রোখসানা চৌধুরী ও অ্যাবি ওয়ামব্যাকের গল্প

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ২৯ জুন, ২০১৯ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ
11

আমাদের অনেক অপারগতার দায় আমরা সময়ের উপর চাপিয়ে দিই। অথচ সময় চলে নিজের নিয়মে, নিজের পথে, নিজের মতো। জীবন যখন হাজারটা কাজের যোগফল এবং সংসারে যখন দু’চারটি বড় কাজের সঙ্গে অগণ্য-অসংখ্য তুচ্ছ কাজও করতেই হয় তখন সময়কে সমীহ না করে সময় বের করার উপায় নেই। সাধারণত অর্থমূল্যে বা স্বার্থমূল্যে বিকোয় না এমন কাজের জন্যই আমরা সময় পাই না। অনেক অনেক উচ্চশিক্ষিত গণ্যমান্য নারীকে বলতে শুনি খবরের কাগজের ভাঁজ খোলার সময়টুকু পান না। অর্থাৎ পড়ার সময় পান না। প্রায় দেড়শ বছর আগে (১০ বছর বাকি এখনও) দিনের আলোয় সম্ভব ছিল না বলে গভীর রাতে মোম জ্বালিয়ে ভাইয়ের কাছে লেখাপড়া শিখেছেন রোকেয়া। উচ্চ শিক্ষিত, উচ্চপদস্থ এবং বিদ্যানুরাগী বলেই শুধু নয়, তাঁর লেখাপড়ায় উৎসাহী ছিলেন বলেই তিনি দোজবরে, অবাঙালি এবং নিজের দ্বিগুণেরও বেশি বয়সী স্বামীর ঘর করেছিলেন। শুধু তাই নয়, এ উপমহাদেশের প্রথম নারীবাদী তিনি যিনি নারীকে পুরুষের সমকক্ষতায় এবং মানুষের মর্যাদায় দেখতে চেয়েছেন। সুন্দর, রুচিস্নিগ্ধ জীবন চেয়েছেন নারীর জন্য। ডিসেম্বর ছাড়া তাঁকে মনে পড়ার বা মনে করার কারণ তো নেই। কিন্তু মনে করিয়ে দিলেন রোখসানা চৌধুরী। ‘আমার রোকেয়া, আমিই রোকেয়া’ শিরোনামে তাঁর একটি লেখা (কালের খেয়া ১৪ জুন ২০১৯) আমাদের আজকের ‘গল্প নয়’ এর প্রেরণা।
পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণা করতে গিয়ে নারীবাদ বিষয়টিতে মন যায় রোখসানা চৌধুরীর। তার কারণ তিনি দেখেছেন একশ বছর আগে এ দেশে রোকেয়ার মতো এক নারী নারীকে জাতি-রাষ্ট্রের অবধারিত অংশ হিসেবে গণ্য করেছিলেন এবং তার কর্ম-পরিবেশের সুষ্ঠু ধারণা দিয়েছিলেন। তাঁর গ্রন্থে তিনি নারীর নিরাপত্তা ও যৌন হয়রানিমূলক ঘটনা হ্রাসের যুক্তিসাপেক্ষে নারীর বিয়ের বয়স করেছিলেন ন্যূনতম ২১ বছর। অথচ শতাধিক বছর পরে আজ এই বাংলাদেশেই প্রতিমাসে শতাধিক ধর্ষণের (নথিবদ্ধ) ঘটনা ঘটছে অথচ পর্দা-হিজাব, বোরকা-নেকাব ব্যবহারে দেশ এগিয়েছে বহুদূর। এদেশে বাল্য বিবাহ বন্ধ তো হয়ইনি বিয়ের বয়সও ১৮ থেকে ১৬ য় নামিয়ে প্রকারান্তরে বাল্য বিবাহকে আইনী করে তোলা হয়েছে।
বছর দশেক আগে তাঁর মুখে (রোখসানা চৌধুরীর) ‘নারীবাদ’ শব্দটি শুনে বড় বড় রথী-মহারথীদের মুখব্যাদানপূর্বক যে মৃদুহাস্য এবং তীর্যক ভাষ্য তিনি উপহার পেয়েছিলেন, রোখসানা বলেন আজ তা বেড়েছে শতগুণ। তাঁর প্রস্তাবিত সিনোপসিসটি ফেরত এসেছিল শিরোনামে রোকেয়ার নাম নিয়ে আপত্তির কারণে। জন্মের পরে তাঁর পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল রুকাইয়া খাতুন। নিজে তিনি মিসেস আর এস হোসেন নামে লেখালেখি করতেন। পরবর্তী সময়ে বেগম রোকেয়া ব্যবহৃত হয়েছে। একাডেমিকভাবে গৃহীত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নামের আগেও কখনও কখনও বেগমের উৎপাত হয়েছে। অনেক ভেবেচিন্তে তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষকের সঙ্গে পরামর্শ করে তাঁর সম্মতিসাপেক্ষে রোকেয়া নামটি তিনি দিয়েছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক (রোখসানার ভাষ্যে) রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নামটিই গৃহীত হয়।
