লালদীঘি হত্যার বিচার আটকে আছে রকিবুল হুদার ‘মৃত্যু প্রতিবেদনে’

আজাদী অনলাইন

বৃহস্পতিবার , ১ নভেম্বর, ২০১৮ at ৪:২৮ অপরাহ্ণ
133

লালদীঘি গণহত্যা মামলার প্রধান আসামি চট্টগ্রাম নগর পুলিশের তখনকার কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদার মৃত্যু প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আটকে আছে বিচার।

আজ বৃহস্পতিবার (১ নভেম্বর) এক অনুষ্ঠানে মামলাটির বিচার শেষ না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা যিনি ৩০ বছর আগের ওই হামলায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। সেই ঘটনায় নিহতদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী মামলাটির বিচার কাজ দ্রুত শেষ করতে পদক্ষেপ নিতেও বলেছেন।

আওয়ামী লীগের সেই সমাবেশে গুলি চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যার বিচার ৩০ বছরেও শেষ না হওয়ায় আক্ষেপ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিডিনিউজ

এই মামলার আসামি রকিবুল হুদার মৃত্যুর বিষয়টি আদালতকে তার আইনজীবী জানান চার মাস আগে। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে পুলিশকে নির্দেশ দেয় আদালত।

পুলিশের দেয়া প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট না হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ আবারও আবেদন করে। এরপর আদালত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বলে। দেড় মাস পরও সে প্রতিবেদন পায়নি আদালত। মামলাটি বর্তমানে চট্টগ্রামের বিশেষ জজ মীর রুহুল আমিনের আদালতে বিচারধীন।

বৃহস্পতিবার ভিডিও কনফারেন্সে ১৯৮৮ সালের সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন আইনজীবী ও আওয়ামী লীগ নেতা ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল।

তিনি বলেন, ‘আসামিপক্ষ একটি ডেথ সার্টিফিকেট আদালতে জমা দিয়েছে কিন্তু সেটার সত্যতা যাচাই করতে হবে। ওই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেলে দ্রুত পরবর্তী ধাপে যাওয়া সম্ভব।’

মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘প্রধান আসামি রকিবুল হুদা মারা গেছেন বলে আসামিপক্ষ একটি পিটিশন আদালতে জমা দেয় জুলাই মাসে। তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নেয়া একটি ডেথ সার্টিফিকেটও জমা দেয়।‘

মেজবাহ বলেন, ‘এরপর আমরা ১৭ জুলাই আদালতে এ বিষয়ে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আবেদন করি। আদালত পুলিশ কমিশনারকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে বলে।’ ওই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে একটি প্রতিবেদন জমা দেয় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ।

নগর পুলিশের সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চের বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল ওয়ারিশ স্বাক্ষরিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, স্ত্রীর মৃত্যুর পর রকিবুল হুদা ‍যুক্তরাষ্ট্রে সন্তানদের কাছে চলে যান।

‘তার চাচাত ভাই ইমন মির্জা জানিয়েছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে মারা গেছেন। তবে তিনি মৃত না জীবিত সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি,’ যোগ করেন আবদুল ওয়ারিশ

আইনজীবী মেজবাহ বলেন, ‘এ প্রতিবেদন আমরা গ্রহণ করতে পারি না। তাই আদালতে আবেদন করি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হতে। এরপর আদালত এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে জানতে চান। সেখান থেকে এখনো কোনো প্রতিবেদন আসেনি।‘

এরপর ৩০ অক্টোবর এ মামলার শুনানির দিন ধার্য থাকলেও প্রতিবেদন না আসায় তা হয়নি। আগামী বছরের ১৫ জানুয়ারি এ মামলায় সাক্ষ্য ও প্রতিবেদনের জন্য দিন ধার্য আছে।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নগরীর লালদীঘি ময়দানে এক জনসভায় যাওয়ার পথে তার গাড়িবহরে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। এতে কমপক্ষে ২৪ জন নিহত হন।

ঘটনার পর ১৯৯২ সালের ৫ মার্চ আইনজীবী মো. শহীদুল হুদা বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেন কিন্তু তখনকার বিএনপি সরকারের সময়ে মামলার কার্যক্রম এগোয়নি।

