লোরকার নির্বাচিত চিঠি

এমদাদ রহমান

মঙ্গলবার , ৮ জানুয়ারি, ২০১৯ at ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ
10

রবীন্দ্রনাথের পাঠক কি শুধুই তার কবিতা, গল্প আর উপন্যাসেই আটকে থাকেন? কবিতার বাইরে পাঠক কেন তার একান্ত ব্যাক্তিজীবনের দিকে ফিরে তাকাতে চান? রাশিয়ার চিঠি, জাভাযাত্রীর পত্র কিংবা জীবনস্মৃতি তারা পড়েন না? কিংবা আলবের কামু’র উপন্যাস পাঠকের ভেতরে কি তাঁর নোটবুকগুলি পড়বার প্রবল আগ্রহ দেখা দেয় না? রুশদি’র উপন্যাস পড়ার পর তাঁর নিকারাগুয়া ভ্রমণ কেউ পড়তে চান না? হ্যাঁ, এমন অসংখ্য পাঠকও আছেন। প্রচল পাঠের বাইরে গিয়েও তারা তাদের পাঠতৃষ্ণা মিটিয়ে নেন; এ হচ্ছে তাদের ভিন্নপাঠ; এই ভিন্নপাঠে আরাধ্য কবি কিংবা লেখকের জীবনও পাঠকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা’র চিঠিগুলিও তেমনই এক সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতায় ভরিয়ে দেয় আমাদেরকে। বলা যায়, এভাবেও পাঠ সম্পূর্ণ হয়, হয়ত বহু কৌতূহলও মিটিয়ে নিতে পারি আমরা, তার চিঠির অন্তরঙ্গ পাঠে। ঝবষবপঃবফ খবঃঃবৎং, ঋবফবৎরপড় এধৎপরধ খড়ৎপধ, ঊফরঃবফ ধহফ ঃৎধহংষধঃবফ নু উধারফ এবৎংযধঃড়ৎ, ঋরৎংঃ ঢ়ঁনষরংযবফ রহ এৎবধঃ ইৎরঃধরহ রহ ১৯৮৪ নু গধৎরড়হ ইড়ুধৎং খঃফ, খড়হফড়হ-কবির মূল্যবান কিছু চিঠির সংগ্রহ। বইটি আমাদের আশ্চর্য করে। লোরকার ২০ বছর বয়স থেকে শুরু করে ১৯৩৬-এ ফ্রাংকো’র বাহিনীর হাতে মারা যাওয়ার এক মাস আগ পর্যন্ত লিখিত অজস্র চিঠি থেকে বেছে নিয়ে গড়ে উঠেছে নির্বাচিত চিঠি’র এই বইটি।
‘হ্যাঁ, তুমি এভাবেই লড়াই করতে শিখেছ। এই পন্থাতেই তুমি শিখে যাবে কীভাবে জীবনে প্রতিকূলতাকে জয় করে নিজের ওপর কর্তৃত্ব তৈরি করবার ভয়ানক শিক্ষানবিশি। তোমার বই ‘নীরবতা দিয়ে ঘেরা’ পৃথিবীর সমস্ত প্রথম বইয়ের মত, আমার প্রথম বইটিরও মত। আর এই নীরবতারও আছে বিপুল যাদু আর শক্তি। নিজের আনন্দে, লেখ। পড়। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ কর। যুদ্ধ কর। নিজের কাজ নিয়ে নিজে কখনও অহংকার কর না। তোমার বইয়ের ভিতর অনেক শক্তি আছে, আছে অনেক অনেক আশ্চর্য হওয়ার মত প্রসঙ্গ, এবং অত্যন্ত চমৎকারভাবে ঘৃণা আর ক্রোধের এক মনুষ্যচিত উন্মোচনের উৎকৃষ্ট চোখ, কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণ সাহসী নয়। যে-সাহসের কথা তুমি বলে থাক, যা প্রায় সকল কবির ভিতরেই আবশ্যকীয়রূপেই বিদ্যমান থাকে।
