শপিংমলগুলোতে শেষ মুহূর্তে বাড়ছে ভিড়

বৈরি আবহাওয়ায় ব্যবসায়ীদের অসন্তোষ

জাহেদুল কবির

বৃহস্পতিবার , ১৪ জুন, ২০১৮ at ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ
33

সূর্যের দেখা নেই গত তিনদিন ধরে। উল্টো থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ছে। আগামীকাল চাঁদ দেখা গেলে শনিবার ঈদ। সেই হিসেবে ঈদের বাকি আছে মাত্র একদিন। তাই বৃষ্টি উপেক্ষা শেষ মুহূর্তে কেনাকাটা সেরে নিতে মার্কেটশপিংমলগুলোতে ভিড় করছেন ক্রেতারা। তবে বৈরি আবহাওয়ার কারণে ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি নাই। তাদের মতে, গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে প্রত্যাশিত ক্রেতারা আসতে পারেননি। তাই বেচাবিক্রির অবস্থাও গত বছরের তুলনায় খারাপ। এছাড়া উত্তর চট্টগ্রামে সৃষ্ট বন্যার কারণে চট্টগ্রাম শহরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তাই হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থেকে ক্রেতারা শহরে আসছেন কম।

এদিকে ঈদের সময় ঘনিয়ে আসায় বিউটি পার্লারগুলোতে ভিড় বাড়ছে মহিলাদের। একই চিত্র দেখা গেছে, ছেলেদের বিভিন্ন নামীদামী পার্লারেও। অন্যদিকে পুরুষরা আতর টুপির দোকান ও বিভিন্ন বয়সী নারীরা জুয়েলারি শপগুলোতে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা সেরে নিচ্ছেন।

জানা গেছে, গতকাল সকাল থেকে নগরীর মিমি সুপার মার্কেট, সানমার ওশ্যান সিটি, রেয়াজুদ্দিন বাজার, নিউ মার্কেট বিপণী বিতান, তামাককুণ্ডি লেইন, জহুর হকার্স মার্কেট, টেরিবাজার, আমিন সেন্টার, আফমি প্লাজা, আখতারুজ্জামান সেন্টার, ইউনেস্কো মার্কেট, চিটাগাং শপিং কমপ্লেক্স, ভিআইপি টাওয়ার ও আগ্রাবাদ সিঙ্গাপুর মার্কেট ক্রেতা সমাগমে মুখর ছিল।

আফমি প্লাজার জুয়েলারি শপ ‘ওপেলিয়া’তে দুপুরের দিকে মধ্য বয়সী নারী ও তরুণীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। এসময় তারা চুড়ি, কানের দুল, গলার পেন্ডেন্ট (মালা), নাকের ফুল খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছিলেন। ঈদ প্রস্তুতি প্রসঙ্গে জানতে জানতে চাইলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সুলতানা আকতার বলেন, ঈদের জামাকাপড় কেনা শেষ হয়েছে। এখন শুধুমাত্র জুয়েলারি আইটেম কেনা বাকি ছিল। তাই মার্কেটে এসেছি। এবছর দাম গতবারের তুলনায় একটু বেশিই মনে হচ্ছে। ওপেলিয়ার সহকারী ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাব্বির দৈনিক আজাদীকে বলেন, খারাপ আবহাওয়ার কারণে মার্কেটে এখন প্রত্যাশিত ক্রেতা নেই। তবে বৃষ্টি থামায় দুপুরের দিকে থেকে ক্রেতা সমাগম একটু বেড়েছে। আমাদের শোরুমে চুড়ি, পায়েল, নেকলেস, গলার পেন্ডেন্ট, ঝাফাটা, টিকলি, কানের দুল ও নাকের ফুলসহ বাহারি অর্নামেন্টস রয়েছে। তবে এ বছর ডায়মন্ড কাটের চুড়ি ও কানের দুলে তরুণীদের আগ্রহ বেশি।

কয়েকটি জুয়েলারি ঘুরে দেখা যায়, চুড়ি পাওয়া যাচ্ছে ৩৮০ টাকা থেকে শুরু করে দুই হাজার ২৮০ টাকার মধ্যে। গলার পেন্ডেন্ট পাওয়া যাচ্ছে ১৯০ টাকা থেকে ৪৯০ টাকায়, নোস পিন (নাকের ফুল) পাওয়া যাচ্ছে ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ২৫০ টাকায়।

