লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে সাতকানিয়ার প্রবীণ ফুলচাষী মোহাম্মদ আইয়ুব

চট্টগ্রামে প্রথম মূল্যবান ঝাড়বেড়া ফুলের চাষ

চৌধুরী শহীদ, চন্দনাইশ

সোমবার , ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ১১:১১ পূর্বাহ্ণ
103

দেড়যুগ ধরে ফুলচাষ করে প্রতি মৌসুমে লাভের খাতা ভারী করতে পারলেও গত কয়েক বছর থেকে চীন তাইওয়ানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কৃত্রিম ফুলের আমদানি এ দেশীয় ফুলচাষীদের পথে বসিয়ে দিয়েছে। আমদানি করা কাগজ ও প্লাস্টিকে তৈরি মনোলোভা ফুলগুলো দামে সস্তা এবং টেকসই হওয়ায় ফুল ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফা লাভের আশায় ঝুঁকে পড়ে সেসব ফুলের দিকে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। অব্যাহত লোকসানের মুখে এ দেশের ফুলচাষে জড়িত চাষীরা ধীরে ধীরে ফুলচাষ ছেড়ে দিয়ে পা বাড়াচ্ছে অন্য পেশা বা চাষে। এভাবেই গড়গড় করে কথাগুলো বলছিলেন ফুলের জগতে সবচেয়ে মূল্যবান ঝাড়বেড়া ফুলের চাষ করা চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার রামপুরার প্রবীণ ফুলচাষী মোহাম্মদ আইয়ুব।
গত ১ ফেব্রুয়ারি সকালে সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা দোলন কান্তি নাথকে সাথে নিয়ে পশ্চিম ঢেমশার মৃত সোলতান আহমদের পুত্র মোহাম্মদ আইয়ুবের ডলু খালের পাড়ের রামপুরা গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে তোলা ঝাড়বেড়া ফুলের খেত দেখতে গেলে আইয়ুব জানায় গত কয়েক বছরে ফুলচাষে ব্যাপক লোকসান দেওয়ার পর ইন্টারনেটে সন্ধান পান ঝাড়বেড়া ফুলের। পরে সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শম্ভুনাথ দেবের পরামর্শে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তারই প্রতিষ্ঠিত খুশবু নার্সারীতে শুরু করেন ঝাড়বেড়া ফুলের চাষ। অনেক ঝক্কিঝামেলা পোহানো শেষে ভারত থেকে বীজ সংগ্রহ করে চারা উৎপাদনের পর পুরোদমে শুরু করেন চাষ। ইতিমধ্যে এ ফুলের চাষে তার বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ১২ লাখ টাকা। প্রথমদিকে ভীষণ কষ্ট হলেও এখন পুরো বিষয়টি তার আয়ত্তে জানিয়ে বলেন চারা রোপণের ২ মাসের মাথায় শুরু হয় সামান্য উৎপাদন। ৬ মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে পুরোদমে ফলন আসা শুরু হয়। প্রতিটি গাছ বছরের পুরোটা সময় ধরে তিন থেকে চারবছর ফলন দেয়। এরপর আবার নতুন চারা রোপণ করতে হয়। পুরোদমে উৎপাদন শুরু হওয়ায় এখন একদিন পরপর তার খেত থেকে এক থেকে দেড়হাজার ফুল তোলা সম্ভব হচ্ছে। প্রতিটি ফুলের পাইকারী মূল্য পাওয়া যায় ১০ থেকে ১২ টাকা। সে হিসাবে আইয়ুবের খেত থেকে প্রতি সপ্তাহে অর্ধ লক্ষাধিক টাকার ফুল বিক্রি সম্ভব হচ্ছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ ফুলের চাষে তার বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত আসবে বলেও জানালেন ঝাড়বেড়া ফুলচাষে সফল ও গর্বিত মোহাম্মদ আইয়ুব। তবে কৃত্রিম ফুলের প্রভাব না থাকলে প্রতি সপ্তাহের আয় লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যেতো বলেও জানালেন এ ঝাড়বেড়া ফুলচাষী। তবে ভালোবাসা দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবসগুলোতে দাম একটু বেড়ে যায়। দৈনিক আজাদীর সাথে আলাপকালে আইয়ুব জানায় বর্ষাকালে এ ফুলের খেতের উপরে আমদানি করা বিশেষ একপ্রকার শক্ত পলিথিনের ছাউনি দিয়ে বৃষ্টির পানিমুক্ত রাখার ব্যবস্থা করতে হয়। খেতে ব্যবহার করা পলিথিনগুলো ইসরাইলে তৈরি হওয়ায় এদেশীয় কোন ব্যবসায়ী তা আমদানি করেনা। ফলে দ্বিগুণ মূল্যে তা ভারত থেকেই কিনে আনতে হয়। ছাউনির পলিথিন এবং এ ফুলের বীজ এদেশে পাওয়া গেলে