শঙ্খ ঘোষের ‘অন্ধের স্পর্শের মতো’ সম্পর্কে কয়েক লাইন

এমদাদ রহমান

মঙ্গলবার , ৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ১১:০২ পূর্বাহ্ণ
4

এমনও কিছু বই থাকে, পড়ে কখনও শেষ করা যায় না; পাঠের এক অমোঘ টানে বার বার সে বইয়ের কাছে ফিরতে হয়!
এমন বহু বইয়ের কাছেই তো আমরা বারবার ফিরেছি। বিজনের রক্তমাংস। সময় বড় বলবান। ধূসর পাণ্ডুলিপি। ছেঁড়া ক্যাম্বিসের ব্যাগ। অক্ষয় মালবেরি। চালচিত্রের খুঁটিনাটি। থিংস ফল অ্যাপার্ট, আগন্তুক, বিচার, জিপসি ব্যালাড, দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন, আরণ্যক, রক্তকরবী, হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ…এভাবে বলতে চাইলে নামের তালিকাও দীর্ঘ হবে, দীর্ঘ তালিকার শেষে দিনে দিনে যোগ দেবে নতুন নতুন বই, সেখানে হয়ত এখন সুদানের প্রখ্যাত লেখক তায়িব সালেহ’র উপন্যাস ‘উত্তরে দেশান্তরের মৌসুম’ স্থান করে নিয়েছে।
শঙ্খ ঘোষের ‘অন্ধের স্পর্শের মতো’ বইটিও তেমন। এক বৈঠকে যে বইয়ের পাঠ শেষ হয় না। পাঠ ফুরোয় না কিছুতেই। আরও নতুন আগ্রহের জন্ম হয়, আরও বিপন্ন বিস্ময় অপেক্ষা করে।
বারো, তেরো বছর আগে প্রথম পড়ি এই বইটি। কিন্তু পড়া আর শেষ হয় না আমার, বিভূতিভূষণের ভণ্ডুল মামার সেই বাড়িটির মতো, সেই ২০০৭ থেকে ২০১৮’র শেষ এখন, এই এতদিনেও, পড়াটা সবসময়ই যেন অসম্পূর্ণ থাকে, ভণ্ডুল মামার বাড়ির কাজও শেষ হয় না! কখনও আধা পৃষ্ঠা কখনওবা এক পাতা; মাঝখানে কয়দিন ভুলে যাওয়া, অন্য পাঠে মগ্নতা…
যা কিছু পড়ি না কেন, তৃষ্ণার জল চাইতে ছেলেবেলায় মায়ের কাছে সেই ছুটে যাওয়ার মতো ফিরে আসতে হয় ছোট্ট এই বইটির কাছে। আরও মনে হয়, এই জীবনে আরও বহুবার ফিরে পড়তে হবে এই লেখা। বইটি মূলত একটি বক্তৃতা। প্রনবেশ সেন স্মারক বক্তৃতা; বইটি প্রকাশ করেছে কলকাতার গাঙচিল, ২০০৭-এ। কী কথা ছিল বইটিতে? এভাবে না বলে, যদি বলি- কী এমন মন্ত্রকথা বলেছিলেন বর্ষীয়ান কবি সেদিনের বক্তৃতায়?
হ্যাঁ, সংযোগের ভাষা নিয়ে কথা বলছিলেন সেদিন, শঙ্খ ঘোষ–‘আমরা যখন সত্যিকারের সংযোগ চাই, আমরা যখন কথা বলি, আমরা ঠিক এমনই কিছু শব্দ খুঁজে নিতে চাই, এমনই কিছু কথা, যা অন্ধের স্পর্শের মতো একেবারে বুকের ভিতরে গিয়ে পৌঁছয়ে। পারি না হয়তো, কিন্তু খুঁজতে তবু হয়, সবসময়েই খুঁজে যেতে হয় শব্দের সেই অভ্যন্তরীণ স্পর্শ।’ এই কথাগুলি বলবার আগে, একটি বিশেষ ঘটনার বর্ণনা দেন তিনি-
‘মাসদেড়েক আগে, বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনের প্রযোজনায়, একটি অভিনয় চলছিল কার্জন পার্কে। পড়তি বিকেলে, খোলা জায়গায়, ছোটো একটি বৃত্ত তৈরি করে নিয়ে সেখানে রক্তকরবীর অভিনয় করছিলেন কয়েকজন মানুষ, কেউ যাঁরা চোখে দেখতে পান না। দর্শক ছিলেন অল্প কয়েকজন। পূর্ণ অন্ধদের সেই সুঠাম অভিনয়শেষে দর্শকেরা যখন উচ্ছ্বাস জানাচ্ছেন, আশ্চর্য একটি দৃশ্যের জন্ম হলো তখন। সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে কুশীলবেরা সবাই তাদের খোলা দুহাত বাড়িয়ে রেখেছেন প্রার্থীর মতো। কী চান তারা? কিছু কি চান? তাঁদের মধ্যে একজন বললেন : -আপনারা সবাই এসেছেন, কিন্তু আমরা তো দেখতে পাচ্ছি না। আপনারা যদি আমাদের সকলের হাতের ওপর একটু হাত ছুঁয়ে যান, আপনাদের ভালো-লাগাটা আমাদের মধ্যে পৌঁছবে, আমাদের ভালো লাগবে।’ দর্শকেরা একে একে সকলের হাতে হাত রাখলেন, কারো কারো চোখে এল জল।’
এই হলো ভাষা। এই হলো কথা। সংযোগের অভিপ্রায়। সেখানে এসে মিশে যায় নীরবতার ভাষা। এভাবেই পরস্পরের সঙ্গে আমাদের একটি সংযোগ তৈরি হয়। এছাড়া আর কোনও উপায় নেই। এছাড়া আর যা বাকি থাকে তা হলো বিচ্ছিন্নতা। একা হয়ে যাওয়া। ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’ হয়ে যাওয়ার ভেতরে সংযোগের যে ব্যাকুলতা, পুরো বক্তৃতাজুড়ে এই প্রবীণ কবি আমাদের বলে গেলেন।
‘জীবনের শেষ কয়েকটা বছর চোখে দেখতে পেতেন না আমার বাবা। বই পড়তে ভালোবাসতেন, কিন্তু পড়া বন্ধ হয়ে গেল। ভালোবাসতেন কথা বলতে। কিন্তু কথাও কিছুটা থমকে গেল। অভ্যাগতেরা কেউ দরজায় এসে দাঁড়ালে চমকে উঠে জিজ্ঞেস করতেন: ‘কে?’ নাম শুনে ‘কই, হাতটা দেখি’ বলে বাড়িয়ে দিতেন হাত। তারপর সেই অভ্যাগতের হাত ধরে অনেকক্ষণ বসে থাকতেন চুপ করে। কথা কখনো হতো, কখনো হতো না। কিন্তু হাতের ওই জড়িয়ে-থাকাটুকু ছিলই।’
এই অংশটুকু পড়লেই বক্তার অভিপ্রায় বোঝা যায়। এই তো কথা বলবার মূল বিষয় ‘সংযোগের ভাষা’।
ঠিক করে রেখেছি যে কোনও একদিন, সকাল থেকে সন্ধ্যা, আবারও এক প্রগাঢ় পাঠ নেব বইটির। আত্মস্থ করে নেব কবির আকুতিটুকু।

x