লামা-আলীকদমে বোরো ও রবি শস্য উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব

ফসলি জমিতে ক্ষতিকর তামাক

লামা প্রতিনিধি

রবিবার , ২৭ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৭:০০ পূর্বাহ্ণ
32

গত প্রায় ৩ যুগ ধরে লামা ও আলীকদমে চলতি মৌসুম এলেই ফসলি জমিতে শুরু হয় ক্ষতিকর তামাকের আগ্রাসন। তারই ধারাবাহিকতায় চলতি মৌসুমে উপজেলা দুটির ফসলি জমিতে প্রায় ১০ হাজার একর ফসলি জমিতে ক্ষতিকর তামাক চাষ হয়েছে। ফসলি জমিতে ব্যাপকহারে ক্ষতিকর তামাক চাষ হওয়ার কারনে বোরো ও রবি শস্য উৎপাদনে এর বিরুপ প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সূত্র জানায়, মাতামুহুরী নদীর পলিবাহিত উর্বর এলাকা এবং জ্বালানি কাঠের সহজ লভ্যতার কারনে দেশের প্রধান প্রধান তামাক কোম্পানিগুলো ১৯৮৪ সাল থেকে লামায় তামাক চাষ শুরু করে। উপজেলার মেউলারচর এলাকায় প্রথম বছর ১০ একর জমিতে তামাক চাষ হয়। তারপর থেকে গত ৩৫ বছরে ক্ষতিকর তামাক চাষের ভয়াল বিস্তার ঘটেছে লামা, আলীকদম ও পার্শ্ববর্তী বমু বিলছড়ি এলাকার বোরো ও রবি মৌসুমের ফসলি জমিতে। গত প্রায় তিন যুগ ধরে স্থানীয় কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা এবং মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সাথে সখ্যতা কম থাকার সুযোগে দেশের প্রধান প্রধান তামাক কোম্পানিগুলো বোরো ও রবি মৌসুমে লামা, আলীকদম এবং পার্শ্ববর্তী বমু বিলছড়ি এলাকায় কৃষকদেরকে ক্ষতিকর তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করে আসছে।
চলতি মৌসুমে দু’উপজেলায় আনুমানিক প্রায় ১০ হাজার একর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। লামা ও আলীকদম কৃষি বিভাগ সূত্র মতে, চলতি মৌসুমে লামা উপজেলায় প্রায় ২ হাজার একর ও আলীকদম উপজেলায় প্রায় ১২শ’ একর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। বেসরকারি হিসেব মতে এর পরিমাণ ৩ গুনের বেশি হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তামাক কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসায়ীক সুবিধা হাসিলের লক্ষ্যে কৌশলগত কারনে কখনই তাদের রেজিস্ট্রেশনকৃত তামাক চাষীর সংখ্যা ও জমির পরিমাণের প্রকৃত হিসাব জানায় না।
জানা যায়, তামাক কোম্পানিগুলো কৃষকদের বীজ, সার, কীটনাশক, পাওয়ার টিলার, পাওয়ার পাম্প, নগদ ঋণ, সর্বোপরি বাজারজাত করণের সুবিধা প্রদানের নিশ্চয়তা প্রদান করে তামাক চাষে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। এর ফলে কৃষকরা চলতি মৌসুমে ফসলি জমিতে বোরো ও রবি শস্যের আবাদ না করে ক্ষতিকর তামাক চাষের দিকে ঝুৃকে পড়ে। লামা ও আলীকদমের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন পরিদর্শনকালে কৃষকদেরকে ফসলি জমি এবং মাতামুহুরী নদীর দু’পাড়ে ব্যাপকহারে তামাক চাষ করতে দেখা গেছে। উপজেলা দু’টির আবাদি ফসলি জমিতে ব্যাপকহারে তামাক চাষের কারণে চলতি মৌসুমে বোরো ও রবি শস্য উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে লামায় আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৫ হাজার ২৩ হেক্টর। তার মধ্যে ২ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে বোরো এবং ৫৯০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ৭৮০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে। অপরদিকে আলীকদমে চলতি মৌসুমে বোরো চাষ ৭৭০ হেক্টর, রবিশস্য ১ হাজার ৫২২ হেক্টর, বাদাম চাষ ২৮৫ হেক্টর, শীতকালীন শস্য ৫৭০ হেক্টর, নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ৪৬০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। যদিও বিগত বেশ কয়েক বছর উপজেলা দু’টির বোরো ও রবি শস্য উৎপাদন শুধু মাত্র কৃষি বিভাগের কাগজে কলমে অর্জিত হয়ে থাকে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, তামাক চাষের পূর্বে এতদাঞ্চলে উৎপাদিত তরিতরকারি দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হতো। বর্তমানে লামা ও আলীকদমে কাঁচা মরিচ থেকে শুরু করে সবকিছুই চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আনতে হয়। এর ফলে তরিতরকারির ভরা মৌসুমেও দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় এতদাঞ্চলে দাম থাকে দ্বিগুণ। তামাক চাষীদের সাথে আলাপকালে তারা জানিয়েছেন, আলু, মরিচ, টমেটোসহ বিভিন্ন তরিতরকারি উৎপাদন করলে তা বাজারজাত করণের সমস্যা হয়।
লামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূরে আলম জানান, তামাক চাষের ফলে বোরো ও রবিশস্য চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কোন প্রভাব পড়বেনা। তিনি বলেন, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদেরকে তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। বিগত বছরের তুলনায় চলতি বছর তামাক কিছুটা কম চাষ হয়েছে। তামাক চাষীরা কিছু কিছু সবজী চাষ ও ভুট্টা চাষ করেছে।

x