শঅর ডুবি গেইয়্যি

মৌসুমের প্রথম ভারী বর্ষণের ধকল সইতে পারল না নগরী, বাসাবাড়ি দোকানপাটে পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষতি, অবর্ণনীয় দুর্ভোগ

মোরশেদ তালুকদার

মঙ্গলবার , ৯ জুলাই, ২০১৯ at ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ
2173

মৌসুমের প্রথম ভারী বর্ষণের ধকল সইতে পারল না নগরী। ডুবে গেল শহরের বেশিরভাগ এলাকা। বাসা-বাড়ি, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও পানি ঢুকে যায়। হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি ছিল সড়কজুড়ে। ফলে জলবন্দী হয়ে পড়েন নগরবাসী। এ অবস্থায় অনেককেই বলতে শোনা গেছে, ‘শঅর ডুবি গেইয়্যি’। গতকাল দুপুর থেকে বিকেল প্রায় সাড়ে চারটা পর্যন্ত ছিল এ চিত্র। জলজটের কারণে শহরের প্রধান সড়কগুলোত যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ে। কোথাও পানি এড়িয়ে যানবাহন চললেও গতি ছিল ধীর। সাথে ছিল তীব্র যানজট। সবমিলিয়ে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে মানুষ।
জলাবদ্ধতার কারণে দুর্ভোগে পড়েন বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনকারীরাও। পূর্ব নির্ধারিত থাকায় তাদের পক্ষে অনুষ্ঠান পেছানোও সম্ভব ছিল না। মনসুরাবাদ এলাকায় জলমগ্ন একটি কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। গতকাল দিনভর ভারী বর্ষণ হয়েছে নগরীতে। সকালে থেমে থেমে হলেও দুপুর ১২টা থেকে বিকেল প্রায় চারটা পর্যন্ত একটানা বৃষ্টি হয়। এরমধ্যে ১২ টা থেকে ৩টা পর্যন্ত শুধু তিন ঘন্টায় ৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস। এছাড়া সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘন্টায় ১৮৮ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে দৈনিক আজাদীকে জানিয়েছেন পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ ও পূর্বাভাস কর্মকর্তা উজ্জ্বল কান্তি পাল। আজও ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে জানান তিনি। এদিকে গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক সতর্কবার্তায় চট্টগ্রামসহ সমুদ্রবন্দরগুলোর তিন নম্বর স্থানীয় সর্তকতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
পানি আর পানি : সরেজমিন পরিদর্শন এবং স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শহরের বেশিরভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত আরাকান সড়কের বহদ্দারহাট থেকে মুরাদপুরে প্রায় কোমর সমান পানি দেখা গেছে। একই অবস্থা ছিল দু্‌ই নম্বর গেইট চশমাহিল এলাকায়। জিইসি মোড় এবং ওয়াসায়ও জলজট ছিল অসহনীয়।
প্রবর্তক মোড়ের অবস্থা ছিল আরও করুণ। সেখানে কোমরেরও অধিক পানির স্থায়ীত্ব ছিল। এখানে পানি ঢুকে যায় বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। রেয়াজুদ্দিন বাজার ও ফলমণ্ডিতেও বিভিন্ন দোকানপাটে পানি ঢুকে যায়। তামাকুমণ্ডি লেইন বণিক সমিতির নেতা মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘বৃষ্টির পানিতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।’
এদিকে আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক, ছোটপুল, চকবাজার, চকবাজার ফালাহ গলির সামনে, গণি কলোনি, কালাম কলোনি, খাতুনগঞ্জ, চাক্তাইসহ বিভিন্ন এলাকায় জলজট ছিল। বহদ্দারহাট এককিলোমিটার, চৌধুরী স্কুল ও খাজারোডসহ আশেপাশের এলাকায় পানি হাঁটুর বেশি ছিল। নাছিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির ৩, ৪, ৫ ও ৬নং সড়কে প্রায় কোমর সমান পানি ছিল বলে জানিয়েছেন আবদুল জলিল নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা।
চান্দগাঁও শরফউদ্দিন আউলিয়া সড়ক, খলিফা পাড়া, ছাত্তার মেম্বার বাড়ি, খাজা রোড, দক্ষিণ চান্দগাঁওয়েও পানি জমেছিল বলে জানান শেখ রওনাজ। মাদারবাড়ি এলাকায়ও প্রায় হাঁটু সমান পানি ছিল। একই অবস্থা ছিল পাহাড়তলী সিডিএ মার্কেট এলাকা, কোরবানীগঞ্জ বলুয়ার দিঘির পাড়, আগ্রাবাদ এঙেস রোড, উত্তর কাট্টলীর বিশ্বাস পাড়া, জামালখান বাই লেইন, সদরঘাট থানার আইস ফ্যাক্টরি রোড, আগ্রাবাদ কর্মাস কলেজ এলাকা, বহাদ্দারহাট থেকে নতুন চান্দগাঁও সড়ক, মোহাম্মদপুর রোড, বাদুরতলা বড় গ্যারেজ, গোসাইলডাঙ্গা এলাকায়।
