমাহীন জুলুম, নিপীড়ন ও স্বৈরতন্ত্র চাপিয়ে দেয়। জনগণের প্রত্যাশাকে পদদলিত করে ইয়াজিদ স্বেচ্ছাচারিতা ও জুলুমতন্ত্র চাপিয়ে দিলে গণরোষের মুখে পড়ে। আমজনতা তার বলাজুরির শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আর স্বৈরতন্ত্রের ওপর দৃঢ় থাকে ইয়াজিদ ও তার পেটোয়া জল্লাদ বাহিনী। ইয়াজিদ মসনদে বসে নানামুখী অবৈধ ফরমান জারি করে। ব্যভিচার ও মদপানকে বৈধতা দিয়ে সে সামাজিক অনাচারের জন্ম দেয়। পেশি শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিবাদী জনতাকে সে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল। নবীর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) ছিল ইয়াজিদি স্বৈরতন্ত্রের পথে বড় বাধা। তাই তিনি ইয়াজিদের টার্গেটে পরিণত হন। নিপীড়িত মানবতার কণ্ঠস্বর হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) সহ নবী পরিবারের সদস্যদেরকে অত্যন্ত নির্মম ও নির্দয়ভাবে খুন করে সেদিনই ইয়াজিদি গোষ্ঠী বর্বরতা ও নৃশংসতার যে নজির সৃষ্টি করেছে দুনিয়ার ইতিহাসে এর দ্বিতীয় নজির নেই। কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনার কথা জেনে আমরা যেমন শিহরিত, ব্যথিত শোকাতুর হয়ে পড়ি তেমনি শাহাদাতে কারবালার চেতনায় আমরা বাতিল ইয়াজিদি অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রেরণা ও তাড়না অনুভব করি। কারবালার শোককে শক্তিতে পরিণত করে ঈমানি চেতনায় যেন আমরা ঘুরে দাঁড়াই।
স্বৈরতন্ত্রী ইয়াজিদের শাসন সেদিন অনেকেই মেনে নেয়নি। ব্যক্তিজীবনে সে ছিল দুরাচারী, শরাবখোর, লম্পট ও জুলুমবাজ শাসক। ক্ষমতার দম্ভ-মোহ তাকে জঘন্য স্বেচ্ছাচারী করে তুলেছিল। ধরাকে সরা জ্ঞান মনে করে নিরীহ জনগণের ওপর জুলুমের রাজত্ব কায়েম করে এই ইয়াজিদ। তার নিপীড়ন ও শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে মক্কা-মদিনা ও কুফাসহ বহু অঞ্চলের মানুষ। ইয়াজিদি নিপীড়ন থেকে তারা বাঁচতে চায়। মনে-প্রাণে ইয়াজিদি জুলুমশাহির তারা পতন চায়। ঠিক এই সময়ে মক্কা-মদিনা কুফাবাসীগণ ত্রাণকর্তা হিসেবে বাছাই করে নেন হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) কে। আহলে বায়তে রাসূল (দ.) তথা নবী পরিবারের সদস্য ও যোগ্য প্রতিনিধি ইমাম হোসাইন (রা.) শাসক হোক, তিনি দেশের হাল ধরে নিষ্পেষিত মানুষকে পরিত্রাণ দেবেন এই ছিল আরবের বিশাল জনগোষ্ঠীর দাবি ও প্রত্যাশা। তারা ইয়াজিদকে নয়, হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) কে খলিফা হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। শত শত চিঠি পাঠিয়ে তারা কুফায় এসে হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) কে খলিফা পদ গ্রহণের আমন্ত্রণ ও দাবি জানায়। জনপ্রত্যাশা ও দাবিকে আমলে এনে ইমাম হোসাইন (রা.) পরিবারের সদস্যসহ পৌনে অর্ধশতাধিক কাফেলা নিয়ে কুফার দিকে রওনা হন। বর্তমানে ইরাকের ফোরাত নদীর কাছে কারবালা প্রান্তরে এসে হোসাইনী (রা.) কাফেলা ইয়াজিদি বাধা ও আক্রমণের মুখে পড়ে। আধুনিক সমরাস্ত্র সজ্জিত বিশাল ইয়াজিদি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যান হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)। অসম যুদ্ধে একে একে নবী পরিবার ও বংশের ৭২ জন সদস্য শাহাদাতের সুধা পান করলেন। তবুও জালিম নরপিশাচ ইয়াজিদিদের কাছে মাথা নত করেননি হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)। হযরত ইমাম আলী আজগর ও আলী আকবরের মতো অবুঝ নিষ্পাপ শিশুদের