রোমা : এক অনন্য উপহার

দেবাশীষ মজুমদার

মঙ্গলবার , ১২ মার্চ, ২০১৯ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ
140

ব্রিটিশ একাডেমী অব ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন আর্টস (বাফটা) অ্যাওয়ার্ডসকে পৃথিবীব্যাপী সিনেমা পাগল মানুষ মাত্রই অস্কারের ড্রেস রিহার্সাল ভাবেন। তো এই বাফটা’র বাহাত্তরতম আসরে সাতটি পুরস্কার জিতে নিয়ে ফেভারিটের আসনটি ‘দ্য ফেভারিট’ পাকাপোক্ত করেছিল। তবে সেরা সিনেমা, সেরা পরিচালক আর সেরা সিনেমাটোগ্রাফি খেতাব জিতে নেয় মেঙিকান সিনেমা ‘ রোমা’। ও আচ্ছা, ভিন্নভাষার চলচ্চিত্র পুরস্কারটাও জেতে ‘রোমা’। এদিকে হ্যাশট্যাগ মিটু আন্দোলনে কিছুটা ব্যাকফুটে থাকলেও ‘বোহেমিয়ান রাপসোডি’ তুমুলভাবেই আলোচনায় ছিল, রেমি মালিকের সেরা অভিনেতার পুরস্কার পাওয়াটাও সকাল হলেই সূর্য উঠবে টাইপ ব্যাপার। একটা করে পুরস্কার জুটে ব্ল্যাকপ্যান্থার, ভাইস, আ স্টার ইজ বর্ন, গ্রীনবুক ইত্যাদি সিনেমার।
সূর্য ডুবে যাবার পর নিকষ কালো অন্ধকার চিরে ঝলমলিয়ে উঠেছিল ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলসের ডলবি থিয়েটার ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে। অস্কার একাডেমি বরাবরের মতোই চমকে দিয়েছিল তাঁদের ভিন্নধর্মী আয়োজনে। প্রথম চমকটা ছিল বিগত তিনদশকের প্রথা ভেঙে সঞ্চালক-বিহীন অনুষ্ঠান। কেবলমাত্র সেরনা উইলিয়ামস বা হেলেনা ক্লার্ক খানিক খেই ধরেছিলেন মাঝেমধ্যে, এটুকুই।
অ্যাফ্রো-আমেরিকান ধ্রুপদী মিউজিশিয়ান ডন শার্লি, সাদা-কালো জাতিগত বিভেদে পড়ে নিজের অস্তিত্বের টানাপোড়নে পর্যুদস্ত। না সাদারা তাঁকে মেনে নিচ্ছে, না কালোরা। তাঁর গাড়ি চালক হলো ইতালিয়ান-আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ টনি ভাল্লেলঙ্গা। এই দুজনের ঘাতপ্রতিঘাত নিয়েই নির্মিত হয়েছে ‘গ্রীন বুক’, এবং সবাইকে চমকে দিয়ে অস্কারের সেরা সিনেমার খেতাব বগলদাবা করে নিয়েছে বৈষম্যকে জয় করে ভালবাসার এ গল্প। তিনটি ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পেয়ে তিনটিতেই জিতেছে সিনেমাটি, বাকি দুটো হল, ডন শার্লি চরিত্রে অভিনয় করে সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হয়েছেন মাহেরশালা আলী এবং নিক ভাল্লেলঙ্গা, ফেরলি নিক, ব্রায়ান কারি-এর সম্মিলিত প্রয়াসে সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার। এ সিনেমা নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে – দুটি পুরুষের মধ্যে পথ চলতে চলতে একটি ভালবাসার গল্পের জন্ম হওয়া সত্যিই বিরল ঘটনা। যেখানে শালির কাছ থেকে টনি শিখতে পারে, কত সুন্দর করে স্ত্রীকে চিঠি লিখতে হয়। ধীরে ধীরে একজনের প্রতি আরেকজনের সম্মান তৈরি হয়। একজন আরেকজনকে ভালবাসতে শুরু করেন, কাজকে ভালবাসতে শুরু করেন।
