শান্তি দ্বীপের ইঁদুর

সাইমুন পাশা মামুন

বুধবার , ১৬ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৬:০২ পূর্বাহ্ণ
47

অনেক দিন আগের কথা। একটি দ্বীপ ছিল ঠিক নদীর মাঝখানে। দ্বীপটি ছিল গাছ-গাছালি আর বন জঙ্গলে ভরা। মহা আনন্দের এ বনে বাস করতো লাল টুক টুকে ঠোঁট সবুজ পালকের টিয়ে। ফুলপরীদের মত রঙ বেরঙের ময়ূর-ময়ূরী। দুষ্টু বানর, বুদ্ধিদীপ্ত শেয়াল, হাতি, মহিষ, টুনটুনি, ইঁদুরসহ আরো অনেক বন্যপ্রাণী। ওরাই এ বনের শান্তিপ্রিয় অধিবাসী। সবাই শান্তিতে বসবাস করতো বলে, এ দ্বীপের অপর নাম শান্তি দ্বীপ। এখানে রাজত্ব করতো এক বুড়ো হুতুম পেঁচা।
তখন এ বনে একটা পরিবেশ ছিল। শিক্ষার পরিবেশ। সবাই লেখাপড়া করতো। বনের ছোট ছোট শিশুরা সকাল বেলা নাচতে নাচতে স্কুলে যেত। আর বিকাল বেলা গাইতে গাইতে বাসায় আসতো। বনের বড় বড় গাছের কোটরে গড়ে উঠেছিল পাঠাগার। বনের ছোট, বুড়োরা সময় পেলেই পাঠাগারে আসতো। বই পড়ে সময় কাটাতো। এভাবে বই পড়ে জ্ঞান অর্জনে সবার চেয়ে এগিয়ে ছিল হুতুম পেঁচা। এজন্য জ্ঞানীর প্রতি সম্মান দেখিয়ে এ বনের সকলে পরম শ্রদ্ধার সাথে বুড়ো হুতুম পেঁচাকে রাজা মেনে নিল। বনে সবার মনে ছিল আনন্দ।
কিন্তু এ বনেরই ইঁদুরের পরিবার ছিল একেবারে সেকেলে। বনের প্রতি পরিবারে আছে একটি কি দুইটি সন্তান। তবে ইঁদুরের ঘরে আট/দশটা বাচ্চা। তার উপর আবার বাচ্চারা স্কুলে যেতে চায় না। স্কুলেই বা যাবে কিভাবে। স্কুলের আর সবাই কত সুন্দর সুন্দর জামা-কাপড় পরে স্কুলে আসে। তাদের টিফিন বক্সে থাকে মজার মজার নাস্তা। কিন্তু ইঁদুরের বাচ্চাদের গায়ে ছেঁড়া কাপড়। জুতা ছেঁড়া, টিফিনও নিতে পারে না। কিভাবেই বা পারবে? কথায় আছে না! “এক মুখ সোনা দিয়ে ভরা যায় আর দশ মুখ ছাই দিয়েও ভরা যায় না”।
একজনের রোজগার, তার উপর বউ এবং দশটি বাচ্চা। তাই ইঁদুরের বাচ্চারা সারাদিন পিল পিল, কিল কিল, পাই পাই, খাই খাই করে। বেচারা ইঁদুর সারাদিন কিছু রোজগার করার চেষ্টায় থাকে। নেংটি ইঁদুর, একেতো অসুস্থ শরীর, তার উপর এতগুলো বাচ্চা। অল্প বয়সেই সে বুড়ির মত ঘরে শুয়ে থাকে।
ইঁদুরের বাচ্চারা খিদার সময় খাবার না পেয়ে অমুকের গাছের আমটা, তমুকের গাছের জামটা, পেয়ারা পেড়ে খায়। আর রাজা হুতুম পেঁচার কাছে রোজ আসে নালিশ। গত ক’দিন আগে রাজার নিজের গাছের কাঁচা ডালিম পেড়ে খেয়েছে ওরা। অন্যদিকে গাছের ফলমূল নষ্ট করেই যে ক্ষান্ত হচ্ছে তেমনটাও নয়। সারাদিন হৈ চৈ, মারামারি, চিৎকার করে বনে তোলপাড় সৃষ্টি করে।
সেদিন টুনটুনির মেয়েটার ভীষণ অসুখ। সে কি হাড় কাঁপানো জ্বর! ডাক্তার বলেছে একটু কোলাহলমুক্ত জায়গায় বিশ্রাম নিতে। যেই না মেয়েটার একটু ঘুম আসলো অমনেই ওদের চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল ওর। বুকটা ধুক ধুক করতে লাগলো। মুর্ছা যাওয়ার মত। ওদের অত্যাচারে সকলে অতিষ্ঠ হয়ে পড়লো। যেন শান্তির দ্বীপ অশান্তির দ্বীপে পরিণত হল। তাই একদিন সকলেই মিলে রাজার কাছে নালিশ দিল ইঁদুরের বিরুদ্ধে।
