রোমাঞ্চকর পথযাত্রা

সান্দাকফু থেকে শ্রীখোলা

শিউলি শবনম

মঙ্গলবার , ৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ১১:০০ পূর্বাহ্ণ
9

(২য় পর্ব)
দ্বিতীয় দিনের ট্রেকিং: গৈরিবাস থেকে সান্দাকফু
১২ নভেম্বর ভোরে গরম, পোড়া-পোড়া ডিম-পাউরুটি ভাজা এবং ওই অঞ্চলের জনপ্রিয় মোমো দিয়ে নাস্তা সারি আমরা। পরে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা হাতে আমরা যখন শ্রীরাধার ম্যাগনোলিয়া লজের বাইরে নরম রোদে গিয়ে দাঁড়াই আর দেখতে থাকি দিগন্তজোড়া ঘন পাইনের বন-কেমন করে আকাশ ছাপিয়ে দৃঢ় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, কুয়াশায় মোড়ানো এ-জনপদের ছোট-ছোট টিনশেড ঘর-বাড়ি কেমন উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে! কোথাও যেন কোনো তাড়া নেই, অস্থিরতা নেই, সারা লোকালয়জুড়ে গভীর এক ধ্যানমগ্নতা। তখন আমাদের বুকের ভেতরটাও কেমন যেন আশ্চর্য প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। গৈরিবাসের চেকপোস্টে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নিয়ে জোনায়েদ ভাই তাড়া দেন, ট্রেকিংয়ের সময় শুরু।
যে লজে রাত কাটাই, ঠিক তার গা ঘেঁেষ উপরের দিকে উঠে গেছে পায়ে হাঁটার পাহাড়ি পথ। কংক্রিট, ছোট-বড় পাথরে এবড়ো-থেবড়ো। ট্রেকিং পুলে ভর দিয়ে আমরা ধীরে ধীরে উপরে উঠা শুরু করি। ট্রেকিংয়ের সবচেয়ে কষ্টকর এই হাঁটাপথ ঠিক কতটা যন্ত্রণাময়, শ্বাসরুদ্ধকর হতে পারে তখনো বুঝিনি। সু্‌উচ্চ, ধ্যানী পাহাড়ের সুশৃঙ্খল সারি, সিঙ্গালিলার রহস্যময় উদ্যান, সাপের মতো আঁকাবাঁকা সড়ক, টিলার উপর ছোট-ছোট বাড়ি-ঘর দেখে দেখে আমার রাস্তা বদলাই। কখনো মেঘ, কখনো রোদের সাথে আকাশের রঙ বদল দেখি। দেখি পাতাঝরা বনপথ, চিরহরিৎ বৃক্ষ, রঙ বেরঙের গুল্ম, পথের ধারে ফুটে থাকা শত-সহস্র নাম না জানা ফুল, উন্মুখ তাকিয়ে থাকা রঙিন পত্রপল্লবের বিস্ময়কর ডালি আমাদের যেন পাগল করে তোলে। মাঝে মাঝে ভেসে আসে পাখির কলতান। বন্যপ্রাণী ও গাছ ভালবাসার আহ্বান জানিয়ে গাছের গায়ে সেঁটে দেয়া সিঙ্গালিলা পার্ক কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখি। দেখতে-দেখতে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড় ডিঙ্গাই। একেকটা সুবিশাল পাহাড় কেমন করে আমাদের বুকের ভেতর ঢুকে পড়ে আশ্চর্য ক্ষিপ্রতায়! গভীর প্রশান্তি এসে ছড়িয়ে যায়। আমরা শুধু অনুভব করি।