নিজেকে প্রশান্ত কর। আজকের স্পেনে ইউরোপের সবচেয়ে সৌন্দর্যময় কবিতা লেখা হচ্ছে। কিন্তু অন্যদিকে, মানুষের কাছে তা পৌঁছাচ্ছে না তোমার ‘পেরিতো এন লুনাস’ (আয়নার কুশলতা) কখনই নির্বোধ নীরবতা প্রত্যাশা করেনি। না। এই বই প্রত্যাশা করে তীব্র ধ্যান, মনোযোগ, উৎসাহ আর সকলের ভালবাসা। যা তোমার অধিগত এবং সামনের দিনগুলোয় যা তুমি হয়ে উঠবে, কারণ তোমার ভিতর আছে কবির রক্ত। এমনকি তুমি যখন অক্ষরগুলো দিয়ে কিছুর প্রতিবাদ লিখছ, তোমার আলোকোজ্জ্বল আর যন্ত্রণাদগ্ধ হৃদয়ের কোমলতা দিয়ে, তুমি তখনও নিষ্ঠুর বর্বরোচিত ব্যাপারগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পার (যা আমার খুব পছন্দের)। আমি অবশ্যই তোমার এইসব বিষয়কে পছন্দ করব, যদি তুমি এই ঘোর থেকে বের হয়ে আসতে পার। এই ঘোর হল কবিকে বুঝতে-না-পারার ঘোর। অন্যভাবে বলতে গেলে, এই ঘোর হল অধিকতর উদার রাজনৈতিক এবং কাব্যিকতায় আচ্ছন্ন অবস্থা। আমাকে লিখ। আমি আমার কিছু বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি যাতে করে তাদের ভিতর ‘আয়নার কুশলতা’ নিয়ে কোনওরকমের আগ্রহ তৈরি হয় কিনা, এটা দেখতে।
কবিতার বই, প্রিয় মিগুয়েল, খুবই মন্থর গতিতে এগিয়ে চলে। ধীরে। খুব ধীরে।’ ১৯৩৩ সালে বন্ধু মিগুয়েল হারনেন্দেজকে চিঠিতে এই কথাগুলো লিখছেন লোরকা। চিঠির কথাগুলি আমাদের কাছে ব্যঞ্জনাময়, এবং বহুমূল্য। কারণ, বিদগ্ধ আত্মার কবির এইসব চিঠিই তো তার স্মৃতিকথা। এছাড়া তাকে আর কোথাও এত নিজের করে পাওয়া যায় না।
১৯২০-এর আগস্টে বন্ধু আন্তনিয় গেলিগো বুরিনকে তিনি লিখছেন-
‘আমার এই গ্রামটা কী চমৎকার–কেন তুমি কিছুদিনের জন্য এখানে চলে আসছ না? আমি পুরো গ্রামটাকে আমার আত্মার ভেতরে গভীরভাবে আশ্রয় দিয়েছি। তুমি যদি দেখতে পেতে সেইসব ভুতুড়ে শিশিরবিন্দুভর্তি সূর্যাস্তগুলো, সেই অপরাহ্ণের শিশিরবিন্দু, দেখলে মনে করবে যেন মৃতদের জন্য ঝরছে, যেন তারা সেইসব বিপথগামী প্রেমিকদের জন্য নেমে আসছে, যাদের পরিণতি সেই একই! তুমি যদি দেখতে পেতে এই বিষণ্ন খালগুলোর বিষাদ আর সেই সেচযন্ত্রগুলোর চাকার জপমালার মত ধীর আবর্তন! আমি প্রত্যাশা করছি এই দেশ, এই গ্রাম আমার গীতিকার শাখাগুলোকে, অপরাহ্ণের লাল ছুরি দিয়ে এই পবিত্র বছরে পরিমার্জিত করে দিবে।’
১৯২১-এর জুলাইয়ে মালশোর হেরনান্দেথকে লিখছেন-
‘আসলে, নিজেকে আমি নতুন করে গড়ছি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিচ্ছি এই জন্য যে, দিনের পর দিন ধরে আমি আমার আকাঙ্ক্ষা আর বিভ্রমগুলোর সমন্বয় করতে পেরেছি!
