শব্দনোঙরের তিনদিনব্যাপী বঙ্গবন্ধু আবৃত্তি মেলা

ইমরান সোহেল

বৃহস্পতিবার , ৯ মে, ২০১৯ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ
8

বাহারি ফেস্টুন, প্লেকার্ড, বাঁশীরসুর আর বৈচিত্র্যময় মুখোশ ও সাজ পোশাক, বর্ণাঢ্য র‌্যালির মাধ্যমে শুরু হয়েছিল “সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের” শীর্ষক চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আবৃত্তি সংগঠন শব্দনোঙরের তিনদিন ব্যাপী বঙ্গবন্ধু আবৃত্তি মেলার। এটি সংগঠনের ৩য় আবৃত্তি মেলা। জাতির জনকের ৯৯ তম জন্মদিনে তাকে উৎসর্গ করে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো “বঙ্গবন্ধু আবৃত্তি মেলা” নামে ৪-৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় জেলা শিল্পকলা একাডেমীর অনিরুদ্ধ মুক্ত মঞ্চে। ভারত ও বাংলাদেশের ১০০ জন বাচিক শিল্পী বঙ্গবন্ধুকে নিবেদন করে একক আবৃত্তি পরিবেশন করে। কোনো আবৃত্তি সংগঠনের আয়োজনে এক মঞ্চে এত জন আবৃত্তিশিল্পীর অংশগ্রহণ এটা দেশের প্রথমবার। আবৃত্তি মেলার উদ্বোধন করেন বরণ্য অভিনেতা, মুক্তিযোদ্ধা রাইসুল ইসলাম আসাদ। প্রধান অতিথি-ছিলেন দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম.এ মালেক, প্রধান বক্তা- বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোঃ আহকাম উল্লাহ ও বিশেষ অতিথি ছিলেন ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার অনিন্দ্য ব্যানার্জী, বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাব্যবস্থাপক নিতাই কুমার ভট্টাচার্য, প্রবর্ত্তক সংঘের সাধারণ সম্পাদক তিনকড়ি চক্রবর্তী, শৃন্বন্তু (কোলকাতা) সভাপতি নাট্যকার রতন কুমার ঘোষ, আবৃত্তিশিল্পী বেলায়েত হোসেন, টিভি সাংবাদিক আলী আহমেদ শাহীন। স্বাগত বক্তব্য দেন বেতার টিভি উপস্থাপক, লেখক দিলরুবা খানম। বঙ্গবন্ধু সুবিশাল ছবি মঞ্চের সাজকে দৃষ্টিনন্দন করে। শিল্পকলার মাঠ জুড়ে ছিল সংগঠনের কার্যক্রমের কয়েক শত ছবি নিয়ে সুবিশাল ব্যানার ও ভাষণরত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছবি। সবচেয়ে চমকপ্রদ ছিল উদ্বোধনী আবৃত্তি। খ্যাতিমান বাচিকশিল্পী হাসান জাহাঙ্গীরের “অন্তর মম বিকাশিত করো, নম নম বাংলাদেশ মম” শীর্ষ অসাধারণ আবৃত্তি শৈলীর সাথে নৃত্য পরিবেশন করেন সুরাঙ্গন বিদ্যাপীঠের নৃত্য শিল্পীরা। সাথে ছিল “অঞ্জলী লহ মোর, মঙ্গল দ্বীপ জ্বেলে, আজি যত তারা তব আকাশে” শীর্ষক সমবেত সংগীত। প্রতিবারের মত এবারও বঙ্গবন্ধু আবৃত্তি মেলায় শুভ উদ্বোধনে ছিল আবৃত্তি, গান ও নৃত্যের মেলবন্ধন। বেলুন উড়িয়ে উদ্বোধন ঘোষণা করেন উদ্বোধক রাইসুল ইসলাম আসাদ, সাথে ছিল ঢোল বাদল। উদ্বোধনী দিনে বক্তারা বলেন “আবৃত্তি শিল্পের বিকাশ ও বাংলা প্রমিত উচ্চরণে সচেতনতা সৃষ্টিতে শব্দনোঙর নিরন্তর কাজ করছে। এতে সচেতন হচ্ছে তরুণ প্রজন্মসহ অভিভাবকরা। বঙ্গবন্ধুর ৯৯তম জন্মদিনে শতাধিক বাচিক শিল্পীকে নিয়ে এতো বিশাল আয়োজন ও বঙ্গবন্ধুর নামে মেলার নামকরণ আয়োজকদের গভীর দেশপ্রেম ও সুবিবেচনার পরিচয় বহন করে। তাছাড়া শব্দনোঙর ভাষা সাহিত্য সম্মাননা ও শব্দনোঙর আবৃত্তি সম্মাননা এটাও ভাল কাজ। সংগঠন দেশের যোগ্য লোকদেরকেই এই সম্মাননার জন্য নির্বাচিত করেছে”। শব্দনোঙর ভাষা ও সাহিত্য সম্মাননা পান শহিদ জায়া লেখক বেগম মুশতারী শফী ও শব্দনোঙর আবৃত্তি সম্মাননা পান দেশবরণ্যে আবৃত্তিশিল্পী ড. ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। ১ম দিনে জাতির জনককে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে সংগঠনের উদ্বোধনীবৃন্দ আবৃত্তির ছিল হাসান জাহাঙ্গীর গ্রন্থিত ও নির্দেশিত “একটি কণ্ঠ বজ্রকণ্ঠ”। এতে সংগঠনের ২৯ জন আবৃত্তি শিল্পী অংশ নেন। মেলায় আমন্ত্রিত আবৃত্তি সংগঠন প্রমা, বোধন ও গৌরি ললিতকলা বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশন করে। অনুষ্ঠানে সার্বিক সহযোগিতা করে ভারতীয় সহকারী হাই কমিশন, চট্টগ্রাম ও শব্দনোঙর উচ্চারণ স্কুল কর্তৃপক্ষ। ১ম দিন শ্রুতি নাটক “আ মরি বাঙাল ভাষা” পরিবেশন করেন কলকাতার (ভারত) নাট্যকার রতন কুমার ঘোষ ও মিতা ঘোষ। বাচিক শিল্পী মীর বরকত, বেলায়েত হোসেনসহ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, মাগুরা, সিলেট, কুমিল্লা, ব্রাহ্মনবাড়িয়া থেকে আগত ও শব্দনোঙনেরসহ প্রায় একশ জন আবৃত্তি শিল্পী একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন। বৈচিত্র্যময় আয়োজনে ছিল রাঙ্গামাটি প্রতিরোধ সাংস্কৃতিক স্কোয়ারের নৃত্য শিল্পীদের আদিবাসী নৃত্য। “প্রমিত উচ্চারণের গুরুত্ব” শীর্ষক গম্ভীরা, শ্রুতি নাটক উচ্চরণ বিভ্রাট ও মশারি, গানের সাথে আবৃত্তি, আবৃত্তি সাথে নৃত্য, শ্রুতি নাটক হিয়ারিং এড এবং আমন্ত্রিত শিশু আবৃত্তিশিল্পীদের একক ও দলীয় পরিবেশনা। পঞ্চ কবির গান, আঞ্চলিক গান ও লোক গানে মঞ্চ মাতান বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী কল্পনা লালা, কাবেরী সেনগুপ্তা, ইকবাল হায়দার, শহীদ ফারুকী, সুপর্ণা রায় চৌধুরী ও সুকুমার দে। জাগরণ সংগীত দল ৫টি দলীয় সংগীত ছিল মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির জনককে নিবেদিত। ধন ধান্যে পুষ্প ভরা, পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠছে, নোঙর তোল তোল, কারার ঐ লৌহ কপাট।
আমন্ত্রিত ৩০ জন কবি কবিতা পাঠে অংশ নেন। কোন আবৃত্তি সংগঠনে আয়োজনে এক মঞ্চে এতজন কবির কবিতা পাঠ এটাও প্রথম। দলীয় সংগীত পরিবেশন করে স্বরলিপি সাংস্কৃতিক ফোরাম। ২য় দিন কথা সাহিত্যিক- নাট্যকার ও সাংবাদিক আনিসুল হক ছিলেন কবি সভার প্রধান অতিথি। কবি ও সাংবাদিক ওমর কায়সার এর সভাপতিত্বে ৭ জন কবি কবিতা পাঠে অংশ নেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন “বঙ্গবন্ধুর একার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তাকে ছাড়া বাংলাদেশের অস্তিত্বের কথা ভাবাই যায় না। শব্দনোঙর তিন দিনের আবৃত্তি মেলা তার নামে করে অসাধারণ একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে”। সমাপনী দিনে প্রধান অতিথি ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত, সমাজ বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. অনুপম সেন। বাচিক শিল্পী হাসান জাহাঙ্গীর এর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন নাট্যজন ও আবৃত্তি শিল্পী ও প্রশিক্ষক মীর বরকত, কাস্টমস কর্মকর্তা মোঃ নজরুল ইসলাম চৌধুরী, মোসলেম উদ্দিন সিকদার, ও সাংবাদিক আলী আহম্মেদ শাহীন।
বক্তারা বলেন “আবৃত্তিশিল্পের বিকাশে শব্দনোঙর ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। আবৃত্তি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আবৃত্তি শিল্পীরা সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে নিরলশ কাজ করছে। শব্দনোঙর আবৃত্তি চর্চার সাথে প্রমিত উচ্চারণের প্রসার ও আলোকিত মানুষদের সম্মাননা দিয়ে ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে অর্পূব ভূমিকা রাখছে।”
দৃষ্টিনন্দন ৮টি আদিবাসি নৃত্য পরিবেশন করে এলিন চাকমার পরিচালনায়- প্রতিরোধ সাংস্কৃতিক স্কোয়ার- রাঙ্গামাটি। তিন দিন অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন বাচিক শিল্পী দিলরুবা খানম, সিফাত সরওয়ার, সঞ্জয় সুন্দর, ইমরান মাহমুদ। আমন্ত্রিত সংগীত দল স্বরলিপি সাংস্কৃতিক ফোরাম, লোকজ সাংস্কৃতিক সংগঠন “প্রমিত উচ্চারণের গুরুত্ব” বিষয়ক গম্ভীরা পরিবেশন করে। তিন দিন আমন্ত্রিত বাচিক শিল্পীরা ছিলেন ড. ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, মোঃ আহকাম উল্লাল, মীর বরকত, বেলায়েত হোসেন, রতন কুমার ঘোষ, মিতা ঘোষ, রাশেদ হাসান, সোহেল আনোয়ার, শরীফ আহমেদ বিল্টু, খান মাযরাহুল হক লিপু, আহসান উল্লাহ তমাল, ফয়জুল্লাহ সাঈদ, মাসুম আজিজুল বাশার, মারিফ বাপ্পী, মনির হোসেন, বাশির দুলাল, প্রণব চৌধুরী, জেসমিন বন্যা, ইকরান হোসেন জুয়েল, আয়েশা হক শিমু, মনিষা পাল, মাহবুবুর রহমান মাহফুজ, হাবিব রেজা বাবলা, এমদাদ হোসেন কৈশোর, জাহান বশীর, মছরুর হোসেন, দেবাশীষ রুদ্র, তাসকিয়াতুন নূর তানিয়া, তামান্না সারোয়ার, রূপসী চক্রবর্তী, সীমা ইসলাম, জামিল আহম্মেদ, মেজবাহ চৌধুরী, শুভাশিস শুভ, বনকুসুম বড়ুয়া, শামিমা শিলা, মিজানুর রহমান, মেহেদী হাসান, শ্রাবণী দাশগুপ্তা, হাসান জাদিদ মাশরুখ, রাতুল পাল রিভু, সুলতানা পারভীন দিপালী, তাহমিনা বেগম, রাকা খোন্দকার শারমীন, নিশাত হাসিনা শিরীন, সুপর্ণা বড়ুয়া, সেলিম রেজা সাগর, এহতেশামুল হক, মোঃ সেলিম ভূঁইয়া, উমেচিং মারমা, ফরহাদ হাসান, অনিক মহাজন, বিজয় চক্রবর্তী, সাইদুল করিম সাজু, জাহানারা টিনা, ফারুক হোসেন, সোমা মুৎসুদ্দী, শেখ মেহেদী, সোহেল ও লাভলু চক্রবর্তী, আবদুল্লা আল মারুক। আমন্ত্রিত শিশু আবৃত্তিশিল্পী- সুমাইয়া, ধ্রুব, তানহা, মীম, এঞ্জেলা, স্বপ্ন, আজরিন, শিহাব ও সুমাইয়া মালিহা। আবহ সঙ্গীতে ছিলেন কী-বোর্ড-সৈয়দুল হক, বেইজ গীটার-আদি ও ডন, অক্টোপ্যাড- রনি নন্দী, তবলা- পিপলু।

x