শওকত ওসমান জীবন ও সাহিত্য

আহমেদ মাওলা

শুক্রবার , ৪ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:১৭ পূর্বাহ্ণ
599

বাঙালি মুসলমান রচিত কথাসাহিত্যের ঐতিহ্য খুব দীর্ঘ নয়। ধর্মীয় বিশ্বাস-সংস্কার শিক্ষার অভাব, অনুদার দৃষ্টিভঙ্গিই এই পশ্চাদপদতার প্রধান কারণ। উনিশ শতকে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২)। তিনি ধর্মীয় ঐতিহাসিক ঘটনাকে বিষয় করে ‘বিষাদসিন্ধু’ (১৮৮৫-৮৭-৯১) রচনা করেন। তাতে উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবতাবাদী জীবনাদর্শ প্রতিফলিত হয়। বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে মুক্তবুদ্ধি, উদারনৈতিক চিন্তা ও পাশ্চাত্য মানবতাবাদী জীবন দৃষ্টির আলোকে সাহিত্যচর্চার একটা স্ফূরণ লক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলামের দ্রোহী ভূমিকার কথা প্রথমেই উল্লেখ করতে হয়। ততোদিনে বাঙালি মুসলমান পাশ্চাত্য শিক্ষা ও আধুনিকতা আয়ত্ত করে নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা (১৯২১) ও ঢাকার নগরায়ন এবং ১৯৪৭ দেশ বিভাগের পর ঢাকা হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যের দ্বিতীয় রাজধানী। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০) তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) এই ত্রয়ী বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগ্য উত্তরাধিকার হিসেবে বিশ শতকের প্রথম পর্বে আবিভূত হন সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ (১৯২২-১৯৭১) শওকত ওসমান (১৯১৭-১৯৯৮) এবং আবু রুশদ (১৯১৯)। বাঙালি মুসলমান কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে তাঁরাই অগ্রগণ্য। তাঁদের মধ্যে শওকত ওসমান সবচেয়ে দীর্ঘায়ু, বহুপ্রজ এবং তাঁর রচনার বিষয়-বৈচিত্র্য ও আঙ্গিক প্রকরণ যথেষ্ট যত্নশীল। শওকত ওসমান মূলত কথাসাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও, সাহিত্যের অন্যান্য শাখায়ও তাঁর স্ব”ছন্দ বিহার লক্ষ করা যায়। গল্পা-উপন্যাস ছাড়াও তিনি কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, অনুবাদ, স্মৃতিকথা, আত্মজীবনী, ডায়রি, পুস্তক সমালোচনা ইত্যাদি লিখেছেন। ভারত বিভাগ পূর্বকালে তাঁর জন্ম পশ্চিম বঙ্গের হুগলি জেলায়। তাঁর শৈশব-কৈশোর, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবনের শুরু কলকতায় হলেও উত্তরকালে তিনি পরিবারসহ বাংলাদেশেই আমৃত্যু বসবাস করেছেন। লেখালেখির সূত্রে তৎকালীন কলকাতার নবীন-প্রবীণ কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে শওকত ওসমানের হৃদ্ধতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে। তাঁর মানসগঠন ও লেখক হিসেবে অভিযাত্রার প্রস্তুতিপর্ব উল্লিখিত সম্পর্কসূত্রে সম্পন্ন হয়। উত্তরকালে, বাংলাদেশের বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, আইয়ুবীয় সামরিক শাসন, উনসত্তরের গণ অভ্যূত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, পঁচাত্তরে জাতির জনকের হত্যা, সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন প্রভৃতি সামাজিক রাজনৈতিক সংগ্রামে-সংকটে সমকালীন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে শওকত ওসমান হয়ে ওঠেন অনিবার্য, অবিস্মরণীয়, অনন্য এক কথাশিল্পী।
