শহর-প্রান্তিকের সাংস্কৃতিক সংযোগ

শনিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৮ at ৯:০৬ পূর্বাহ্ণ
111

যথারীতি বৈশাখী নববর্ষের জন্য তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে কদিন থেকেই। ব্যবসায়ীরা তাঁদের বিচিত্র পণ্যের পসরা সাজাতে ব্যস্ত। মুনাফার বড় একটি সুযোগ বর্ষবরণ উপলক্ষে, যেমন দেখা যায় ঈদ উৎসবে, আর বাংলাদেশে অংশত শারদীয় পূজা উৎসব ঘিরে। লক্ষ করার মতো বিষয় যে এসব উৎসব, বিশেষ করে বৈশাখী নববর্ষের উৎসব সাংস্কৃতিক চরিত্রের হওয়া সত্ত্বেও এতে বই কেনাবেচার দিকটি, বই উপহার দেওয়ার সংস্কৃতি বড় একটা জলচল নয়, বরং অবহেলিতই বলা যায়।

এ উৎসবে সাংস্কৃতিক চরিত্র অর্থাৎ গানবাজনা যতই প্রকট হোক না কেন, ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রকাশ এ ক্ষেত্রে খুবই স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তাই পারিবারিক জরিপে দেখা যায়, গৃহিণীদের যত ঝোঁক মূলত গয়নার দোকানে ভিড় জমানো। আর তরুণতরুণীদের যাত্রা প্রধানত সর্বাধুনিক ডিজাইনের পোশাক বিক্রেতার দোকানঘরে। যেখানে যত চটকদার আধুনিকতার প্রকাশ, সেখানেই তত ভিড়। জিনিসের দাম যতই হোক না কেন।

বুঝতে কষ্ট হয় না, মাত্র কয়েক দশকে বাংলাদেশি সমাজে বিত্তবান শ্রেণির কত দ্রুত কী পরিমাণ বিকাশ ঘটেছে। তা যেমন কিছু ন্যায্য পদ্ধতিতে, বেশির ভাগ অন্যায্য মুনাফাবৃত্তিতে ও সুযোগ সন্ধানে। দুর্নীতি কোথাও কোথাও অনুপস্থিত নয়, তবে রীতিসম্মত ব্যবসাও কম নয়। সুদৃশ্য চেহারার শাড়ি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, সালোয়ারকামিজ মিলে পহেলা বৈশাখপূর্ব বাজারে কেনাকাটার ধুম, বলতে হয় এলাহি কাণ্ড। এতে তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের মাত্রা কিছুটা বিস্ময়েরও বটে।

বুঝতে পারা যায়, একুশ শতকে পৌঁছে আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে অর্থনীতির তথা ব্যবসাবাণিজ্য ও মুনাফাবৃত্তির ব্যাপক সংযোগ ঘটে গেছে। সমাজের প্রধান ঝোঁকটা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক। অর্থ ও বিত্তের সন্ধানে যে প্রবলতা, তা তরুণসমাজকেও গ্রাস করেছে। অবশ্য সবাই না হলেও বলা যায় অধিকাংশই তাতে শামিল।

তারুণ্যের শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চিন্তা ও আদর্শবাদ এখন অনেকটাই পরিত্যক্ত। আধুনিক চরিত্রের বিপণিবিতানে পা দিলে তার সাজসজ্জা ও জুলুস ও নব্য আধুনিকতা চমকে দেওয়ার মতোই। কোথাও কোথাও উদ্ভাবনউৎকর্ষ যে প্রশংসা দাবি করতে পারে, এ সত্য মানতে হয়। কিন্তু অস্বীকার করা যায় না সমাজে বাণিজ্যিক মানসিকতার প্রাধান্য তরুণ থেকে বয়স্কদের মধ্যে। তাই মনে পড়তে পারে প্রাচীন শ্লোক; ‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’। এখানে অবশ্য বাণিজ্য বলতে আমরা ব্যবসাকেই বোঝাতে চেয়েছি। যে দেশে দারিদ্য বিমোচন প্রচেষ্টা ‘সামাজিক ব্যবসায়ে’ পরিণত হয়, সে দেশে এমনটাই স্বাভাবিক।

