শতবর্ষেও সংগ্রাম

সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি

বৃহস্পতিবার , ১১ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ
80

রতন মুন্সীর বয়স প্রায় ১০৯ বছর। বয়স শত বছর পেরোলেও থেমে নেই জীবন সংগ্রাম। প্রায় ৮০ বছরের বেশি সময় ধরে সংসারের ঘানি টানছে বার্ধক্যের ভারে ন্যুজ্ব এই সদা হাস্যোজ্জ্বল মানুষটি। বয়স আর কঠোর পরিশ্রমেও মলিন হয়নি হাসিমুখ। বড় অদ্ভুত তার পেশা। হাটের দিনে খাঁচায় করে কবুতর বিক্রি করে সংসারের খরচ জোগাড় করে। এভাবে পাড়ি দিয়েছেন জীবনের দীর্ঘ সময়।
মঙ্গলবারে হাটের দিন রতন মুন্সীর সাথে আলাপ হয় । বাড়ি থেকে প্রায় ৬ কিমি দূরে দীঘিনালা থানা বাজার । ঘর থেকে এক জোড়া তিতির এবং ৫ জোড়া কবুতর নিয়ে হাঁটের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে । প্রায় ১৫শ টাকায় কবুতর বিক্রি হলেও, তিতির বিক্রি না করে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। তিনি জানান, এক জোড়া তিতির পাখি ৩ হাজার টাকা পেলে বিক্রি করতাম। এই বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে কবুতর সংগ্রহ করে রতন মুন্সী। নিজের বাড়িতে লালন পালন করে বাড়তি দামে বাজারে বিক্রি করে। এই আয় দিয়ে চলে সংসার । বাড়ি থেকে ৫-৭ কিমি দূরে বাজার হলেও হাঁটের দিন কাঁধে খাঁচা নিয়ে পাঁয়ে হেঁটে বাজারে যান তিনি।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালার আশ্রম এলাকায় রতন মুন্সীর বসবাস। দীর্ঘকাল কবুতর বিক্রি করে বলে কইতর মুন্সী নামে আশেপাশের লোকজন বেশি চিনে। আশ্রম এলাকায় রতন মুন্সীর নাম বলতেই বাড়ির পথ দেখিয়ে দেয় এলাকার বাসিন্দারা।
স্থানীয় দোকানি মো. রশিদ আহমেদ জানান,’রতন মুন্সীর বয়স প্রায় ১০৯ বছর। এখনো শনিবার উপজেলার প্রায় ৪ কিমি নতুন বাজার ও মঙ্গলবার প্রায় ৬ কিমি দূরে থানা বাজার পায়ে হেঁটে যায়। সারা জীবন ধরে দেখছি কাঁধে ঝুড়ি নিয়ে দীর্ঘপথ হেঁটে আসা -যাওয়া করে। শতবছরেও রতন মুন্সীর এমন কঠিন জীবন সংগ্রাম দেখে বিস্মিত গ্রামবাসী। স্থানীয়রা জানান, ছোট বেলা থেকেই দেখে আসছি তিনি হাটে হাটে কবুতর বিক্রি করে ।
শতবর্ষী রতন মুন্সী বাড়িতে গেলে নীতিদীর্ঘ আলাপে তিনি জানান, গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর জেলার বাকেরগঞ্জে। ১৯৮৩ সালে সরকার শরণার্থী হিসেবে দীঘিনালার বাবুছড়াতে নিয়ে আসে। প্রথমে বাবুছড়াতে পুনবার্সিত করা হলেও পরে স্থায়ী আবাস হয় দীঘিনালার আশ্রম এলাকায়। ২ পুত্র ৩ কন্যা সন্তান নিয়ে রতন মুন্সীর সংসার। অনেক আগেই মেয়েদের বিয়ে দিয়েছে। মেয়ের ঘরের নাতিরও বিয়ে হয়েছে বলে জানান তিনি।
জাতীয় পরিচয় পত্রে অনুসারে রতন মুন্সীর বয়স ৯৬ হলেও তিনি দাবি করেন বয়স প্রায় ১০৯ বছর। এই বয়সে অন্য কিছু করার সুযোগ নেই । পুরনো পেশা বাজারে বাজারে ঘুরে কবতুর, হাঁস ,মুরগি বিক্রি করি। এতে কোন রকমে সংসার চলে। কোন কোন দিন একদমই বেচা কেনা থাকে না । পাড়ার বিভিন্ন বাড়ি ঘুরে কবুতর কিনে নিই। এরপর লালন পালন করে বাজারে বিক্রি করি। বর্তমানে কবুতরের পাশাপাশি তিতির বিক্রি হয়। এসব বিক্রি করে যা আয় হয় তাতেই কোন রকমে সংসার চলে। রতন মুন্সী জানান, এক সময় উপজেলা প্রায় ১২-১৫ কিলোমিটার দূরে মেরুং বা বাবুছড়া বাজারে গিয়ে কবুতর বিক্রি করতাম। বেশ কয়েক বছর ধরে এতদূরে হেঁটে যাওয়া সম্ভব হয়না। এছাড়া বয়স্ক ভাতার কার্ড থেকে মাসে শেষে কিছু অর্থ পাই।
রতন মুন্সীর স্ত্রী জরিনা খাতুন জানান, খুব ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে বাজারে যায়। এতে কোন রকমে সংসার চলে। পাঁচ ছেলেমেয়ের মধ্যে এক ছেলে আমাদের সাথে থাকে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ছেলে বিয়ের পর থেকে আলাদা থাকে। তবে কষ্টকর জীবন সংসার চললেও রতন মুন্সীর চোখে মুখে কোন আক্ষেপ নেই। মুখে মিষ্টি হাসিতে ভরে থাকে শত বছরের রতন মুন্সীর। এখনো তাকে রোগ বালাই খুব একটা র্স্পশ করতে পারেনি ।
রতন মুন্সীর প্রতিবেশী হাবিবুর রহমান (৮২) ও আব্দুল মালেক (৮০) জানান, এই এলাকায় তার মত প্রবীণ ব্যাক্তি নেই। ছেলে বা অন্য কারো উপর তিনি নির্ভরশীল নন। এখনো বাজারের দিন খাঁচা নিয়ে বাজারে যায়। রতন মুন্সীকে আর্থিক সহায়তায় প্রতিশ্রুতি দিয়ে দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী (ইউএনও) শেখ শহিদুল ইসলাম জানান, যেহেতু উনারঅনেক বয়স হয়েছে, তাঁকে আয় বর্ধক কোন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। ’

x