রোহিঙ্গা সংকট : জটিলতা মোকাবেলা করতে হবে নতুন করে

শনিবার , ২৪ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ
79

রোহিঙ্গাদের কেউ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফিরে যেতে রাজি নয়। ফলে বৃহস্পতিবার তাদের প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি।
মিয়ানমারে নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় এ মুহূর্তে বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকে ফিরতে চাচ্ছে না রোহিঙ্গারা। এতে ভেস্তে গেল ফেরত পাঠানোর দ্বিতীয় উদ্যোগ। বহুল প্রত্যাশিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আবারও হোঁচট খেল। অবশ্য জনমনে আগে থেকে এমন সংশয় বিরাজ করছিল। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে কেন বার বার ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ অথবা কেন একজন রোহিঙ্গাকেও স্বদেশে ফিরতে রাজি করানো যাচ্ছে না- এসব বিষয়ে আজাদীতে গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ‘আস্থার সংকটই প্রত্যাবাসনে বড় বাধা’। এতে আরো বলা হয়, অধিকাংশ রোহিঙ্গার ধারণা, রাখাইনে ফিরে যাওয়ার মতো পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। স্বদেশে ফিরলেও তাদের পুরনো বাড়িঘর, ব্যবসা-বাণিজ্য দোকানপাট ফিরিয়ে দেওয়া হবে না। বরং নিজ দেশে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতদের জন্য তৈরি করা ক্যাম্পগুলোতে প্রায় বন্দিদের মতো তাদের রাখা হবে। উখিয়া-টেকনাফের নতুন পুরাতন ক্যাম্পগুলোতে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের কাছে জানতে চাইলে প্রায় সকলেরই বক্তব্যে এমনটাই ওঠে আসে। এছাড়া অনেকেই স্বদেশে ফিরে গেলে ফের নির্যাতনের শিকার হতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন।
বিশ্লেষকরাও উপরিউক্ত মন্তব্য করেছেন। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত মন্তব্যে তাঁরা বলেন, মিয়ানমার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থার সংকট রয়েছে। এ ছাড়া আশ্রয় শিবিরে কর্মরত দেশি-বিদেশি এনজিওদের প্রত্যাবাসনবিরোধী তৎপরতার কারণে তারা নিরুৎসাহিত হয়েছে। চীন, মিয়ানমার ও জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) প্রতিনিধিরা প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করেছেন। ফেরত পাঠানোর বিষয়ে সরকারের কৌশল পরপর দু’বার ব্যর্থ হওয়ায় এখন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে তারা মনে করছেন। বিশেষ করে প্রত্যাবাসন শুরুর নির্ধারিত দিনের আগে ৬১টি দেশি-বিদেশি এনজিও যেভাবে যুক্ত বিবৃতি দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিরুৎসাহিত করেছে তা নজিরবিহীন। ফলে ভবিষ্যতে এনজিওদের তৎপরতা গভীর পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন বলে তারা মত দেন।
এদিকে, রোহিঙ্গাদের কেউ মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি না হওয়াকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। তিনি বলেন, প্রত্যাবাসনে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। রোহিঙ্গাদের থেকে যাওয়ার জন্য যারা প্ররোচণা দেবেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের থাকার জন্য অনেকেই প্ররোচণা চালাচ্ছেন। লিফলেট বিতরণ করছেন। ইংরেজিতে প্ল্যাকার্ড লিখে দিচ্ছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমার সৃষ্টি করেছে। এই সংকট তাদেরই সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরে যাওয়ার জন্য মিয়ানমারকে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আমরা আশা করছিলাম এবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হবে। কিন্তু হল না। এরপরও আমরা আশায় বুক বেঁধে আছি।’
অন্যদিকে, রোহিঙ্গা নিয়ে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ ঠেকাতে পাশে থাকার কথা জানিয়েছে চীন। বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে এক সাক্ষাতে এ কথা জানান সফররত চীনা দূত চেন হাই। চীনা দূত ও মিয়ানমারের সেনাপ্রধানের মধ্যে বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানের কার্যালয়। এতে বলা হয়েছে, চীনা রাষ্ট্রদূত তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এগুলো হলো- রোহিঙ্গা ও মানবাধিকার বিষয়ে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপের বিরুদ্ধে বেইজিংয়ের অবস্থান; মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় শান রাজ্য ও মান্দালায় অঞ্চলের গ্যারিসন শহরে সহিংস হামলা ও জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা এবং মিয়ানমার সরকারের গৃহীত শান্তি প্রক্রিয়ায় চীনের সহায়তা অব্যাহত রাখা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বর্তমানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছেন। তাদের বেশিরভাগই মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর বর্বর অভিযান থেকে জীবন বাঁচাতে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ কয়েক দফায় ৫৫ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করে। তাদের মধ্য থেকে মিয়ানমার তিন হাজার ৪৫০ জনকে যাচাই করে ফেরত নেয়ার জন্য তালিকা পাঠায়।
রোহিঙ্গা সংকটের দু’বছর পূরণ হওয়ার লগ্নে পরিস্থিতি নতুন করে জটিল আকার ধারণ করল। এ বিষয়ে বাংলাদেশকে অত্যন্ত ধৈর্য্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। নতুন করে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির পদক্ষেপ নিতে হবে।

x