অপরদিকে শেষ মূহুর্তে তরুণরা পছন্দের পাঞ্জাবি কিনতে ভিড় করছে নামীদামী ব্র্যান্ডের পাঞ্জাবির শোরুমগুলোতে। আফমি প্লাজার শৈল্পিক শাখার ব্যবস্থাপক আরিফুল হক অভি বলেন, শৈল্পিকের পাঞ্জাবি ইতোমধ্যে তরুণ প্রজন্মের মন জয় করে নিয়েছে। অন্যান্য বছরের মতো এবারও আমরা কিছু স্পেশাল পাঞ্জাবি এনেছি। দাম গত বছরের মতোই। ঈদের বাকি আছে আর দু’দিনের মতো। তাই শেষ মুহূর্তে ভালোই চলছে আমাদের কেনাবেচা। তবে বৃষ্টি না হলে আরো ভালো বিক্রি করতে পারতাম। নগরীর শেরশাহ কলোনি থেকে আসা কলেজছাত্র আরিফুল ইসলাম টিপু জানায়, শৈল্পিকে এলাম পাঞ্জাবি কিনতে। এখানে দামও গত বছরের তুলনায় বেশি। তবে এবার কিছু ইউনিক ডিজাইনের পাঞ্জাবি এসেছে।

অন্যদিকে শেষ মুহূর্তে শাড়ির দোকানগুলোতেও নারীদের আনাগোনা চোখে পড়ার মত। ইউনেস্কো সিটি সেন্টারের ‘নবরূপা’র শাখা ব্যবস্থাপক মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, বৃষ্টির কারণে গত দুই দিনে ক্রেতার সংখ্যা একটু কম ছিল। তবে আজ (গতকাল) তা বেড়েছে। তারপরেও বেচাবিক্রির অবস্থা খারাপই বলতে হবে।

টেরিবাজার ময়ূরি ফ্যাশনের বিক্রেতা নওশাদ হোসেন জানান, বৃষ্টি উপে া করেও টেরিবাজারে ক্রেতারা আসছেন। তবে দূরদূরান্ত থেকে এবার বৃষ্টি ও বন্যার কারণে আসতে পারছেন না। এই সময়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ব্যবসায়ীদের অনেক তি হয়ে গেল।

রেয়াজুদ্দিন বাজারের ফ্যাশন জোনের স্বত্ত্বাধিকারী মো. বেলাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমাদের দোকানে দেশিয় পণ্যই বেশি। ক্রেতারা আস্তে আস্তে এখন বিদেশি পণ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। গত দু’দিন যাবত আমাদের দোকানে ক্রেতার সংখ্যা বাড়ছে। আশা করছি আগামীতে আরো বাড়বে।

অন্যদিকে রেয়াজুদ্দিন বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. মাহাবুবুল আলম দৈনিক আজাদীকে বলেন, রেয়াজুদ্দিন বাজারে প্রতি ঈদে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ ভিড় করেন। কারণ এখানে বিভিন্ন স্তরের ক্রেতাদের জামা কাপড় পাওয়া যায়। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজন এখানে শপিং করতে আসেন। ঈদের বাকি আছে আর মাত্র দু’দিনের মতো। তাই ক্রেতারা শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা সেরে নিচ্ছেন।

এছাড়া শেষ মুহূর্তের বিভিন্ন বয়সী মানুষ আতরটুপির দোকানগুলোতে গিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। জহুর হকার্স মার্কেটের শতরূপার স্বত্বাধিকারী এম এম রাসেল বলেন, ঈদের দুই তিনদিন আগে থেকে আতর টুপি বেচাকেনা শুরু হয়। আমাদের দোকানে দেশিয়, পাকিস্তানি, ভারতীয় এবং সৌদি আরবের আতর টুপি পাওয়া যাচ্ছে। প্রতি পিস আতর পাওয়া যাচ্ছে ২৫২৫০ টাকার মধ্যে। এছাড়া টুপি বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকায়।

পৌর জহুর হকার্স মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল আমিন বলেন, এবার ঈদে আমাদের মার্কেটে প্রত্যাশা মতো বেচাবিক্রি হয়নি। তবে বৃষ্টি হয়ে না দাঁড়ালে বিক্রি আরো বেশি হতো। তারপরেও যে পরিমাণ ক্রেতা সমাগম হয়েছে এতে আমরা সন্তুষ্ট।