নববর্ষ উপলক্ষে সামাজিক সংস্কৃতির ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছে ব্যবসায়ীদের হালখাতা অনুষ্ঠান। এতে যতটা বৈষয়িক, তার চেয়ে সামাজিক উৎসবের ছোঁয়া অধিক। মিষ্টিমিঠাইয়ের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এক ধরনের সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত। তবে বিস্ময়কর যে এতকাল পর এত সামাজিক পরিবর্তনের ও আধুনিকতার মধ্যেও মহাজনি ব্যবসা ও তার শোষণ সমাজ থেকে দূর হয়নি।

সমাজ ও রাজনীতিতে এখন বৈশ্যতন্ত্রের প্রভাব সব সময়ের চেয়ে বেশি। এটা শুধু নববর্ষেরই বিষয় নয়, এর চরিত্র এখন সঠিক এবং আন্তর্জাতিক। এবং তা মূলত সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের ব্যাপক প্রসারের কারণে। করপোরেট পুঁজিবাদ দেশিবিদেশি দুই ধারাতেই দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে। সেই সঙ্গে যুক্ত আধুনিক প্রযুক্তির নানা অনুষঙ্গ। তাতে তারুণ্যের প্রবল আকর্ষণ। এটাই বর্তমান আধুনিকতার বড় অবদান, তা আমরা আধুনিকতার নামে যত গলাবাজি করি না কেন। সমাজের এ চরিত্র কি স্বাধীন বাংলায় আমাদের প্রত্যাশায় বা হিসাবে ছিল? নিরাসক্ত বা আবেগবহির্ভূত রাজনৈতিক চিন্তায় কোনো কোনো মানুষের বিচারবিবেচনায় তা ছিল। আর সেটাই বর্তমান বাস্তবতা।

দুই.

বর্ষবরণ উৎসবের অবশ্য অন্যদিকও আছে। আছে ইতিবাচক দিক। একদা বাংলার গ্রামে গ্রামে সংস্কৃতিচর্চার প্রধান প্রকাশই ছিল বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বৈশাখী মেলায়। এ মেলার ছিল ধর্মসম্প্রদায় নির্বিশেষে সর্বজনীন চরিত্র। শিশুকিশোরকিশোরীদের অপেক্ষার দিন যেন এই বৈশাখী মেলা অশথবটের ছায়ায়। শহরগ্রামে তখনো বৃক্ষ নিধনের তান্ডব শুরু হয়নি। তাই বিশাল গাছের ছায়া মেলায় আগত দোকানিদের এবং কেনাকাটায় ব্যস্ত ক্রেতাদের কিছুটা স্বস্তি জুগিয়েছে। গ্রামীণ বৈশাখী মেলা ছিল ছোটদের আনন্দ বিনোদনের প্রধান উৎস। আর বড়দের উপস্থিতি মূলত প্রয়োজনের তাগিদে।

বিনোদন ও প্রয়োজন, এ দুই ধরনেরই চাহিদা মিটিয়েছে বৈশাখী মেলা। যেমন মেলায় যোগ দেওয়ার আনন্দ, প্রীতি ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের ঐতিহ্যপূরণ, তেমনি প্রয়োজনীয় কেনাকাটা। মেয়েদের চুড়ি, ফিতা, অলংকার, শাড়ি ইত্যাদি, তেমনি ছোটদের বেলুন, বাঁশি, খেলনা, পোড়ামাটির ছোট ছোট মূর্তিভারি সুন্দর দেখতে লোকসংস্কৃতির কারিগরদের নিপুণ হাতে তৈরি। এজাতীয় মেলাকে প্রধানত লোকসংস্কৃতির মেলা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের শহরগ্রামে এজাতীয় মেলা অনুষ্ঠানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। লিখেছেনও এ বিষয়ে। তখনকার সামাজিকসাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি বিচারে সম্প্রীতির সম্ভাবনা মাথায় রেখে বিশেষ

করে মানুষে মানুষে প্রীতি ও সৌহার্দ সৃষ্টির বিবেচনায়। বিষয়টি এখনকার পরিস্থিতি বিবেচনায়ও সত্য।

কিন্তু গত কয়েক দশকে গ্রামের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। গ্রাম এখন আর ‘ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়’ নয়। অর্থনৈতিক মন্দার চেয়ে সামাজিকসাংস্কৃতিক মন্দা বড় হয়ে উঠেছে। গ্রাম অনেকটাই উঠে এসেছে শহরে বস্তিবাসী ও নিম্নবর্গীয়দের সংখ্যা বাড়াতে। তাদের যোগাযোগ নেই যেমন রাজধানীর বৈশাখী উৎসবে, তেমনি গ্রামের মেলায়ও নেই আগেকার জমজমাট ভাব। চরিত্র বদল ঘটেছে গ্রামেরও।

