শাস্তি নয় : আনন্দময় শ্রেণি দরকার

শনিবার , ২১ জুলাই, ২০১৮ at ৬:২১ পূর্বাহ্ণ
128

প্রত্যেক সভ্য সমাজের প্রাণকেন্দ্র মানুষ। মানুষের প্রাণকেন্দ্র হল শিক্ষা ও সংস্কৃতি। শিক্ষা আর সংস্কৃতির বাহক হলেন একটি সমাজের একজন দায়বদ্ধ আদর্শ শিক্ষক। আমাদের চরম দুর্ভাগ্য যে, আমাদের শিক্ষা, শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষক ও শিক্ষাদান বিষয়ে বাঙালি মনীষীদের দুর্লভ ও সৃজনশীল চিন্তাগুলো বাস্তবে ফলানোতো দূরে থাক, এই বিষয়গুলো সাধারণ পাঠকদের কাছে সুলভ করা হয়নি। তবে ইদানিংকালে এর ব্যতিক্রম কিছুটা চোখে পড়ছে, কার্যত তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আমাদের দেশের শিক্ষার এই হাল, শিক্ষার উন্নতি ও অবনতি কিসে হয় এই দুই সত্য বিষয় জানেন দুইজন. যিনি শেখান অর্থাৎ শিক্ষক খ. যিনি শিখেন অর্থাৎ ছাত্র।

কিন্তু সত্য যারা জানেন তারাতো সত্যকে প্রয়োগ কিভাবে করবেন তা জানেন না। কারণ শিক্ষা পদ্ধতি ও শিক্ষাপ্রণয়ন যাঁরা করেন তারা এই দুইজনের বাইরের লোক। অর্থাৎ শিক্ষার ভালো ও মন্দের ব্যাপারে কোনোদিনই যাঁদের কোনো শিক্ষা নেয়া হয়নি কিংবা চিন্তা করবার অবকাশ জোটেনি, কালগুণে অধিকার যার তাকে ঠেলা মেরে ওসব জবর দখল করে আছেন কর্তাব্যক্তিরা। আর এর ফলশ্রুতি হিসাবে শিক্ষার মূল গলদ চিরকাল গলদ হিসাবে থেকে গেল।

আমার গত সপ্তাহের লেখা ‘একজন শিক্ষক একটি জাতির শিক্ষা ব্যবস্থা’। এই বিষয়ে লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর চারদিক থেকে পরিচিত অপরিচিত অনেকের ফোন পেয়েছি, এই সপ্তাহে ৩টি চিঠি আমার কাছে এসেছে প্রশংসা সূচক। জেনেছি ডবলমুরিং থানার শিক্ষা অফিসার (প্রাথমিক) বাবু রিটন কুমার বড়ুয়া থানার সকল প্রধান শিক্ষককে নিজ খরচে লেখাটি পৌঁছে দিয়েছেন। সবার উচ্ছ্বাস দেখে এবার শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব এবং শিশুদের শাস্তি বিষয়ে আলোচনায় যেতে চাই। এই বিষয়ে লেখার জন্য অনেকের অনুরোধ ও ছিল।

ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ্তুঈযরষফ রং হড়ঃ ধ সরহরধঃঁৎব ড়ভ সধহ.্থ অর্থাৎ শিশু বয়স্ক মানুষের ক্ষুদ্র সংস্করণ নয়। আমরা অনেকেই শিশুকে বয়স্ক মানুষের ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসাবে মনে করি। আবার কেউ কেউ ভুল করে শিশুকে মিনি পেস্ট, মিনি ক্যামেরা ও মিনি সাইনিজের মত শিশুকে মিনি মানুষ মনেকরি। এই বিষয়টি শুধু শিক্ষক নন সমাজের সবাই মনেকরি। আমাদের এই কথাটি ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, শিশু আকারে ছোট হতে পারে তবে তার আবেগ, রাগ, অনুভূতি, ভালবাসা, বোঝার ক্ষমতা, ঈর্ষা ইত্যাদি বয়স্ক মানুষের মত। তাহলে আমার প্রশ্ন আমরা একজন বয়স্ক মানুষের আবেগ, অনুভূতি, দুঃখবোধ ইত্যাদিকে যদি গুরুত্ব দিই, সম্মান করি তাহলে কেন আমরা একজন শিশুর এই বিষয় গুলোকে সম্মান দেখাবো না?

