লাইভ ফ্রম ঢাকা নাগরিক অস্থিরতার ছবি

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ২৩ এপ্রিল, ২০১৯ at ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ
45

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ পরিচালিত ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ নিয়ে গত কিছুদিন ধরে বেশ আলোচনা চলে আসছিল। চলচ্চিত্রকর্মীরা ছবিটিকে সিনেমা হল থেকে নামিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। এমতাবস্থায় ছবিটি দেখার সুযোগ হলো চট্টগ্রামের সিনেপ্লেঙ সিলভার স্ক্রীনে।
ভালোই লেগেছে ছবিটি। ছবির বিষয়বস্তু, নির্মাণ শৈলী, অভিনয় ও কারিগরি কুশলতার সমন্বয়ে প্রায় দু’ঘণ্টার একটি ছিলেটান সিনেমা ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’। বিশ্বজুড়ে যে নাগরিক অস্থিরতা তার কবল থেকে বাংলাদেশেরও নিস্তার নেই। এদেশ এখন নগরায়নমুখী। অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যার বসবাস শহরাঞ্চলে। বিভিন্ন শ্রেণির, বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন চরিত্রের মানুষ। বাংলাদেশের মতো একটি সমস্যা জর্জরিত উন্নয়নশীল দেশে চরম অস্থিরতা কাজ করে। বিশেষ করে যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে। এই অস্থিরতা মূলত অর্থনৈতিক। বলা ভাল বেকারত্ব কেন্দ্রিক। দিনদিন যে সমস্যা বৃদ্ধিমান। সত্যিকার অর্থে প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ও উদ্যোগ কোনোটাই নেই। ফলে চরম এক অসন্তোষ সর্বত্র। সামাজিক বিভিন্ন স্তর, শিক্ষাব্যবস্থা, রাজনীতি, খাদ্যব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবা, পরিবহন খাত সর্বত্র এক চরম অরাজকতা ক্রমশ বৃদ্ধিমান। বলতে গেলে খাদের কিনারে পৌঁছে যাচ্ছে। মূল্যবোধের অবক্ষয় সব বয়েসী, সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে প্রকট।
এসব হতাশার চিত্র যুব প্রজন্মের মধ্যে অধিক মাত্রায় দৃশ্যমান। শিক্ষাক্ষেত্রে চরম নৈরাজ্য,সীমাহীন বেকারত্ব, পারস্পরিক সম্পর্কে বিশ্বাসহীনতা, অসার মূল্যবোধ এই প্রজন্মকে প্রচন্ড রকমের হতাশায় নিমজ্জিত করেছে। এর নেপথ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য আর বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা। পাশাপাশি ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং জঙ্গিবাদ হতাশার এই নৈরাজ্যকে আরো ভয়ংকর অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে।
আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ চলচ্চিত্রে মূলত এই নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতি সাজ্জাদ রেহানা, মাইকেল মোশাররফ, রনি, উজ্জ্বল এই কজন তরুণকে ঘিরে চিত্রায়িত হয়েছে। সাজ্জাদ একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী যুবক যে ঢাকা শহরের চরম নাগরিক চাপের মধ্যে বেঁচে থাকার প্রাণপণ যুদ্ধে লিপ্ত। জীবনটাকে সে তার খোঁড়া পায়ের মতোই যেন টেনে নিয়ে চলেছে, সাজ্জাদ শেয়ার বাজারের ধসে তার সর্বস্ব অর্থ খুইয়ে এখন নিঃস্ব প্রায়। নানা সূত্র থেকে ঋণ করে কোনোমতে জীবন ধারণ করে। প্রেমিকা রেহানার সাথে প্রায়শই তার মনোমালিন্য লেগে আছে। সে রেহানাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। রেহানার মনেও অনেক সংশয় সাজ্জাদকে ঘিরে। অথচ পারস্পরিক প্রণয় ও মমত্ববোধ গভীর। সাজ্জাদের ছোট ভাই মাইকেল মাদকাসক্ত। তার নানান