শওকত ওসমানের সাহিত্য-জীবনের পরিচয় দিতে গেলে সবকিছু ছাপিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর কথাসাহিত্যিক সত্তার বিবেকী উত্থান। সাহিত্য-যাত্রার প্রথম দিকে তিনিও আর দশটা বাঙালি সন্তানের মতো কবিতা দিয়ে শুরু করেছিলেন। ‘সওগাত’ ‘আজাদ’ ‘বুলবুল’ প্রভৃতি পত্রিকায় শেখ আজিজুর রহমান নামে বেশ কিছু কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু‘ সেই প্রাথমিক রচনাগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ‘বাবা প্রথমে কবিতা লিখতেন। আজিজুর রহমান নামে আর এক কবি থাকায় তিনি নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। আবুল কালাম শামসুদ্দীন তাঁর স্মৃতি কথায় লিখেছেন-
‘শওকত ওসমান প্রথম দিকে কবিতা লিখতেন এবং সেই সব প্রধানত বাহার সাহেবের ত্রৈমাসিক ‘বুলবুলে’ প্রকাশিত হত। ‘মাসিক মোহাম্মদী’ তে আজিজুর রহমান নাম দিয়ে তাঁর কয়েকটি লেখা প্রকাশিত হয়।’

সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ছাত্র থাকাকালীন হাবীবুল্লাহ বাহারের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা ও বন্ধুত্ব শওকত ওসমানকে সাহিত্যের পথে প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করে। সেই স্মৃতিময় দিনের কথা তিনি কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করেছেন-
‘আমার সাহিত্য জীবনের বিশেষ অধ্যায় হাবীবুল্লাহ বাহারের সঙ্গে জড়িত। বিশেষ কেন, বরং বলা যায় জীবন বিকাশের জন্য যেটুকু আবহাওয়া প্রয়োজন, যা ছাড়া হয়ত তার বিনাশই ঘটে বা বিকাশ বাধা পায় এমন সংকট সংকুল মুহূর্তের দিশারী অধ্যায়।’
সাহিত্য -যাত্রার উষালগ্নে হাবীবুল্লাহ বাহারের মতো হৃদয়বান মানুষের সাহায্য- সহযোগিতা, প্রেরণা পেয়েছেন বলেই তিনি উত্তরকালে সাহিত্যকে নিত্য সঙ্গী করতে পেরেছেন। বাংলা সাহিত্য পেয়েছে তাঁর মতো একজন দিকপাল কথাশিল্পীকে।
শওকত ওসমানের প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালে। কলকাতা মাদ্রাসা-এ আলিয়ার এ্যাংলো ফার্সিয়ান (ইংরেজী শাখা) শাখার ম্যাগাজিনে। রচনাটি ছিল গল্প। গল্পটির শিরোনাম ও অন্যান্য তথ্য পাওয়া যায় নি। মাদ্রাসা-এ আলিয়ায় ‘পরিচয় হয় মানিকগঞ্জ এলাকা থেকে আসা আবু নসর মুহম্মদ তবীরের। সে-ই তাকে মাদ্রাসার গ্রন্থাগারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, যেখানে শুধু বই পড়া যায় না, ইস্যু করে বাড়িও নিয়ে যাওয়া যায়। তার ছিল মধুর ব্যবহার।
‘যদি বলা যায়, আবু নসর তবীর আমাকে সাহিত্য পথে টেনে এনেছিল, তা খুব অন্যায় হবে না।’