এই ট্রেকের প্রতিটি বাঁকে, প্রতি পদে-পদে লুকিয়ে আছে বিস্ময়কর সব সৌন্দর্য। কায়কাটার বন-জঙ্গল পেরিয়ে যখন কালাপোখারি পৌঁছি তখন বুদ্ধ ভক্তরা ছোট্ট লেকের কালো পানিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করছিলেন। তুষারপাতের দিনে যখন চারপাশ বরফে ঢাকা পড়ে তখনো জমে না এই পানি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই পানি অতি পবিত্র। লেকের চারপাশ ভয়ংকর সুন্দর সব পাহাড় দিয়ে ঘেরা। সেসব পাহাড়ের চূড়ায় জেগে আছে কুয়াশা জড়ানো রোদ আর রাশি-রাশি ইত:স্তত মেঘ। আমরা কিছু সুন্দর ক্যামেরায় ধারণ করি। আর পুরোটাই হৃদয়ে। ক্যামেরায় সে সুন্দর ধরা সম্ভব না! ফিল্মমেকার সুজন ভাইকে খুঁজে পাওয়া যায় না। ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে তিনি সে-আচ্ছন্ন করা সৌন্দর্যের পেছন-পেছন ছুটছেন ধারে-পিঠে কোথাও। ততক্ষণে আমরা প্রত্যেকেই ক্লান্তিতে জর্জর। চটপটে, স্মার্ট, ফ্রান্স ভাষা জানা রিয়াদ তখন দুই ফরাসী ট্রেকারের সাথে গভীর আলাপনে মগ্ন, কালাপোখারির এক ঝুপড়ি হোটেলে। হোটেলে ঢুকে কামরুল, জোনায়েদ ভাই চোখ বুজে সটান শুয়ে পড়ে ছিপছিপে বেঞ্চিতে। অর্ডার দেয়া হয় আমাদের প্রত্যেকেরই প্রায় বিতৃষ্ণা জাগানো স্যুপি নুডুলস। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় আমাদের অপেক্ষা যেন আর ফুরায় না। এই ফাঁকে দুই ফরাসি ট্রেকারের সাথে আমরাও অল্প-স্বল্প আড্ডা জমাই, পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে ছবি তুলি। ভীষণ বন্ধুবৎসল, প্রাণবন্ত দু’জনের কেউ-ই ফেসবুক ব্যবহার করেন না! আমাদের মতো ফেসবুক ম্যানিয়ায় ভোগা জাতির কাছে সেটা বিস্ময়কর খবরই বটে! ততক্ষণে খাবার টেবিলে চলে আসে সসপ্যান ভর্তি ধোঁয়া ওঠা স্যুপি নুডুলস।
কালাপোখারি থেকে এবার ট্রেকিং শুরু ৭ কিলোমিটার দূরে সান্দাকফুর দিকে। স্থানীয় এক নেপালি বললেন, ‘এই ভীষণ কঠিন যাত্রায় দম বের হয়ে যাবে!’ দম বের হওয়া সম্পর্কিত কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় আমরা বিষয়টা স্রেফ উপেক্ষা করে ট্রেকিং শুরু করি। তখন আকস্মিক বৃষ্টির মতো কুয়াশা ঝরা শুরু হয়। চারদিক ফ্যাকাশে, বিবর্ণ হয়ে ওঠে মুহূর্তেই। শিগগির এই কুয়াশা কেটে যাওয়ারও কোনো সম্ভাবনা দেখতে পাই না। আমরা যাত্রা শুরু করতেই দেখি দুই ফরাসি বন্ধু ধীর গতিতে, দৃঢ় পায়ে তাদের ট্রেকিং শুরু করে দেয়। জোনায়েদ ভাই বললেন, ‘ফলো দেম। তাদের হাঁটার স্টাইল দেখো!’ আমরাও দেখি। না, তাদের পা ফেলায় কোনো রকম তাড়াহুড়ো নেই, প্রতিটি পদক্ষেপ আশ্চর্য চৌকস, টানটান। কিন্তু কল্পনার চেয়ে বেশি মারাত্মক খাড়া রাস্তায় তাদের অনুসরণ করে গতি ধরে রাখা আমাদের পক্ষে বেশিক্ষণ সম্ভব ছিল না। বিকেভাঞ্জনের কাছাকাছি পৌঁছে ব্যাগের ভারে কামরুল, রিমঝিম ভীষণ কাহিল হয়ে পড়ে। ঘাড়ের তীব্র ব্যথায় প্রায় কাতরানোর দশা তাদের। এদিকে সবাইকে পা আরো জোরে চালানোর তাড়া দেন জোনায়েদ ভাই। কারণ, সন্ধ্যে নেমে গেলে অন্ধকার, জনমানবহীন, খাবার-পানীয়হীন পাহাড়ি রাস্তায় ঝামেলায় পড়তে পারি পুরো টিম। কুয়াশা এড়াতে আমরা আরো শক্তপোক্তভাবে মাফলার, কানটুপিতে নাকমুখ ঢেকে দ্রুত পা চালাই। এমন সময় আমাদের চোখে পড়ে ব্রিটিশদের তৈরি ল্যান্ড রোভারে চড়ে সান্দাকফুর দিকে যাচ্ছে কয়েকটা টিম। সিদ্ধান্ত হয় কামরুল ও রিমঝিম গাড়িতে সান্দাকফু যাবে। বাকিরা ট্রেকিং করবে। কিন্তু তাদের আপত্তি, গাড়ির দুষ্প্রাপ্যতা সব মিলে শেষমেষ আমরা ট্রেকিং করি সবাই।
পথে দেখা হয়ে যায় বহু বছর আগে চট্টগ্রাম থেকে কলকাতায় গিয়ে সেটেলড হওয়া ষাটোর্ধ দুই বাঙালি ট্রেকারের সাথে। অনেক বছর পর পুরনো লোকদের সাথে দেখা মিলে গেলে যা হয়, তেমনিভাবে চট্টগ্রামে তাদের পুরনো ঘরবাড়ি, স্থান সম্পর্কে খোঁজ নেন। বুকের কিনারে কোথাও হয়তো আজো জন্মভূমির উষ্ণতা পুষে রেখেছেন তারা। তাদের সাথে ছিলেন চট্টগ্রাম ওয়াসায় চলতি ডিসেম্বরে একটি প্রজক্টের দায়িত্ব পাওয়া এক অবাঙালি ইঞ্জিনিয়ার। চট্টগ্রাম থেকে গেছি শুনে চেয়ে নিলেন আমাদের ভিজিটিং কার্ড, যোগাযোগের নাম্বার।
হাঁটতে হাঁটতে আরো বাড়তে থাকে উচ্চতা। বাড়তে থাকে কুয়াশার তীব্রতা। কারো কারো দাড়ি, গোঁফে জমে যায় তুষারবিন্দু। উপরের পাহাড়ে উঠে নিচের দিকে তাকালে মনে হয় সেখানে শাদা শাদা মেঘ কিংবা মহাসাগরের অথৈ জলরাশি। এক গজ সামনে থাকা রিয়াদকে খুঁজে না পেয়ে চিৎকার করে ডাকি। কিন্তু এত প্রতিকূলতার ভেতরেও যে ঘন জঙ্গল পেরিয়ে আমরা হাঁটতে থাকি, বিস্ময়কর তার সৌন্দর্য! নেপালি ভাষায় ‘ছুতোর’ নামে গোলাপি রঙা যে মনোহর গাছ- বাঁকে বাঁকে আলো ছড়াচ্ছে সেরকম অসংখ্য রঙিন লতা, গুল্ম! কোনো কোনোটার গায়ে তখনো লেগে আছে জমে যাওয়া বরফের পুরনো দাগ। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে পথের পুরো সৌন্দর্য উপভোগ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। সান্দাকফু পৌঁছার ২ কিলোমিটার আগে থেকে সুন্দর যেন আরো তীব্র হয়ে উঠে, ভয়ংকর হয়ে উঠে পাহাড়ের বাঁক। খাড়া, ছিপছিপে পাহাড়ি রাস্তা থেকে পিছলে পড়লেই ঘটতে পারে ভয়ানক কিছু। ক্রমেই আরো খাড়া, আরো উদ্ধত, আরো ভয়ংকর হয়ে উঠতে থাকে সান্দাকফু যাত্রা। গাইড সামনে থাকা আমাদের কয়েকজনকে নিয়ে চৌরাস্তা মতো এক পাহাড়ের খাদে থামলেন বাকিদের জন্য। কারণ, সে মোড়ে রয়েছে পথ হারানোর সম্ভাবনা।
