শবে-কদর : ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে মানবিক অনুভূতির সমন্বয় ঘটুক

শনিবার , ১ জুন, ২০১৯ at ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ
51

বিশ্বের মুসলিম সমপ্রদায়ের জন্য বিশেষ রহমত ও বরকতের মাস পবিত্র রমজান মাস। এ মাসেরই একটি বিশেষ রাত লাইলাতুল কদর বা শবে-কদর। পবিত্র শবে-কদরের রাতেই পবিত্র কোরআনুল করিম নাজিল হয়েছিল। বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যেই মহিমান্বিত এ রাত অর্থাৎ শবে-কদর নিহিত রয়েছে। আর সে কারণেই ধর্মপ্রাণ মানুষ রমজান মাসের শেষ বিজোড় রাতগুলোয় আল্লাহর বিশেষ আরাধনায় মগ্ন হন। তবে ২৬ রমজান রাত অর্থাৎ ২৭ রমজানের রাতটিই সেই পুণ্য রজনী বলে ইসলামী বিশারদগণ অভিমত প্রকাশ করেছেন। শবে কদর সে রাত -যে রাতের সুসংবাদ মহান আল্লাহ ও তার রাসুল (দ) দিয়েছেন। ফজিলতের দিক থেকে এ রাতকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে। পরম প্রেমময় আল্লাহ মুসলমানের জন্য যতগুলো নিয়ামত দান করেছেন তার মধ্যে লায়লাতুল কদর শ্রেষ্ঠতম। এ রাতটি এমন একটি বৈশিষ্ট্যময়, মহিমান্বিত রাত যার মান-মর্যাদার বিবেচনায় এর সমকক্ষ অন্য কোনো রাত হতে পারে না। এ রাতেই মানব জাতির হেদায়েতের বাণী ঐশী গ্রন্থ আল কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। যার মাধ্যমে নতুন প্রেরণা নিয়ে মানবতা জেগে ওঠে বিশ্বের মুসলমান সমপ্রদায়ের মধ্যে। মুমিন মুসলমানদের জন্য এ রাতটি তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ রাতে যিনি নিজেকে যত বেশি ইবাদত-বন্দেগিতে নিয়োজিত রাখবেন তিনি তত বেশি সওয়াব হাসিল করবেন।
সহস্র মাসের ইবাদত-বন্দেগিতে যে পুণ্য অর্জিত হয়, তার চেয়েও বেশি পুণ্য অর্জিত হয় এই বরকতময় রাতের ইবাদত-বন্দেগিতে। স্বয়ং আল্লাহপাক আল কোরআনে এ রাতের মর্যাদা ও তাৎপর্য নিয়ে এরশাদ করেছেন- নিশ্চয়ই আমি এই কোরআন নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এ রাতে ফেরেশতারা স্বীয় পালনকর্তার নির্দেশে অবতীর্ণ হন। পরম শান্তি বিরাজ করতে থাকে সূর্যোদয় পর্যন্ত (সূরা কদর)। হযরত আনাস (রা.)-এ বর্ণিত আছে- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, লাইলাতুল কদরের এই রাত কেবল আমার উম্মতরাই পেয়েছে। মানুষের প্রতি আল্লাহপাকের যত নিয়ামত ও রহমত রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হল এমন একটি বরকতময় রজনীকে তার বান্দাদের জন্য নসিব করা। কোরআন শরীফ বিশ্ব মানবের ইহকাল ও পরকালের সামগ্রিক কল্যাণের পথপ্রদর্শক এক সার্বজনীন, শাশ্বত ও পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। কোরআনের মাধ্যমেই বিশ্বজগৎ ও সৃষ্টি বৈচিত্র্যের রহস্য ও বৈজ্ঞানিক সত্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। কোরআনুল করিম নাজিল হওয়া প্রসঙ্গে আল্লাহপাক বলেন, এটি একটি কিতাব যা আমি আপনার কাছে বরকত হিসেবে প্রেরণ করেছি; যাতে মানুষ এর আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা করে এবং জ্ঞানীরা তা অনুধাবন করে। প্রিয় নবী (দ.) বলেন, তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই উৎকৃষ্ট যে নিজে পবিত্র কোরআন থেকে শিক্ষা লাভ করেছে এবং অপরকেও শিক্ষা দিয়েছে। যিনি অন্যকে কোরআন শিক্ষা দেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের মর্যাদা লাভ করবেন। কোরআন মজিদের শিক্ষা মানুষকে প্রকৃত ঈমানদার করে তোলে; চরিত্রকে করে উন্নত। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে মানবিক অনুভূতির সমন্বয় ঘটিয়ে তাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করে। এজন্যই পবিত্র কোরআন পড়ার সঙ্গে এর মর্মবাণী অনুধাবনেরও তাগিদ দেয়া হয়েছে। কোরআনের মর্মবাণী অনুধাবন করলে মানুষ লোভ-লালসা, হিংসা-দ্বেষ, সন্ত্রাস, পাশবিকতা, ঘৃণ্য আচরণ, পরশ্রীকাতরতা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারবে। মানুষ হয়ে উঠবে গরিব-দুখীদের প্রতি দরদি ও সহানুভূতিশীল। এটিই পবিত্র কোরআনুল করিমের শিক্ষা। লাইলাতুল কদর বা শবে-কদরের মহিমা ও তাৎপর্য বিষয়ে বিশ্বের সব মুসলমান অবহিত। অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে জ্ঞান ও শিক্ষাচর্চার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ রাতে মানব সমপ্রদায়কে বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন। পবিত্র হাদিস মতে, রহমত ও বরকতময় শবে-কদরের এ রাতটি মুসলমানদের জন্য বাড়তি পাওয়া। বরাবরের মতো এবারো বিশ্বের মুসলমানরা এ রাতে আল্লাহ তাআলার ইবাদতে নিমগ্ন হবেন। আর সে কারণেই মুমীন মুসলমানদের মনে রাখতে হবে, বাহ্যিক আচারের বিষয়টি ইসলাম ধর্মের মূল বিষয় নয়। মানুষের জীবনের মৌলিক আধ্যাত্মিক অবস্থার পূর্ণ বিকাশসাধনই ইসলামের মূল লক্ষ্য। মানুষের মনের কলুষ দূর না হলে এ পুণ্য রজনী কারো জন্যই মুক্তির বার্তা নিয়ে আসতে পারে না। জীবনাচরণের ক্ষেত্রে সৎ থেকে, নৈতিকতার আদর্শ মেনে, মানবতার আদর্শকে উঁচুতে তুলে ধরতে হবে। সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসতে হবে। পবিত্র লাইলাতুল কদরের মর্ম উপলব্ধি করতে হবে সবাইকে। মানুষকে কুসংস্কার থেকে মুক্তি দিয়ে আলোর পথে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামের রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা। মানুষকে আলোর পথে নিয়ে যেতে হবে। দিতে হবে আলোকিত জীবনের সন্ধান। তবেই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে লাইলাতুল কদরের আবেদন সার্বিকভাবে প্রতিফলিত হবে।
আজ লাইলাতুল কদরের পবিত্র রজনীতে ইবাদতে নিমগ্ন হবেন মুসলমানরা। শবে-কদরের ইবাদত মানবজীবনের পাপমুক্তি ও আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য অপরিসীম কল্যাণকর। আমরা মনে করি, পুণ্যময় এ রাতে আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে মানুষ মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার প্রতিজ্ঞা করতে পারলেই সার্থক হবে এ রাতের ইবাদত। এই ইবাদত কবুল করার জন্য আমরা মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রার্থনা জানাই।

x