শস্যের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে শুধু যান্ত্রিকীকরণ নয় প্রতিটি পর্যায়ে প্রযুক্তির সম্প্রসারণও চাই

বৃহস্পতিবার , ১১ অক্টোবর, ২০১৮ at ৬:৫০ পূর্বাহ্ণ
15

দেশে গত কয়েক বছরে জমি আবাদে যন্ত্রের ব্যবহার বেশ বেড়েছে। বর্তমানে ৯৫ শতাংশ জমিতেই যন্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। তা সত্ত্বেও সেভাবে বাড়ছে না শস্য খাতে প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) সবচেয়ে খারাপ প্রবৃদ্ধি এখন কৃষি খাতের শস্য ও শাকসবজি উপখাতে। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে শস্যে প্রবৃদ্ধি ৮৮ শতাংশে নেমে আসার পর থেকে এখনো তা ১ শতাংশে উন্নীত করা যায়নি। শস্যে প্রবৃদ্ধি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে হয়েছে দশমিক ৯৬ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধি ছিল দশমিক ৯৮ শতাংশ। প্রায় এক দশক আগে ২০০৯-১০ অর্থ বছরে শস্যে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ, যদিও এখনকার মতো যন্ত্রের ব্যবহার তখন ছিল না। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্ম পাওয়ার অ্যান্ড মেশিনারী বিভাগের তথ্য বলছে, দেশে এখন ৯৫ শতাংশ জমির আবাদ হচ্ছে যন্ত্রে, যা কয়েক বছর আগেও ছিল ৯০ শতাংশ। গত এক দশকেই সবচেয়ে বেশি যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে জমি আবাদে। এ কাজে এখন দেশে প্রায় ৩৫ হাজার ট্রাক্টর সাত লাখ পাওয়ার টিলার, এক হাজার কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। পত্রিকান্তরে গত ১৮ আগস্ট এসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। খবরে বলা হয়, যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ার পরও শস্য খাতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি নানা কারণ রয়েছে বলে মনে করেন কৃষিমন্ত্রণালয়ের একজন সাবেক সচিব। তাঁর মতে কৃষক বান্ধব সরকারের গৃহীত নানা উদ্যোগ ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্বল বাজার ব্যবস্থার কারণে গতি পাচ্ছে না। এতে কৃষকরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি প্রতারিত হচ্ছেন ভোক্তারাও। শস্য খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন বাড়াতে হবে তেমনি বাজার ব্যবস্থায় প্রক্রিয়াজত ও ভ্যালু চেইনকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে। জোর দিতে হবে গবেষণা ও সম্প্রসারণে। সর্বোপরি উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষককে আরো বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
দেখা যাচ্ছে, দেশের কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়লেও এটি কেবল জমি চাষ, সেচ কিংবা বালাইনাশক প্রয়োগের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ। বীজ বপন, ফসল কাটা, মাড়াই কিংবা দীর্ঘ মেয়াদি শস্য সংরক্ষণে বহুমাত্রিক যান্ত্রিকীকরণ ব্যবস্থার প্রচলন তেমন ঘটেনি। অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে আছে। দেশটির পাঞ্জাব হারিয়ানা, মহারাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমবঙ্গের কৃষক ও দেশীয় কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও খরচ হ্রাসে সক্ষম হয়েছেন। তাই আমাদের শুধু শস্যের আবাদ নয়, বরং কৃষির অন্যান্য পর্যায়েও যান্ত্রিকীকরণ জরুরি। এ লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায় থেকে নানা উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে কৃষকদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। দেশে প্রতি বছর গড়ে যে পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়, তার মধ্যে মাঠ থেকে বাজারজাত পর্যায়ে প্রায় ১৪ শতাংশ বিনষ্ট হয়। এতে কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি শস্যের প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এটা উন্নয়নের প্রতিবন্ধক। শস্যের ফলন বাড়াতে উন্নত বীজ গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলেও ভালো বীজের অভাবে প্রত্যাশা অনুযায়ী উৎপাদন হয় না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের ভালো বীজের গুরুত্ব ও বীজ উৎপাদন সংক্রান্ত জ্ঞান সীমিত। এক্ষেত্রে কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার মাধ্যমে সহযোগিতা করতে হবে। উন্নত মানের বীজ সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করার মাধ্যমে শস্যের প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সম্ভব। কৃষকদের উৎপাদিত শস্যের নায্যমূল্য প্রাপ্তির দিকেও নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বাজারজাত ও শস্য সংরক্ষণ ব্যবস্থারও সংস্কার জরুরি। মানসম্মত গুদামজাত পদ্ধতির অভাবে বছরে অনেক পণ্য নষ্ট হয়। তাই শস্য সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করাসহ ধাননির্ভর ফসলের পাশাপাশি অন্যান্য শস্য আবাদকেও গুরুত্ব দেয়া দরকার। কৃষিযন্ত্র সম্প্রসারণ ও সহজলভ্য করার মাধ্যমে সময়মতো চাষাবাদ, উপকরণের যথাযথ ব্যবহার এবং কম সময়ের মধ্যে শস্য আহরণ করা সম্ভব হবে।
বিবিএসের তথ্যমতে, বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) সবচেয়ে খারাপ প্রবৃদ্ধি কৃষিখাতের শস্য ও শাক-সবজি উপখাতে। বিষয়টি কৃষির সার্বিক পর্যায়ে যান্ত্রিকীকরণের অভাব, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি ও কৃষকের পক্ষে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনাকে স্পষ্ট করে। কৃষি ভর্তুকির যথাযথ ব্যবহার না হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ্য। সমস্যার সমাধানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ভালো মানের বীজ ব্যবহার নিশ্চিত করার সাথে সাথে উৎপাদন-পরবর্তী ব্যয় ও শস্যের মূল্য সংযোজনের দিকেও নজর দিতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থার সংস্কারেরও প্রয়োজন রয়েছে। কৃষি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি কৃষকের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আনা জরুরি। শস্য বপন, উৎপাদন থেকে বাজারজাত করা, অর্থাৎ কৃষির প্রতিটি পর্যায়ে যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণ করতে হবে। জলবায়ু মোকাবেলা করে জমি আবাদে সবচেয়ে কার্যকর পথই হচ্ছে যান্ত্রিকীকরণ। এটি সময় ও খরচ বাঁচাতে অনেক বেশি কার্যকর। শস্যের প্রবৃদ্ধির অভাব আমদানি নির্ভরতাকে বাড়িয়ে তোলে। এটা খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়। ভুললে চলবে না যে, কৃষি আমাদের দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। তাই কৃষি খাতে ভর্তুকিসহ অন্যান্য প্রণোদনা অব্যাহত রেখে প্রতিটি স্তরে যান্ত্রিকীকরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করতে হবে।

x