শান্তনু বিশ্বাস : নও কাছে নও দূরে

রোকসানা বন্যা

বুধবার , ১৭ জুলাই, ২০১৯ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ
57

কীভাবে শুরু করবো আপনাকে নিয়ে ভেবে পাচ্ছি না। কিন্তু আপনাকে নিয়ে লিখতে চাই, বলতে চাই। এতো সমৃদ্ধশালী যে মানুষটি তাকে নিয়ে লেখাটা আমার মতো মানুষের পক্ষে সাহস করাটাই দুঃসাহসিকতা দেখানো। মন মানছে না। আপনার কথা বলতেই হবে আমাকে।
আমি আপনাকে চেরাগী বা শিল্পকলায় দেখিনি। ওখানে আমার যাতায়াত ছিলো কম। আপনাকে দেখেছি প্রথম বিশুদার বাসায়। বিশুদা দাওয়াত করলেন আমাদের। উপলক্ষ্য কী জানতে চেয়েছিলাম। বললেন, কিছু না, আমার দুই বন্ধু আসবে তাই আপনাদের বলছি। তখন আমরা আর বিশুদারা আলকরণেই থাকতাম। একটু অস্বস্তি লাগছিলো। ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই আপনার চোখাচোখি হয়েছিলো। পরিচয় করিয়ে দিলেন আপনার সাথে, শুভ্রাদির সাথে, রুপালি দিদির সাথে। সনটা হয়তো ৯৪/৯৫ দিকে হবে।
আমি সেই প্রথম আপনাকে দেখলাম। আড্ডা চলছিলো। আমি মুগ্ধ হয়ে সেই আড্ডার খুনসুটি দেখছিলাম। আমার খুব ভালো লাগছিলো সে সময়টা। একবার বাদল, বিশুদা, খালিদভাই, এজাজ মাহমুদ নেপাল, দার্জিলিং ভ্রমণে গেলো। ভ্রমণ শেষ করে বাড়িতে এলো। কথা প্রসঙ্গে বাদল বললো, ওনাদের বাসায় আসতে বলি। খালিদ ভাইকে বলার পর উনি বললেন, আমার বাসায় করি। সেইখানে আবারও আপনাকে দেখলাম। তারপর শুরু হলো আমার বাসায়, বিশুদার বাসায়। সে-ই শুরু। এটা কোনো সময়ে ৬ মাসে গিয়ে, অথবা কোনো উপলক্ষ্যে আড্ডাটা জমে উঠলো। মাস যায়, বছর যায়। আমাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। বন্ধুত্বের পরিধিও বেড়েছে। সময়ের সাথে সাথে আপনি আড্ডার শিরোমণি হয়ে উঠলেন। সময় গড়িয়ে যায়। আপনার বলার ভঙ্গি, কথায় শব্দের গাঁথুনি দেখছি, শুনছি আর মুগ্ধ হচ্ছি। আমাদের বন্ধুত্বের বিশালতা বাড়লো। আড্ডা, গান থাকতো আপনাকেই ঘিরে।
শামুদা আপনি যখন ফোন করতেন রিসিভ করতেই ওপার থেকে সুর গুনগুন করতো। আমি হাসতাম আর মনে মনে চাইতাম আরো কিছুক্ষণ চলুক। আপনি কথায় চলে যেতেন। ওটাও ভালো লাগতো শুনতে। আপনি বলতেন, আমি হেসেই যাচ্ছি। কতো সুন্দর করে বলতেন! সবসময়ে গুনগুনিয়ে গান করছেন, আড্ডা দিচ্ছেন, টিপটপ ভঙ্গিতে কথা বলছেন। কখনও নাটকের কথা, কখনও গানের কথা, কখনও বা পুরনো কোন বন্ধুর কথা শুনতে শুনতে আমি যেন অন্য এক মানুষ হয়ে উঠছি। আপনার কথা বলা যেন এক একটা পারফর্ম । বাস্তব যা, মঞ্চও তা। কোন ভনিতা নেই।
আমার ঘর আপনাদের ঘর হয়ে উঠলো। যখন তখন, সময় অসময়ে আপনার আসা যাওয়া বেড়ে গেলো। উছিলা পেলেই আড্ডা। খাওয়া দাওয়া। শুভ্রাদি কতবার বকেছে আপনাকে, আমার কষ্ট হচ্ছে ভেবে। আপনি বলতেন, আমি সব নিয়ে আসবো। আমাকে ফোনে জানাতেন ম্যানেজ করো শুভ্রাকে। বলো বিশু, ফারহানাকে। আমার চোখে মুখে খুশির রেখা ভেসে ওঠতো। আমার আয়োজন করতে কোনো কষ্টই লাগতো না তখন। আপনি সবার আগেই চলে আসতেন। দরজা খুলে সে-ই হাসি দেখতাম। এতো সুন্দর আপনার হাসি। গান শুনতে চাইতাম আড্ডার ফাঁকে। গানের মাঝে গান হয়ে ওঠার গল্প শুনতাম। প্রতিবার একই গল্প আপনার বলাতে ভিন্নতা পেতো। গানের গল্পের দুঃখবোধে মন খারাপ হতো, আবার কোনো সময়ে হেসে লুটোপুটো হয়ে যাচ্ছি। মুগ্ধতা ঘিরে থাকতো আপনার বলা নিয়ে। আপনার স্বাভাবিক ভঙ্গি ছিলো অভিনয় ভঙ্গি। যেমন বলেন তেমনিই।