এদিকে স্টিলমিল থেকে সিমেন্ট ক্রসিং পর্যন্ত সড়কে কোমর সমান এবং সিমেন্টক্রসিং থেকে রুবি গেইট পর্যন্ত প্রায় গলা সমান পানি ছিল বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শী রফিকুল ইসলাম। মধ্যম হালিশহর, দক্ষিণ হালিশহর, পতেঙ্গা এলাকায় বাসা বাড়ি দোকানপাটে পানি ওঠে। শিল্পী শ্রীকান্ত মেহেদীবাগস্থ তার অফিসের নিচে পানি জমেছিল বলে জানিয়েছেন।
স্কুল ছুটি : পানি ঢুকে যাওয়ায় পূর্ব ষোলশহর হাছান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ নিচু এলাকায় অবস্থিত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি দেয়া হয়। নাছিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের (সরকারি) নিচ তলায় পানি ঢুকে যায়। ফলে ‘মর্নিং শিফটে’ এ ক্লাস হলেও বিদ্যালয়টিতে ‘ডে শিফটে’ ক্লাস হয় নি। এদিকে ডিসি রোডে একটি মসজিদেও পানি ঢুকে যায় বলে জানিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা মো. আবদুছ সবুর।
আগ্রাবাদের জাম্বুরি মাঠ সংলগ্ন মা ও শিশু হাসপাতালের নিচতলায় পানি ঢুকে যায়। প্রায় হাঁটু সমান পানির কারণে সেখানে সেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। অবশ্য এখানে জোয়ার থাকায় পানির পরিমাণ বেশি হয়েছে। পানি উঠলে নিচতলার রোগীদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। পানি উঠার কারণে চলাফেরায় কিছুটা সমস্যা হলেও হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম অব্যাহত ছিল বলে জানা গেছে।
সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ : নগরীর পাঁচলাইশস্থ একটি বেসরকারি ক্লিনিক থেকে অসুস্থ পিতাকে নিয়ে পতেঙ্গা নিজ বাড়ির উদ্দেশে রাওয়ানা হন সরকারি কর্মকর্তা মিনহাজ উদ্দিন। সকাল ১১টায় যাত্রা করলেও বিকেল চারটায় স্টিলমিল বাজারে পৌঁছান তিনি। পাঁচঘণ্টায়ও আনুমানিক ১৫ কিলোমিটার দূরত্বের গন্তব্যে পৌঁছুতে না পারার কারণ হচ্ছে, জলাবদ্ধতা। জমে থাকা পানির কারণে যাত্রাপথের সড়কের অধিকাংশ অংশে যান চলাচল বন্ধ ছিল। ফলে কিছু হেঁটে এবং কিছুদূর ভিন্ন পথে যেতে হয়েছে। আবার যেখানে গাড়ি চলেছে সেখানে ছিল যানজট। ফলে দুর্ভোগকে সঙ্গী করেও নির্দিষ্ট সময়ে বাড়ি পৌঁছুনো সম্ভব হয় নি।
দুপুরে মুরাদপুরে দেখা যায়, সড়কে পানির জন্য যান চলছে না। এসময় অনেককে দেখা যায়, ভ্যানগাড়িতে করে গন্তব্যে যেতে। কিন্তু সেখানে ছিল গলকাটা ভাড়া। মুরাদপুর থেকে বহাদ্দার হাট পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছিল ১০০ টাকা। এছাড়া শহরের অন্যান্য সড়কেও বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার অজুহাতে বাড়তি ভাড়া দাবি করেছেন চালকরা। বিশেষ করে মর্জিমাফিক ভাড়া দাবি করেছে সিএনজি এবং রিকশা চালকরা।
এদিকে শহরের বিভিন্ন স্থানে বিকেলের পর পানি কমে গেলেও অঙিজেন মোড়ে হাঁটুর উপর পানি দেখা গেছে বিকেল ৫টার পরেও। এ জলজটের কারণে অঙিজেন মোড়সহ আশেপাশের এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। অঙিজেন মোড় থেকে উত্তরে কুলগাঁও এবং দক্ষিণে প্রায় আতুরার ডিপো পর্যন্ত অংশে তীব্র যানজটে ভোগান্তিতে পড়েন মানুষ।
বিকেল চারটা ২০ মিনিটে শান্তনু চৌধুরী নামে একজন জানান বলেন, ‘আগ্রাবাদ থেকে দুপুর ১টায় গাড়িতে উঠে এখন পর্যন্ত সল্টগোলা আসার সৌভাগ্য হয়েছে। অথচ সামান্য এ পথের দূরত্ব সাড়ে তিন কিলোমিটার।
এদিকে বিমানবন্দর সড়কে পানি উঠায় এবং পানির কারণে সৃষ্ট যানজটে দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে বিদেশগামী ও দেশে আসা যাত্রীদের। বখতেয়ার নামে রাউজানের এক বাসিন্দা বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমার ছোট ভাই এসেছে। তীব্র যানজটের কারণে সঠিক সময়ে তাকে রিসিভ করতে যেতে পারেনি। আমি পৌঁছুনোর প্রায় দুইঘন্টা আগেই সে বেরিয়ে যায়। এদিকে যানজটের কারণে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দুবাইগামী ফ্লাই দুবাই, কলকাতাগামী ইউ এস বাংলা, আবুধাবীগামী বাংলাদেশ বিমান, দোহাগামী ইউএস বাংলা, শারজাহগামী এয়ার এরাবিয়া, ঢাকাগামী রিজেন্ট এয়ারের ফ্লাইটের যাত্রীরাও দুর্ভোগে পড়েন।
দুপুরে স্বরুপ দত্ত রাজু নামে এক যাত্রী জানান, ইপিজেড থেকে শহরের দিকে আসতে কোথাও কোন গাড়ি নেই। মোড়ে মোড়ে কর্মজীবী লোকজন কাকভেজা হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে বহদ্দারহাট থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত ফ্লাইওভারেও ছিল তীব্র যানজট। সড়কে পানি থাকায় বেশিরভাগ গাড়ি উঠে ফ্লাইওভারে। কিন্তু দুইদিকে পানির জন্য গাড়িগুলো আটকে যায় সেখানে। এতে কয়েক ঘণ্টা ধরে তীব্র যানজট ছিল সেখানেও।

x