ম্যাক্সিকোর দুজন কিশোর যারা খুব অল্পদিনের মধ্যেই যৌবনে পদার্পণ করতে যাচ্ছে, তাদের কল্পিত ‘স্বর্গদ্বার’ ভ্রমণের গল্প বলা হয়েছে ‘ই তু মামা তাম্বিয়ান’ সিনেমায়। শুধু এইটুকু বললে এই সিনেমা সম্পর্কে ধারণা পাওয়াটা কঠিন যদিও তবে আজ এ পর্যন্তই থাক। এ সিনেমাটা দিয়েই মূলত পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছিলেন আলফানসো কুয়ারোন। ক্রিটিকদের ভূয়সী প্রশংসার পাশাপাশি এই সিনেমাটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্পিরিট এওয়ার্ড অর্জন করেছিল। অনেককেই দেখেছি তাঁদের দেখা সেরা ১০ ট্রাভেল সিনেমার লিস্টে এই সিনেমার নাম উল্লেখ করতে। যদিও ‘লাভ ইন দ্যা টাইম অফ হিস্টিরিয়া (১৯৯১)’, চিলড্রেন অব মেন(২০০৬) ইত্যাদি সিনেমা দিয়ে আলোচনায় থাকলেও তাঁকে নিয়ে তুমুল হুল্লোড় শুরু হয় ২০১৩ সালে ‘গ্র্যাভিটি’ সিনেমাটার পর। গ্র্যাভিটি দেখবার পর সবারই প্রায় ধারণা হয়েছিল এই সিনেমা নিশ্চিত অস্কার জিতবে, কিন্তু এ সিনেমা ৭ টি এওয়ার্ড জিতে নিয়ে অস্কারকে প্রায় একঘরে করে ফেলবে এমন ধারণা কেউ করেছিল বলে মনে হয় না। হাইটেক ব্যাপার-স্যাপার বাদ দিলে এই মুভির কাহিনী খুবই সাদামাটা। কিন্তু এখানেই কুয়ারোনের স্পেশাল সিগনেচার। গন্ডাখানেক সিনেমা এর আগেও এমন কাহিনী নিয়ে হয়েছে, কিন্তু এত টানটান উত্তেজনার গল্প বলতে পারাটাই হচ্ছে কুয়ারোনের স্পেশালিটি। মুভিটা দেখবার সময় প্রতিটা দর্শকের মনে হতে বাধ্য যে তিনিই ওই মুভির একটা চরিত্র হয়ে সৌরজগত চষে বেড়াচ্ছেন।
এর আট বছর পর তিনি নির্মাণ করলেন ‘রোমা’-স্প্যানিশ ভাষায় ড্রামা ঘরানার সিনেমা। ১৯৭০ সালের শুরুর দিকে মেঙিকো শহরের একটি গল্প নিয়ে সিনেমাটি নির্মাণ হয়েছে। মেক্সিকান সিনেমা হিসেবে ‘রোমা’ প্রথমবার অস্কার জিতল। একই বিভাগে আরও মনোনয়ন পেয়েছিলো ‘কোল্ড ওয়ার’ (পোল্যান্ড), ‘নেভার লুক অ্যাওয়ে’ (জার্মান), ‘ক্যাপেরনাম’ (লেবানন) এবং ‘ সোপলিফটার্স’ (জাপান)। সামগ্রিকভাবে সেরা সিনেমার খেতাব জিততে না পারলেও মোট দশটি বিভাগে মনোনয়ন পেয়ে সেরা পরিচালক, সেরা ওরিজিনাল স্ক্রিনপ্লে এবং সেরা বিদেশি ভাষার ক্যাটাগরিতে অস্কার জিতে নিয়েছে ‘রোমা’ ছবিটি। ‘গ্র্যাভিটি’ মুক্তির পর টারান্টিনো এবং নোলানের পাশাপাশি তাঁর ছবি ঘিরেও দর্শকদের নতুন কিছু পাবার আগ্রহ প্রচুর। বাকি দু’জনের মতোন তাঁর সিনেমাতেও সিনেমাটোগ্রাফি একটা বিশেষ আগ্রহের বিষয় দর্শকদের কাছে। এই যেমন ‘রোমা’ সিনেমাটা শুরু হয়েছে এইভাবে – সাদাকালো ফ্রেম, দেখা যাচ্ছে একটা পাথুরে মেঝে। বেশ কয়েক সেকেন্ড এই মেঝের দিকে তাকিয়ে থেকে এর মধ্যে কোন বিশেষ কিছু আছে কিনা এমন অনুসন্ধান করতে গিয়ে যেই কিছু না পেয়ে হাল ছেঁড়ে দিল, তক্ষুনি একরাশ জল ছিটকে এসে ভিজিয়ে দেবে পর্দাটা। ভেজা মেঝেতে তখন দেখা যাচ্ছে আকাশের স্পষ্ট প্রতিফলন। একটা বিমান সেই আকাশে উড়তে উড়তে ফ্রেমের বাইরে চলে যাচ্ছে। দর্শক যখন এই বিমানের রহস্য উদ্ঘাটনে বুঁদ ঠিক তখনই চিন্তায় জল ঢেলে দেবার মতোই আর এক পশলা সাবান-পানি এই দৃশ্যকে ঘোলা করে দেবে।