মামলার বাদী মো. শহীদুল হুদাও মারা গেছেন। মারা গেছেন সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি আব্দুল কাদের এবং আসামি পুলিশ কনস্টেবল বশির উদ্দিনও।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। আদালতের আদেশে সিআইডি মামলাটি তদন্ত করে ১৯৯৭ সালের ১২ জানুয়ারি প্রথম এবং অধিকতর তদন্ত শেষে ১৯৯৮ সালের ৩ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় অভিযোগপত্র দেয়া যাতে আসামি করা হয় আট পুলিশ সদস্যকে।

সেই আসামিরা হলেন চট্টগ্রামের তখনকার পুলিশ কমিশনার রকিবুল হুদা, কোতোয়ালি অঞ্চলের পেট্রোল ইন্সপেক্টর জে সি মণ্ডল, কনস্টেবল আব্দুস সালাম, মুশফিকুর রহমান, প্রদীপ বড়ুয়া, বশির উদ্দিন, মো. আবদুল্লাহ ও মমতাজ উদ্দিন।

৪৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ

১৯৯৮ সালে দেয়া মামলাটির দ্বিতীয় অভিযোগপত্রে মোট ৭০ জনকে সাক্ষী করা হয়। মামলাটিতে সর্বশেষ ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল সাক্ষ্য দেন নিহতের স্বজন অশোক বিশ্বাস।

এ মামলার বিচার শুরুর পর গত ২০ বছরে সাক্ষ্য দিয়েছেন মোট ৪৬ জন।

১৯৯৭ ও ১৯৯৮ সালে একজন করে মোট দুজন, ২০০০ সাল থেকে গত ১৮ বছরে ৪৪ জন।

২০১৬ সালে মামলাটি চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে আসার পর ১১ জন সাক্ষ্য দেন।

২০০১ সালের মে থেকে ২০০৬ সালের ২৩ অগাস্ট এবং ২০০৯ সালের ২৬ জুলাই থেকে ২০১৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এ মামলায় কারও সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি।

২০১৬ সালের ২৬ জুন সাক্ষ্য দেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আওয়ামী লীগ নেতা গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

এরপর নিহতের মা শেফালী সরকার, সাংবাদিক অঞ্জন কুমার সেন ও হেলাল উদ্দিন চৌধুরী, সুভাষ চন্দ্র লালা, নিহতের ভাই অশোক কুমার বিশ্বাস, নিহতের মা হাসনা বানু, নিহতের ভাই মাঈনুদ্দিন, আবু সৈয়দ এবং অশোক বিশ্বাস সাক্ষ্য দেন।

মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের মধ্যে আছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু ও সাজেদা চৌধুরী।

এছাড়াও সাক্ষী হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক, এম এ জলিল, এম এ মান্নান, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এবং আতাউর রহমান খান কায়সারের নাম রয়েছে। তারা গত কয়েক বছরে মারা গেছেন।

আদালতে দেয়া সাক্ষ্যে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে’ সেদিন গুলি চালানো হয়েছিল। ভাগ্যক্রমে তা তার গায়ে লাগেনি। বিনা উসকানিতে সেদিন ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ ঘটানো হয়েছিল।

চট্টগ্রামের তখনকার পুলিশ কমিশনার ও মামলার আসামি রকিবুল হুদার নির্দেশে ওই ঘটনা ঘটানো হয় বলে আদালতকে বলেন মোশাররফ।

ওই দিনের ঘটনায় নিহতরা হলেন মো. হাসান মুরাদ, মহিউদ্দিন শামীম, স্বপন কুমার বিশ্বাস, এথেলবার্ট গোমেজ কিশোর, স্বপন চৌধুরী, অজিত সরকার, রমেশ বৈদ্য, বদরুল আলম, ডি কে চৌধুরী, সাজ্জাদ হোসেন, আব্দুল মান্নান, সবুজ হোসেন, কামাল হোসেন, বি কে দাশ, পঙ্কজ বৈদ্য, বাহার উদ্দিন, চান্দ মিয়া, সমর দত্ত, হাসেম মিয়া, মো. কাসেম, পলাশ দত্ত, আব্দুল কুদ্দুস, গোবিন্দ দাশ ও শাহাদাত।

তাদের স্মরণে চট্টগ্রাম আদালত ভবনের প্রবেশ পথে নির্মাণ করা স্মৃতিস্তম্ভটি দীর্ঘদিন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল।

পরে নিহতের স্বজনদের আহ্বানের প্রেক্ষিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম সেটি সংস্কারের উদ্যোগ নেন। সংস্কার করা স্মৃতিসৌধটি বৃহস্পতিবার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

x