আন্তর্জাতিক শিশু দিবস উপলক্ষে আলোচনা এবং শিশু অধিকার ও নির্যাতনের এক জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়। জরিপে দেখা গেছে শিশুরা স্কুলে, কর্মস্থলে এবং ঘরে শাস্তির শিকার হয়। তবে ভয়ানক তথ্য হল শিশুরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষকদের হাতে বেশি বেশি লাঞ্জিত ও নিগৃহিত হয়ে থাকে। ঘরে শিশুরা নির্যাতিত হলেও উচ্চ শিক্ষিত বাবামায়েরা কম নির্যাতন করেন বলে জরিপে দেখা গেছে। কিন্তু উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীকে বেশি নির্যাতন করেন বলে জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে। লাঠি ও বেতের আঘাতের শিকার হন বিদ্যালয়গুলোতে, এতে আঘাতের হার ৮৭ দশমিক ৬ শতাংশ বলে উলেখ করা হয়। এছাড়াও হাতের তালুতে রুলার ও স্কেল দিয়ে আঘাত করা হয়। এই আঘাতের হার শতকরা ৭৬ শতাংশ। বিদ্যালয়ের শ্রেণী কক্ষে দাঁড় করিয়ে রেখে ৬৩ শতাংশ শিশুকে শাস্তি দেয়া হয়। ৪৯ শতাংশ শিক্ষার্থীকে চড় ও থাপড়ের শিকার হতে হয়। হাঁটু ভেঙে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় ২৫ শতাংশ শিশুকে। সাধারণ শাস্তির মধ্যে বকাবকি, তিরস্কার, নিন্দা ও ভয় দেখানো হয়। অথচ শিশুদের এই ধরনের শাস্তি কোনক্রমেই আইন সিদ্ধ নয়।

একজন শিশুর চাহিদা বুঝার জন্য একজন বয়স্ক শিশু মনের মানুষ খুবই জরুরি। শিশুদের নিয়ে আমাদের কাজ করতে গেলে কেন আমরা নিজেরা শিশু হব না? আর এই রকম শিশুসুলভ আচরণ না হওয়ার সঙ্গত কারণ হচ্ছে সনাতনী ধ্যানধারণা পোষণ। আমরা যদি শিশুদের নিয়ে কাজ করতে যাই তবে কেন শিশুর চাহিদা, তার মানসিকতা, তার চিন্তা চেতনাকে বুঝব না? শিশুকে তার চিন্তা চেতনার মধ্যে এমন ভাবে একজন শিক্ষককে ডুকতে হবে যাতে শিশু আগামী দিনের সহজ সাবলীল ভাবে স্বপ্ন দেখে। তার আবেগ অনুভুতি দিয়ে জীবনকেপরিবেশকে বুঝতে শেখে। সে তার চারদিকে শুধু মনেকরে সব কিছুই সহজ ও সাবলীল। এক্ষেত্রে শিক্ষক শিশুর কাছে সফল মানুষের উদাহরণ দিতে হবে, সফল হওয়ার গল্প বলতে হবে, আদর্শবান মানুষের উপমা তুলে ধরতে হবে। তবেই একজন শিশু স্বপ্ন দেখবে, জীবনকে রঙিন করার স্বপ্ন। শিক্ষার্থীর ভিতরের সুপ্ত প্রতিভা গুলোর সন্ধান দিতে পারেন একজন আদর্শ শিক্ষক। আর একজন আদর্শ শিক্ষকের শিক্ষার্থীর সামনে পাঠদানের পূর্বে ও শিক্ষকতা জীবনে প্রতিদিন নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খুজে বের করতে হবে। তবেই শিক্ষার্থী তাঁকে সহজে গ্রহণ করবে। প্রশ্নগুলো

 শিক্ষক হিসাবে আমি কি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছি?

