রোহিঙ্গা সংকট

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ৮ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:২৮ পূর্বাহ্ণ
23

২০১১ সালে পবিত্র হজ্ব সেরে প্রায় সপ্তাহখানেক ফিরতি ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয়। এই সময়টাতে প্রায় সব হাজীদের কেনাকাটায় ব্যস্ত দেখা যায়। বিশেষ করে মহিলা হাজীরা স্বর্ণ কিনতেই বেশি আগ্রহী হয়। আমাদের গ্রুপের অনেকেই স্বর্ণ কিনেছেন যদিও আমার এসবের প্রতি আগ্রহ কম তবুও কারো কারো অনুরোধে সাথে গিয়েছি। মক্কায় বাঙালি দোকানগুলোর বেশিরভাগই রোহিঙ্গাদের দোকান। বাঙালিরা বাঙালিদের দোকানই পছন্দ করবে এটাই স্বাভাবিক। এই দোকানদারগুলো কোনো এক অজানা কারণে বাঙালিদের সাথে ভাল ব্যবহার করে না এবং ঠকানোর চিন্তায় থাকে। এইসব রোহিঙ্গা বাঙালি পরিচয় এবং বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েই ঐদেশে গিয়েছে তার জন্য তাদের কোনোরকম কৃতজ্ঞতা নেই বরং এক ধরনের বীতশ্রদ্ধ বাংলাদেশীদের প্রতি। তারা এমনিতেই মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যথেষ্ট ক্ষুণ্ন করেছে। আমার পরিচিত অনেকেই প্রতারিত হয়েছে বাঙালি রোহিঙ্গাদের দোকান থেকে স্বর্ণ কিনে। এমনও হয়েছে এখানকার আসল স্বর্ণ দিয়ে ওখানকার নকল স্বর্ণ কিনে নিয়ে এসেছেন। হজ্বের সময় এই প্রতারণা বেশ ভালোভাবেই চলে!
আমার এসব কাহিনীর অবতারণা এই কারণে যে নিগৃহীত মানুষের আচরণ বুঝানোর জন্য। রোহিঙ্গাদের উদ্ধত আচরণই ওদেরকে বাঙালিদের থেকে আলাদা রাখে। এই আলাদা হওয়ার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। তারা নিগৃহীত জনগোষ্ঠী সব মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। নিজ দেশে পরবাসী হয়ে থেকেছে। বেড়ে উঠেছে বৈরি পরিবেশে যেহেতু তারা শিক্ষাদিক্ষার সুযোগ পায়নি সেহেতু তাদের আচার আচরণও পরিশীলিত হয়ে ওঠেনি। একুশ শতকে এসে মানুষ মানুষকে আশ্রয়হীন করছে বিতাড়িত করছে নিজ বাসভূম থেকে। বিশ্বজুড়েই শরণার্থী বিতাড়িত মানুষের মিছিল বাড়ছেই।
রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা। বাংলাদেশে এখন ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে নানামুখী চেষ্টা চললেও এখনও পর্যন্ত সফল হয়নি। উল্টো রাখাইনে অন্য নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সে দেশের সেনাবাহিনীর সংঘর্ষের প্রেক্ষিতে নতুন করে মিয়ানমারের নাগরিকদের বাংলাদেশে আসার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে জন্ম নিয়েছে প্রায় ৯১ হাজার শিশু। এত বিপুল সংখ্যক শরণার্থীদের ভরণ পোষণের ভার বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল ও উন্নয়নশীল দেশ বহন করে যাবে তা প্রত্যাশিত নয়। এছাড়া রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি স্থানীয়দের উদ্বেগ উৎকণ্ঠার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশের ক্ষতি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি তো রয়েছেই। শুধুমাত্র মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ে যে ক্ষতি হচ্ছে তা অপূরণীয়। রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের সংকট নয় এটা অবশ্যই মানবতার সংকট। বন্ধু রাষ্ট্র চীন এবং ভারত নিজ নিজ স্বার্থে রোহিঙ্গা সংকটকে এড়িয়ে চলেছে। এই সংকটের সমাধান শুধুমাত্র কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় হবে বলে মনে হয় না। তবুও এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোকে সাথে নিয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগের বিকল্প নেই। রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি আছে এসব বাস্তবায়িত না হলে কেউ ফেরত যেতে রাজি হবে না।
১১ লাখ রোহিঙ্গাদের মধ্যে অর্ধেকই শিশু-কিশোর। এরা বেড়ে উঠছে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন ক্ষোভ হতাশা ও প্রতিহিংসার জায়গা থেকে এরা যদি সন্ত্রাস ও বিদ্রোহের পথ বেছে নেয় তাহলে সেটা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য ভীষণ বিপজ্জনক হবে। মিয়ানমার, চীন, ভারত কেউ এই বিপদের বাইরে থাকতে পারবে না। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ভারত চীনের সব স্বার্থও অনবরত হুমকির মুখে থাকবে। তাই বাংলাদেশকে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং সংকটের বিচার বিশ্লেষণ করেই ব্যবস্থা নিতে হবে।
দীর্ঘস্থায়ী বসবাসের সুযোগে দিন দিন বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা। পূর্ব শত্রুতার জের, আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, মাদকসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের এমন আচরণ স্থানীয় এবং প্রশাসনকে ভাবিয়ে তুলেছে। স্থানীয়রা জানায়, দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে রোহিঙ্গারা। পাশাপাশি তারা চুরি, ডাকাতি এবং স্থানীয়দের সাথেও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হলে সুযোগ নিতে পারে জঙ্গি ও উগ্রবাদী সংগঠনগুলো। সম্প্রতি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৭৪তম অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের লক্ষ্যে চার দফা প্রস্তাব রাখেন। সেখানে তিনি টেকসই প্রত্যাবাসনের কথা উল্লেখ করেন। জাতিসংঘকেই এর দায় দায়িত্ব নিতে হবে। রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

x