লিম্ফোমা নিরাময়ে হোমিওপ্যাথি

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ২৪ নভেম্বর, ২০১৮ at ৮:১৩ পূর্বাহ্ণ
182

যে কোন এক শ্রেনীর ক্যানসারে লিম্ফায়েড টিসুর কোষগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পাওয়াকে লিম্ফোমা বলে। লিম্ফোমা হলো এমন এক ক্যানসার যা লিম্ফেটিক সিস্টেমে হয়ে থাকে। লিম্ফনোড (লিম্ফ গ্র্যান্ড), স্প্লিন, থাইমাস গ্ল্যান্ড এবং বোনম্যারোর (অস্থিমজ্জা) মাধ্যমে লিম্ফেটিক সিস্টেম গঠিত। সাধারণত এসব অংশে লিম্ফোমা দেখা দেয়। এছাড়া শরীরে অন্যান্য অংশেও এ রোগ হতে পারে।
লিম্ফোমার প্রকারভেদ

লিম্ফোমা দুই ধরনের হয়। (১) অস্বাভাবিক কোষগুলো উপস্থিত থাকলে রোগটিকে হজকিনস লিম্ফোমা বলে। আর সব অন্যান্যগুলোকে নন-হজকিনস লিম্ফোমা বলে।
ননহজকিনস লিম্ফোমা

হজকিনস ডিজিজ ছাড়া লিম্ফয়েড টিসু (সাধারণত লসিকা গ্রন্থি ও প্লীহায় দেখা যায়)-র যে কোন ক্যানসার। অস্বাভাবিক কোষগুলোর কাজ ও প্রকৃতি অনুযায়ী নন-হজকিনস লিম্ফোমাগুলোর সাংঘাতিকতার পরিবর্তন ঘটে। মৌলিক কোষগুলোকে পৃথক করা কষ্টসাধ্য হলেই লিম্ফোমাগুলো খুব সাংঘাতিক হয়। এই কোষগুলো সমগ্র লসিকা গ্রন্থিসমূহকে দ্রুত গ্রাস করে। নিম্নমানের (কম সাংঘাতিক) লিম্ফোমাগুলো পৃথকযোগ্য হতে পারে।
রোগের কারণ

লিম্ফোমার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। বিভিন্ন কারণে এই রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। রোগ প্রতিরোধ তন্ত্রের দমন করার সঙ্গে কখনো ইহা সম্পর্কযুক্ত। বিশেষ করে অঙ্গের স্থানান্তরকরণের পরে এরূপ অবস্থা দেখা দেয়। এপস্টাইন বার ভাইরাস দ্বারা এক ধরনের নন-হজকিনস লিম্ফোমা-বারকিট’স লিম্ফোমা হতে পারে। অন্যান্য ধরনের লিম্ফোমাগুলো অন্যান্য ভাইরাসের কারণে হয়।
লিম্ফোমার লক্ষণ

এ রোগ আক্রান্তদের মধ্যে যেসব লক্ষণ দেখা যায় তা হলো- অবসাদ, গলায় বা কুঁচকিতে এক বা একাধিক গুচ্ছ লসিকাগ্রন্থির যন্ত্রণা-বিহীন স্ফীতি। যকৃৎ ও প্লীহা বর্ধিত হতে পারে। ঘাড়ে শক্তপিন্ড দেখা দেওয়া, কর্কশ কণ্ঠস্বর, মুখে ব্যথা, কুঁচকি ফুলে যাওয়া, মুখে ঘা, কাঁধে শক্ত পিন্ড দেখা দেওয়া, কানে চুলকানি, পেটের লিম্ফয়েড টিস্যু আক্রান্ত হয়, অন্যান্য অনেক যন্ত্রও জড়িত হতে পারে। ফলে মাথায় যন্ত্রণা থেকে ত্বকের ক্ষত দেখা যায়। খাবার উগরে আসা, মাংসপেশিতে ব্যথা, সারা শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। নিয়ন্ত্রণ না করলে রোগের বিস্তার রোগ প্রতিরোধ তন্ত্রকে ক্রমশ দুর্বল করে। অন্যান্য রোগ সংক্রমণের ফলেও মৃত্যু হয়। ক্যানসারের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের ফলেও রোগীর মৃত্যু হতে পারে।
যাদের জন্য রোগটি ঝুঁকিপূর্ণ

