শরণার্থী

নাসের রহমান

শুক্রবার , ৪ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:১৬ পূর্বাহ্ণ
24

সখিনা বেগমের বয়স ষাট পেরিয়েছে। সঠিক বয়স কত সে নিজেও জানে না। না জানারই কথা। বয়সের হিসাব তেমন একটা করতে হয় না। বিয়ে শাদীতে মেয়েদের বয়সের একটা কথা আসে। আর বয়স নিয়ে তেমন আলাপ হয় না। কোথাও নাম নিবন্ধন করতে হলে বয়সের প্রশ্ন উঠে। সেরকম কোন কিছুর প্রয়োজন হয় না। তবে তারে দেখলে বয়স আরো বেশী মনে হয়। লম্বা গড়নের এ মহিলার চোখে মুখে অনেক বছরের ক্লান্তির ছাপ লেগে আছে। ক্লান্তির আড়ালে হাজারো জিজ্ঞাসা যেন ভাঙা চোরা মুখখানার গহবরে লুকিয়ে আছে। গৌর বর্ণের মুখ মন্ডলে খাড়া নাকটি কিছুটা নুয়ে আছে। ঠোঁট দু’টি মাড়ির সাথে চেপে রেখেছে। লম্বাটে গলার চামড়ার ভাঁজে ভাজে বয়সের চিহ্ন বয়ে চলেছে। হাতের কোকড়ানো চামড়া আর শীর্ণ আঙ্গুলগুলো যেন বলে দেয় বয়সী এ মহিলার অতীত কেমন হতে পারে। এর গায়ে গাউন, পরনে থামি, মাথায় ভারী ওড়না। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে আছে যেন জগতের বিষ্ময় জড়িয়ে উদাস দৃষ্টি নিয়ে। কোলে অপূর্ব সুন্দর এক নবজাতক। ফুটফুটে এ বাচ্চাটির চোখেমুখে আনন্দ নেই আবার কান্নাও নেই। চোখ দুটি মিটমিট করে খুলছে আবার দিনের আলোতে পাতা যুগল যেন বার বার নেমে আসছে। চোখে সূর্যের আলো এখনো নিতে পারছে না। মাতৃত্বের অন্ধকারের খোলস কাটাতে পারেনি। হয়ত দু’একদিনের মধ্যে কেটে যাবে। চোখ দু’টি মেলে দিনের আলোর মাঝে অনেক কিছু দেখতে পাবে। নবজাতকের চেহারা কিরকম, চোখ দুটি, নাক, ঠোঁট, কান, কপাল, মুখবয়ব কার মত হয়েছে এসব এখন বুঝা যায় না। ধীরে ধীরে কয়েকদিন পর চেহারার গড়ন ঠিক বুঝা যাবে।
সখিনা বেগমের পেছনে শিশুটির মা সিতারা বেগম বসে আছে। বিষণ্নতায় ভরে আছে তার মুখ। চোখের উপর ভাসছে অবাক পৃথিবী। এমন করে দৃষ্টি মেলে আছে যেন সবকিছু দুঃখের ভেতর ডুবে আছে। এ অনন্ত দুঃখ চিরসাথী। এর ভিতর থেকে বের হওয়ার কোন পথ নেই। তার দুঃখ ভরা দৃষ্টিটা দূরে অনেক দূরে যেন নাফ নদীর সীমানা পেরিয়ে ওপারে। এ নদীর কোন কুল নাই কিনারা নাই। দৃষ্টিটা এমন যেন এর মাঝে কোন আনন্দ নেই কোন আশা নেই। সীমাহীন ক্লান্তি আর অবসাদ তার চোখে মুখে ভর করে আছে। হালকা পাতলা গড়নের কৈশোর উত্তীর্ণ এ মেয়েটির মাঝে নবজাতকের মার কোন আনন্দ নেই। এসময়ে যে মেয়েটি প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর থাকার কথা , মাতৃত্বের অপার আনন্দে বিভোর হওয়ার কথা সে কেন এ রকম নিমগ্ন হয়ে গেছে। তার চেহারায় শুধু ক্লান্তি আর বিষণ্নতার ছাপ নয় , চোখ দু’টির দৃষ্টি চিন্তা ভাবনার সীমারেখা অতিক্রম করে অন্তহীন দিগন্তের পানে ছুটে চলছে। তার পরনেও কারুকাজময় বিচিত্র রংয়ের থামি গায়ে ঢিলেঢালা বর্ণিল ব্লাউজের মত টপস আর মাথায় রঙিন ওড়না। এসব কাপড় চোপড় তারা সাহায্য হিসেবে পেয়েছে। ওড়নার ভিতর থেকে তার মাথার