 পাঠদানের পূর্বে আমি কি প্রস্তুতি নিয়েছি?

 শিক্ষার্থীদের চাহিদা পূরণে সক্ষম ও সচেতন থেকেছি?

 আমি কি শিক্ষার্থীর ভাল কাজের প্রসংশা করেছি?

 আমি পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো জেনেছি?

 পেশাগত মান উন্নয়নে আমি কি সচেষ্ট ছিলাম?

ষ গত সপ্তাহে আমি কি শিক্ষা বিষয়ক কোন পুস্তক বা পত্রিকা পাঠ করেছি?

 আমি কি নিজ থেকে সহকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক সৃষ্টি করেছি?

শিক্ষককে সফলতার গল্প শিক্ষার্থীর মাঝে তুলে ধরতে হলে প্রথমে তাঁকে সফল হতে হবে। কারণ শিশুর কাছে সফল মানুষ শিক্ষক নিজে হলে তবেই শিক্ষার্থীকে সেই গল্প সহজে বুঝানো যাবে। শিক্ষক নিজেই যদি কর্ম জীবনে বিফল হন তবে তিনি কিভাবে তার শিক্ষার্থীকে সফল হওয়ার গল্প শুনাবেন? শুনালেও সেই গল্প শিক্ষার্থী গ্রহণ করবে না। তাই শ্রেণি কক্ষে পাঠ বুঝানো এবং শিক্ষার্থী যাতে শ্রেণিতে মনোযোগি থাকে সেই জন্য শিক্ষাদর্শনে চ৩ দর্শনের প্রচলন আছে= চৎবংবহঃ (যথাসময়ে প্রতিষ্ঠান ও শ্রেণিতে উপস্থিতি এবং শ্রেণি কক্ষ ত্যাগ করা), = চৎবঢ়ধৎধঃরড়হ (শ্রেণিতে যে বিষয়ের উপর পাঠ দেব তার উপর একটি পূর্ব প্রস্তুতি থাকা একান্ত দরকার), = চবৎংড়হধষরঃু (অবশ্যই শিক্ষার্থীদের কাছে আপনার ব্যক্তিত্ব থাকতে হবে) অপরদিকে চ৩ দর্শনের ব্যাখ্যা অন্যভাবেও দেয়া হয়েছে। যেমন: চষধহহরহমপরিকল্পনা প্রণয়ন, চবৎভড়ৎসধহপবকার্যসম্পাদনের মনোইচ্ছা, চবৎপবঢ়ঃরড়হপ্রত্যক্ষণ করার ক্ষমতা। মনে রাখতে হবে শিক্ষকের ৩টি গুণের কোন একটি বাদ পড়লে তাকে শিক্ষক বলা যাবে না। আর এর জন্য শিক্ষার্থী যদি ঐ শিক্ষকের পাঠ গ্রহণ না করে এটি বেতের মাধ্যমে আদায় করা যাবে না। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানে শাস্তি নয়শিক্ষকের যোগ্যতাই শিক্ষার্থীকে প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকমুখী করে তুলবে। (সূত্র : শিক্ষাব্যবস্থা : সংকট ও সমাধান)

