রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহে আটকে গেল প্রত্যাবাসন

নাগরিকত্ব পেলে একদিনেই ফিরতে রাজি সবাই

আহমদ গিয়াস, রফিকুল ইসলাম ও সুনীল বড়ুয়া

বৃহস্পতিবার , ১৫ নভেম্বর, ২০১৮ at ৯:১৭ অপরাহ্ণ
107

অনেক নাটকীয়তার পরও আজ বৃহস্পতিবার (১৫ নভেম্বর) রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করা গেল না। দুপুরে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমস্থ মৈত্রী সেতু দিয়ে ৩০ পরিবারের ১৫০ জন রোহিঙ্গার একটি দলকে প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে বহুল প্রত্যাশিত প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা ছিল। এ লক্ষে প্রস্তুতিও নিয়েছিল বাংলাদেশ-মিয়ানমার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য রাজি করানো যায়নি। ফলে আটকে যায় প্রত্যাবাসন। কবে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করা যাবে তাও গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল। তবে মিয়ানমারে নাগরিকত্ব পেলে বাংলাদেশে অবস্থানরত সকল রোহিঙ্গা একযোগে ‘একদিনেই’ ফিরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গঠিত টেকনিক্যাল কমিটির প্রধান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ব্যর্থতা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করেছি। কাউকে তো জোর করে পাঠানো যাবে না।’ মিয়ানমারকে রোহিঙ্গারা এখনো নিরাপদ মনে করছে না বলে তারা এ মুহূর্তে ফিরে যেতে রাজি নয়। এ কারণে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। তবে এ চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

এর আগে দুপুরে প্রাথমিকভাবে উখিয়ার ২২নং জামতলী ও টেকনাফের ১৫নং উনচিপ্রাং ক্যাম্প থেকে ৩০টি পরিবারের ১৫০ জন রোহিঙ্গাকে ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কথা ছিল। এসব রোহিঙ্গাকে প্রথমে নিজ নিজ ক্যাম্প থেকে উখিয়ার কুতুপালং এলাকার ট্রানজিট কেন্দ্রে রাখার পর সেখান থেকে ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে স্থলপথে মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করার পরিকল্পনা ছিল। তাই ট্রানজিট কেন্দ্রে রোহিঙ্গাদের রাখতে ইতোমধ্যে ৫৭টি ঘরও নির্মাণ করা হয়।

কিন্তু শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার জন্য ক্যাম্পে গিয়ে রোহিঙ্গাদের আহ্বান জানালে তাদের কেউই এতে সাড়া দেয়নি। এসময় প্রত্যাবাসনের বিরুদ্ধে টেকনাফের উনচিপ্রাং ক্যাম্পসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করে রোহিঙ্গারা। উনচিপ্রাং ক্যাম্পে বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে শুরু হওয়া ঘন্টাব্যাপী বিক্ষোভে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব পেলে একইসাথে ‘একদিনেই’ ফিরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। কেউ কেউ আত্মহত্যারও হুমকিও দেয়। প্রত্যাবাসনের ভয়ে ইতোমধ্যে দুই রোহিঙ্গা আত্মহত্যা করেছে বলেও দাবি করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আগে বুধবার জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের রাখাইনের পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের জন্য এখনও নিরাপদ নয় বলে মন্তব্য করে। এর আগে গত মাসের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডা্ব্লিউ) রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কারণে এই জনগোষ্ঠীটি নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে এক বিবৃতিতে মন্তব্য করে।

জাতিসংঘও তাদের পাশ কাটিয়ে করা দুদেশের চুক্তিটি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এবং ইউএনএইচসিআর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো সহযোগিতা করবে না বলেও এরআগে বাংলাদেশকে সাফ জানিয়ে দেয়।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গঠিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) তৃতীয় বৈঠক শেষে গত মাসের ৩০ তারিখ মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের সময়ও রোহিঙ্গারা ফিরে যাওয়ার শর্ত হিসাবে ৭ দফা দাবি দেয়।

এর আগের দিন রাজধানী ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায় অনুষ্ঠিত (জেডব্লিউজি) তৃতীয় বৈঠকে বৃহস্পতিবার প্রত্যাবাসন শুরু করতে দুদেশ সম্মত হয়।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ১০ লাখেরও বেশি মানুষ। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য গত বছরের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ-মিয়ানমার চুক্তি সম্পন্ন হয়।

পরে গত ৬ জুন মিয়ানমারের নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সর্বশেষ জেডব্লিউজি’র বৈঠকের চুক্তি অনুযায়ী প্রথম দফায় ৪৮৫ পরিবারের ২ হাজার ২৬০ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের কথা ছিল। তবে এখন পর্যন্ত প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় একজন রোহিঙ্গাও ফিরে যায়নি।

x