সবাই একসাথে হাঁটতে হাঁটতে এক খাড়া পাহাড়ে আরোহনের পর পরই জোনায়েদ ভাই বুকে হাত চেপে বললেন, ‘কেমন যেন চাপ অনুভব করছি’। বিষয়টা আমিও টের পাচ্ছিলাম আরো আগে থেকে। কিন্তু বুঝে উঠতে পারছিলাম না ঠিক কী হচ্ছে! অন্যদেরও হয়তো একই অবস্থা। সান্দাকফু শূন্য কিলোমিটারে পৌঁছে আমরা যখন বিজয়ের হাসিতে ছবি তোলার চেষ্টায় রত, তখন কারো মুখে আসলে হাসি ছিল না। প্রচন্ড শ্বাসের সমস্যায় সবাই মোটামুটি কাবু। আমার সমস্যা যেন ঠিক শ্বাসের নয়, কেমন যেন গা গোলানা অনুভূতি। শূন্য কিলোমিটারে পৌঁছেও তখন হেঁটে উঠছি আরো প্রায় এক কিলোমিটার উচ্চতায়। কিছুতেই পা দুটো চলছে না কারো। মনে হচ্ছে ওগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। যে-কোনো সময় পড়ে যাবে। কামরুল, সুজন ভাই বসে পড়ে রাস্তার এক কিনারে। কুয়াশা এসে আরো জেঁকে ধরে।
আমি যেন প্রায় অচেতন অবস্থায় হাঁটছি। এমন সময় পেছন থেকে আশ্চর্য হাসির ঝংকার তুলে দেখলাম একটা তরুণ ট্রেকিং গ্রুপ আসছে। আমার গায়ের পাশ দিয়েই যাচ্ছিল তারা । একজনকে বললাম, ‘এতো উচ্চতায় উঠতে-উঠতে কীভাবে এতো হাসছো তোমরা? কোন জাদুতে? আমাদের শরীর, পা কিছুই তো ঠিকভাবে চলছে না আর!’ এই কথা শুনে আকৃতি নামের ১৮-২০ বছরের নেপালি মেয়েটি তার বন্ধুদের নিয়ে থামলো। আমাদের টিমের বাকিরাও এসে দাঁড়ালো সেখানে। আকৃতির এক বন্ধু জ্যাকব এসে আমার মুঠো ভর্তি করে তুলে দেয় ভুট্টা। বলে, ‘এটা মেডিসিন, খেতে থাকো।’ সেই মেডিসিন আমি আমার বন্ধুদের দুয়েকটা করে ভাগ করে দিয়ে নিজের মুখেও তুলে নিই। তা দেখে জ্যাকব দু’হাত ভর্তি করে আরো ভুট্টা এনে দিয়ে বলে, ‘নাও, তোমার বন্ধুদের জন্য’। ভুট্টা মুখে দিয়ে মনে হলো একটু যেন স্বস্থি পেলাম। সত্যিই তবে ভালো মেডিসিন! ভুট্টা চিবাতে চিবাতে আমরা উঠতে থাকি সান্দাকফুর চূড়ার দিকে।
অনেক কষ্টে, শ্রমে সান্দকফুর চূড়ায় উঠি। রিয়াদ আর মাজেদ উঠে যায় সবার আগে। তারা হোটেল রুম ঠিক করে। তারপরের স্মৃতি খানিকটা বেদনাদায়ক! আমার শুধু মনে পড়ে, শেরপা লজের ডরমেটরি রুমে ঢুকে কামরুল সবার আগে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পড়ে। সুজন ভাইয়ের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে বলে তিনিও লেপের নিচে। মাজেদও কোনোরকম কথা ছাড়াই গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। পানি শূন্যতার সমস্যায় প্রচন্ড যন্ত্রণার ভেতর অস্থিও হয়ে ওঠে রিমঝিম। রুমের ভেতর জোনায়েদ ভাইয়ের অস্থির পায়চারি। একটু পর পর মৃদু ঝাড়ি, ‘আপনাদের বারবার বলেছিলাম, একটু পর পর পানি খাবেন। পিপাসা না পেলেও পানি খাবেন।’ রিয়াদ পাশের হোটেলে খাবারের মেনু ঠিক করতে গেছে। আমার গা গোলানো অনুভূতি, তীব্র মাথাব্যথা আরো বাড়ে। বিছানায় বসে পড়ি। জোনায়েদ ভাই বুঝতে পেরে সামনে এসে যেই আমার ব্যথা উপশমের জন্য কপালের দুই পাশে আঙ্গুল দিয়ে চাপ দেন, ম্যাসেজ করার চেষ্টা করেন অমনি আমার দু’চোখ বেয়ে ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়তে থাকে পানি। আশ্চর্য, আমার তখন কেবলই মনে পড়ে, আমাকে লেখা আশির সর্বশেষ ম্যাসেজের কথা। ‘ট্র্যাকিং মানে কী আমি জানি না, তবে এটা বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে জানি যে, দুর্গমতা জয় করা মানে, নিজের ভেতর আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হওয়া।’ আমি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। মানে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় ভয়ংকর বরফ পানিতে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে ঢুকলাম। আবারও সেই ছুরি দিয়ে হাত ফালি করার অনুভূতি! ধারণা করতে পারি, জোনায়েদ ভাই খুব অসহায়বোধ করছিলেন। আমাদের প্রায় পুরো টিম বিপর্যস্ত। উনি অসুস্থ বোধ করলেও প্রকাশ করতে পারছিলেন না।
সন্ধ্যা পেরুলেও আমার উচ্চতাজনিত সমস্যা কিছুতেই কাটে না। জোনায়েদ ভাই, রিয়াদসহ রুম থেকে বেরিয়ে কফি খেতে যাই। বাকিরা বিছানায় শুয়ে। তাদের নড়চড়ের ক্ষমতা নেই। কফি খেয়েও গা গোলানো থামে না। এরপর কয়েক দফা বমি আমাকে প্রায় কাহিল করে তোলে।
ট্রেকিংয়ে আসা লোকজনসহ স্থানীয়রা বিভিন্ন পরামর্শ দিলেন। বেশি তরল গ্রহণ, এই ওষুধ, সেই ওষুধ খাওয়ার। সবটাই নিই আমি, সেরে উঠার সুনিশ্চিত আশায়। যেই কি সেই, কমে না। তবে এক বাটি গরম কর্ণ স্যুপ খাওয়ার পর মনে হলো একটু যেন স্বস্তি পেলাম। এবার শুরু হলো জমে যাওয়ার অনুভূতি, তীব্র মাথাব্যথা। রিয়াদ ছুটে যায় আমার জন্য হট ওয়াটার ব্যাগ ম্যানেজ করতে। ব্যাগ আসতে দেরি দেখে আমি নিজেই চলে যাই দোতলার নেপালি রান্নাঘরে। দেখি সেখানে তখন হুলস্থূল ব্যস্ততা। কেউ নুডুলস, কেউ সবজি, চিকেন রান্নায় মগ্ন। পাশে একজন কয়লার চুল্লিতে তাপ নিচ্ছেন আর চা কিংবা পানি গরম করছেন। অনুমতি নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে ঠিক দাঁড়িয়ে পড়ি চুল্লির সামনে। আমার কাহিল অবস্থা টের পেয়ে নেপালি মহিলা একটা কাঠের টুল ঠেলে দিলেন আমাকে, বসার জন্য। তিনি পুড়িয়ে ভুট্টা খাচ্ছিলেন। খেতে দিলেন সেখান থেকেও। আধা হিন্দি-আধা ইংরেজিতে তার সাথে আলাপ জমাই। আমার রান্নাঘরে অবস্থান ওদের কাজে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে ওরা সেটা অল্পস্বল্প বুঝিয়েও দিচ্ছে। আমি হেসে বললাম, ‘তোমরা আমাকে ওয়াটার ব্যাগ দাও, ওটা পেলেই রুমে চলে যাচ্ছি।’ চুল্লিতে তাপ নেয়া বৃদ্ধাও দেখি আমাকে সমর্থন দেন। তিনি গরম গরম আরো ভুট্টা তুলে দেন আমার হাতের তালুতে। এমন চরম সংকটে ভালোবাসার উষ্ণতা টের পাই সেই ভিনদেশী নারীর কাছে। এরইমধ্যে জড়োসড়ো রিমঝিম এসে দাঁড়ায় আগুনের পাশে। তাকেও ভুট্টা খেতে দিই। আমার ওয়াটার ব্যাগ রেডি হলে সেটা নিয়ে রুমে ফিরি রিমঝিমকে রেখেই। একটু পর রুমে ফিরে আসে রিমঝিমও। তাকে হট ওয়াটার ব্যাগ নিতে ওরা নাকি চাপ দিচ্ছিল। এক ব্যাগ হট ওয়াটার ৪০০ রুপি! রিমঝিম হট ব্যাগ ছাড়াই শুয়ে পড়ে। আমি ব্যাগসহ লেপের নিচে।
এরমধ্যে রিয়াদ আর জোনায়েদ ভাইয়ের আলাপ কানে আসে। আমাদের উচ্চতাজনিত সমস্যা না কাটলে গাড়িতে চড়ে নিচে ফেরত যেতে হবে। রিমঝিম সাথে সাথেই বলে উঠে , ‘সকাল হতে হতে আমাদের সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে।’ আমি কোনো কথা বলার পরিস্থিতিতে নেই। মাথা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। আর ভেতরটা মনে হচ্ছে উল্টেপাল্টে যাচ্ছে ক্রমাগত। অন্যদের মুখেও কোনো কথা নেই। নড়াচড়া করলেই সুজন ভাইয়ের শ্বাস বন্ধ হওয়ার অনুভূতি। এরই মধ্যে আবার রাতের খাবারের সময় চলে আসে। এজন্য যেতে হয় পাশের আরেকটি হোটেলে। রিয়াদ ইয়াকের মাংস অর্ডার দিয়ে এসেছে। সান্দাকফুর ২ ডিগ্রি তাপমাত্রায় আমার কাছে থাকা সমস্ত প্রটেকশন নিয়েও তখন আমি রীতিমতো কাঁপছি। বুকের সাথে হট ব্যাগ চেপে রেখে কোনোমতে খেতে যাই। ইয়াকের মাংস খাবো ভেবে একটু রোমাঞ্চ আনার চেষ্টাও করি সবার সাথে। রোমাঞ্চ ঠিক আসে না! শেষ পর্যন্ত ইয়াকের মাংসও আমরা পাইনি। কি এক কারণে ইয়াক সে-রাতে হোটেলে পৌঁছেনি। মুরগির মাংস, ডিম, খিচুড়ি, পাপড় আরো কী কী সব! কোনোটাই চোখ মেলে তাকাতে পারছি না। কোনোমতে অল্প মুখে দিয়ে রুমে চলে আসি। তখন হোটেলের করিডোরে কয়লার চুল্লিকে ঘিরে বসেছে নানান বিদেশি বন্ধুর জটলা। চলছে আলাপ-পরিচয়। কত আশ্চর্য রঙের গল্প ভেসে আসছিল কানে। ২ ডিগ্রি তাপমাত্রাও যেন কথার তোড়ে উষ্ণ হয়ে উঠছিল! কিন্তু শরীর আমাকে থামতে দিলো না। আগের ওয়াটার ব্যাগ পাল্টে আরো দুটো ব্যাগ নিয়ে সোজা শুয়ে পড়ি। ঘুম আসে না। একটা ব্যাগ দিয়ে কীভাবে যেন অল্প অল্প পানি গড়িয়ে পড়ে। আমার জামা খানিক ভিজে যায়। খুব সাবধানে পায়ে আর বুকে দুই ওয়াটার ব্যাগ চেপে রেখে চোখ বন্ধ করি। আর মনে মনে অসহায় প্রার্থনা করি, যেন আমাদের নিচে ফেরত যেতে না হয়!
