শরতের গল্প

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৮:২৬ পূর্বাহ্ণ
62

ছয় ছয়টি ঋতু নিয়ে অনেক অনেক ধনী দেশের চেয়েও অনেক ধনী আমরা। এমন অহঙ্কার নিয়ে বেড়ে ওঠা শিশু দেশ নিয়ে কখনও হীনম্মন্যতায় ভুগবে না। সে অহঙ্কারের বীজ শিশুর বোধের জগতে, তার চেতনার নরম মাটিতে বুনে

দিতে হবে মাবাবাকে।

পরিপূর্ণ সৌন্দর্যে বা ঐশ্বর্যে, গাম্ভীর্যে বা চাঞ্চল্যে টানা দু’মাস আমাদের একটি ঋতুকেও আমরা পাই না। কারণ আমাদের ঋতুদের মধ্যে একে অন্যের সীমা ডিঙ্গিয়ে আসা যাওয়ার খেলাটা খুব চলে এবং আমরা তা বেশ উপভোগও করি। তাছাড়া বর্ষপঞ্জি নির্দেশিত দিন তারিখের হিসেব ধরে যথাসময়ে যথানিয়মে বাংলার ঋতুরা আসাযাওয়াও করে না। তবু জলবায়ু, জলভাগ ও বনভূমি নিয়ে পিলে চমকানো কিছু খবর যখন শুনি বা পড়ি তখন ভেবে অবাক হতে হয় এই ভেবে যে ঋতুর পালাবদলে তেমন কোনও বিপর্যয় আমরা এখনও দেখিনি। সেই সঙ্গে আমাদের শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সৃজনশীলতার চাষবাস ও ফলন দেখে ভাবি যে প্রকৃতি তার ইন্ধন ঠিকই যুগিয়ে যাচ্ছে। এমন আকালের দিনে, এখনও। তাই বলে দুর্ভাবনার কোনও কারণ নেই তাও ঠিক নয়। ক্রমশ এবং অতি দ্রুত বদলে যাওয়া সময়ের অমোঘ টানে দিশেহারা প্রজন্মের জন্য আমাদের চিন্তা হয়। বাংলার রূপে মুগ্ধ হবার মতো চোখ, স্বদেশপ্রেমে বুঁদ হয়ে থাকার মতো মন কোথায় ওদের? অথচ এমন কিন্তু নয় যে ভার্চুয়াল জগত ওদের আষ্টেপৃষ্টে বন্দী করে রেখেছে। এই শিশু কিশোরদের হাতেই দেশের নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন আমাদের ভাবুকচিন্তক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকবৃন্দ। সড়ক দুর্ঘটনায় তারেকমিশুককে হারানোর বিক্ষোভের মুখে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের ফলে প্রস্তুতকৃত ৭ বছর ধরে ফাইলবন্দী আইনের খসড়াটি সহপাঠী হারানো কিশোরদের আন্দোলনের মুখে আলোচনার টেবিলে উঠেছে। অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান বলেন, এও কি কম প্রাপ্তি? তাঁর আক্ষেপটুকু দিকনির্দেশনা হয়ে রইল আমাদের জন্য। তিনি বলেছেন, ওদের এই আন্দোলনের সঙ্গে বিশদ পরিসরে আমাদের বয়স্করা যদি পথে নামতেন তাহলে এ আন্দোলন অশ্রুপাত ও রক্তক্ষয়ে শেষ হতো না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও তাদের ছত্রছায়ায় অপচ্ছায়ার মতো অস্ত্রধারীরাও সুযোগ পেত না। (দৈনিক প্রথম আলো, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮)

ঋতুর কথায় ফিরছি। ভোরের আলো ফোটার আগে যাদের ঘুম ভাঙে এবং যারা প্রাতঃভ্রমণে অভ্যস্ত ঋতুদের আসাযাওয়ার সঙ্গে তাদের এক ধরনের চেনাজানা হয়ে যায়। কোন ঋতু কোন পথে কখন কিভাবে আসছে, যাচ্ছে রূপেরসে গন্ধে বর্ণে চলার পথে হাওয়ার দোলায় তারা ঠিকঠাক বুঝিয়ে দিয়ে যায়। না, এটুকু বোঝার জন্য বিশেষ কোনও ধরনের জ্ঞানবুদ্ধির দরকার হয় না। অনুভব করার ইচ্ছেটা থাকতে হয় এবং পঞ্চেন্দ্রিয়ের দুয়ার খুলে রাখতে হয়। তবে হ্যাঁ, ভোর বেলাটা মাহেন্দ্রক্ষণ হলেও দিনের আলোতে বা রাতের আঁধারে, পাখির ডাকে, ফুলের ফোটায় সর্বত্র, সবকিছুতে আমাদের ঋতুরা থাকে মাখামাখি হয়ে।

