রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে প্রস্তুত বাংলাদেশ

নৌ ও স্থলপথে দুটি ট্রানজিট ক্যাম্প স্থাপন

জাবেদ ইকবাল চৌধুরী, টেকনাফ

সোমবার , ১৯ আগস্ট, ২০১৯ at ৮:০০ পূর্বাহ্ণ
103

২২ আগস্ট হতে সাড়ে ৩ হাজার রোহিঙ্গাকে পর্যায়ক্রমে মিয়ানমার ফিরিয়ে নিতে সম্মত হওয়ায় বাংলাদেশও প্রত্যাবাসনে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। গতকাল ১৮ আগস্ট কক্সবাজারে এ সংক্রান্ত টাস্কফোর্স বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে প্রস্তুত বলে নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নুরুল আলম নিজামী।
সূত্রে জানা যায়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে টেকনাফের কেরুনতলী নৌ পথে ও বান্দরবানের ঘুনধুমে স্থলপথে দুটি প্রত্যাবাসন ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করতে এ দুটি ট্রানজিট ক্যাম্পের যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের প্রথমে ট্রানজিট ক্যাম্পে নেওয়ার পর মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা তাদের স্বদেশে স্বাগত জানাবেন। এভাবেই আগামী ২২ আগস্ট বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের একটি দল মিয়ানমারে ফিরে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত টেকনাফ প্রত্যাবাসন পয়েন্টে কোন রোহিঙ্গা পরিবারের অবস্থান দেখা যায় নি। এ ছাড়া উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় অনেকের বাড়িঘর তালাবদ্ধ। অনেকে নিজ কক্ষ ছেড়ে অন্যজনের কক্ষে গোপনে অবস্থান নিয়েছে। কেউ কেউ পালিয়ে অন্য ক্যাম্পেও অবস্থান নিয়েছে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমার নাগরিকদের সংগঠন ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি পিস এন্ড হিউম্যান রাইট্‌স (এআরএসপিএইচ)’ সদস্য ছৈয়দ উল্লাহ জানান, মিয়ানমার সরকারের একটি প্রতিনিধি টিম ও আসিয়ানের ৫ সদস্য গত জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। সেখানে তারা আমাদের সাথে কথা বলেছেন। সেখানে কথা ছিলো দেশে প্রত্যাবাসনের আগে মিয়ানমার সরকারের প্রতিনিধি ও আসিয়ান প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক বসে এ সমস্যার সমাধান বের করবেন। কিন্তু এখানে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ফলে রোহিঙ্গাদের মনে বারবার মিয়ানমার সরকার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে এমন মনোভাব তৈরি হয়েছে। এর ফলে মূলত রোহিঙ্গারা যাতে মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে তার ক্ষেত্র তৈরি করছে মিয়ানমার। তিনি আরো জানান, অনেক রোহিঙ্গা বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করতে শুরু করেছে। আসলে তারা জানেই না কাদের নাম মিয়ানমার সরকার প্রত্যাবাসনের জন্য চূড়ান্ত করেছে।
গত বছর ১৫ নভেম্বরে প্রত্যাবাসনের ছাড়পত্র পাওয়া জামতলীর দিল মোহাম্মদ বলেন, ওই সময় একটি এনজিও’র লোকজন খবর দিয়েছিল তালিকায় তাদের নাম আছে তাই যে কোন দিন মিয়ানমারে ফেরত যেতে হবে। এবার এখনো কিছু বলা হয়নি। তিনি আরো জানান, বাংলাদেশ সরকার থেকে বা অন্যকোনভাবে তাদের উপর চাপ দেওয়া হয়নি। তবে ২২ আগস্ট মিয়ানমারে ফিরে যেতে হতে পারে এমন খবরে পাশের অনেকে পালিয়ে গেলেও তিনি প্রতিবন্ধী হওয়ায় কোথাও পালিয়ে যেতে পারেন নি।
তিনি বলেন, আমাদের উপর ঘটে যাওয়া অত্যাচার নির্যাতনের এখনো বিচারই হয়নি। এ অবস্থায় ফিরে যাওয়ার চেয়ে এখানে আত্মহত্যা করা অনেক ভালো হবে। একই সুরে কথা বলেন প্রত্যাবাসনের ছাড়পত্র পাওয়া রোহিঙ্গা আব্দুর রশিদ, মোহাম্মদ সোয়াইব। তারা বলেন, পূর্ণ নাগরিকত্ব দেওয়ার সাথে সাথে কোন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে থাকবে না। স্বেচ্ছায় সবাই চলে যাবে মিয়ানমারে।
এদিকে জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা এখনো মিয়ানমারের পরিবেশ ঠিক হয়নি বলে মত প্রকাশ করায় ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসন শুরু হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহও রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। এর আগে ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ করা হলেও রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ফিরে যেতে অনীহা প্রকাশ করে বিক্ষোভ করায় তা সফল হয়নি। বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার এবং জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সদস্য মো. আবুল কালাম বলেন, মিয়ানমার সরকার হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করতে চেষ্টা করছে। আমরাও সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রত্যাবাসনের সঙ্গে যেহেতু মিয়ানমার সম্পৃক্ত তাই বিষয়টি উভয় দেশের সম্মতির ওপর নির্ভর করবে বলেও জানান তিনি।
আবুল কালাম আরো বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্থান নির্বাচন চূড়ান্ত করা আছে। এর মধ্যে বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুনধুম অথবা টেকনাফ উপজেলার কেরুনতলী ট্রানজিট ক্যাম্প রয়েছে। তবে মিয়ানমারে ফিরে যেতে রোহিঙ্গাদের জোর করা হবে না বলেও জানান তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রত্যাবাসনের অংশ হিসেবে কয়েক দফায় রোহিঙ্গাদের তালিকা মিয়ানমারে পাঠানো হয়েছে। বাছাইকৃত পরিবারের সদস্যদের তালিকা মিয়ানমারও ফের বাংলাদেশে দেয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাদের শনাক্তকরণের কাজও শেষ করতে হবে। এরপরই প্রত্যাবাসনের আনুষ্ঠানিকতা।সমপ্রতি দুই দেশের সমন্বয়ে গঠিত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় প্রত্যাবাসন বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।

x