ভোর পাঁচটায় উঠে জোনায়েদ ভাই কাঞ্চনজঙ্ঘার ভিউ পয়েন্টে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। সাথে রিয়াদ, কামরুল, মাজেদ। সুজন ভাই বিছানা থেকে নড়লেই শ্বাসের সমস্যা। তিনি যাবেন না। রিমঝিম বিছানা থেকে উঠে পায়ে কেডস গলিয়ে বলে, ‘আমি যাবো!’ জোনায়েদ ভাই তাতে রাজি না। বললেন, ‘আপনারা তিনজন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখবেন।’ শেষ পর্যন্ত ওরা পাঁচজনই ভিউ পয়েন্টের দিকে চলে যায়। আমি ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াই। সুজন ভাই ঘুম। বাইরে তখনো ইতস্তত অন্ধকার। হু হু করে ভেসে আসে হাঁড় কাপানো হিমেল হাওয়া। দেখি আকৃতি, জ্যাকবসহ তার বন্ধুরা দাঁড়িয়ে, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখবে বলে। জানতে চাইল, ‘তোমার বন্ধুরা কই?’ বললাম, ‘ওরা ভিউ পয়েন্টে গেছে।’ সেটা কতদূর, কোনদিকে জানতে চাইলাম। আমি মনে মনে যাওয়ার বাসনা পুষে রেখেছি সেকথা আকৃতি টের পেয়ে ব্যালকনির এক কিনারে নিয়ে গেল আমাকে। অদূরের একটি উঁচু টিলার দিকে হাত দিয়ে দেখাল ভিউ পয়েন্ট। ততক্ষণে আকাশে অল্প অল্প আলো ফুটতে শুরু করেছে। মাজেদের ফিরোজা রঙের উইনচিটার দেখতে পেয়ে বুঝলাম তারা সেখানেই আছে। আকৃতি বলল, ‘চলো তোমাকে ভিউ পয়েন্টে নিয়ে যাই।’ আমি ভীষণ উৎফুল্ল হয়ে আকৃতির পেছন পেছন ছুটি। হঠাৎ দেখি রিমঝিম সামনে দাঁড়িয়ে। ভিউ পয়েন্ট থেকে ফেরত এসেছে সে। বলল, ‘অনেক খাড়া আর অন্ধকার রাস্তা।’ ভিউ পয়েন্টে না গিয়ে আমরা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আড্ডা জমাই। আকৃতি নেপালের একটি স্কুলে সবে ক্লাস নাইনে পড়ছে। তাকে বলি, ‘আকৃতি মানে শেপ? শব্দটা বাংলায়ও ব্যবহৃত হয়।’ সে অবাক হয়ে বলে এটাতো নেপালি শব্দ! ‘আকৃতি মানে ইমেজ।’ আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘শিউলি মানে কি?’ রিমঝিম ব্যাখ্যা দেয়। শিউলি ফুল চিনিয়েই ছাড়ে আকৃতিকে! আমার একাডেমিক পড়াশোনা পাঁচ বছর আগেই শেষ শুনে আকৃতি চোখ গোল গোল করে তাকায়, হাসে। মুখে কিছু বলে না। এরই মধ্যে ফেনিল মেঘ ও কুয়াশার বুক চিরে আকাশে রাঙ্গা আবির ছড়িয়ে সূর্য উঠতে শুরু করলে আকৃতিদের গ্রুপটা উল্লাস করতে শুরু করে।

