রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের প্রস্তাব প্রসঙ্গে

রবিবার , ৩ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৩১ পূর্বাহ্ণ
44

মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিনটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো- ১. কফি আনান অ্যাডভাইজরি কমিশনের সুপারিশসমূহের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন তদন্তের অগ্রগতি বিধানের সহায়ক হিসেবে নিরাপত্তা পরিষদে রেজুলেশনটি আবারও আলোচনার টেবিলে আনা যাতে প্রত্যাবাসনের জন্য একটি আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা যায়। ২. নিরাপত্তা পরিষদের পুনরায় কক্সবাজার ও রাখাইন স্টেটের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন। ৩. মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত অসামরিক ‘সেফ জোন’ সৃষ্টি করা। গত বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সফররত পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার পরিস্থিতি বিষয়ক এক আলোচনায় বাংলাদেশের পক্ষে এ প্রস্তাব দেন।
রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছা-প্রণোদিত প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে আরও কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব করেন পররাষ্ট্র সচিব। যেমন : ১. রোহিঙ্গাদের উপর সৃষ্ট সহিংসতা ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ঘটনার দায়বদ্ধতা নিরূপণ। এক্ষেত্রে বিদ্যমান জাতিসংঘ ব্যবস্থাপনার আওতায় যে সব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা কাজ করছে তাদের বাধাহীন প্রবেশাধিকার ও সহযোগিতা করতে হবে, যাতে তারা দশকের পর দশক ধরে চলা এ অপরাধের দায়বদ্ধতা নিরূপণ এবং অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বিচারের মাধ্যমে বন্ধ করতে পারে। ২. ইউএনএইচসিআর ও ইউএনডিপি’র সঙ্গে মিয়ানমারের যে ত্রি-পক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। ৩. মিয়ানমারের অভ্যন্তরে অবস্থিত আইডিপি ক্যাম্পগুলো তুলে নিতে হবে যাতে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রত্যাবাসনের আস্থা তৈরি হয়। এছাড়া বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তের জিরো লাইনে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে হবে।
সারা বিশ্ব আজ অবগত যে, শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদান করতে গিয়ে বাংলাদেশ এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর আগমন, তাদের নিরাপত্তা বিধান ও পরিচর্যার জন্য বড় ধরনের কর্মযজ্ঞের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার সীমাবদ্ধতা, সম্পদের স্বল্পতা, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে দারিদ্র্যের মাত্রা ও পরিকাঠামোগত স্বল্পতা এবং একই সঙ্গে শরণার্থী মোকাবিলার প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের উচ্চতম পর্যায় থেকে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে বেশ কিছু সেক্টর চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই চাপ মোকাবিলায় দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়েছে, যার সাড়া ইতিমধ্যে মিলছে।
যদিও আমরা জানি, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অনেক রকম ঝুঁকির মধ্যে আছে। তন্মধ্যে খাদ্যঝুঁকি একটি। দেশ-বিদেশ থেকে খাদ্যের সহায়তা আসছে। কিন্তু তা শরণার্থীদের চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। ফলে খাদ্যের অভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে শিশুরা অপুষ্টি এমনকি অকালমৃত্যুর শিকার হতে পারে। এখানে প্রণিধানযোগ্য যে এ বছর নানা কারণে ইতিমধ্যে প্রচুর খাদ্যশস্য নষ্ট হয়েছে। তদুপরি রোহিঙ্গাদের খাদ্য সংস্থানের চাপ যোগ হয়ে তা বাংলাদেশের খাদ্য মজুতেরও নতুন সংকট তৈরি করছে, যেটা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হিসেবে ধরা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সুদূরপ্রসারী সমাধানে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় যখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে, একই সময়ে ৯-১০ লাখ শরণার্থীর জন্য ত্রাণ এবং সুরক্ষা প্রদান করার গুরুদায়িত্ব বাংলাদেশের ওপর বর্তেছে, এমন এই পরিস্থিতিতে এই সম্ভাব্য প্রলম্বিত শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। সে ক্ষেত্রে শরণার্থীদের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের যথেষ্ট বিচক্ষণতা ও সাবধানতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। মানবিকতার সঙ্গে প্রয়োজন বিরাজমান বাস্তবতার সঠিক মূল্যায়ন। এ ক্ষেত্রে জরুরি হচ্ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আমরা কীভাবে আখ্যায়িত করছি, তা নির্দিষ্ট করা এবং সরকারের উদ্যোগকে যথাযথভাবে প্রতিপূরণ (সাপ্লিমেন্ট) করতে পারে, এমন সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া যার শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায় অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা রয়েছে।
জাতিসংঘ হচ্ছে এমন একটি জায়গা, একমাত্র যে সংগঠন যারা মিয়ানমারকে রাজি করাতে পারে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এবং নাগরিকত্বের ব্যাপারে। মিয়ানমার কাউকে কোনও পরোয়া করে না। কিন্তু জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে তার একধরনের দায়বদ্ধতা আছে। বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন লেভেলে এবং এটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে জাতিসংঘের মাধ্যমে জিনিসটা সমাধানের চেষ্টা করা। তাই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিনটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেসব প্রস্তাবের ব্যাপারে তাদের সাড়া দেওয়া দরকার। বিশ্বনেতৃবৃন্দের দৃষ্টি নিবন্ধ হোক- সেটাই আমরা প্রত্যাশা করি।

- Advertistment -