শামসুল আরেফীনের গবেষণা : প্রাসঙ্গিক আলোচনা

রশিদুল হাসান শাহেদ

শুক্রবার , ৩ মে, ২০১৯ at ৬:৪০ পূর্বাহ্ণ
66




শামসুল আরেফীনের নাম শুনলেই এখন একজন লোকগবেষক হিসেবে তাঁর ছবি চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে। আশুতোষ চৌধুরী, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, আবদুল হক চৌধুরী ও আবদুস সাত্তার চৌধুরীর মতো পুঁথি ও লোকসাহিত্য সংগ্রহে সংযুক্ত হয়ে তিনি ইতোমধ্যে তাঁদের সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। এছাড়াও তিনি আশুতোষ চৌধুরী ও আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের মতো নিজের সংগৃহীত পুঁথি ও লোকসাহিত্যের পাঠোদ্ধার ও গবেষণা করে চলেছেন। এমনকি এসব পুঁথি ও লোকসাহিত্য সম্পাদনাও করছেন। শামসুল আরেফীনের প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ ও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর লোক-বিষয়ক প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলো পাঠ করলে দেখা যায়, তিনি ইতোমধ্যে বিস্মৃত ও বিলুপ্তপ্রায় শতাধিক লোককবি আবিষ্কার করেছেন এবং এঁদের রচনা গবেষণা ও সম্পাদনা করেছেন। তাঁর আবিষ্কৃত লোককবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-আস্কর আলী পণ্ডিত, মোজহেরুল আলম ওরফে ছাহেব মিয়া, বজলুল করিম মন্দাকিনি, শেখ মোহাম্মদ নিজামুদ্দিন, আবদুল জব্বার মীমনগরী, আবদুস সবুর মাখন, গোলাম গণি চৌধুরী, আতিকউল্লা শাহ্‌, মুন্সী আমিন শরীফ, মোরশেদ চাঁদ দরবেশ, দলিলুর রহমান পণ্ডিত, করিম শাহা, আফতাব উদ্দিন, আবদুল লতিফ শাহ্‌, শাহ্‌ আবদুল জলিল সিকদার, আমানুল্লাহ, আতর আলী, আবুল খায়ের নক্সবন্দি, কাজল শীল, বাদশা আলম, ফকির ইয়াছিন শাহ্‌, হেফাজতুর রহমান খান, ক্ষেমেশ চন্দ্র রক্ষিত, আবদুল্লাহ বাঞ্জারামপুরী, মকবুল আহমদ পণ্ডিত, ঈছা আহমেদ নক্সবন্দি, খাদেম আলী, সাইদ মিয়া, আবদুল আজিজ পণ্ডিত, আব্দুর রশিদ, আবদুল খালেক প্রমুখ। তিনি আলী রজা ওরফে কানুফকির, আবদুল গফুর হালী প্রমুখকে নিয়েও আলোচনা করেন।
শামসুল আরেফীনের লোক-বিষয়ে প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হলো-
১.আস্কর আলী পণ্ডিত: একটি বিলুপ্ত অধ্যায়, ফেব্রুয়ারি ২০০৬, পৃষ্ঠাসংখ্যা ১১২।
২.বাঙলাদেশের লোককবি ও লোকসাহিত্য ১ম খণ্ড, ফেব্রুয়ারি ২০০৭, পৃষ্ঠাসংখ্যা ১২৮।
৩. বাঙলাদেশের লোককবি ও লোকসাহিত্য ২য়-৪র্থ খণ্ড, জানুয়ারি ২০০৮, পৃষ্ঠাসংখ্যা ২৪০।
৪. আস্কর আলী পণ্ডিতের দুর্লভ পুঁথি জ্ঞানচৌতিসা ও পঞ্চসতী প্যারজান (সংগ্রহ ও সম্পাদনা), ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠাসংখ্যা ২৮০।
৫. বাংলাদেশের বিস্মৃতপ্রায় লোকসঙ্গীত ১ম খণ্ড, ফেব্রুয়ারি ২০১২, পৃৃষ্ঠাসংখ্যা ৪৩২।
৬. বাঁশরিয়া বাজাও বাঁশি (পল্লীগানের গ্রন্থ), ২০১২ সালে ‘বাংলাদেশের বিস্মৃতপ্রায় লোকসঙ্গীত ১ম খণ্ড’ গ্রন্থভুক্তির মাধ্যমে প্রকাশিত।
৭.আস্কর আলী পণ্ডিত: ৮৬বছর পর (সংগ্রহ ও সম্পাদনা), ফেব্রুয়ারি ২০১৩, পৃষ্ঠাসংখ্যা ১৬০।
৮.আঠারো শতকের কবি আলী রজা ওরফে কানুফকির, ফেব্রুয়ারি ২০১৭, পৃষ্ঠাসংখ্যা ১২০।
৯. কবিয়াল মনিন্দ্র দাস ও তাঁর দুষ্প্রাপ্য রচনা, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, পৃষ্ঠাসংখ্যা ১৯০।