কালো চুল , কপাল আর মুখায়ব এমনভাবে দেখা যাচ্ছে যেন সে বহুকাল ধরে এভাবে শান্ত স্নিগ্ধতার মাঝে পুত পবিত্র হয়ে অপেক্ষা করছে। তার অপেক্ষা কিসের জন্য এবং কখন শেষ হবে কে জানে। এমন দামী সৌখিন কাপড় তারা আগে কখনো পরেনি। পিন্ধনে কমদামী সূতির ঘাগড়া আর গায়ে ঢিলেঢালা ব্লাউজ তাদের জন্য অনেক আরামের পোশাক ছিল। এরকম খাবারও তারা কখনো পায়নি। এখানকার এ খাবার তাদের ক্ষিদে তাড়িয়ে দেয় কিন্তু তৃপ্তি দেয় না। শাক মাছের ঝোল মিশিয়ে গরম ভাতের খাবার তাদের অনেক প্রিয়। তার সাথে ভর্তা হলে আর কিছু লাগে না। সেরিল্যাক, দামী বিস্কিট, চকলেট কিংবা হরলিক্‌্েরর মত সুস্বাদু স্বাস্থ্য সম্মত খাবারে তারা মোটেই অভ্যস্ত নয়। তাই এসব দিয়ে তাদের কখনো ভাতের ্‌ক্িষদে মিটে না। তারপরও খেতে হয়, বেঁচে থাকতে হয়, এ বেঁচে থাকার মাঝে কোন আনন্দ নেই, কোন তৃপ্তি নেই। এমনকি আশা ভরশাও নেই। আশা না থাকলে মানুষ বাঁচে কি নিয়ে। না, এখনো ক্ষীন আশা আছে। সেটা কিসের আশা তার জানা নেই। তবুও সে আশাই বাঁচিয়ে রেখেছে।
জীবন যে এমন হতে পারে তা কল্পনার বাইরে ছিল। সবকিছু ছিন্ন করে এখানে এসে এভাবে রাতের পর দিন কাটাতে হবে ভাবতে পারেনি কখনো। এখানে রাত আর দিন একইরকম। তেমন একটা পার্থক্য নেই। দিনের বেলা আলো আসে। রাতে অন্ধকার নেমে আসে। রাতদিন এ খুপরির ভিতর কাটাতে হয়। বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আশে পাশে সব খুপরি। টিলার ঢালে এরকম অসংখ্য ঘর সেখানে কোন মতে মাথা গুজানো যায়। এটাও কম কি। খোলা আকাশের নীচে থেকে মাথা গোজানোর ঠাঁই পেয়েছে। সুযোগ এখানে কম পাচ্ছে না। সহানুভূতিও অনেক। কিন্তু মানবেতর জীবন কেউ চায় না। আবার মরতেও চায় না। সবাইতো বেঁচে থাকতে চায়। বাঁচার জন্য এতসব আয়োজন চারিদিকে। এসব চিন্তা তাদের ভিতর খুব একটা কাজ করে না। তারা ভাবতে পারে না আর কোনদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে বলে। কোথাও কোন আশার আলো খুঁজে পায় না। সামনে যেন সীমাহীন অন্ধকার যেখানে পথ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তারপরও সব কিছু থেমে যায় না। খাওয়া দাওয়া ঝিমুনি ঘুম অলস কর্মহীন সময় ভাবনার ভিতর দিয়ে অতিবাহিত হয়ে যায়। কারো জন্য কিছু অপেক্ষা করে না। এটাই নিয়ম। এ নিয়ম সবাইকে মানতে হয়। এদের কি হবে ? এরা কি এখানে থেকে যাবে? এভাবে তাদের জীবন কাটবে। আর কতদিন থাকতে হবে। কত মাস না কত বছর এভাবে থাকবে তারা। নাকি বছরের পর বছর ধরে থেকে যাবে। কেউ কেউ বহু বছর থেকে গিয়েছে। এদের এখন আর কেউ আলাদা করে না। এরা যেন এখানকার হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এদের কি এ সুযোগ হবে। এখানে মিশে যেতে পারবে। এখন আর সে সুযোগ নেই। নাম খাতায় উঠে গেছে। এরা নিয়মিত রেশন পায়। এদের এখান থেকে বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। বাইর হয়ে কোথায় যাবে। খাওয়া দাওয়া কোথায় পাবে। আকাশের নীচে কতদিন রাত কাটাবে। তাও বলা যায় না। সিকিউরিটির লোকজন দেখলে আর রক্ষা নেই। ছোট্ট খুপরির ভিতর থাকতে হবে। এসব নিয়ে ভাবার কোন প্রয়োজন নেই। তবুও কেন যেন বার বার ঘুরে ফিরে এসব ভাবনা মাথায় এসে যায়। যতবার ভাবে এসব নিয়ে ভেবে লাভ কি। কোন কিছুইতো হবে না। তারপরেও এরকম ভাবনা মাথা থেকে দূর করতে পারে না।