প্রাতঃভ্রমণে খানিকটা সোনামুখী সুঁচের মতো বৃষ্টিতে, খানিকটা কদম ফুলের পরাগ ঝরার মতো বৃষ্টিতে ঘণ্টাখানেক হাঁটার পরেও শাড়ি জড়ানো শরীর যখন আর্দ্রতার কোনও অস্বস্তিতে পড়ল না তখন ধরে নিতে হবে শরতে ডুবে আছি। ঝলমলিয়ে সূর্য ওঠা এক সকালে নগরীর উত্তর থেকে দক্ষিণপ্রান্তে ছুটতে হলো বিশেষ কাজে। ছুটির দিন বলে অবাধে ধাবমান টেক্সির খোলা দরোজা (জালি ঢাকা) পথে এই রোদ, এই ছায়া মিলে কী যে এক মায়ার খেলা খেলে গেল সারাটা পথমনে হলো, এই তো শরৎ। মেঘরৌদ্র, আলোছায়ার এমন বুনন কর্মটি অবলীলায় চলে শরতে, দিনভর।

মেঘবৃষ্টির আষাঢ়শ্রাবণের দেখা মাঝে মাঝে মেলে শরতে। কিন্তু নীলের নির্ভেজাল নীলকান্ত মণি আকাশটা, ঝলমলে ময়ূরকণ্ঠী নীলের টান টান আকাশটা শরত ছাড়া আর কার? বিশেষ করে আশ্বিনে। এ নীলের মোহনী মায়াকে প্রগাঢ় করে তোলে পুঞ্জ পুঞ্জ সাদা মেঘ। আমাদের কবি (নির্মলেন্দু গুণ) বলেন, ‘জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিলেই দেখবে আকাশ আজ দাঁড়িয়ে আছে তোমার দৃষ্টিতে পড়বে বলে।’ এমন নীলের বিপরীতেই শরতের সাদার মতো শুভ্রতা ও পবিত্রতা সম্ভব। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা দেখা ফ্ল্যাট বাড়ির জানালা বা বারান্দা থেকেও সম্ভব। তবে বিলেঝিলে, হাওরেবাঁওড়ে চাঁদমালা, শাপলা বা শ্বেতপদ্মের সাদায় যে কী আছে আমাদের আজকের শিশুরা ক’জন তা জানে বা দেখে? আসলে ঋতুবোধ, আমাদের শিশুদের মনে ঋতুবোধ জাগানোর কাজটি শরত দিয়ে শুরু হতে পারে। ফেলে আসা গ্রীষ্মের রোদের সঙ্গে শরতের রোদের এবং বর্ষার বৃষ্টির সঙ্গে শরতের বৃষ্টির তফাৎটা এই শরতেই ওদের বোঝানো যায়। কবি (অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ) বলেছেন, ‘পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার জন্য, আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য, ঋতুদের পর্যবেক্ষণ জরুরি। সৃজনশীল একটা অবিশ্রান্ত অদিগন্ত জীবনের জন্য সেটা যে কত জরুরি তার প্রমাণ স্বয়ং তিনি। জীবনস্মৃতিতে ‘অকারণপুলকে ছবি আঁকানো, গানবানানো শরতের’ কথা বলেছেন তিনি। লিখেছেন, ‘সেই শরতের সকাল বেলায় সোনা গলানো রৌদ্রের মধ্যে দক্ষিণের বারান্দায় গান বাঁধিয়া তাহাতে যোগিয়া সুর লাগাইয়া গুনগুন করিয়া গাহিয়া বেড়াইতেছি, আজি শরত তপনে প্রভাত স্বপনে কী জানি পরাণ কী যে চায়।’ পদ্মার বুকে বসে লিখেছেন,‘ এমন সুন্দর শরতের সকালবেলা চোখের উপর কী যে সুধাবর্ষণ করছে সে আর কী বলব। তেমনি সুন্দর বাতাস দিচ্ছে এবং পাখি ডাকছে। (প্রসঙ্গত বলে নিই বর্ষাশেষের প্রকৃতির শব্দগ্রহণ ও প্রেরণের ক্ষমতা সকারণেই বেড়ে যায় বহুগুণ। পাখির ডাক চেনার মোক্ষম ঋতু এই শরত)। এই ভরা নদীর ধারে, বর্ষার জলে, প্রফুল্ল নবীন পৃথিবীর ওপর শরতের সোনালি আলো দেখে মনে হয় যেন আমাদের এই নবযৌবনা ধরনী সুন্দরীর সঙ্গে কোন এক জ্যোতির্ময় দেবতার ভালবাসাবাসি চলছে, তাই এই আলো, এই বাতাস, এই অর্ধ উদাস অর্ধ সুখের ভাব, পাতা এবং ধানের ক্ষেতের মধ্যে এই অবিশ্রাম স্পন্দনজলের মধ্যে এমন অগাধ পরিপূর্ণতা, স্থলের মধ্যে এমন শ্যামশ্রী আকাশে এমন নির্মল নীলিমা।’