১০.গাঙ্গেয় বদ্বীপের অনন্য সঙ্গীতজ্ঞ: স্বপন কুমার দাশ (সম্পাদনা), সরগম একাডেমি, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠাসংখ্যা ৩২।
১-৯ নং গ্রন্থ প্রকাশিত হয় চট্টগ্রামের বলাকা প্রকাশন থেকে। গ্রন্থগুলোর প্রত্যেকটি খুবই মূল্যবান ও আলোচনার দাবিদার হলেও এখানে ‘আঠারো শতকের কবি আলী রজা ওরফে কানুফকির’ সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলা যাক। চট্টগ্রামের আনোয়ারার ওষখাইন এলাকা নিবাসী আলী রজা (১৭৫৯-১৮৩৭) আঠারো শতকের স্বনামধন্য কবি। ৩৬ বছর আধ্যাত্মিক সাধনা করে উঁচু স্তরের সাধকে পরিণত হওয়া এই কবি অনেক পুঁথি রচনা করেন। এক্ষেত্রে তাঁর রচিত পুঁথির মধ্যে ১. জ্ঞানসাগর ২. আগম ৩. ষটচক্রভেদ ৪. ধ্যানমালা ৫. সিরাজ কুলুপ ৬. যোগকালন্দর ৭. শাহনামা (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড) ৮. রাগতাল নামা ৯. ইসলাম নামা ১০. খাবনামা ১১. সৃষ্টিপত্তন ১২. হাতেম তাঈ ১৩. তাওফায়ে হেদায়তুল এজাম ১৪. আওরাদে আছানি ১৫. ছালাতুল মোক্তাদি ১৬. রফিকুচ্ছালেকীন ১৭. কিতাবে জরুরে মুকাল্লেদ ১৮. কিতাবে তাজহিজে তাকদ্বীন ১৯. আহকামুচ্ছালাত ২০. তাওফায়ে মকবুল ও ফজায়েলে রাসুল ২১. কিতাবে চেহেল হাদিছ ও মছায়েল ২২. খোতবায়ে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা ২৩. বয়ানে শবে বরাত ও শবে ক্বদর ২৪. রাহাতুর রুহ্‌ ২৫. তারিফে রাসুল ২৬. যোগ সাধন ২৭. তনের বিচার ২৮. জ্যোতিষ নামা ২৯. রাগনামা ৩০. অমরসিং প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
শামসুল আরেফীন ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে আলী রজার মৃত্যুবরণের প্রায় ১৮০ বছর পর, ২০১৭ সালে তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করে তাঁর জীবন, রচনা ও কর্ম নিয়ে ‘আঠারো শতকের কবি আলী রজা ওরফে কানুফকির’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ও কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. আবুল কাসেম গ্রন্থটি সম্পর্কে বলেছেন: “আলী রজা ওরফে কানুফকির রচিত পুঁথি-পদ সংগ্রহের মাধ্যমে আঠারো শতকের কবি হিসেবে তাঁকে আবিষ্কার করেন মুন্সী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। ১৯১৭ সালে কলকাতা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে সাহিত্যবিশারদের সম্পাদনায় আলী রজার জ্ঞানসাগর পুঁথিটি প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ড. আহমদ শরীফ এই কবির আরও কয়েকটি পুঁথি সম্পাদনা করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই কবি ও তাঁর রচনা নিয়ে কোন আলোচনা বা গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ হয়নি বললে চলে। সে-দৃষ্টিকোণ থেকে শামসুল আরেফীনের এ-গ্রন্থই প্রথম। এ-গ্রন্থে আলী রজার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, এছাড়া আলী রজার রচনার আলোকে তাঁর তত্ত্ব বা দর্শন উপস্থাপিত। এ কাজে আরেফীনকে ক্ষেত্রগবেষণারও আশ্রয় নিতে হয়েছে। ফলে বলা যায়, এ-গ্রন্থ প্রণয়ন করে আরেফীন বাংলা সাহিত্যের জন্য একটি বড়ো কাজ করলেন এবং বাংলা সাহিত্যের বোদ্ধাপাঠকসমাজ ও গবেষকবৃন্দকে আলী রজা ও তাঁর রচনা সম্পর্কে অনেককিছু জানার সুযোগ করে দিলেন। পরিশ্রমী গবেষক আরেফীন ইতোমধ্যে লোকসাহিত্য বিষয়ে অনেকগুলো গ্রন্থ প্রণয়ন করে খ্যাতি অর্জন করেছেন। মনে করি, তাঁর এ-গ্রন্থও ব্যাপক প্রচার-প্রসার পাবে এবং তিনি উপযুক্ত মূল্যায়ন পাবেন।”