ওরা যেখানে থাকতো যে গ্রামটিতে , তার কথা মনে পড়ে। জন্ম থেকে ঐ গ্রামে। শিশুকাল শৈশব কৈশোর বয়ঃসন্ধিকাল সবকিছু ঐ গ্রামটিতে। স্বপ্ন কিছু থাকলেও তাও সেখানে। চেনা জানা বলতে ঐ গ্রামের ভিতর। এর বাইরে যাওয়ার তেমন সুযোগ হয়নি। এমনকি যাওয়ার প্রয়োজনও হয়নি। কখনো দুঃখ কষ্ট আনন্দ বেদনা আবেগ অনুভ্থতির কোনটাই বুঝে উঠার মন মানসিকতা তৈরি হয়নি। গৃহস্থালি কাজে আর খেয়ে ধেয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু ছিল না। অভাব অনটনের আর ভয় ভীতির মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠা যেন ওখানকার নিয়ম রীতি। এর বাইরে কেউ ভাবতে পারতো না। ঘর বাড়ির চারপাশে ফসলী জমিতে ধানের ফলন হয় খুব ভাল। ফলমূল শাকসবজির কমতি নেই। খালে বিলে প্রচুর মাছ। তারপরও এরা অভাবের ভিতর থাকে। ফসল তোলার আগে ভাগ দিতে হয়। নইলে কেড়ে নিয়ে যায়। ফল মূল মাছও প্রতিদিন গ্রাম থেকে নিয়ে যায়। কখনো কতক দাম দেয় কখনো একেবারে দেয় না। প্রতিবাদ করার কোন সুযোগ নেই। বাধাতো দেয়া যায় না। কম বয়সী তরুণেরা মানতে পারে না কিছুতে।তারা প্রতিবাদ করতে চায়। কোন একটা ছুতা ধরে এদের ধরে নিয়ে যায়। নানাভাবে নিপীড়ন করে। চাষবাসও আগের মত হয় না, ফলন নেই। তারপরও খেয়ে পরে বাঁচতে হয়। না খেয়েতো থাকা যায় না। জমি চাষ হয় ফসল বোনে। সবুজে সবুজে ভরে ওঠে চারিদিকে। চির চেনা গ্রামটি যেন চোখের উপর ভেসে ্‌ওঠে। কিন্তু এ সময়টা বেশি দিন টিকে না। প্রতিদিন সকাল বিকাল তরুণ যুবকদের কাউকে না কাউকে ধরে নিয়ে যায়। কেউ কেউ আর ফিরে আসে না। তখন মায়াময় সবুজ গ্রামের রূপটি যেন অন্যরকম হয়ে যায়। তারপরও বাড়ীর জন্য মন কাঁদে। ঠিক বাড়ীগুলো সবুজের সাথে মিশে গেছে। সে ঘরটিতে খাবার দাবার সবসময় থাকতো না। কিন্তু অনাবিল শান্তির পরশে যেন ঢাকা থাকতো। সে শান্তিটুকু তারা কেড়ে নিয়ে যায়। ফসল কেড়ে নিয়ে যায়। হাঁস মুরগী এমনকি গবাদি পশু কোনটাই বাদ রাখে না। পুকুরের মাছ যেন তাদেরই বর্গা। তাতে অর্ধেক ভাগ পাওয়ার কথা। কিন্তু তাও হয় না। সবটাই জোর করে নিয়ে চলে যেতে চায়। বাধা দিলে উল্টোটা ঘটে। পাকা ফসলের সোনালী ধানে আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। সে আগুন কোন কোন সময় বাড়ি ঘরে এসে লাগে। এর প্রতিকার নেই কোথাও। কাউকে বলে কোন কিছু হয় না। বললে যেন বিপদ আরো বেড়ে যায়। তবুও তরুণেরা মানতে চায় না। মুখ বুঝে থাকতে পারে না। এসব কি করে সহ্য করা যায়? এরা নানাভাবে প্রতিরোধ করতে চায়, সংগঠিত হতে