শাটার-তালা অক্ষত রেখে ৩ মিনিটেই চুরি!

সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করে ১২ ধরে চলছে এ কাজ, চক্রের ১১ সদস্য গ্রেফতার

ঋত্বিক নয়ন

সোমবার , ২৬ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:১৭ পূর্বাহ্ণ
700

‘ডিউটি আছে, অফিস যাইতে অইবো। তোরা আইলে ক। তেইল্যাচোরা (তেলাপোকা) তেমন নাই। ব্যবসা অইবো। আম খাওয়ামু। নিয়া গেলে ঠোঙ্গা নিয়া আসিস। চলি আয়। গাড়ি লইয়া টান দে।’- যে কেউ মোবাইল ফোনে এমন কথোপকথন শোনে ভাবতেই পারবেন না, পরিকল্পনাকারী কোনো দুঃসাহসিক চুরির জন্য তার সহযোগীদের আসতে বলছেন। আসলে পুরো কথোপকথনে পুলিশের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য নিজস্ব ‘কোড’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন চোরের দল চুরি করাকে বলে ডিউটি। তেলাপোকা হলো পুলিশ। দোকানকে বলে অফিস। তালাকে বলে আম। কাটারকে বলে গাড়ি। চাদরকে বলে ঠোঙ্গা। দোকানের ভেতরে যে চুরির করার জন্য প্রবেশ করে তাকে বলে অফিসম্যান। সংবাদদাতাকে ডাকে লাইনম্যান, চুরির টাকাপয়সাকে বলে ব্যবসা। চুরি করা টাকা ভাগ করার সময় এক লাখ টাকাকে বলে ‘এক টাকা’। গত শনিবার নগরীর আবাসিক হোটেল থেকে গ্রেফতার হওয়া ১১ ‘চোর’ তাদের চুরির কৌশল সম্পর্কে অভিনব তথ্য দিয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, তালা না ভেঙে, শাটার অক্ষত রেখে দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে পারে এই চোরের দল। মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে চুরি শেষ করে তারা। এ চক্রের দলনেতা হানিফ। চুরির পর হানিফ দলনেতা হিসেবে তিন ভাগের এক ভাগ টাকা নেন। কামাল নেন ২০ শতাংশ টাকা। বাকি টাকা অন্যদের মধ্যে বিলি করা হয়। তবে যারা দোকানের ভেতরে ঢুকে, তাদের জন্য ‘বিশেষ বখশিস’ থাকে। গত ২৪ আগস্ট রাতে নগরীর লালদিঘীর পাড়ে তুন্নাজ্জিন নামে একটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে হানিফসহ ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এরা হলেন লিয়াকত হোসেন (২৪), মো. আকরাম (২৩), মো. তৌফিক (২৬), মো. মাসুম (২৬), নয়ন মল্লিক (২২), মো. মিলন (২৫), কামাল হোসেন (২৮), জামাল উদ্দিন (৩০) ও মো. কামাল (৩২)। তাদের কাছ থেকে দুটি এলজি ও চারটি কার্তুজ এবং একটি লোহার কাটার ও একটি লোহার রড উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে হানিফ বর্তমানে চট্টগ্রামের হালিশহর থানার নয়াবাজার ধোপাপাড়া এলাকায় থাকতেন। আর কামাল থাকতেন ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানার দরবার গলি এলাকায়। হানিফের নেতৃত্বে নয়টি চক্র দেশ জুড়ে এ কাজ করে বেড়াচ্ছে। ৯টি গ্রুপ মিলে সদস্যসংখ্যা ৫০ জন। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে হানিফ ও আরিফ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন। নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি, দক্ষিণ) শাহ মো.আব্দুর রউফ আজাদীকে বলেন, তালা কেটে কিংবা শাটার ভেঙে চুরি দেখেছি এতদিন আমরা। জানালার গ্রিল কেটে চুরির তথ্যও পেয়েছি। কিন্তু এবার তালা-শাটার অক্ষত রেখে চুরি করতে পারে এমন একটি দলকে গ্রেফতার করেছি। তারা তালা-শাটার কেটেও চুরি করে, তবে অধিকাংশ সময়ই অক্ষত রেখে চুরি করে। একটি প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ দুজন প্রবেশ করেন। বাইরে কয়েকজন পাহারায় থাকেন। চুরি শেষ করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে তাদের সময় লাগে ২ থেকে সর্বোচ্চ ৩ মিনিট।