আপনি আমার শুধু বন্ধু নন, একজন অভিভাবকের স্থান নিয়ে ছিলেন নিজ দায়িত্বে। সবসময়ে পাশে থেকেছেন দুঃসময়ে। আশ্বস্ত করেছেন, আমি আছি তোমার সাথে। আমি আপনাকে দেখে চলতে শিখেছি, ভালোমন্দ বুঝতে শিখেছি, নিজেকে গড়ে নিতে, স্বাধীনভাবে চলতে অনুপ্রেরণা পেয়েছি। বিদেশ যাওয়া সে আপনিই আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। রাতদিন বাসায় সেই কাজগুলোর জন্য কতবার এসেছেন এই সিঁড়ি ডিঙিয়ে। কোথাও আমাদের ফেলে বেড়াতে যেতে চাইতেন না। বুঝিয়ে বাধ্য করতেন যেতে।
শামুদা আপনাকে নিয়ে লিখতে গেলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লাগবে। এতো দীর্ঘভ্রমণে আপনাকে ছুঁয়ে থাকতে পেরেছি সেটাই আমার অহংকার। আমি আপনার মতো এতো পরম বন্ধুকে হারাতে চাইনি। কেন এমন হলো? একটু যদি বলতেন রাতে আজ হয়তো অন্যরকম হতো। আপনার যাওয়ার স্মৃতিপথ আজীবন মনে থাকবে। আপনি একদম ভালো করেননি এভাবে চলে গিয়ে। সেদিন ফারহানা বলছিলো, আর আসবো না আপনার ঘরে। আমার বুকের ভিতরটা ভেঙে যাচ্ছিলো তখন। আপনি তো জানেন আমি কত ভালোবাসি আপনাদের। কীভাবে আপনাকে ছাড়া আমার ঘরটা পূর্ণ হবে? কে বলবে চা দাও তো আমাকে। বড় মগে আপনাকে চা করে দিতাম। মগটাও চেয়ে আছে কবে আসবেন আপনি। যে সোফায় বসতেন আপনাকে বিদায় দিয়ে এসে দেখি সেও কাঁদছে খুব। এতো প্রিয় ঘর ছিলো আমাদের এই ঘর আপনার। যে শুক্রবারে আপনি চলে গেলেন ঠিক তার আগের শুক্রবারে ফোন করে জানালেন শুভ্রাদিকে নামিয়ে বাসায় আসবেন। এলেন, খেলেন, গল্প করলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আমি একটুও টের পেলাম না এই যাওয়া আপনার শেষ যাওয়া হবে। এমন কী বয়স হলো যে আপনাকে এতো তাড়াতাড়ি চলে যেতে হবে। এতো নিয়ম মেনে চলা আপনি, সে আপনিই চলে গেলেন! সারা ঘর জুড়ে শূন্যতা। আমাদের ছাদের একটা অংশ দেবে গেছে। কারো কি নজর পড়েছিলো আমাদের অতি আনন্দে?
আমি আর কখনও বলতে পারবো না শামুদা গান করেন।লিরিঙ মনে থাকতো না আপনার। কতবার বকেছি আমার প্রিয় গানগুলি মুখস্থ করতে। শামুদা, আমার এখন শুধু ভয়। হারানোর ভয়। আমার এই ঘরে একটা শূন্যতা থেকেই যাবে আজীবন। কেন! কেন? “আমার সকাল বেলার পাখি দেখা হলেই বলিস তাকে, / শুধু কি নাম ছু্‌ঁয়েছুঁয়ে আমি কেমন করে থাকি। কেন এমন করে টানে কোন ভুলে যাওয়া গানে, / আমার স্বপ্ন গেরস্থালি তবুও একলা লাগে খালি। আমার মাঘ নিশিথের পাখি, দেখা হলে বলিস তাকে/ শুধু রাতের তারা গুণে আমি কেমন করে থাকি”।
১২ জুলাই আমাদের জীবনের একটা কালো অধ্যায়। ১৩ জুলাই যখন আপনাকে শহীদ মিনার নিয়ে যাচ্ছি অঝোর বরষা তখন। রেকর্ড প্লেয়ারে বাজছে আপনারই গান। “এমন বরষা তাও নদী হলো না, রাত ছিলো চোখে, তাই ঘুম ছিলো না।
দূরে নয় কাছে থেকো বলেছো আমাকে, আলো হাসি গান যেন প্রাণ ভরে থাকে, দূর আরো দূরে গেলো, কাছে এলো না”।
ফেসবুকে পড়েছিলাম একজন লিখেছেন, ‘চট্টগ্রামের উঁচু প্রসেনিয়াম ছুঁয়ে হেঁটে যাওয়ার মানুষ আপনি’। আপনি সেইজন।
লেখক : প্রাবন্ধিক

x