তার চেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে রাজধানীর সমাজে, যে কথা উল্লেখ করা হয়েছে আগে। শ্রেণিগত বৈষম্য অর্থনৈতিক বিচারে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে নগরবন্দরে এবং বিশেষভাবে রাজধানী ঢাকায়। তাই বৈশাখী মেলা ঐতিহ্যের টানে গ্রাম থেকে রাজধানীতে উঠে এলেও এর চরিত্র মূলত মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির। যেমন বিনোদনে তেমনি অন্যদিক থেকেও। এতে বস্তিবাসী বা নিম্নবর্গীয়দের অংশ নিতে দেখা যায় না।

সাংস্কৃতিক বিচারেও রাজধানীর বৈশাখী মেলার চরিত্র শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণিসুলভ। এখানে জনসংস্কৃতির কোনো প্রকাশ নেই। যদিও এ উৎসব উপলক্ষে অনুষ্ঠিত মেলায় দেখা যায় মাটির পুতুল, কাঠের খেলনা এবং বাঁশ বা বেতের তৈরি কারুপণ্য। বৈশাখী অনুষ্ঠানে শোনা যায় উদ্দাম গণসংগীত।

কিন্তু গণমানুষের উপস্থিতি সেখানে শূন্যের কোঠায়। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সংস্কৃতিচর্চা জনগণকে কাছে টানতে পারেনি এবং দুই সংস্কৃতিকে একাকার করতে পারেনি। অথচ এটা দরকার।

তিন

বৈশাখী উৎসব অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে আসে লোকাচার ও লোকগীতিসহ লোকসংস্কৃতির প্রসঙ্গ, যা দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিকতার নানা সংস্কৃতির আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে বর্তমান সময়ে এসে পৌঁছেছে। এগুলোকে বিধর্মী বা বিজাতীয় বলে বর্জনের যে প্রবণতা রক্ষণশীলদের মধ্যে দেখা যায়, তা যুক্তির ধোপে টেকে না। লোকসংস্কৃতি চিরদিন, সব দেশই বহু সংস্কৃতির দানে সমৃদ্ধ। এর মাটিঘেঁষা চরিত্রই বড় কথা।

মানতে হয় বাংলাদেশের গ্রাম ও গ্রামীণ মানুষ ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতিকে ধরে রেখেছে। কিন্তু বর্তমান সামাজিক রক্ষণশীলতা ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক অবস্থায় লোকসংস্কৃতির চর্চা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। সামাজিক আচারে এর কিছু কিছু বেঁচে থাকলেও তা ক্রমেই বিলুপ্তির মুখে। দোতারাএকতারায় গ্রামে গ্রামে লোকগীতির ঝঙ্কার এখন বড় একটা শোনা যায় না। তেমনি অবস্থা ভাটিয়ালিভাওয়াইয়ার করুণ সুরের মূর্ছনা বা মরমী গানের সাধনা।

অন্য অনেক ক্ষেত্রে গ্রামের অনেক কিছু যেমন শহরে উঠে এসেছে তেমনি এসেছে বা নতুন করে রাজধানীতে শুরু হয়েছে লোকগীতি বা লোকসংস্কৃতির কিছু চর্চা। এ পর্যায়ে গ্রাম কিন্তু নিঃসঙ্গ। যেমনঅনেকটা দেখা যায় গ্রামে বর্তমান বৈশাখী নববর্ষের অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে। গ্রামের এ সাংস্কৃতিক নিঃসঙ্গতার অবসান ঘটাতে হবে।

বৈশাখী নববর্ষের মতো লোকসংস্কৃতিও বিশেষভাবে লোকগীতির চর্চায় গ্রামনগর একাকার করতে হবে। যাতে দুয়ে মিলে জাতীয় সংস্কৃতির নয়া রূপ গড়ে ওঠে। জানি না কেন রাজধানীর জাঁকজমকপূর্ণ বৈশাখী নববর্ষের অনুষ্ঠান আমাদের চেতনায় সমন্বিত সংস্কৃতি চর্চার বার্তা পৌঁছে দেয় না। কাজটা শ্রমসাপেক্ষ বলে? নাকি সাংস্কৃতিক সচেতনতার অভাবে? বিষয়টি সংস্কৃতি চর্চার ধীমানদের বিবেচনায় নিতে অনুরোধ জানাই।

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

x