উৎপীড়নে সাজ্জাদের অতিষ্ঠ জীবন। ছোট ভাইয়ের প্রতি তার সহজাত স্নেহ। কিন্তু তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে সে ব্যর্থ। এক পর্যায়ে মাইকেল মারা যায়। সাজ্জাদ সিদ্ধান্ত নেয় রাশিয়া যাবার। কিন্তু ট্র্যাভেল এজেন্সির ছল চাতুরির খপ্পরে পড়ে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। পরে স্থির করে মালয়েশিয়া চলে যাবে। সম্ভবত চোরাই পথে (ততটা স্পষ্ট নয় ছবিতে)। একদিন তার কাজিন মোশাররফ আসে তার বাসায় কদিনের আশ্রয়ে। পরে দেখা যায় মোশাররফ বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থির রাজনীতিতে যুক্ত। এক ছাত্র বিক্ষোভে পড়ে সাজ্জাদের শেষ সম্বল তার গাড়িটা পুড়ে যায়। গাড়িতে থাকা সাজ্জাদ কোনমতে প্রাণে রক্ষা পায়। শেষে স্থির প্রতিজ্ঞ হয় মালয়েশিয়া চলে যাবার সিদ্ধান্তে। রেহানাকে জানায়। অন্তসত্ত্বা রেহানা অসহায় বোধ করে। এক নৈরাশ্যজনক পরিণতিতে ছবি শেষ হয়।
দেশ জুড়ে যে হতাশার চিত্র সেটাই দেখাতে চেয়েছেন, সাদ তার ছবিতে। নিজেও তিনি একজন যুব প্রজন্মের নির্মাতা, কাজেই বিষয়টি তিনি ধরতে পেরেছেন ভাল। পুরো ছবি মিনিমাইজেশনের প্রয়োগ লক্ষণীয়। চিত্রনাট্যে, সম্পাদনায়। দুটোই সাদের নিজের করা। ফলে চিত্রনাট্যের সুন্দর সমন্বয় ঘটেছে সম্পাদনায়। তুহিন তামিজুলে সাদাকালো চিত্রগ্রহণ ভালো এবং ছবির মেজাজের সঙ্গে বেশ মানানসই। তুলনায় সায়রা তালুকদারের শব্দগ্রহণ যুতসই হয়নি। ডাবিংকৃত সাউন্ড ও লোকান (এটমসফেয়ার) সাউন্ডের মিশ্রণে সমস্যা আছে। ট্র্যাক পরিবর্তনের সময় একটু ধাক্কা দেয়।
তবে চিত্রনাট্যে আর কয়েকটা বিষয় সংযোজন করলে ভালো হতো মনে হয়। সাজ্জাদের একটু পারিবারিক পটভূমি, তার প্রতিবন্ধিতার কারণ, মাইকেলের সম্পর্কে আরো একটু পটভূমির প্রয়োজন ছিল। দেখা যায় সে শিক্ষিত রুচিশীল তরুণ (তার ঘরের ডিটেলস তাই বলে)। কিন্তু কেন তার এই অধ:পতন বোধগম্য হয় না।
এসব ছোটখাটো ত্রুটি বাদ দিলে ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ ভাল একটি নির্মাণ। ২০১৬ সালে নির্মিত হয়ে এটি দর্শকের কাছে পৌঁছেছে ২০১৯ সালে। তাও পৌঁছানোর মতো নয়। প্রেক্ষাগৃহ থেকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে ঢাকায়। চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশেষ প্রদর্শনী। এভাবে একটি ছবি দর্শকের কাছে পৌঁছুতে পারে না। এমনিতেই সিনেমা হলের সংখ্যা এখন হাতে গোনা। প্রদর্শকরা হুমকি দিয়ে চলেছেন সিনেমা হল যে কয়টা রয়েছে সেগুলোও বন্ধ করে দেবেন। এমতাবস্থায় বিকল্প প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। সিনেপ্লেঙ নির্মাণ অতি ধীরে হলেও শুরু হয়েছে সময়ের দাবিতে। কিন্তু সিনেপ্লেক্স উচ্চ বিত্তদের কাছে সীমিত করে রাখলে কাজের কাজ কিছুৃ হবে না। সাধারণ দর্শকের আয়াসাধ্য করে তুলতে হবে।
যে ছবিটি নিয়ে আজকের আলোচনা, সেটি এদেশের বর্তমান নৈরাশ্যকার পরিবেশ নিয়ে নির্মিত। বাংলাদেশ এখন নুসরাত হত্যার বিচারের দাবিতে সোচ্চার। কিন্তু নুসরাতের হত্যা থেমে থাকেনি। গত কয়েকদিনে আরো কয়েকজন নুসরাত একই কারণে খুন হয়েছে। এই লেখা যখন লিখছি তখন টেলিভিশনে আরো দুজন তরুণীকে একই কারণে খুনের কথা জানলাম। সকল ধর্ষনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আশা করি।
এই লেখা উৎসর্গ করছি নুসরাতসহ সকল নির্যাতিত নারীদের প্রতি।
লেখক: চলচ্চিত্র পরিচালক
email : shaibalchowdhury71@gmail.com

x