আমি কিছু অদ্ভুত সংলাপ লিখে ফেলেছি, সংলাপগুলো এতই গভীরতাহীন যে তারা অগভীর বলেই গভীর, প্রগাঢ়। প্রতিটি সংলাপ শেষ হচ্ছে একটি গানের সঙ্গে। ইতোমধ্যেই আমি শেষ করে ফেলেছি ‘কুমারি’, ‘নাবিক আর ছাত্র’, ‘পাগল আর পাগলী’, ‘সিভিল গার্ডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল’ আর ‘ফিলাদেলফিয়া বাইসাইকেল’-এর সংলাপ, এবং নাচের সংলাপ। নাচের সংলাপ নিয়েই এখন কাজ করছি।
প্রকৃত কবিতা- নগ্ন। আমি বিশ্বাস করি যে তারা ধারণ করে গভীর আগ্রহ আর আসক্তি। তারা আমার অন্যসব কাজ থেকে অনেক বেশি বৈশ্বিক (যেগুলোকে, আলাদা আলাদাভাবে, সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবার মত কিছু পাইনি)।’
১৯২৬-এ বন্ধু আনা মারিয়া দালিকে লিখছেন-
‘মারিয়া, গ্রানাদায় আমি ক্লান্ত, বিরক্ত। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাইছি, মাঝেমাঝেই, এবং খুব সম্ভবত কিছুদিনের ভেতর।’
১৯৩১-এ গ্রানাদা থেকে রেজিনো দে লা মাহাকে লিখছেন-
‘হ্যাঁ, আমি কাজ করছি। এইতো শেষ করে ফেললাম ‘পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলে’ নাটকটি। ভালয় ভালয় নাটকের কাজটা শেষ করতে পারায় বেশ তৃপ্তি পাচ্ছি, আর হ্যাঁ, ‘ইয়েরমা’ নাটকটি জিরগু’র মঞ্চে অভিনয়ের জন্য প্রায় আধাআধি পর্যন্ত শেষ করে এনেছি। এটা একটা দারুণ প্রচেষ্টা, রেজিনো। পাশাপাশি একটি কবিতাবইয়ের কাজও গুছিয়ে ফেলেছি, ‘মৃত্যুর জন্য কবিতা’। কবিতাগুলো খুব তীব্র, প্রগাঢ়। এখনও, মৃত্যু নিয়েই আমার বলবার মত কিছু কথা রয়ে গেছে! আমি, প্রকৃত অর্থেই, এক প্রস্রবণের আদিমুখ। দিনরাত লিখছি। লিখছিই। এই সময় আমি যেন এক প্রাচীন রোম্যান্টিক, কিন্তু এই অলীক কল্পনাবিলাসটুকুকে মর্ম থেকে না তাড়িয়ে এক বিপুল, খুব সচেতন এক সৃষ্টির দিকেই আমার যাত্রা।’
ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা’র লেখালেখি শুরু হয়েছিল ‘ছায়ারেখা এবং ভূ-দৃশ্যাবলী’ বই দিয়ে; বইটিকে বলা হয় স্পেনের চিত্রকলা, ভূ-দৃশ্যাবলী এবং ইতিহাস নিয়ে এক তরুণ কবির গভীর ধ্যান। গ্রানাদা’র সূর্যাস্ত, ক্যাথিড্রালগুলির গথিক স্থাপত্যরীতি, পর্বতমালার সৌন্দর্য থেকে তিনি যেন স্পেনের অন্তর্নিহিত চেতনার রূপটিকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। লুই বুনুয়েল, সালভাদর দালি, নেরুদা, রাফায়েল আলবেরতি, হুয়ান রামোন হিমেনেথ–এইসব দুনিয়াখ্যাত লেখক ছিলেন তার বন্ধু। তার সবচেয়ে বড় কাজ হিশেবে বিবেচিত জিপসি-গীতিকা বের হয় ১৯২৮ সালে। ১৯ আগস্ট ১৯৩৬-এ স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়, ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকো’র ফ্যাসিবাদী প্যারামিলিশিয়া ব্ল্যাক স্কোয়াডের সদস্যরা তাকে হত্যা করে। তার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায় নি।
বন্ধুদের কাছে লেখা লোরকা’র চিঠিগুলিই তার স্মৃতিকথা, তার আত্মজীবনী।

x