অপরদিকে ঈদের আগে নিজেকে মনের মতো রাঙিয়ে নিতে নগরীর বিভিন্ন পার্লারে ছুটছেন তরশুণীরা। এছাড়া ফ্যাশন সচেতন তরুণরাও এখন কম যান না। তারাও নিজেকে আরো ফ্যাশনেবল করে তুলতে ভিড় করছেন ছেলেদের পার্লারগুলোতে। নগরীর হাবিব তাজকিরাজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী সামিউদ্দিন আহমেদ বলেন, এবার ঈদ উপলক্ষে বেশ কিছু স্পেশাল সার্ভিস নিয়ে এসেছি আমরা। এছাড়া আমাদের সেবাগ্রহীতারা বোনাস হিসেবে থাকছে ভারতীয় হেয়ার স্পেশালিস্ট এবং লরিয়েল প্রফেশনাল মাহিন দাশের কাছেই চুলের বিভিন্ন সার্ভিস পাওয়ার সুযোগ। স্পেশাল সার্ভিসগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রাাজিলিয়ান বেহ্মা ডাই, থ্রি ফোরডি ফাইভ ডি, ১২টি স্পেশাল হেয়ার কাটিং ও স্পেশাল প্রোডাক্ট ফেসিয়াল। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে চাঁদরাত পর্যন্ত সারা রাতব্যাপী খোলা থাকবে আমাদের পার্লার। তবে বৃষ্টির কারণে তরুণতরুণীদের চাপ গত বছরের তুলনায় একটু কম।

তিনি আরো বলেন, তরুণ তরুণীরা ‘ফ্রুট + ইনস্ট্রা ব্লো’ ফেসিয়ালের পাশাপাশি মেনিকিউর করার সেবাও পাবে এই ফেসিয়ালে। সার্ভিসটির দাম রেখেছি এক হাজার ৩০০ টাকা আর মেয়েদের জন্য এক হাজার ৬০০ টাকা। এছাড়া রয়েছে ‘লোটাস ন্যাচারাল গ্লে’, ‘স্প্যাসিপিক্স প্রফেশনাল (এইজ ডিফায়িং গোল্ড ফেসিয়াল কিট), ‘স্প্যাসিপিক্স ওয়াইটনিং ফেসিয়াল’, ‘লরিয়েল গোল্ড ফেসিয়াল’, ‘ভিকো ন্যাচারাল স্কিনস’, ‘অক্সিগ্লো ফ্রুট ফেসিয়াল’। এসব ফেসিয়ালে ছেলেদের ক্ষেত্রে দাম পড়বে এক ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা, মেয়েদের ক্ষেত্রে ২ হাজার টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা। এছাড়া আরো রয়েছে ‘চকলেট ফেসিয়াল’, ‘ও থ্রি ফেসিয়াল’, ‘ভিটামিন সি ফেসিয়াল’, ‘লোটাস ফেসিয়াল’ (৫টি ধরণের)। এসব ফেসিয়ালে খরচ পড়বে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। এছাড়া বিশেষ করে ছেলেদের জন্য রয়েছে ‘ওয়াইট হেডস, ব্ল্যাক হেডস লেজার ট্রিটমেন্ট’। দাম পড়বে এক হাজার টাকা মতো। এছাড়া বর্তমানে তরুণ তরুণীরা পেডিকিউর, মেনিকিউরের দিকে ঝুঁকছেন। আমাদের পার্লারে পাওয়া যাবে লাটাস পেডিকিউর, মেনিকিউর।

অপরদিকে গোলপাহাড় মোড়ের হাবিব আলভিরাসের ইনচার্জ সৈকত বড়ুয়া বলেন, ঈদের সময় যেহেতু আর বেশি নেই, তাই আমাদের পার্লারে তরুণ তরুণীদের ব্যস্ততা বেড়েছে। তারা হেয়ার কাটিং, হেয়ার কালার, হেয়ার ট্রিটমেন্ট, ফেডিকিউর মেনিকিউর, ফেয়ার পলিস, ফেসিয়াল সার্ভিস নিতে আসছেন। আমাদের সার্ভিসের দামও রয়েছে কম। তাই সবাই সানন্দে আমাদের পার্লারে আসেন।

আলভিরাসের মহিলা শাখার ইনচার্জ পারভিন আকতার বলেন, ঈদের যেহেতু আর বেশি সময় বাকি নেই, তাই আমাদের পার্লারে তরুণীরা প্রয়োজনীয় সেবা নিতে আসছেন। গত কয়েকদিনের বৃষ্টির কারণে ভিড় একটু কম ছিলো। তবে এখন ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। এছাড়া ভিআইপি টাওয়ারের অল্পরী বিউটি পার্লারের স্বত্বাধিকারী রাশেদ চৌধুরী বলেন, সকাল থেকে বিভিন্ন বয়সী নারীরা রূপসজ্জা করতে আসছেন। তবে গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার কাজের চাপ কিছুটা কম। আশা করি ঈদের আগে ভিড় আরো বাড়বে।

x