পর্যন্ত ইয়াজিদিরা রেহাই দেয়নি। তীর বল্লম বর্শার আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে এই নিষ্পাপ শিশুরা একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ঘোড়া দাবড়ানো হলো নবী পরিবারের ওপর! কী জঘন্য নৃশংসতা! প্রচণ্ড তৃষ্ণা ও ক্ষুধায় কাতর হোসাইনি (রা.) কাফেলার তাঁবুতে নারী-শিশুদের আর্তনাদ আহাজারিতে সেদিন আল্লাহর আরশ পর্যন্ত থর থর করে কেঁপে ওঠে। সমগ্র দুনিয়ায় প্রলয় বয়ে যায় সেই দিনটিতে। সৃষ্টি জগতে হাহাকার রব ওঠে। দুঃখে শোকে যাতনায় সমগ্র দুনিয়া স্তব্ধ হয়ে পড়ে। হায়, কি ইয়াজিদি নৃশংসতা! নিষ্পাপ অবুঝ শিশুরা সেদিন কি অপরাধ করেছিল যে, এমন জঘন্য কায়দায় তাদের প্রাণ কেড়ে নেয়া হলো! দুগ্ধপোষ্য কোলের শিশুরা পর্যন্ত ইয়াজিদি নির্মমতা থেকে রেহাই পেল না! কারবালা ট্র্যাজেডি স্মরণ করে কেয়ামত পর্যন্ত মানুষেরা আর্তনাদ আহাজারি করবে। শোক ও ক্ষোভের বহ্নিশিখা জ্বলবে ঈমানদার জনতার মাঝে।
নবীর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) ক্ষমতার জন্য নয়, জনগণকে জুলুমবাজ শাসকের কবল থেকে বাঁচানোর জন্যই সেদিন কারবালার প্রান্তরে ছুটে গিয়েছিলেন। অর্থবিত্ত, ক্ষমতার হাতছানি উপেক্ষা করে, ইয়াজিদি প্রলোভনকে পদদলিত করে, তিনি জনগণের মুক্তির জন্য ইয়াজিদি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। হাসিমুখে সপরিবারে শাহাদাতের সুধা পান করেছেন, তবুও ইয়াজিদি দুঃশাসনকে তিনি মেনে নেননি। দেশ ও বিশ্বে যখনই কোনো শাসক জনগণের ওপর জুলুমতন্ত্র চাপিয়ে দেবে, স্বৈরতন্ত্র কায়েম করবে, প্রভুত্বমূলক জবরদস্তির শাসন চাপিয়ে দেবে, তখনই ওই শাসকগোষ্ঠীর সামনে মাথা নত না করাই হযরত ইমাম হোসাইনের (রা.) শাহাদাতের দর্শন ও কারবালার অন্তর্নিহিত শিক্ষা। জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করে দেশে জনগণের রাজ কায়েম করাই ইমাম হোসাইনের (রা.) শিক্ষা। ১০ মহররম আশুরা দিনটি কারবালার ট্র্যাজেডি ছাড়াও আরো অনেক কারণে প্রসিদ্ধ ও গুরুত্ববহ। এদিনে মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.) ও হযরত হাওয়া (আ.) কে আল্লাহপাক সৃষ্টি করেছেন। শয়তানের প্ররোচনায় নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়ে দুনিয়াতে এসেছেন তারা এই আশুরার দিনে। বহু বছর ধরে হযরত আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) দুনিয়ায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিলেন। অনেক কান্নাকাটি ও অনুশোচনার পর আরাফাত ময়দানে তারা মিলিত হন আশুরা দিবসে। তাদের তওবা আল্লাহ পাক কবুল করেন। নমরুদ হযরত ইব্রাহিম (আ.) কে আগুনে নিক্ষেপ করে এই আশুরা দিবসে। হযরত মুসা (আ.) ও তাঁর উম্মত বনি ইসরাইলিরা এই আশুরার দিনে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি লাভ করে। ফেরাউন ও তার বাহিনী সদলবলে নীলনদে ডুবে মারা যায় এই দিনে। হযরত ইউনুস (আ.) এর ৪০ দিন পর মাছের পেট থেকে মুক্তি লাভ, কঠিন ব্যাধি থেকে হযরত আইয়ুব (আ.) এর পরিত্রাণ লাভ, হযরত সুলাইমান (আ.) এর রাজত্ব ফিরে পাওয়া, হযরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর পুত্র হযরত ইউসুফ (আ.) এর সাক্ষাত পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে এই আশুরা দিবসে। হযরত নূহ (আ.) মহাপ্লাবন থেকে বাঁচতে বিশাল আকারের কিস্তি তৈরি, প্লাবন থেকে মুক্তি এবং হযরত ঈসা (আ.) আল্লাহর হুকুমে আসমানে উত্থিত হন এই দিনে। আরো বহু ঘটনা ইতিহাসের সাক্ষী ১০ই মহররম।
লেখক : সাংবাদিক

x