চায়। প্রতিবাদ করার সাহস দেখায়। কিন্তু কোন মতে এদের এক হতে দেয় না। যেন পুরো গ্রাম পাহারায় রাখে। কোন তরুণ কখন ঘর থেকে বের হয়। কোথায় যায়, কার সাথে দেখা করে এসব কিছু কড়া নজরে রাখে। লেখা পড়ার কোন সুযোগ নেই। স্কুল, মাদ্রাসা. মক্তব কিছুই গড়ে তুলতে দেয় না। এমনকি ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানও ঠিকমত পালন করতে পারে না। মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে সেখানেও যেন নজরদারি। এভাবে দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর এসব নিরীহ গ্রামবাসীর উপর অমানবিক নির্যাতন করে এদের বিতাড়িত করার চেষ্টা চালায়। প্রতি বছর অনেক পরিবার বাড়ি ঘর ছেড়ে সীমানা পেরিয়ে ওপারে পাড়ি জমায় । গ্রাম ছেড়ে বাড়ি ঘর ছেড়ে এখনো অনেকে চলে যাচ্ছে। কেউ থাকতে পারছে না বাপ দাদার বসত ভিটায়। গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে। নানান খবর আসে চারিদিক থেকে। এত বছর ফসল তুলে নিয়েছে, মাছ তুলে নিয়েছে। গরু ছাগল হাঁস মুরগী ধরে নিয়ে গেছে। এখন তরুণ যুবকদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এমন করে মারছে তারা যেন আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারে। কেউ কেউ আর ফিরে আসছে না। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কেউ বলতে পারে না। মগেরা যেন এ এলাকার মালিক। জমি জিরাত বিল ঝিলের সব কিছরু ভোগ দখল চায়। তাদের উৎপাত বহুকাল ধরে। কখনো মাত্রা এত বেশি ছাড়িয়ে যেতো এলাকায় থাকা দায় হয়ে পড়তো। মগদের উৎপাত বছরের পর বছর বাড়তে থাকে। এক সময় অত্যাচারে রূপ নেয়। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এলাকাবাসীরা প্রতিবাদ করে। এতেই আঘাতের শিকার হয় নিরীহ গ্রামবাসী। নির্মম নিষ্ঠুরতার ভিতর দিয়ে শিশু কিশোরেরা বেড়ে ওঠে। এদের ভিতরও নানা বৈপরিত্য দেখা দেয়। হাজার প্রশ্নে কৈশোর মনটা উদ্বেগে উৎকন্ঠায় ভরে থাকে। মগদের রাজত্বে তারা মনে করে এটা তাদের মুল্লুক। এখানে আর কারো থাকার অধিকার নেই। এদের সাথে যোগ দেয় পোশাকধারী বাহিনী। তরুণ যুবকদের সাথে তরুনীরা রেহাই পায় না। অমানবিকতার পাশাপাশি শুরু হয় লুটতরাজ, ধর্ষণ, হত্যা । আগুন লাগিয়ে বাড়ি ঘর পুড়ে ছাই করে দিয়ে গ্রামবাসীদের বিতাড়িত করতে চায়। গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়ে বিরান ভূমি করতে চায়। বিশাল এক বিরান ভূমি প্রয়োজন তাদের। এত বড় বিরান ভূমি দিয়ে কি করবে তারা। সখিনা বেগমের বয়সতো অনেক হয়েছে। অনেক কিছু দেখেছে তার চোখে। তার স্বামীকে গুম করেছে অনেক বছর আগে। মাটি কামড় দিয়ে ছেলে মেয়ে নিয়ে পড়ে ছিল এত বছর। ভিটে ছেড়ে কোথাও যায়নি। গ্রাম ছেড়ে পাশের গাঁয়ে , কেউবা আবার দূর গাঁয়ে চলে গেছে। কেউ কেউ অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছে। এসবে কান দেয়নি। চুপ করে সহে গেছে । একদিন দিন ফিরবে এ আশায়। না এ দিনতো আর ফিরে না। রাত যেন বাড়তে থাকে। রাত ফুরায় না আর । মেঘের আঁধারের ভিতর বসবাস, আঁধারের ভিতর বেড়ে ওঠা। বাপের কি হয়েছে তা জানে না সিতারা বেগম। কেউ বলে তাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে। কেউ বলে গুম হয়েছে। না, এসব কিছুই সখিনা বেগমকে টলাতে পারেনি। সে অবিচল থেকেছে ছেলেমেয়েকে নিয়ে। এখন কিন্তু সে আর স্থির থাকতে পারছে না। মগেরা যেখানে হন্য হয়ে খুঁজছে তরুণ তরুণীদের। তাদের হাত থেকে আর বাঁচা যাবে না। পোশাকধারীরা এদের সাথে টহল দেয়। এ পাড়া ওপাড়া এমনি করে গ্রামের পর গ্রাম তাদের ছায়ায় যেন কেঁপে ওঠে।
সখিনা বেগম কোনদিন ঘর ভিটে ছেড়ে যেতো না। সবাই চলে গেলেও সে থেকে যাবে। এ মনোভাব নিয়ে কয়েক মাস থেকেও যায়। যেদিন তার ছেলেটি ধরে নিয়ে বেদম মারধর করলো সেদিন থেকে তার ভিতরেও ভয় ঢুকে গেল। ছেলেটি বড় নিরীহ চুপচাপ স্বভাবের। কারো সাথে কখনো ঝগড়াঝাটি হয় না তার। সে ছেলেটিকে তারা এমনভাবে মারলো সে বিছানা থেকে উঠতে পারলো না আর কোনদিন। পিঠে কোমরে শরীরের নানা জায়গায় বড় বড় সব দাগ করে দিয়েছে। এ দাগ আর শুকায় না। কবিরাজের ওষুধ, মা মেয়ের সেবা শুশ্রূষা কোন কাজ হয় না। সে আর শোয়া থেকে উঠে বসতে পারে না। মা মেয়ের চিন্তার শেষ নেই। এ ঘোর বিপদের সময় তাকে নিয়ে কি করবে। প্রতিদিন ঘর বাড়ি ছেড়ে অনেকে চলে যাচ্ছে। এ পাড়া ওপাড়া হিসাব নিয়ে দেখা গেছে অনেকে চলে গেছে। কখন এসে হাক দিয়ে যায় ঠিক নেই। ভয় ভীতিতে দিন কাটে সবার। সেদিন মা গিয়েছে গরু নিয়ে মাঠে। ছেলেটি গরু দু’টিকে আগলে রাখতো এতদিন। এখন সে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। মা মেয়ে পালা করে এসব কাজ করে। হঠাৎ বাইরে কিসের আওয়াজ শুনতে পায় ভাই বোন। ভাই বিছানায় শুয়ে নিষেধ করে বোনকে বাইরে যেতে। এদের হৈচৈ বেড়ে যায়। দরজা খুলতে বলে। ভাই বোনকে দরজা খুলতে বার বার নিষেধ করে। পালিয়ে যেতে বলে। বোনটি নিজেকে আড়াল করে লুকায়ে থাকার চেষ্টা করে। এরা দরজা ধাক্কিয়ে ঘরে ঢুকে। অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে। ভাইটির গায়ে লাথি মারে। লাথির পর লাথি মেরে তাকে ঘরের মেঝেতে গড়াগড়ি দেয়ায়। বোনটি সইতে না পেরে ডুকরে কেঁদে ওঠে। কান্নার শব্দ শুনে তারা বোনটিকে টেনে হেঁচড়ে বের করে। সে ধানের মোটকার পেছনে লুকিয়ে ছিল। মেয়েটিকে পেয়ে তারা ভাইটিকে আর লাথি মারে না। লোলুপ দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকায়। হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরতে চায়। মেয়েটি চিৎকার করে ওঠে। তখন ভাইটি আর চোখ বুজে থাকতে পারে না। সিতারার গায়ের কাপড় এরা ছিড়ে ফেলে। পরনের কাপড় টেনে ধরে বিবস্ত্র করতে চায়। ভাই আর শুইয়ে থাকতে পারে না। হায়ানারা বোনটাকে জোর করে মাটিতে শুইয়ে দেয়। তখন ভাইটি কোন এক অপার শক্তি বলে তাদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বোনকে রক্ষা করতে চায়। দেরী না করে একজন তার দিকে গুলি ছোড়ে। ভাই আবার লুটিয়ে পড়ে। আর কখনো উঠতে পারে না। চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়ে। তখন উম্মাত হায়েনাদের ছোবলে অসহায় বিবস্ত্র মেয়েটি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ঘুমিয়ে পড়া ভাইটির পাশে রক্তাক্ত দেহ নিয়ে বোনটিও শুয়ে থাকে। তার উঠারও শক্তি নেই। লজ্জা আবু্রর কোন বালাই নেই। বিবস্ত্র কিশোরী মেয়েটির হুশ জ্ঞান কিছুই থাকেনা। তার চোখে মুখে সারা শরীরে রক্তের দাগ। বিভৎস অন্ধকারে সে ডুবে যায়।
গুলির শব্দে গরু মাঠ থেকে দৌঁড়াতে থাকে। পেছনে পেছনে মাও। মাঠ থেকে দৌঁড়ে এসে মা হতভম্ব হয়ে যায়। ক্ষণিক নির্বাক নয়নে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ মার বুক ফাটা আর্তনাদে আকাশ বাতাস কেঁপে ্‌ওঠে। গরুও হাম্মা রব তুলে গৃহস্থের সাথে কান্নার রোলে ভাসে। তারপরও এরা থামে না। ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। মা দৌঁড়ে ঘর থেকে মেয়েরে টানতে থাকে। আগুনের লেলিহান শিখা ঘরটির চারিপাশের বাশের বেড়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ছনের ছাউনি ঘরটিতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে। মা কোনমতে হামাগুড়ি দিয়ে টানতে টানতে মেয়েটিকে দরজার বাইরে নিয়ে আসে, গায়ে কাপড় জড়িয়ে দেয়। ছেলেটিকে আর আনতে পারেনি। ঘরের দরজায় আগুন জ্বলে ওঠে। গুলি খাওয়া ছেলেটি বাপ দাদার ভিটায় আগুন সমাধি লাভ করে। মেয়ের তখনো জ্ঞান ফিরেনি। মার শরীরে আর জোর নেই। মা মেয়ের পাশে উঠানে কাত হয়ে পড়ে যায়। যেন প্রাণহীন দু’টি দেহ নিথর হয়ে শুয়ে আছে। কেউ আর দেখারও নেই। আগুন একবার জ্বললে সে কি আর নিভে। আগুন জ্বলতে থাকে গ্রামের পর গ্রাম। এদের আর হারানোর কিছুই নেই। সব হারিয়ে তারা নির্বাক এখন। কিসের মায়ায় থাকবে। তারাতো সব হারিয়ে নিঃস্ব এখন। কোথায় থাকবে? না, কোথাও আর থাকা যাবে না। এখানে তাদের কিছুই নেই। অন্য কোথাও নেই। কোথাও কিছু নেই। শূন্য থেকে শূন্যতায় ডুবে গিয়েছে। সবাই তাদের ফেলে চলে গিয়েছে। কোন পথে গেলে এদের খুঁজে পাবে। সে পথও জানা নেই। তারপরও পাড়ি জমাতে হবে। পথ না চিনলেও খুঁজে নিতে হবে। এবার তারা বের হয়ে যায় পথের খোঁজে। হাঁটতে শুরু করে। গায়ে গতরে শক্তি নেই মনে সাহস নেই। তারপরও হাঁটতে থাকে। পথ চলা আর থামে না। পথে পথে অনেকের সাথে দেখা হয়। সবাই অপরিচিত। একের পেছনে এক লাইন ধরে হাঁটছে। কারো মুখে কথা নেই। সবার কথা যেন অনেক আগে থেমে গিয়েছে। কোথায় যাচ্ছে, কেউ জানে না। শুধু জানে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে বহুদূর যেতে হবে। এ লম্বা লাইন যেন ওপারে পাড়ি জমানোর মিছিল। প্রাণে বাঁচার মিছিল। মা ও মেয়ে যোগ দেয় শরণার্থীর এ মিছিলে।

- Advertistment -