সিনেমার শুরুতেই এই ম্যাসেজটা যেন অনেকটা ‘শরৎকুমার রায়’ এর ‘বৌদ্ধজীবন’-এ লেখা পরবর্তী দর্শনের মতো- ‘সাধারণ মানব আপন ব্যক্তিত্বের নিগূঢ় তাৎপর্য আপনি অবগত নহে; ঐহিক জীবনযাত্রার শেষে সে যে কোন্‌ পরিণামে উত্তীর্ণ হইবে তাহা কখনো তাহার কল্পনায়ই উদিত হয় না; তাহার প্রত্যেক কার্য, প্রত্যেক বাক্য, প্রত্যেক চিন্তা কোন্‌ পরিণামের সৃষ্টি করিতেছে, সে তাহা অবগত নহে; তাহার বর্তমান ব্যক্তিত্ব কেমন করিয়া সম্ভব হইল, সেই রহস্য সম্বন্ধেও সে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। আপনাকে আপনি না জানিয়া মানব আপনার সত্তা রক্ষা করিবার নিমিত্ত নিরন্তর সংগ্রাম করিতেছে। অন্ধ যেমন আপনার গন্তব্যপথ দেখিতে পায় না, তথাপি দণ্ড হস্তে কোনরূপে যাতায়াত করে, মানবও তদ্রুপ অন্ধভাবে জীবনপথে চলিতে থাকে। সত্তা রক্ষা করিবার জন্য এই সংগ্রামে মানব যেমন অশেষ দুঃখ পাইয়া থাকে, তেমনি স্থূল সুখও লাভ করিয়া থাকে। জীবন এই সুখ দুঃখের সংমিশ্রণ। শশিকলায় যেমন হ্রাস ও বৃদ্ধি আছে, তরঙ্গে যেমন উত্থান ও পতন আছে, জীবনে তেমনি সুখ ও দুঃখ রহিয়াছে।’
মানষের জীবনের সমস্ত কর্মকাণ্ডই সচ্ছলতা, বিলাস এবং আর্থিক লাভের জন্য। প্রায় সকলেই ভাবি সচ্ছলতার অপর নাম সুখ। যদিও ছোটবেলায় সবাই আমরা গল্পে পড়েছি, সুখী মানুষের খোঁজে ঘুরতে গিয়ে দেখা গেছে, যে লোকটি সবচাইতে সুখী তার গায়ে কোনো জামা নেই। আধুনিক বা ভোগবাদী সমাজে সুখের যে উপকরণ তা হলো বাড়ি, গাড়ি ও ব্যাংক ব্যালান্স। এগুলো যে সুখের যথার্থ উপকরণ নয়, তা আমরা চারিদিকে একটু বিশ্লেষণী দৃষ্টি দিলেই বুঝতে পারি। সুখ অর্জনের যে কামনা তা প্রত্যেক মানুষেরই থাকা উচিত, এটা ঠিক। তবে সুখ অর্জনের যে সফলতা তা ন্যায় নিষ্ঠা এবং পরার্থপরতার মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কথাকেও আড়াল করা যাচ্ছে না। সুখের এই যেনতেন প্রকারেণ প্রচেষ্টা জীবনের জন্য ভার বা বোঝা হয়ে জীবনকে হতাশায় ডুবিয়ে ফেলতে পারে।
ফেরা যাক ‘রোমা’ সিনেমায়, এ সিনেমা মূলত: অটোবায়োগ্রাফিকাল ড্রামা ঘরানার। বহু সিনেমার মতো এতেও একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র আছে। এ সিনেমায় সময়টাকে ধরা হয়েছে সত্তর দশকের গোঁড়ার দিককার। উচ্চশিক্ষিত এবং সচ্ছল একটা পরিবারের গল্প। চারটা বাচ্চা, তাঁদের মা-বাবা এবং দিদিমা- এই হল সংসার। শেষ নয়, আরও যারা আছে এই পরিবারটিকে ঘিরে সর্বক্ষণ তারা হল দু’জন গৃহপরিচারিকা এবং একটি কুকুর। একটা