বলা বাহুল্য, শামসুল আরেফীন বিস্মৃত ও বিলুপ্তপ্রায় শতাধিক লোককবি আবিষ্কার এবং এঁদের রচনা সম্পাদনা করার কারণে কেবল দেশে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পেয়েছেন সুনাম ও প্রশংসা। কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস জোসেফ টিও কনেল, যিনি বর্তমানে প্রয়াত, তাঁর লেখা এক চিঠিতে (রচনাকাল ১১/৩/১২) শামসুল আরেফীনের ‘বাঙলাদেশের লোককবি ও লোকসাহিত্য ১ম খণ্ড‘, ‘বাঙলাদেশের লোককবি ও লোকসাহিত্য ২য়-৪র্থ খণ্ড‘, ‘আস্কর আলী পণ্ডিতের দুর্লভ পুথি জ্ঞান চৌতিসা ও পঞ্চসতী প্যারজান’, ‘বাংলাদেশের বিস্মৃতপ্রায় লোকসঙ্গীত ১ম খণ্ড‘ এবং ‘আস্কর আলী পণ্ডিত: একটি বিলুপ্ত অধ্যায়’ পাঠ করে বলেন: ‘বইগুলো দুর্দান্ত, পরিশ্রমলব্ধ ও আন্তরিক কাজ।’ তিনি চিঠিতে মন্তব্য করেন: ‘বইগুলো বাংলা সাহিত্যের সম্পদ, হীরার খনি।’
জোসেফ টিও কনেল ভাল বাংলা জানতেন এবং লিখতে পারতেন। তাঁর লেখা চিঠিটি পরবর্তীতে একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রসঙ্গত, শামসুল আরেফীন লোকগবেষক হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর প্রথম গ্রন্থটি ছিলো বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান কথাশিল্পী আহমদ ছফাকে নিয়ে। ২০০৪ সালে চট্টগ্রামের বলাকা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত গ্রন্থটি সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক (বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস) ড. আনিসুজ্জামান লিখেন: “ ‘আহমদ ছফার অন্দরমহল’ বইতে শামসুল আরেফীন প্রাথমিক উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তার জীবনকাহিনী পুননির্মাণ করার চেষ্টা করেছেন এবং আহমদ ছফার পত্রগুচ্ছ সংকলন করে তার মানসপ্রকৃতি উদ্ঘাটনের প্রয়াস পেয়েছেন। এ-ধরনের উদযোগ অল্প সময়ে সমপূর্ণ হওয়ার নয়, তবু তার মূল্য আছে”। গ্রন্থটি আহমদ ছফার প্রথম জীবনী ও পত্রসংকলন।
শামসুল আরেফীনের ‘রুবাইয়াত ই আরেফীন’ ও ‘সূর্য-পুত্র’ নামে দু’টি কাব্যগ্রন্থ এবং ‘বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার দুর্লভ দলিল’ নামে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণাকে কেন্দ্র করে একটি গ্রন্থও রয়েছে। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের বলাকা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ে তাঁর দু’টি গবেষণা-গ্রন্থ ‘কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র ও স্বাধীনতা ঘোষণা’ এবং ‘কালুরঘাট প্রতিরোধ যুদ্ধ ও অন্যান্য’। শামসুল আরেফীন ‘এনসাইক্লোপিডিয়া অফ বাংলাদেশ ওয়ার অফ লিবারেশন প্রজেক্ট, এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বাংলাদেশ’ কর্তৃক নিযুক্ত মুক্তিযুদ্ধের তথ্যসংগ্রাহক ও গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। গ্রন্থদ্বয় এই কাজেরই ফসল। আমাদের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে শামসুল আরেফীনের কাছ থেকে আমরা লোকগবেষণাসহ অন্যান্য বিষয়ে আরও অনেক ভালো ভালো গ্রন্থ পাবো।

x