…-এ তিনি লিখেছেন, ‘আমার’ সাহিত্য সাধনা কবিতা দিয়েই শুরু হয়। আজ নিছক গদ্য লেখক হিসেবে পরিচিত। অবশ্য কবিতা আমাকে পরিত্যাগ করলেও আমি কবিতা লেখা একদম ছেড়ে দেইনি।’
তিনি যে কবিতা লেখা একদম ছেড়ে দেননি, তার প্রমাণ পাওয়া শেষ জীবনে ১৯৮২ সালে। ‘নিজস্ব সংবাদদাতা প্রেরিত’ এবং দুই খণ্ডে প্রকাশিত ‘শেখের সম্বরা’ কাব্যগ্রন্থের প্রকাশ। ‘নিজস্ব সংবাদদাতা প্রেরিত’ কাব্যে তিনি পরিহাস ছলে আত্মচরিত্র এঁকেছেন এভাবে কাল মারা গেছে শওকত ওসমান/ইন্নালিল্লাহে…রাজেউন, রবিবার ২৩ অঘ্রাণ’ সংবাদদাতা জাকছেন প্রশ্ন উঠবে তবে কী এ মরহুমের শত্র ছিলো/ছিলো তবে ব্যক্তিগত নয়। তাঁর নৈর্ব্যক্তিক শত্রুদের মধ্যে রয়েছে ‘যে সব পন্ডিত-শুকন আ’ম মানুষের কাঁধে করে তাকে ভর বর্গবিদ্বেয় অথবা ধর্মের জিগিরে বর্বর বিভ্রান্ত পথে পরিচালনার কাজে/…তাদের প্রতি ক্রোধ, মরহুমের ঘৃণা। ছিলো সহজাতা তিনি শ্রেয় বোধ, বেদ/ধ্যানে মরহুম হাইনের সাগরের।’ তাঁর লক্ষ ছিলো এই ক্লিষ্ট দুনিয়ার/সব ময়লা করবো সাফ।’ এভাবে নিজেকে নিজে বিদ্রুপ এবং পরিহাস করে সমাজ সমকালকে অভিঘাত করেছেন। নিজেকে সব সময় ভাবতে ঝাড়ুদার গ্রন্থাকার। হিসেবে। সমাজের অজস্র জঞ্জাল সাফ করতেই জীবনের আশিটা বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। কবিতা লেখা ছেড়ে গদ্য- গল্পে আমার পেছনে সমকালীন লেখক বন্ধুদের প্রসংশা ও প্রেরণাও হয়ত কাজ করেছে। একটি ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই। আবুল কালাম শামসুদ্দীন তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন আমরা সেদিন একদিনের জন্য হুগলী পান্ডুয়া ভ্রমণে গিয়েছিলাম। বাহার মিয়া, আয়নল হক খাঁ, নাসির আলী, মুজিবুর রহমান খাঁ, মঈনুদ্দীন প্রমুখ সাহিত্যিক বর্গ মিলে আমরা প্রায় জনা দশেক ছিলাম সে দলে। তরুণ সাহিত্যিক শওকত ওসমানও আমাদের সহযোগী হন। হুগলী ও পান্ডুয়ার দ্রষ্টব্যগুলো দেখে সে রাতেই আমরা আবার কলকাতায় ফিরে আসি। দিন কয়েক পরেই শওকত ওসমান তাঁর ভ্রমণ বিবরণ লিখে ‘মাসিক মোহাম্মদী’ অফিসে আসেন। তাঁর লেখাটি পড়ে একেবারে বিস্মিত-চমকৃত হয়ে গেলাম। লেখাটির ভাষাই শুধু সুন্দর ছিলনা, দ্রষ্টব্য বিষয়গুলোর বিবরণ ছিল এতই সজীবন এবং তাঁর তীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ এতই পরিস্ফুট ছিল যে, তাঁর রচনায় মুগ্ধ হয়ে তাকে বলে ফেললাম, আপনি গল্প লেখেন না কেন ? আপনি তো জাত-গল্পলেখক।…এবার থেকে গল্পই লিখবো। কিন্তু তো? আমি বললাম নিশ্চয় পারবেন।’ গল্প লেখার এ উৎসাহ শওকত ওসমানকে কবিতা থেকে ফিরিয়ে আনে এবং গল্প উপন্যাস লেখার পথে অগ্রসর করে দেয়। ১৯৪৬ সালে। আজাদ’ পত্রিকার ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম উপন্যাস বনী আদম এর অংশ বিশেষ। সাতচল্লিশে দেশ বিভাগের পর তিনি পূর্ব বাংলায় চলে আসার ফলে ‘বনী আদম’ উপন্যাসের পান্ডুলিপি তাঁর হস্তগত ছিলনা। ১৯৯০ সালে ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ পত্রিকার ঈদসংখ্যায় উপন্যাসটির পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত করে প্রকাশিত হয়। ফলে ‘বণী আদম’ শওকত ওসমানের প্রথম উপন্যাস হলেও এটি প্রকাশিত অনেক পরে। ‘বনী আদম’ উপন্যাস সম্পর্কে অনীক মাহমুদ লিখেছেন। ‘গ্রাম ও শহরের পটভূমিতে নানান মানুষের দুঃখ-দারিদ্র্য তৎসঙ্গে ফাঁপা কিছু ভন্ডের জীবনদর্পণ হচ্ছে শওকত ওসমানের ‘বনী আদম’। ১৯২০ এর দশকের শেষ এবং ১৯৩০ দশকের প্রথম দুটি বছর এই উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহের সময়…‘বনী আদমের’ শুরুতে শওকত ওসমান স্বর্গচ্যুত আদমের পরিণতির কথা স্মরণ করেছেন। সামান্য ভুলের জন্য হযরত আদম (আঃ) বেহেস্ত থেকে বিচ্যুত হয়ে যে মানব মন্ডলীর জন্ম দিয়েছিলেন, তিনি বিধাতার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা পেলেও তৎসৃষ্ট মানুষরা অশেষ দুর্গতির কবল থেকে রক্ষা পায়নি। প্রতিনিয়ত হাজারও সমস্যার ছোবলে তাদের জর্জরিত হতে হয়।…বেনী আদম’কেবল নায়ক হারেসের মর্মস্পশী কাহিনী নয়। তার সঙ্গের এখানে যে সমস্ত পাত্র-পাত্রী চিত্রিত হয়েছে, তারা সবাই একই রকম দারিদ্রের ছোবলে ক্রুষ্ট। ফলে আদম সন্তানদের শোচনীয় পরিণামের ঈঙ্গিত থেকে লেখক উপন্যাসের নাম ‘বনী আদম’ বা আদমের বংশধর করেছেন। গ্রন্থাকারে শওকত ওসমানের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘জননী’ (১৯৬১)। এটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। যদিও ‘জননী উপন্যাসের কিছু অংশ ‘সওগাত’পত্রিকায় ১৯৪৪-৪৫ প্রকাশিত হয়েছিল। উপন্যাসটির ‘মুখবন্ধ’-এ তিনি লিখেছেন ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় এই উপন্যাস রচনার সূত্র স্বাধীন স্বদেশের এর সমাপ্তি। কাহিনীর পটভূমি চল্লিশ বা আগেকার।’ ‘সওগাত’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের সময় এর নাম ছিলো। জিন্দান’। ‘জননী’ গ্রন্থাকারে প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উপন্যাস সাহিত্যে শওকত ওসমানের নাম পাকাপোক্ত হয়ে যায়। সমকালীন কবি সাহিত্যিগত ‘জননী’ উপন্যাসের আলোচনা সমালোচনা লিখে তাঁর নানাভাবে অভিনন্দিত করতে থাকেন। ‘জননী’হয়ে বাংলাদেশের সাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। আবুল ফজল ‘মাহেনও’ পত্রিকায় লেখেন ‘মনে হয় ‘জননী’ আমাদের একমাত্র প্রতীক উপন্যাস। মানব চরিত্রের ঊীরংঃবহপব বা অবস্থানের যে যন্ত্রণা, যা সাধারণ মানুষকে উপন্যাসের চরিত্র করে তোলে, আমাদের ঔপন্যাসিকদের মধ্যে শওকত ওসমানই তা ধরতে পেরেছেন। তার চেয়ে বড় কথা তাকে ভাষায় রূপ দিতে পেরেছেন। আলী আজহার খাঁ, দরিয়া বিবি, চন্দ্রকোটাল, ছোট বড় আরো অনেকে এই যন্ত্রণার শিকার, যে যন্ত্রণা তাদের মত অভাজনদেরও সাহিত্যের মানুষ উন্নীত করেছে। এজন্য শওকত ওসমানের কৃতিত্ব স্বীকার করতেই হবে।’ শওকত ওসমানের ‘জননী’ এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জননী’ (১৯৩৬) একই নামে দুটি উপন্যাস রচিত হলেও এই দুই ঔপন্যাসিক হিন্দু ও মুসলিম দু’রকম পরিবারের দুই মায়ের চরিত্র তুলে ধরেছেন। শওকত ওসমানের ‘জননীর’ দরিয়াবিবি ছিল স্বামীহীনা, বিধবা, শরীর ও মনের দিক থেকে সে ছিল উপবাসী। সহায়-সম্বলহীন এই বৈধব্য জীবনে দরিয়াবিবি শুধু অর্থাভাব ও অন্নাভাব দিয়ে বিচার করলে তার প্রতি অবিচারই করা হবে। দরিয়াবিবির আগের পক্ষের সন্তান মোনাদিরের পড়ার খরচ সংসারের খরচ ইত্যাদি মেটানোর জন্য তাকে দেবররূপী লস্পট ইয়াকুবের কাছে সাহায্য নিতে হয়, গ্রহণ করতে হয় ঋণ। ‘হন্তারক’ গ্রীষ্মে দুহার ঘুমের মধ্যে ইয়াকুব দরিয়াবিবির উপর দখল নেয়। দবিয়াবিবি চোখ মেলে দেখতে পায় ইয়াকুবের গভীর আলিঙ্গনে সে আবদ্ধ। দারিয়াবিবি সন্তান সম্ভাবা হয়ে পড়ে। এভাবে সন্তানদের বাঁচানোর জন্য দরিয়াবিবি পরপুরুষের দ্বারা সন্তানবতী হয়। তারপর নিজেই প্রসূতি, নিজেই ধাত্রী হয়ে সন্তান প্রসব করে, তাকে সুন্দর করে দুধ খাইয়ে নিজেই ফাঁসিতে আত্মহত্যা করে গ্লাণিকর মাতৃ-পরিচয়কে মহীয়ান করেছে। অন্যদিকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জননী’ শ্যামার মধ্যে এরকম মানসিক দ্বন্দ্ব ও জীবন সংকট নেই। শ্যামাকে সমাজ কিবো পরপুরুষের সঙ্গে লড়াই করতে হয়না। স্বামীর সঙ্গমেই তার সন্তান হয়। এই ভিন্নতার কারণ হচ্ছে, মানিক হিন্দু পরিবারের পটভূমিতে জননীকে চিত্রিত করেছেন, আর শওকত ওসমান মুসলিম পরিবারের পটভূমিতে জননীকে চিত্রায়িত করেছেন। তবু আমরা এই দুই উপন্যাসের জননীকে দেখি অশ্রুসিক্ত, বেদনায় রিক্ত, অথচ জননীত্বের তুলনাহীন মহিমায় মহিমান্বিত।’ সমস্ত পবিত্র ধারণা দিয়ে আমরা মাকে ভাবতে শুরু করি আশৈশব। আমাদের এই ভাবনায় মা হয়ে ওঠেন স্বর্গের অভিবাসী। আমরা ভুলে যাই যে, মা-ও মানুষ এবং রক্তমাংসের মানুষ। আর দশটা নারীর মতো তারও থাকতে পারে শারীরিক প্রয়োজন, মানসিক অতৃপ্তি, এবং চারিত্রের ত্রুটি। হিন্দু হোক আর মুসলমান হোক কোনো ধর্মের …সন্তানই মায়ের কলঙ্কিত, গ্লাণিকর পরিচয় মেনে নেয় না। এটা জেনেই দরিয়াবিবি আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। অর্থাৎ সন্তান বাৎসল্য তাকে বাঁচতে দেয় না, মৃত্যুর পথেই ঠেলে দেয়। তবু দরিয়াবিবি মায়ের পরিচয়কে অক্ষুণ্ন রাখে, নিজের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শাশ্বত জননীত্বকে জয়ী করেছে। ‘ধনী আদম’ এবং ‘জননী’ দু’টি উপন্যাসই গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত। বিশেষত পশ্চিম বঙ্গের হুগলী, হাওড়া অঞ্চলের কৃষিপ্রধান মুসলমান সমাজ ও পারিবারিক ওঠে এসেছে ওই দু’টি উপন্যাসে। শওকত ওসমানকে এর পর গ্রামীণ পটভূমিতে উপন্যাস লিখতে দেখা যায়নি। এর কারণও অনির্দ্দেশ্য নয়। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হবার পর লেখক পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে চলে আসেন পূর্ববঙ্গে। ফলে গ্রাম-জীবনের সঙ্গে তাঁর যে- বিচ্ছেদ ঘটে উপন্যাসের ক্ষেত্রে সেটা আর জোড়া লাগে নি। ফলে বাংলাদেশের গ্রাম ভিত্তিক কোনো উপন্যাস আর তাঁর হাত থেকে বের হয়নি।’ পাকিস্তানের সামরিক শাসন পার্চ সরাসরি কথা বলা সম্ভব ছিল না। অনরুদ্ধ এই সামাজিক রাজনৈতিক পক্ষ একজন সচেতন শিল্পী দায়িত্ববোধ থেকেই শওকত ওসমান লেখেন ‘ক্রীতদাসের হাসি’ (১৯৬২)। রূপকাশ্রয়ী এই উপন্যাসে তিনি সামরিক শাসন শৃঙ্খলিত জাতীয় মুক্তি আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিবিম্বিত করেছেন।‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসের ভূমিকা স্বরূপ এ পুস্তকের পাণ্ডুলিপি আবিষ্কারের একটি বৃত্তান্ত সংযোজিত হয়েছে। উপন্যাসের প্লট বিন্যাসের ক্ষেত্রে এই বৃত্তান্তের ইঙ্গিতময় তাৎপর্য রয়েছে। উপন্যাসের কাহিনীকে বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোমার জন্য, রূপকের আড়াল বা ভ্রান্তি তৈরি করার জন্য তিনি একটি গল্প ফেঁদেছেন। সবাই জানে আরব্য উপন্যাস আলেফ লায়লা ওয়া লায়লা ’ এক হাজার একরত্রির গল্প কিন্তু ফরিদউদ্দীন জৌনপুরী জানান, তা সঠিক নয়। সঠিক হচ্ছে, ‘আলেফ লায়লা ওয়া লায়লানে’ অর্থাৎ এক হাজার দুই রাত্রির গল্প’ এবং শেষ গল্পটির নাম হচ্ছে,’জাহাকুল আব্‌দ’ মানে‘ক্রীতদাসের হাসি’। ‘তাতারীর সেই মহান ঔদ্ধত্য ‘শোনো, হারুনর রশীদ। দিরহাস দৌলত দিয়ে ক্রীতদাস গোলাম কেনা চলে। বান্দী কেনা সম্ভব। কিন্তু, কিন্তু ক্রীতদাসের হাসি-না-না-না-না’ তখন আমাদের অনেকের রক্তে জ্বলে ওঠে বিদ্রোহ। এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হচ্ছে তৎকালীন আইয়ুবীয় সামরিক শাসনের ভয়ে দুঃখিনী পূর্ববাংলার মুখে হাসি নেই। ‘চৌরসন্ধি’ (১৯৬৬) মূলত চোরদের নিয়ে লেখা হলেও এর রূপকের আড়ালের মধ্যে রয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের মোনেম খাঁ, পশ্চিম পাকিস্তানে আইয়ুব খানের রাজত্ব। যেন দুই চোরের সন্ধি। কাল্লু সর্দার আর বেচু সর্দার। মূল কাহিনী কাল্লুকে নিয়ে। উপকাহিনী উনিশ পত্মী কুব্রা এবং ব্যবসায়ী সায়ীদের প্রণয়। একজন তাগড়া রিকশাওয়ালা কিভাবে মিল মালিকের ধর্মঘট ভাঙার সাহায্য করতে এসে সর্দারের পরিণত হয়, তার বিস্তারিত বর্ণনায় বেশ জট পাকানো হয়েছে। পাঠক বুঝতে পারে উচ্চবিত্তের মূল্যবোধ মধ্যবিত্ত বা সাধারণ জনগণের মতো নয়, এর মধ্যে বিপুল পার্থক্য আছে।
‘সমাগম’ (১৯৬৮) উপন্যাসটি সিকান্দার আর জাফর সম্পাদিত ‘মাসিক সমকাল’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়। এ উপন্যাসের গঠন-কৌশল, বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তাশক্তির অবরুদ্ধতার প্রেক্ষপটে যথেষ্ট আলোচনা সমালোচনা হয়। বিভিন্ন যুগের মনীষীদের সমাগম করে তাদের চিন্তা চেতনা, তর্কবিতর্কের মাধ্যমে তৎকালীন সামরিক-স্বৈরাচারক নিন্দা করেছেন। এটি ছিলো শিল্পীর বিবেকী উত্থানের অসাধারণ শৈল্পিক প্রয়াস। ‘বাজাউপাখ্যান’ (১৯৭০) উপন্যাসের উপক্রমনিকায় শাহনা…. মহাকাব্যের কবি ফেরদৌসীর প্রসঙ্গ আছে। সম্রাট জাহুক অভিশপ্ত জীবনযাপন করছে। তার দুই কাঁধে দুইটি বিষধর সর্প। সর্প দুইটির