প্যারালাল গতিতে পরিবারটার বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুহূর্তের গল্পগুলো বলেছেন পরিচালক। আর অন্য বহু সিনেমাতে যেমন হয়, তেমনই এই সিনেমাতে একটা কেন্দ্রীয় চরিত্র রয়েছে। আর সেই চরিত্র হল মেক্সিকোর প্রত্যন্ত কোনো গ্রাম থেকে জীবিকার জন্য বহুদূর পাড়ি দেয়া দুই গৃহপরিচারিকার একজন, তার নাম ক্লেও। এ যেন তপন সিন্‌হা পরিচালিত সিনেমা ‘গল্প হলেও সত্যি’-র ধনঞ্জয় চরিত্রের রবি ঘোষ, যখনই প্রয়োজন, আছি – এমন প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির একটা মানুষ, প্রয়োজনে নারিকেলের মালা হয়ে সমাজের শ্যাওলা তুলব টাইপ ব্যাপার। বাচ্চাদের ঘুম থেকে ওঠানো, স্কুলের জন্য তৈরি করা, নাস্তা খাওয়ানো, স্কুল থেকে আনা, ঘুম পাড়ানো, কুকুরের বিষ্ঠা পরিষ্কার থেকে শুরু করে খাবার তৈরি করা, কাপড় ধোয়া, ঘরদোর সাফ-সুতরো করা ইত্যাদি সমস্ত কাজই তাকে করতে হয় রীতিমত দশভুজার রূপধারী হয়ে। না, গল্প অতোটা ডিটেইলে বলে দেয়া মনে হচ্ছে ভুল হবে, অনেকেই এই সিনেমা হয়তো নানা কারণে এখনো দেখে উঠতে পারেননি। গল্প আপাতত এটুকুই।
অস্কার জয় তাঁর জীবনকে কতটা বদলেছে, এক সাক্ষাৎকারে এমন প্রশ্নের উত্তরে কুয়ারোন বলেছেন – যে সময় ভীতি এবং ক্রোধ আমাদের জীবনকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে, সেই সময় একজন বাড়ির কাজের সহকারীর জীবনই হলো আমার কাছে আসল পৃথিবীর মতো। পৃথিবীজুড়ে চলমান বিচ্ছিন্নতা কখনও কোনও কিছুর সমাধান হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে না। এই পুরস্কার সব গৃহকর্মীর জন্য।
তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই এই সিনেমা বানানো কিনা এমন প্রশ্ন শুনে বলেছেন, প্রত্যেক মানুষের অভিজ্ঞতা তার একটি লম্বা সফরের অনুষঙ্গ। কেউ যখন একটা চাকরিতে যোগদান করে, তখন একান্ত পার্সোনাল কাজের চাইতে এটাকে খুব দীর্ঘ মনে হয়। সবার জীবনে তখন প্যারালালি দুটো বাস্তবতা এগিয়ে চলে। চলার পথে প্রত্যেকটি বাধা-বিপত্তি ওই লম্বা সফরে এক ভিন্ন ধরনের গতি তৈরি করে। ভিন্ন ভিন্ন প্রাণের সাথে আমাদের যে বন্ধন, তারাও যে ভেসে চলেছে সময়ের অভিন্ন স্রোতে, সেই বাস্তবতার সাথে আপনি যতবার মুখোমুখি হচ্ছেন, আপনি বিসদৃশ কিছু অনুভব করেন। কখনও কখনও এই ভিন্নতা নিজের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে, মানুষকে বদলে দেয়। হয়তো আমার জীবনেও তাই ঘটেছে। ‘রোমা’য় প্রত্যেকেরই একটি বিষয়ের দিকে ফোকাস থাকবে। তা হলো- তাদের নিজেদের স্মৃতি। এটা হতে পারে সুখের বা বিষাদময়। স্মৃতির মুখোমুখি হওয়া মানে পেছনে ফেলে আসা সময়ের সঙ্গে বাস করা। রোমার স্মৃতির সঙ্গে আমার তিন বছরের বসবাস। শুধু বসবাসই নয়, এটা অনেকটা স্মৃতির গোলকধাঁধার দরজা খুলে দেওয়ার মতো।

x