কোতোয়ালী থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন আজাদীকে জানিয়েছেন, গত ২৭ জুন সকালে নগরীর নন্দনকাননে নিউ লাকী ইলেকট্রিক নামে একটি দোকান থেকে ক্যাশবঙের তালা ভেঙে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা চুরি হয়। এর আগে গত ২ ফেব্রুয়ারি নগরীর জুবিলি রোডের রয়েল প্লাজার তৃতীয় তলায় কাজী কম্পিউটারস নামে একটি দোকান থেকে ১২টি ল্যাপটপ, ৫২৫ পিস পেনড্রাইভ ও ৪৫০ পিস মেমোরি কার্ড চুরি হয়। এই দুটি চুরির ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলা তদন্তে নেমে আমরা একটি আন্তঃজেলা চোরের দলের সম্পৃক্ততা পাই। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখতে পাই, চোরের দল কাজী কম্পিউটারের শাটারের তালা কেটে ভেতরে প্রবেশ করেছে। লাকী ইলেকট্রিকে প্রবেশ করেছে শাটার কৌশলে ফাঁক করে। তালা না কেটে শাটার ফাঁক করে চুরির বিষয়টি দেখে আমরা অনুসন্ধানের মাধ্যমে কুমিল্লার এই চোরচক্রের খোঁজ পেয়েছি। ঈদুল আজহার বন্ধে ফাঁকা নগরীতে চুরি করতে এসে তারা হোটেলে উঠেছিল। এই বন্ধের মধ্যে ৪-৫টি চুরি করেছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা ১১ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি।
কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কামরুজ্জামান জানান, গ্রেফতার ১১ জনের মধ্যে দলনেতা বা লাইনম্যান হচ্ছে হানিফ। এক হাত পুড়ে বিকলাঙ্গে পরিণত হওয়া হানিফ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে প্রতিষ্ঠান টার্গেট করেন। কামাল এই দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড। হানিফ খবর দেন কামালকে। চুরির প্রস্তুুতি নিয়ে দলের অন্য সদস্যদর খবর দেন। বিকাশের মাধ্যমে তাদের যাতায়াত ভাতা পাঠানো হয়। হানিফ ও কামাল যৌথভাবে সবুজ সংকেত দিলেই চোরের দল অভিযানে নামতে পারে। লিয়াকত ও তৌফিক হচ্ছেন অফিসম্যান, মানে তারা দোকানের ভেতরে প্রবেশ করেন। কাটার দিয়ে তালা কাটেন কামাল হোসেন, মিজান ও মো. কামাল। বাকিরা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বাইরে থাকেন।
জিজ্ঞাসাবাদে হানিফ জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের শাটারের প্রস্থ ছোট হলে তালা কাটেন। আর শাটারটি প্রশস্ত হলে শাটার ফাঁক করে ভেতরে দু’জন ঢোকেন। তারপর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দিয়ে ক্যাশবাঙ ভেঙে টাকাপয়সা নিয়ে নেন। ল্যাপটপ পেলে সেগুলোও নেন। ২-৩ মিনিটের মধ্যে চুরি শেষ করে তারা বেরিয়ে আসেন। চুরির সময় বাইরে থাকা সদস্যরা কখনো ছাতা মেলে কিংবা কখনও চাদর বিছিয়ে মানুষের দৃষ্টি এড়ানোর জন্য বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করেন। তারা সাধারণত সকালে কিংবা রাতে চুরি করেন।
হানিফের নিয়ন্ত্রণে এই ধরনের ৯টি গ্রুপ আছে। তারা গত একযুগ ধরে চুরি করে আসছেন। গ্রুপের সদস্য প্রায় ৫০ জন। তাদের সবার বাড়ি কুমিল্লায়। তারা ঢাকার গুলশান, মহাখালী, বাড্ডা ও যাত্রাবাড়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, কুমিল্লা শহরের কোতোয়ালী, সিলেট সদর, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্থানে চুরি করেছেন বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন। দেশের বিভিন্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় বড় শোরুম, বড় কাপড়ের দোকান, বাজারের বাইরে থাকা বড় মুদির দোকান, পরিবেশক কোম্পানির অফিস, বিকাশ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানকে সাধারণত তারা টার্গেট করেন। বড় চুরি হলে হানিফ একাধিক ছোট গ্রুপকে একত্রিত করেন। তারপর চুরি করেন। কোনো একটি গ্রুপের সদস্যরা গ্রেফতার হলে অন্য গ্রুপ দিয়ে হানিফ চুরি করান। সেই চুরির টাকায় সদস্যদের পরিবার ও মামলার খরচ চালান।

x