শীতের প্রায় শেষ একদিন বিকেল বেলা। অনেক গাছের পাতা পড়েছে ঝরে। প্রায় সবার মনও নেই ভাল। তার উপরে ইঁদুরের বাচ্চাদের অত্যাচার। তাই রাজা সকলকে ডাকলেন। আর যে যার মত উপস্থিত হল ইঁদুরের বিরুদ্ধে নালিশ নিয়ে। সবার অভিযোগই রাজা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন।
কিছুক্ষণ নীরব ভেবে তারপর ইঁদুরকে ডেকে বললেন, তুমি সবই শুনেছ। যার একটি কথাও অসত্য নয়। বৃদ্ধ ইঁদুর দুই হাত সামনে জোড় করে, লেজ গুটিয়ে মাথা নত করে সব স্বীকার করলেন। কাঁদো কাঁদো সুরে বললেন, মহারাজ! আপনি বলে দিন আমি এখন কি করবো!
এবার রাজা সবার উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরাতো সবাই শুনেছ বৃদ্ধ ও অশিক্ষিত ইঁদুরের কথা। এখন কি করা যায়? ওতো ভুলই করে ফেলেছে। তোমরা যা সিদ্ধান্ত দেবে ওকে তাই করতে হবে। এ সময় গায়ে কাঁদা মাখান মহিষ সামনের দুই পা জোড় করে মাথা নত করে কিছু বলার অনুমতি চাইলো রাজার কাছে। রাজা কিছু বলতে না বলতে খরগোশ মাথা উঁচু করে মহিষদের দিকে তাকালো। মুখে ভ্যাংছি কেটে নাক রুমাল দিয়ে ঢেকে বলে, তোমার গায়ে ভীষণ গন্ধ! আর তুমি সারাদিন মাথা নিচু করে খাও ঘাস। তুমি আবার কি বলবে বাপু?
এইতো আমি অনেক সুন্দর। আমার অনেক বুদ্ধি। যা বলবো আমিই বলবো। আর অমনি কচ্ছপ খোলস থেকে মাথা বের করলো এবং খরগোশের মুখের উপর বলে দিল, হ্যাঁ দেখেছি না! তোমার কত বুদ্ধি! এই বেশি বুদ্ধির কারণেইতো তুমি সেদিন আমার কাছে হেরেছো। অমনি সভার উপস্থিত সকলে হু হু করে হেসে উঠলো। লজ্জা পেয়ে খরগোশ একেবারে মাথা নিচু করে চুপসে গেল। এ সময় রাজা হুতুম পেঁচা সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলবো, কি ব্যাপার! এরই মধ্যে তোমরা ঝগড়া শুরু করলে! না, না, এটা ঠিক নয়।
পরে মহিষের দিকে চেয়ে রাজা বললেন, তুমি কি বলতে চাও ? নির্ভয়ে বল। তখন মহিষ তার গায়ের দুর্গন্ধ ও ময়লার জন্য একটু লজ্জা পেল। কিন্তু কাদা না থাকলে যে, গা টা গরমে পুড়ে যায়। আর লোমও বেশি নেই গায়ে। তবুও সব লজ্জার কথা ভুলে গিয়ে মোটা গলায় বলে, মহারাজ, আমি সব শুনেছি। ইঁদুরের কথাও শুনেছি। বেশি সন্তানের জন্য একটি সন্তানকেও ইঁদুর ভালো বানাতে পারে নি। এ অবস্থায় ওরা এ শিক্ষিত সমাজে থাকলে বনের সকলের শান্তি নষ্ট হবে। আমি বলি এই বনের পশ্চিম পার্শ্বে নদী। তার অপর পার্শ্বেই একটি ছোট্ট দ্বীপ। ওখানে প্রচুর খাবার আছে এবং লেখাপড়ার সুযোগ আছে। তাই শীতের সময় ভিন দেশ থেকে অনেক অতিথি নানা রঙের পাখিরা আসে। তারা অ, আ, ক, খ শিখে, শিক্ষিত হয়ে আবার নিজ দেশে ফিরে যায়। ইঁদুরেরাও ওখানে গিয়ে হৃষ্টপুষ্ট হতে পারবে। লেখাপড়া শিখেও ইঁদুরের মত ইঁদুর হয়ে পুনরায় এই শান্তির দ্বীপে আসবে। তখন আর কারো অসুবিধা হবে না।
মহিষের কথা শেষ হতে না হতেই, সবাই হাততালি দিয়ে রাজাকে বুঝিয়ে দিলেন, হ্যাঁ, মহিষের প্রস্তাবটাই সঠিক। রাজা খরগোশের দিকে তাকালেন। খরগোশও কাঁচুমাঁচু গলায় বললো, হ্যাঁ মহারাজ এটা উত্তম প্রস্তাব। পরে রাজা হুতুম পেঁচা ইঁদুরকে ডেকে বললেন, আগামী দিন সূর্য উঠার আগে তুমি তোমার পরিবার নিয়ে এ বন ছেড়ে পাশের চরে চলে যাবে। যেদিন বাচ্চাদের লেখাপড়া শিখিয়ে ইঁদুরের মত ইঁদুর বানাতে পারবে সেদিন আবার তোমরা এই শান্তির দ্বীপে ফিরে আসবে। আমরা তোমাদের অপেক্ষায় থাকবো।

x