আমাদের শিক্ষার মান নিয়ে কিছু বলার পূর্বে আমি সবিনয়ে অনুরোধ করব আমাদের শিক্ষকদের মানের বিষয়ে সচেতন হওয়ার। আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে প্রাথমিক শিক্ষার মান দ্রুত অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। শহরের মান কোন রকম হলেও গ্রামের চিত্র একেবারে নিম্ন পর্যায়ে। প্রাথমিক শিক্ষার মান সামগ্রিক মানের অবনতি ঘটছে। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার মান উদ্বেগজনকভাবে নিচে নেমে এসেছে একথা আর আজ বলার অপেক্ষা রাখে না। এর কারণ হিসাবে যাই চিহিৃত করা হোক না কেন আমি বলব একটিই কারণ ‘শিক্ষকদের উদাসীনতা।’ শিক্ষকদের মাঝে শিক্ষা সুলভ আচরণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। অধিকাংশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষককে আমি বলতে ও করতে দেখেছি ‘বেতের ব্যবহার পারে শিক্ষার্থীর উন্নয়ন।’ অথচ একথা ভুললে চলবে না যে, একজন আদর্শ শিক্ষক দরকার তার শিক্ষার্থীর জন্যশাস্তি নয়। শিশু শাস্তির বিভিন্ন যুগে বিভিন্নভাবে প্রচলন আমরা লক্ষ্য করিনিম্নে এর কিছু বিবরণ তুলে ধরা হল

. প্রাগ ঐতিহাসিক যুগের শাস্তি : কঠোর বেত্রাঘাত, মাথা মোড়ানো, শিক্ষাঙ্গন হতে বের করে দেয়া, গুরুর সান্নিধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করা, খুঁটিতে বেঁধে রাখা, মাটি কামড়ায়ে পড়ে থাকা, পাথর হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ইত্যাদি।

. মধ্যযুগের শাস্তি : কানধরে উঠবস, বেঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা, কঠোর বেত্রাঘাত, গাল দেয়া, অনাকাঙ্ক্ষিত খেতাব দেয়া, খুঁটিতে বেধে রাখা, পাথর হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ইত্যাদি।

. আধুনিক যুগের শাস্তি : চক্ষু শাসন, দৈহিক অঙ্গভঙ্গির শাসন, স্নেহ প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত করা, শ্রেণীকক্ষে স্বল্পসময় দাঁড়িয়ে রাখা, মনোভাব পরিবর্তন করা, ভর্ৎসনা করা, হাতের কাজ বেশি দেয়া ইত্যাদি।

. মনোবৈজ্ঞানিক শাসন : গোপনে কথা বলা, দিকনির্দেশনা দেয়া, যাকে ভয় পায় তাকে জানানো হবে মর্মে ভয় দেখানো, পরীক্ষা ভীতি প্রয়োগ, সঙ্গী ও সহপাটির কাছ থেকে দূরে রাখা, কন্ঠশ্বরের শাসন, চক্ষু শাসন ইত্যাদি। আর উলেখিত শাসনগুলোতেও যদি না হয় তবে প্রতিষ্ঠান প্রধানের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। তবুও শিক্ষার্থীকে বেতাঘাত করা যাবে না। (তথ্য সূত্র : শিখনের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দিক, পৃষ্ঠা৫০)

শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে সামগ্রিকভাবে একজন শিক্ষার্থীর চৈতন্যকে জাগরিক করা। শিক্ষার্থীর কাছে মেধা মনন, সহনশীলতা, উদারতা ও ভালবাসা সবই আছে। কিন্তু তা বের করে আনার কাজটি করবেন একজন শিক্ষক। তাই আমি মনেকরি শিক্ষা নয়শিক্ষক হলেন একটি জাতির মেরুদন্ড। আর সেই মেরুদন্ড যদি উপযুক্ত না হন তবে শিক্ষার অবস্থা যা হওয়ার তাই হবে বা হচ্ছে। তাই শ্রদ্ধেয় শিক্ষক যাঁরা এখনও বেতকে, শাস্তিকে তাদের সম্পদ হিসাবে মনে করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণি কার্যক্রম হবে আনন্দময় ও শিক্ষার্থী বান্ধব। তাদের প্রতি নিবেদন বেতের প্রয়োজন নাই, আপনার মধ্যে থাকলে শিক্ষার্থী এমনিতে শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় শিক্ষাগ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠবে।

x