প্রতিদিনের আহার হচ্ছে তাজা তরুণ তরুণী অথবা জ্ঞানী বৃদ্ধের মগজ। যতদিন এই আহার যোগাতে পারবে ততদিন সে বাঁচবে। যেদিন সর্পদ্বয়ের খোরকের অভাব ঘটবে, সেদিন সর্পগুলো রাজার মাথার খুলি ভেঙে মগজ আহার করবে। সেদিন তার মৃত্যু হবে। প্রতিদিন রাজ্যের তরুণ তরুণী বিনা কারণে মৃত্যু বরণ করছে। রাজকন্যা গুম্মশান বাবার এই হত্যাকাণ্ড দেখছে। হরমুজ নামের এক কয়েদি থাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আনা হলে সে বলে, আমি রাজাকে এই সর্প অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে পারবো। সে কৌশলে সর্পদ্বয়ের মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়। সর্পদ্বয় রাজার গলাপেঁচাশে থেকে বের করার জন্য একটাকে বেশি ঘিলু অন্যটাকে কম ঘিলু দেয়ার প্রাপ দুইটি একটার সঙ্গে অন্যটা যুদ্ধ করে মারা যায়। রাজা জাহুক অভিশাপ মুক্ত হয়ে কন্যা গুলশানের সঙ্গে হরমুজের বিয়ের ঘোষণা দেয়। ‘রাজা উপাখ্যান’ উপন্যাসের সাপ দুটি আসলে পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতীকী রূপ। ঘিলু উম-বেশি দিয়ে সর্পদ্বয়ের মধ্যে যুদ্ধের অবতারণা মূলত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যকে প্রতীকায়িত করা হয়েছে। রূপক-প্রতীক রীতির উপন্যাসের মাধ্যমে শওকত ওসমান এভাবে সমকালীন সামাজিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক সংকটকে প্রতিবাদী চেতনায় শিল্পরূপ দিয়েছেন। মুক্তযুদ্ধকে শিল্পরূপ দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন ‘জাহাম্লাস হইতে বিদায় (১৯৭১) দুই সৈনিক (১৯৭৩) নেকড়ে অরন্য (১৯৭৩) জলংগী (১৯৭৪) ইত্যাদি। ভাষা আন্দোলনকে পটভূমি করে লিখেছেন ‘আর্তনাদ’ (১৯৮৫)। এছাড়া ‘পতঙ্গ পি…(১৯৮৩) পিতৃপুরুষের পাপ (১৯৮৬) রাজপুরুষ (১৯৯২) প্রভৃতি উপন্যাসে তিনি বাংলাদেশের সমকালীন বস্তুবাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। ষাটের দশক ছিল শওকত ওসমানের জন্য সবচেয়ে সৃষ্টিশীল দশক। এসময়ের তিনি উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম সম্পাদন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস তিনি কলকাতায় উদ্বাস্ত ছিলেন। ফিরে আসেন ১৯৭২ সালে ৮ জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হলে শওকত ওসমান একধরনের প্রতীকী প্রতিবাদ স্বরূপ স্বেচ্ছায় পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। পাঁচ বছর সেখানে ছিলেন। ১৯৮১ সালে ১৭ এপ্রিল তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। প্রাবন্ধিক আবদুল হকের ‘স্মৃতি সঞ্চয়’ থেকে জানা যায়, ‘গতকাল শওকত ওসমান জানালেন, শীগগীরই তাঁর ছোটদের উপন্যাসও। রিটায়ার করার সুফল। রিটায়ার না করলে অল্প সময়ের মধ্যে এতগুলো বই লেখা এবং বের করা সম্ভব হতো না। আরও জানালেন, তিনি একখানি এপিক উপন্যাস লেখায় হাত দিয়েছেন।’ আমৃত্যু তিনি সাহিত্যচর্চা করেছেন, কখনো সময়ের অপচয় করেন নি, এখানেই তাঁর কৃতিত্ব।

x