হজকিনস লিম্ফোমার ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো হলো- আগে এপস্টাইন বার ভাইরাসের (এবিভি) কারণে ইনফেকশন অথবা মনোনিউক্লিওসিস দেখা দিলে। দুর্বল ইমিউন সিস্টেম। যাদের বয়স ১৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে এবং যাদের বয়স ৫৫ বছরের বেশি তাদের এ রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। ৫ শতাংশ ব্যক্তি বংশগত কারণে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে।
* নন-হজকিনস লিম্ফোমার ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো হলো- যাদের বয়স ৬০ বছরের বেশি, তাদের এ রোগ হতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক পদার্থ, যেমন- বেনজিন এবং কীটনাশকের সংস্পর্শে এলে এ রোগ হতে পারে। আগে কেমোথেরাপি অথবা রেডিয়েশন থেরাপি গ্রহণ করলে রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। রেডিয়েশন এক্সপোজার। দুর্বল ইমিউন সিস্টেম এবং এইচআইভি ইনফেকশন।
* এইচআইভি বা এপস্টাইন বার ভাইরাসে (এবিভি) ইনফেকশন দেখা দিলে রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। হ্যালাকোব্যাকটার পেলোরাইয়ের কারণে ক্রনিক ইনফেকশন দেখা এ রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
রোগ নির্ণয়

সাধারণত একটি লসিকা গ্রন্থি থেকে লিম্ফয়েড টিসুর বাইয়োপসিই রোগ নির্ণয়ের ভিত্তি। রোগের বিস্তৃতি একটি প্রক্রিয়া বা অবস্থার দ্বারা নিরূপণ করা যায়। বুকের এক্স-রে। সি.টি স্ক্যানিং, এম আর আই, অস্থিমজ্জার বাইয়োপ্সি ও পেটের লিম্ফ্যাঞ্জিওগ্রাফি করার দরকার হতে পারে।
পরামর্শ

লিম্ফোমা প্রতিরোধে কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি নেই। এইচআইভি, ইবিভি হেপাটাইটিস ভাইরাসের কারণে ইনফেকশন দেখা দিলে এ রোগ হয়ে থাকে। ঘন ঘন হাত ধোঁয়া, নিরাপদ যৌন সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে এ ধরনের ইনফেকশন প্রতিরোধ করা যায়। এ ছাড়া অন্যের ব্যবহৃত ইনজেকশনের সুচ, রেজার, টুথব্রাশ ব্যবহার করাও উচিত নয়। হজকিনস লিম্ফোমা রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সুস্থ হতে বেশ সময় লাগে। অনেক ব্যক্তির সুস্থ হতে বেশ সময় লাগে। অনেক ব্যক্তিই লিম্ফোমার চিকিৎসা করে সুস্থভাবে বেঁচেও আছেন।
ক্যানসার প্রতিরোধী খাবার

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনষ্টিটিউটের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু খাবার প্রতিদিন গ্রহণ করলে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটা কমে যায়। এ খাবারগুলোকে গবেষকরা ঘোষণা দিয়েছেন ক্যানসার প্রতিরোধী খাবার বলে। যেমন-হলুদ-কমলারঙের সবজি ও গাজর এবং ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফলমূল : এগুলোতে আছে পর্যাপ্ত বিটাক্যারোটিন, কম ফ্যাটযুক্ত দুধে আছে-ক্যালসিয়াম রিবোফ্ল্যাবিন, ভিটামিন এ-সি-ডি, ইত্যাদি উপাদান এবং পেঁয়াজ ও রসুন এগুলো ক্যানসার প্রতিরোধক হিসেবে দেহে কাজ করে।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান

বিজ্ঞানী চিকিৎসক হ্যানেম্যান এর যুগান্তকারী আবিষ্কার ক্রনিক মায়াজম যোরা, সাইকোটিক ও টিউবারকুলোসিস এর প্রভাবেই লিম্ফোমা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। লিম্ফোমা একটি জটিল রোগ। লিম্ফোমা একগুচ্ছ লসিকা গ্রন্থিতে সীমাবদ্ধ থাকলে হোমিও ওষুধে চিকিৎসা করা যায়। রোগ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলে হোমিও অ্যান্টিক্যানসার ওষুধ দিতে পারেন।
নন-হজকিনস লিম্ফোমাতে আক্রান্ত রোগীকে কয়েক বছর বাঁচানো যেতে পারে। তাই অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে লক্ষণ সাদৃশ্যে নির্দিষ্ট মাত্রায় নিম্নলিখিত ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। যথা- (১) কার্বো-অ্যানিমেলিস, (২) চেলিডোনিয়াম, (৩) ক্রোটেলাস, (৪) ক্যালেন্ডুলা, (৫) ফসফরাস, (৬) সিয়ানেথাম, (৭) ইচিনেসিয়া, (৮) এক্স-রে, (৯) রেডিয়াম, (১০) বেলেডোনা, (১১) ক্যালকেরিয়া কার্ব, (১১) ক্যালকেরিয়া ফ্লোর, (১২) ল্যাকেসিস, (১৩) নেট্রাম সালফ, (১৪) ল্যাকেসিস, (১৫) ক্রোটেলাস, (১৬) ভাইটেক্স নিগান্ডো, (১৭) ইউক্যালিপ্টাস, (১৮) জাভেরিন, (১৯) জানহেপাটিন, (২০) ভাইটাম, (২১) ট্রিবিউলাস, (২২) ডার্মাজোন, (২৩) জাপোলিন উল্লেখযোগ্য। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x