লক্ষ্যে পৌঁছাতে আরো কাজ করতে হবে

দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য

মঙ্গলবার , ১৬ জুলাই, ২০১৯ at ১০:১৩ পূর্বাহ্ণ
35

জাতিসংঘ জানিয়েছে, বিশ্বের যে তিনটি দেশ সবচেয়ে দ্রুত গতিতে সব ধরনের দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে যাচ্ছে, তার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপি প্রকাশিত ‘মাল্টিডাইমেনশনাল পভার্টি ইনডেক্স ২০১৯’ এ উঠে এসেছে বাংলাদেশের সাফল্যের এই চিত্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ যেসকল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জসমূহের মুখোমুখি, সেগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য অবশ্যই সবচেয়ে গুরুতরগুলোর একটি এবং এখনও এই ক্ষেত্রে প্রচুর কাজ করার আছে।
হতদরিদ্র জনগণ সাধারণত জমির মালিক হয় না এবং তারা কম মজুরীর শ্রমজীবী কর্মকাণ্ডের ফাঁদে আটকা পড়ে থাকে। তারা অস্তিত্ব রক্ষার প্রান্তে বসবাস করছে। আর যখন কেউ শুধুমাত্র তার আজকের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই সংগ্রাম করে যাচ্ছে, আগামীকালের ব্যাপারে চিন্তা করা বা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করার মতো বিলাসিতা তার থাকবে না।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য-এসডিজিতে যে ১৭টি লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে, তার প্রথমটি হল দারিদ্র্য বিমোচন। ২০৩০ সালের মধ্যে সব জায়গা থেকে ‘বহুমাত্রিক’ দারিদ্র্য দূর করার কথা বলা হয়েছে সেখানে। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো কতটা এগোতে পারল, তা বোঝার একটি কৌশল এই ‘মাল্টিডাইমেনশনাল পভার্টি ইনডেক্স’ বা এমপিআই। কেবল মাথাপিছু আয়কে দারিদ্র্যের নির্ণায়ক হিসেবে বিবেচনা না করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মোট দশটি মানদণ্ডে দারিদ্র্যকে পরিমাপ করা হয় এই সূচকে। ইউএনডিপি, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ যৌথভাবে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ১৩ জুলাই দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, ১০১টি দেশের ১৩০ কোটি মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে জর্জরিত। এই সংখ্যা দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার ২৩.১ শতাংশ। তাদের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ মানুষের বসবাস মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে থাকা এই ১৩০ কোটি মানুষের মধ্যে অর্ধেকের বয়স ১৮ বছরের নিচে, এক তৃতীয়াংশের বয়স ১০ বছরের কম। বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের রূপটি আরও স্পষ্ট বোঝার জন্য ১০টি দেশের তথ্য আলাদা করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সবগুলো অঞ্চল, সবগুলো অর্থনৈতিক শ্রেণি থেকে বাছাই করা এ দেশগুলোতে ২০০ কোটি মানুষের বসবাস। দশটি দেশই জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য-এসডিজির প্রথম লক্ষ্য পূরণে অগ্রগতি দেখিয়েছে। এর মধ্যে আটটি দেশ বহুমাত্রিক দরিদ্রের সংখ্যা কমিয়ে সূচকে সবচেয়ে বেশি এগিয়েছে গত এক বছরে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দশ দেশের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বহুমাত্রিক দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারছে ভারত, কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশ।
মাল্টিডাইমেনশনাল পভার্টি ইনডেঙ ২০১৯ বলছে, বাংলাদেশে এখনও দুই কোটি ৬৭ লাখ মানুষ ‘বহুমাত্রিক’ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে, যা মোট জনসংখ্যার ১৬.৭ শতাংশ। এক বছর আগে এই হার ছিল ১৮ শতাংশের মত। যে দশটি মানদণ্ডে এই সূচক তৈরি হয়েছে তার নয়টিতেই বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি হয়েছে। বহুমাত্রিক দারিদ্র্য কমার গতি গ্রাম ও শহর- দুই ক্ষেত্রেই প্রায় সমান। বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পয়েন্ট সমান- ০.১৯৮। কিন্তু পাকিস্তানে অসমতা বাংলাদেশের চেয়ে বেশি বলে জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রধানত দুটি কারণে বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। এর একটি হলো শ্রমের মজুরি বৃদ্ধি, অন্যটি জনসংখ্যার প্রকৃতিতে পরিবর্তন। মোট জনসংখ্যায় কর্মক্ষম লোকের অংশ বেড়ে যাওয়ায় মাথাপিছু আয় বেড়েছে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্যের দাম কম থাকা দারিদ্র্য হ্রাসের অন্যতম কারণ। বর্তমানে দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আনা হয়েছে। আগামী ৫ বছরে এ খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁরা বলেন, দেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে দারিদ্র বিমোচন কর্মসূচির তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি জনসংশ্লিষ্ট কর্মসূচি হয়ে ওঠার ইতিবাচক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে একইসঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত এমন কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পক্ষপাত, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির আশঙ্কাও থেকে যায়। কেননা নির্বাচিত নানা পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাববলয় বিস্তারের জন্য এ কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের মানুষদের সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এ ধরনের সুযোগের অপব্যবহার রোধ করে সত্যিকারের দরিদ্র পরিবারগুলোকে ঋণ সহায়তা পৌঁছে দিতে পারলে তা দারিদ্র্য বিলোপে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি নিজেদের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছে যে ২০২০ সাল নাগাদ আরও ৬ মিলিয়ন জনগণকে চরম দারিদ্রতা থেকে বের করে আনবে। একইভাবে জাতিসংঘের ২০৩০ সালের উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রাগুলোর একটি, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা, তা হলো চরম দারিদ্র্য সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা। উভয় ক্ষেত্রেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে অনেক পরিশ্রম করতে হবে।

x