লিঙ্গসমতা ও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে

নীপা দেব

শনিবার , ১৯ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ
81

নারীর লিঙ্গ-সমতা নিশ্চিতকল্পে ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য আমাদের আরও অনেক কিছু করার দরকার রয়েছে। এবং এটা খুব জরুরি। কেননা, রাজনৈতিকভাবে নারীর ক্ষমতায়ন ব্যতিত নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করা অনেক কঠিন ব্যাপারই বলতে হবে। বৈশ্বিক এই সূচক আনন্দ জাগানিয়া হলেও একে ধরে রাখতে হলে উভয়ক্ষেত্রে আমাদের আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। বিশেষ করে- আমাদের দেশের তৃণমূল পর্যায়ের নারীরা এখনও রাজনৈতিক সচেতনতার দিকে থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। এক্ষেত্রে- রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও এগিয়ে আসতে হবে। এ বিষয়ে তাদের ‘রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ থাকতে হবে। তৃণমূল পর্যায় থেকে নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে।

লিঙ্গসমতা বা নারী-পুরুষের সমতার দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে টানা চতুর্থবারের মতো সবার ওপরে রয়েছে বাংলাদেশ। সার্বিক বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এবার ৪৮তম। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক যুগে নারী-পুরুষ সমতার ক্ষেত্রে বেশ ভালো উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশের। ২০০৬ সালেও বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৯১তম। নারী-পুরুষ সমতায় দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশি দেশগুলো বাংলাদেশের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। বলা ভালো- নারী-পুরুষ বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সবক’টি দেশ তো বটেই বরং পেছনে ফেলেছে এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকা মহাদেশের অনেক দেশকেই। এমনকি বিশ্বের সেরা ২০টি ধনী দেশেরও কারও-কারও থেকে সূচকে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। উপরন্তু- নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে দুই ধাপ এগিয়ে পঞ্চম হয়েছে বাংলাদেশ।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডাব্লিউইএফ) ‘বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য প্রতিবেদন-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য ওঠে এসেছে। বিশ্বের ১৪৯টি দেশের নারী-পুরুষের সমতার চিত্র নিয়ে তৈরি করা এ প্রতিবেদন গত ১৭ ডিসেম্বর সোমবার প্রকাশিত হয়েছে। নারী-পুরুষ সমতার দিক থেকে অবস্থানে বাংলাদেশের পরে রয়েছে শ্রীলঙ্কা, যার অবস্থান ১০০তম। এছাড়া নেপাল ১০৫, ভারত ১০৮, মালদ্বীপ ১১৩, ভুটান ১২২ ও পাকিস্তান ১৪৮তম অবস্থানে রয়েছে। র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষ দশে রয়েছে আইসল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নিকারাগুয়া, রুয়ান্ডা, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন, আয়ারল্যান্ড ও নামিবিয়া। তালিকায় ইয়েমেনের অবস্থান হয়েছে সবার নিচে।
প্রতিবেদনটিতে- দেশগুলোর অবস্থান নির্ণয় করা হয়েছে মোট চারটি মূল সূচকের ওপরে। এগুলো হলো- নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষায় অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্য ও আয়ু এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। এর ভেতরে আবার ১৪টি উপসূচক রয়েছে।
যাই হোক, প্রতিবেদন অনুযায়ী- যে চারটি ক্ষেত্রে বিশ্বের সব দেশের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে সেগুলোর মধ্যে তিনটি হলো- ছেলে ও মেয়েশিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি, মাধ্যমিকে ছেলে ও মেয়েদের সমতা এবং সরকারপ্রধান হিসেবে কত সময় ধরে একজন নারী রয়েছেন। চতুর্থ ক্ষেত্রটিতে অবশ্য মানুষের হাত নেই। সেটি হলো- জন্মের সময় ছেলে ও মেয়েশিশুর সংখ্যাগত সমতা।
আমি যে বিষয়টিতে ফোকাস করতে চাই সেটি হচ্ছে- নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। এই সূচকে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। অর্থাৎ পৃথিবীতে যেসব দেশে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সবচেয়ে বেশি হয়েছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। তালিকায় বাংলাদেশের ওপরে আছে শুধু চারটি দেশ। এক নম্বরে আছে আইসল্যান্ড, দুইয়ে নিকারাগুয়া, তিনে নরওয়ে ও চারে রুয়ান্ডা। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের তিনটি উপসূচক আছে। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ৮০তম এবং নারী মন্ত্রীর সংখ্যার দিক থেকে ১২৬তম। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন, তাই নারী সরকারপ্রধানের দিক দিয়ে বিশ্বসেরা হয়েছে বাংলাদেশ।
তবে প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে- প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছেলে ও মেয়েদের সমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে ১ নম্বর অবস্থান পেলেও উচ্চশিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ১২১তম। অর্থাৎ জীবনের শুরুতে নারীরা ভালো করলেও পরবর্তী জীবনে তা ধরে রাখা যাচ্ছে না। উল্লেখ করা দরকার যে- আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারত ২০০৬ সালের তুলনায় এখন আরও পিছিয়েছে। নারী-পুরুষ সমতার দিক দিয়ে ২০০৬ সালে দেশটির অবস্থান ছিল ৯৮তম। এখন ১০ ধাপ পিছিয়ে ১০৮তম অবস্থানে ভারত। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ১৯তম অবস্থানে রযেছে দেশটি। সার্বিকভাবে ১৪৮তম হলেও নারীর ক্ষমতায়নে দেশটি ৯৭তম অবস্থানে রয়েছে।
আমি মনেকরি- নারীর লিঙ্গ-সমতা নিশ্চিতকল্পে ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য আমাদের আরও অনেক কিছু করার দরকার রয়েছে। এবং এটা খুব জরুরি। কেননা, রাজনৈতিকভাবে নারীর ক্ষমতায়ন ব্যতিত নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করা অনেক কঠিন ব্যাপারই বলতে হবে। বৈশ্বিক এই সূচক আনন্দ জাগানিয়া হলেও একে ধরে রাখতে হলে উভয়ক্ষেত্রে আমাদের আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। বিশেষ করে- আমাদের দেশের তৃণমূল পর্যায়ের নারীরা এখনও রাজনৈতিক সচেতনতার দিকে থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। এক্ষেত্রে- রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও এগিয়ে আসতে হবে। এ বিষয়ে তাদের ‘রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ থাকতে হবে। তৃণমূল পর্যায় থেকে নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে। সর্বোপরি, রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে এমন উন্নত পর্যায়ে নিতে হবে যে সেখানে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা সমানভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণে আগ্রহী হবে।
আমার বিশ্বাস, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা বাড়াতে পারলে তৃণমূল থেকে নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলা সম্ভব। জাতীয় সংসদে নারীর ফলপ্রসূ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করাও এক্ষেত্রে যার পর নাই জরুরি। রাজনৈতিক দল ও জোটের নির্বাচনী ইশতেহারে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়ে তাই সুনির্দিষ্ট বক্তব্য থাকা উচিত এবং এটা সময়ের অনিবার্য দাবি বলে মনে করি।

x