রোজার মাসে প্রার্থনা

শনিবার , ২৬ মে, ২০১৮ at ৪:০৭ পূর্বাহ্ণ
23

আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস এই রমজান মাস। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে ক্রোধ লালসা, হিংসা দ্বেষ অন্যায়, অসত্য, অকল্যাণ, অমানবিকতা ইত্যাদি কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা। বেশ ভালোই বলতে হয় বর্ষার আবহে সিয়াম সাধনার কয়েকটি দিন পার করছি। শান্ত প্রকৃতি, কাহিল লাগছে না মোটেও। যত অশান্তির মূল খবরের কাগজ। না পড়ে থাকতে পারলে সব ঝামেলা চুকে যেতো। মাথার ভেতর কটমট করতো না। তার চেয়ে শুয়ে বসে চোখ বন্ধ করে রবীন্দ্র সঙ্গীত শোনার তুলনা হয় না।

আমার পরানে আজি, যে বাণী উঠিছে বাজি

অবিরাম বর্ষণ ধারে

কারণ শুধায়ো না, অর্থ নাহি তার সুরের সংকেত জাগে পুঞ্জিত বেদনার।

চোখ বন্ধ করলেই কি প্রলয় বন্ধ হয়? অক্টোপাসের মত আকড়ে ধরে অনাকাঙিক্ষত যত খবর। মানুষের লোভ লালসা, নিষ্ঠুরতায় শুধু মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। হচ্ছে সম্ভ্রান্ত মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানও। এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হবে না কারণ নারীঘটিত কেলেঙ্কারি। শ্লীলতাহানি! কেন? কীভাবে যারা উৎসাহী তারা অন্তর্জালে দেখে নেবেন। এত অনিয়ম, এত নিষ্ঠুরতা, এত ধর্ষণ এত মৃত্যু যেন থামার নয়। সিরিয়া থেকে শুরু করে মিয়ানমার। ভূলুণ্ঠিত মানবতায় আমরা অভ্যস্ত। অত দূরে না গিয়েও আমার চারপাশটায়, আমার দেশটার দিকে তাকালে হতাশায় ডুবে যেতে হয়। জগতের কোন নিষ্ঠুতার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, কোনো খুনখারাবির সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই! তবুও কেন আমার ভেতরটায় এত তোলপাড়! আমার বুকের ভেতর এত হাহাকার! আজকের দৈনিক আজাদীতে প্রথম পাতায় দুই ইঞ্চি দূরত্বের পাশাপাশি দুটি খবর। প্রথম দিনই জমজমাট ইফতারের বাজার, বৃষ্টির বাধা উপেক্ষা করে ক্রেতার ঢল। পাশের খবর ঘরে দুই বান্ধবীর লাশ, মুখে বিষ, গলায় ফাঁস, সুকলতি ত্রিপুরা (১৫), ছবি রানী ত্রিপুরা (১৪)। পরিবারের দাবি প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় হত্যা। এখনও স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি সী বিচে পড়ে থাকা তাসফিয়ার নিষ্পাপ সুন্দর মুখটি। বিষাদে ভরে যায় মনটা প্রেম কি, ভালোবাসা কি? প্রেমের সাথে ধর্ষণমৃত্যুখুন মিশে যায় কীভাবে? এত ধৈর্য্যহীন, এত বন্ধনহীন কেন হয়ে পড়ছি আমরা? এ প্রশ্নের জবাব কার কাছে? আমাদের গন্তব্য কোথায়? কেন এমন হচ্ছে? নাকি অবাধ তথ্য পরিবেশনের এ যুগে তথ্য পাওয়া সহজ হয়েছে বলে বহুকাল ধরে চলে আসা এই ব্যাধিকে হঠাৎ ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে! এই বছর শাজনীন হত্যা মামলার আসামীকে ফাঁসির রায় দেওয়া হয় ঘটনার দীর্ঘ ১৯ বছর পর। এসব অপরাধগুলোর গুরুত্ব পাচ্ছে না তা এই রায়ের দীর্ঘ সময় থেকে বোঝা স্পষ্ট। পরিসংখ্যান বলছে অপ্রতিরোধ্যভাবে এসব অপরাধগুলো বেড়েই চলেছে। আমরা অনেকটা অভ্যস্থ হয়ে পড়েছি। নারী ও শিশুর জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে চারপাশ! প্রথম আলোর অনুসন্ধানে এসেছে শুধু রাজধানীতে নারী নির্যাতনের ঘটনার বিচারে আসামীদের সাজা হচ্ছে ৩ শতাংশ। অব্যাহতি ৪১ শতাংশ, খালাস ৫৫ শতাংশ এবং নিষ্পত্তি এক শতাংশ।

হতাশার সাথে আরো হতাশা যোগ হয়। কেউ অর্থের কাছে, কেউ লজ্জার কাছে কেউ দাপটের কাছে হেরে যায়, সরে যায় এই সরে যাওয়ার ফাঁকা জায়গায় আবারো চলে ঘটনার পুনরাবৃত্তি। বাংলাদেশে প্রতি ঘণ্টায় একজন করে নারী অথবা শিশু ধর্ষিত হয়! আমরা নির্বিকার। মধ্যম আয়ের দেশের রূপান্তর হচ্ছি। জিডিপি বাড়ছে ম্যাজিক হারে। আমাদের খুশির অন্ত নেই। এই সিয়াম সাধনার মাসে এই রোজার মাসে হাজার কোটি টাকার কেনাবেচা হবে। উৎসবমুখর বিপণীগুলো আলোয় ঝলমল করবে। আলো ঝলমলে জায়গায়ও ফাঁদ পাতা থাকবে নারীর জন্য। কিছু জানা যাবে কিছু অজানা থেকে যাবে।

চোখের সামনে ভেসে ওঠে ত্রিপুরা পাড়ার দুই কিশোরীর নিষ্পাপ মুখ সুকলিত ত্রিপুরা ও ছবি রানী ত্রিপুরা। স্মৃতি ভেসে বেড়ায় তাসফিয়ার সুন্দর শিশু মুখটা। হত্যা না আত্মহত্যা এভাবেই শুরু হয় এক সময় থমকে যায় সব প্রশ্ন। বলছি না শুধু বাংলাদেশেই সব অঘটন ঘটছে। নারীর কোনো দেশ নেই। সবখানেই নারী একইভাবে না হোক নির্যাতিত, নিপীড়িত ধর্ষিত ও খুনের শিকার হচ্ছে। সারাবিশ্ব জুড়েই অস্বস্তি আর অশান্তির ডামাঢোল। এই রোজার মাসে প্রার্থনা করি হে প্রভু মানুষের মানবিক বোধগুলো ফিরিয়ে দাও।

x