কিছুক্ষণের ভেতরেই সান্দাকফুর চূড়া ভরে ওঠে অলৌকিক আলোয়! কিন্তু মেঘের দেয়াল ভেদ করে কাঞ্চনজঙ্গা তখনো ঠিক যেন পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারছে না। বহু পর্যটক বিভিন্ন পাহাড়ের চূড়ায়, টিলায়, ভবনের ছাদে, গাছের উপর বসে অধীর অপেক্ষায়। কখন জেগে উঠবে এভারেস্ট, কাঞ্জনজঙ্গা, লোৎসে, মাকালু! অবশেষে শ্বেত মাখনের মতো মেঘপুঞ্জ আলতো সরিয়ে ঝলমল করে হেসে ওঠে স্বপ্নকুমাররূপী অপরূপ কাঞ্চনজঙ্গা! দেখা দেয় বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে লোৎসে, মাকালু। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে হিমালয়ের পুরো রেঞ্জ। ম্যাপ দেখে দেখে রৌদ্রজ্জ্বোল আকাশে আমরা খুঁজে বের করি কুম্ভকর্ণ, থ্রি সিস্টার্স, পান্দিমের চূড়া। সূর্যের সোনাঝরা আলোয় জেগে উঠে শুয়ে থাকা ধ্যানী বুদ্ধ! বিস্ময়ের ঘোর লাগে আমাদের চোখে! ততক্ষণে ভিউ পয়েন্ট থেকে বাকিরাও চলে আসে হোটেলের সীমানায়। সূর্যের আলো বাড়তেই দেখা যায় হরেক রঙের গাছপালা, ঝোঁপঝাড়, গুল্মের উপর হালকা বরফের শুভ্র, মায়াবী আচ্ছাদন। নতুন ভোরের আলো লেগে চিকচিক করে সেসব তুষারকণা! বরফ পড়া দেখার, স্পর্শ করার বহুদিনের অবদমিত ইচ্ছে সুজন ভাইয়ের। তার কিছুটা হলেও ইচ্ছেপূরণ হলো বলে অন্যরা সুজন ভাইকে নিয়ে হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠে। কেউ হোটেলের দেয়ালে লেগে থাকা বরফ খসিয়ে তুলে দেয় সুজন ভাইয়ের হাতে। অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্যে আমরা তখন ভুলে যাই গতরাতের দুর্বিষহ স্মৃতি! কিছুক্ষণের মধ্যেই সান্দাকফুর পুরো আকাশ মেঘে ঢাকা পড়ে। হারিয়ে যায় হিমালয় রেঞ্জের উজ্জ্বল আলোকধারা। সকাল ৮টা বাজতেই সূর্য গায়েব! এর মধ্যে তৃতীয়দিনের ট্রেকিং শুরু করতে গাইড এসে হাজির।
আমরা নাস্তা সারতে দ্রুত হোটেলে ঢুকি। সুজন ভাইয়ের শ্বাসের সমস্যা তখনো বহাল। আমি টের পাই আমার ভেতরটা উল্টেপাল্টে যাচ্ছে আবারো। সেইসাথে তীব্র মাথাব্যথা বাড়তে থাকে। কোনোমতে নাস্তা সেরে রুমে পৌঁছার আগেই হোটেল লবি পেরিয়ে আবারো কয়েক দফা বমি! প্রায় নির্জীব হয়ে পড়ি আমি!

x