এবং সরকার এ ফুলের চাষ বৃদ্ধি করতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে ঝাড়বেড়া ফুলের উৎপাদন ব্যয় অনেকটা কমে আসবে এবং এ ফুলের চাষ দেশব্যাপী দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। এ ফুলটি যেমন মূল্যবান তেমনি টেকসই হওয়ায় এটি বিদেশে রপ্তানির একটি সম্ভাবনাও রয়েছে বলে আশা করেন চট্টগ্রামে এ ফুলের প্রথম চাষী আইয়ুব। আর তা করা গেলে প্রকৃতপক্ষে লাভবান হবে জেলার ফুলচাষীরা। বর্তমানে আইয়ুবের ক্ষেত থেকে উৎপাদিত ফুল বাজারজাত করতেও তেমন বেগ পেতে হয়না আইয়ুবকে। প্রতিদিনের উৎপাদিত ফুল ক্ষেত থেকে তুলে তা চট্টগ্রামমুখি যে কোন গণ পরিবহনে দিয়ে দিলে চট্টগ্রাম মহানগরীর মোমিন রোডে গড়ে উঠা ফুলের পাইকারী ব্যবসায়ীরা তা নিজেদের উদ্যোগে সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। কোন ধরনের ঝক্কিঝামেলা ছাড়াই উৎপাদিত ফুল বাজারজাত করতে পারায় বেছে যাওয়া সময়টুকু অনেকটা নির্বিঘ্নেই ফুলের ক্ষেতে ব্যয় করতে পারছে মোহাম্মদ আইয়ুব। এ ছাড়া উৎপাদিত ফুল দ্রুত বাজারজাত করতে পেরে সে যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে তেমনি ক্ষেতে বেশী সময় সঠিক পরিচর্যা করতে পারার কারণে ফুলের উৎপাদনও বেড়ে যাচ্ছে।
আইয়ুবের ঝাড়বেড়া ফুলের ক্ষেতেই দেখা মেলে উপজেলার উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শম্ভু নাথ দেবের। এ সময় শম্ভুনাথ জানায় দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার ফুলচাষীরা কৃত্রিম ফুলের দাপটে ফুলচাষে লোকসান দিয়ে আসছিল। সেই লোকসানের খড়ক থেকে ফুলচাষীদের কিভাবে বের করে আনা যায় এ চিন্তার মাঝেই খোঁজ পাওয়া যায় ঝাড়বেড়া ফুলের। খোঁজ পেয়েই আইয়ুব সিদ্ধান্ত নেয় এ ফুলের চাষ সে করবেই। শেষে আমার সাথে পরামর্শ করে সে নেমে পড়ে চাষে। এখন আইয়ুব চট্টগ্রামের মধ্যে একজন সফল ঝাড়বেড়া ফুলের চাষী হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়ার পাশাপাশি এ ফুলের চাষ করে লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে বলেও জানায় এ উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা।
চট্টগ্রাম জেলা ফুল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন ঝাড়বেড়া ফুলের ব্যাপক চাহিদা থাকার কথা স্বীকার করে বলেন মূলতঃ এটি একটি চাইনীজ ফুল। এ ফুলের বীজ ভারত হয়েই এদেশে আসে। প্রাথমিকভাবে ঝুকি নিয়ে এ ফুলের চাষ করা গেলে কৃষক লাভবান হয়। তেমনি আইয়ুবই প্রথম চট্টগ্রামে এ ফুলের চাষ করতে উদ্যোগী হয়ে এখন লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে। এ ফুলটি তিন থেকে চারদিন সতেজ থাকার কারনে এবং একই ফুল ৬/৭টি রঙে পাওয়া যাওয়ায় এটি বিক্রি করতে ফুল ব্যবসায়ীদের খুব বেশী বেগ পেতে হয়না। ফলে ব্যবসায়ীরাও এ ফুলটি সহজেই লুফে নেয়। তবে কৃত্রিম ফুলের অত্যধিক আমদানির কারণে দেশের হাজার হাজার ফুলচাষী পথে বসে গেছে। এ সংকট থেকে উত্তরণে ফুলচাষীদের একটি নীতিমালার আওতায় আনা যায় কিনা ভেবে দেখার জন্যও আবেদন জানিয়েছেন এ ফুল ব্যবসায়ী নেতা।
সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) শামীম হোসেনের সাথে কথা বললে তিনি আইয়ুবের ঝাড়বেড়া ফুলের চাষ সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানান এ ফুলের চাষে যেহেতু লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হচ্ছে সে কারণে এলাকার ফুলচাষীদের এ ফুলের চাষে এগিয়ে আসার জন্য কৃষি বিভাগ থেকে উদ্বুদ্ধ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তবে এ ফুলের চাষ বৃদ্ধি পেলে বীজসহ অন্যান্য উপকরণ এবং ছাউনির পলিথিনগুলোও সহজলভ্য হয়ে উঠবে এমনটিই আশা করছেন এ কৃষি কর্মকর্তা।

Advertisement