দিনের কাশফুল ও রাতের শেফালি ছাড়া শরতের গল্প হয় না। শেফালি তার কটকটে বৈজ্ঞানিক নামটি (নিক্ট্যান্থাস আববর ট্রিসটিস) নিয়ে আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে পারতো। কিন্তু গল্পটা যে আমাদেরও। নিক্ট্যান্থাস মানে রাতের ফুল। ‘আববরট্রিস’ বিষাদিনী তরু। এমন নামের পেছনে গ্রীক উপকথাটি অসামান্য সুন্দরী এক গ্রীক রাজকন্যার গল্প। তার ভালবাসাকে অপমান করেছে সূর্যদেব। সম্ভোগের পর মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে প্রেমাস্পদ। আত্মহত্যা করে রাজকন্যা। তার কবর ফুঁড়ে ওঠা ফুলের গাছটির ডালে ডালে ফুলে ফুলে ফোটে তার যত দুঃখ। কিন্তু ফোটে সূর্যাস্তের পরে এবং ঝরে পড়ে সূর্যোদয়ের আগে। প্রতারক প্রেমিকের মুখ সে দেখবে না। আবদুশ শাকুর এ গল্পের ভারতীয় ভাষ্যটির খোঁজ নিতে বলেছেন শিবকালী ভট্টাচার্যের ‘চিরঞ্জীব বনৌষধি’ গ্রন্থে। কোথায় পাবো সেই বই? তবে গল্পটি পেয়েছি বিপ্রদাশ বড়ুয়ার লেখায়। ভারতীয় উপকথাটিতেও শিউলির প্রেমিক সূর্যদেব। নাগরাজের কন্যা পারিজাত নায়ক সূর্যের শঠতা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে। তার প্রাণত্যাগের জায়গায় মা ধরিত্রীর বুকে জন্ম নিল একটি বৃক্ষ। রাতভর তার পাতার কোলে ডালে ডালে ফোটে রাজকন্যার দুঃখ।কিন্তু সূর্য ওঠার আগেই তাদের সবংশে ঝাঁপ দিতে হয় মরণ যমুনায়। বাঙালির বাড়ির উঠোনের এককোণে বা আনাচেকানাচে শেফালির গাছ এবং ঘরে ঘরে শেফালি বা শিউলি নামের ছড়াছড়িতে এ গল্পের কোনও অর্থবোধক ইঙ্গিত কি মেলে? ইঙ্গিত মিলুক বা না মিলুক ডালের আদরে, পাতার কোলেপিঠে বিচিত্র ভঙ্গিতে শেফালির ফোটা এবং তার বৃন্তচ্যুতির ও ঝরে পড়ার খেলাটাও ভারি সুন্দর।

নদীর ধারে কাশবন নিয়ে কবিতা কবিগুরু থেকে আমাদের অনেক কবি লিখেছেন। আবদুশ শাকুরের বর্ণনায় ‘সঞ্চরমান হাল্কা সাদা মেঘে ছাওয়া প্রগাঢ় নীল আকাশতলে কাশফুলের ছায়া পড়ে বর্ষাশেষের নদীগুলোর ভরা জলে। আকাশের পাল তোলা মেঘের বিপরীতে নদীর জলে পালতোলা নৌকা। এমনি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ক্যানভাসে ধবধবে সাদা কাশফুল দুলে দুলে জলভরা নদীর কূলে কূলে দৃষ্টিসীমার বাইরে গিয়ে এক সময় হারিয়ে যায় ঘুমঘুম অস্পষ্ট স্বপ্ন ছড়িয়ে।’ শরতের স্নিগ্ধতা ও শুভ্রতার বর্ণনা কালিদাসে বোধকরি সবচেয়ে নিবিড়। ঋতুসংহার কাব্যে শরত বর্ণনায় কালিদাস বলেছেন, (বিপ্রদাস বড়ুয়ার রচনা থেকে) ‘কাশফুল ধরিত্রীকে, চাঁদ রাত্রিকে, হংসমিথুনের দল নদীর জলকে, পদ্মফুল জলাশয়গুলোকে, ফুলের ভারে আনত ছাতিম গাছ বনপ্রান্তকে এবং মালতীফুল উদ্যানসমূহকে সাদা করে তোলে।’ অন্যত্র (কালিদাসেই) শরতকালকে সেই নববধূর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে যার মুখশ্রী প্রফুল্ল পদ্মের মতো এবং পরিধেয় বস্ত্র কাশফুলের মতো। সাদা এখানে স্নিগ্ধতাও পবিত্রতার প্রতীক বলেই মনে হয়।

ছয় ছয়টি ঋতু নিয়ে অনেক অনেক ধনী দেশের চেয়েও অনেক ধনী আমরা। এমন অহঙ্কার নিয়ে বেড়ে ওঠা শিশু দেশ নিয়ে কখনও হীনম্মন্যতায় ভুগবে না। সে অহঙ্কারের বীজ শিশুর বোধের জগতে, তার চেতনার নরম মাটিতে বুনে দিতে হবে মাবাবাকে। তারপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেবে তার ভার। নাশেখানো, নাদেখানো শিশুরা যদি বড়দের শেখাতে পারে তাহলে যথাযথ পরিচর্যায়, শিক্ষায় বড় হতে দিলে ওরা কোথায় যাবে, কি করবে ভাবতেও পারিনা। আশ্বিন সমাগত। আসুন, শরত দিয়েই শুরু করি।

x