রোখসানা চৌধুরীর এই লেখাটি আমাদের নারী-চিন্তক-ভাবুক-লেখক-তাত্ত্বিক এবং নারী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত সকলের অবশ্য পাঠ্য তো বটেই, ‘নারীবাদ’ যাঁদের হাসি-তামাশার বিষয়, নারীর মেধা ও কর্মযজ্ঞের প্রতি যাঁদের ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ নেই তাঁরাও এটি পড়ে উপকৃত হবেন। এই লেখাটির শেষ অংশটুকুর তুলনা হয় না। গবেষণার কাজটি সম্পূর্ণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের অনুমোদন সাপেক্ষে রোখসানা ৩ বছরের ছুটি পেয়েছেন। কিন্তু তিনি জানাচ্ছেন পারিবারিক দায়িত্ব থেকে তাঁর একদিনের ছুটিও মেলেনি। আর তখনই তিনি রোকেয়াকে মনে-প্রাণে ধারণ করতে পেরেছেন। রোখসানার ভাষ্যে, ‘আমি রোকেয়া হয়ে উঠেছি যখন গভীর রাতে সব দায়িত্ব পালন শেষে লণ্ঠন জ্বালিয়ে গোপনে সরস্বতীকে আহ্বান করেছি।’
আমাদের দ্বিতীয় গল্পটির বক্তা অ্যাবি ওয়ামব্যাক। অলিম্পিকে দুবার স্বর্ণপদক জয়ী এক মার্কিন ফুটবলার ও কোচ এই নারী ২০১৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ মানুষের তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন। ২০১৮ য় যুক্তরাষ্ট্রের বার্নার্ড কলেজের সমাবর্তন উৎসবে ৬১৯ জন নারী গ্র্যাজুয়েটের উদ্দেশ্যে তাঁর দেওয়া ভাষণটির (টাইমস ডটকম থেকে শাহরোজা নাহরিনের অনুবাদ; ২৩ জুন প্রথম আলোয় প্রকাশিত) কিছু অংশ শোনাবো আপনাদের।
রূপকথার গল্প থেকেই জীবনের পাঠগ্রহণ শুরু তাঁরও, অন্য অনেক মেয়ের মতো। বনের ভিতর দিয়ে চলেছে লাল টুকটুকে মেয়েটি। সাবধানে পথ চলার জন্য তাকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। ঘোমটায় মুখ ঢেকে পথ চলবে, কারও সঙ্গে কথা বলবে না। কিন্তু অদম্য কৌতূহল তাকে সতর্কবাণী ভুলিয়ে দিল; সে পড়ে গেল নেকড়ের কবলে। গল্পটি অ্যাবি ওয়ামব্যাকের জীবনে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। তাঁর অনেক ভয় ছিল। পথচ্যুত হবার ভয়। দলচ্যুত হবার ভয়। পদোন্নতির সুযোগ না পাবার ভয়। ছিল বেতন হারাবার শঙ্কা। এই ভয়গুলো ছিল তাঁর পথের নেকড়ে। বার্নার্ড কলেজের মেয়েদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, আজ যদি অতীত ফিরে পেতাম, বলতাম, ‘অ্যাবি, তুমি কিন্তু সেই লাল টুকটুকে মিষ্টি মেয়েটি নও, তুমিই আসল নেকড়ে।’ তিনি সমাবর্তনে উপস্থিত মেয়েদের প্রত্যেককে নেকড়ে হবার আহ্বান জানালেন। কিন্তু কেন? কি হয় নেকড়ে হলে? কেন নেকড়ে হতে হবে? অ্যাবি ওদের গল্প শোনালেন। ১৯১৫ সালের তরতাজা গল্প।
ইয়েলোস্টন ন্যাশনাল পার্কে হরিণের সংখ্যা এতটাই বেড়ে গেল যে পার্কের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ে। ঘাস নেই, গাছ-গাছালি নেই। বনাঞ্চল সাবাড় হয়ে যাওয়ায় নদী ভাঙন ত্বরান্বিত হলো। পার্ক বাঁচাতে কর্তৃপক্ষ নেকড়ের যোগান দিতে বাধ্য হলো। অচিরেই হরিণেরা উধাও। গাছ-গাছালি, পাখ-পাখালিতে ভরে উঠলো পার্ক। নদীর প্রাণীই নদীতে প্রাকৃতিক বাঁধ দিয়ে দিল। দলে দলে হাঁস জুটলো। জুটলো ভোঁদড়ের দল। নেকড়েই বদলে দিলো সব। মুক্তির বাণী নিয়ে এল নেকড়ে। এই সমাজে নারীকে নেকড়ের মতো হুমকির চোখে দেখা হয়। কিন্তু নেকড়েরাও বদলে দিতে পারে, স্বস্তি এনে দিতে পারে। অ্যাবি বলেছেন, শুধু এক হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ।
কিন্তু একজন সফল নারীর মুখ থেকে এমন গল্প কেন শুনতে হবে? সে কথা, তিনি শুরুতেই বলেছেন। আমরা আমাদের গল্পের খাতিরে এখন শোনাচ্ছি। অবসর নেবার পরে ইএসপিএন একটি জমকালো অনুষ্ঠানে আরও দুজন পুরুষ ফুটবলারের সঙ্গে তাকে বিদায় সংবর্ধনা দেয়, পুরস্কৃত করে। তিনি সেখানে আইকনের মর্যাদা পেলেন। প্রচুর হাততালি, প্রচুর ভক্ত। উচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভাসলেন অ্যাবি। কিন্তু এক সময় ঘোর কাটে তাঁর। সংবর্ধিত সতীর্থ দুই খেলোয়াড়ের সামনে নিশ্চিন্ত, নির্ভার জীবন। কারণ তাদের ব্যাংকে শত কোটি টাকার সঞ্চয়। কিন্তু অ্যাবি? তাঁর ভাবনার জীবন মাত্র শুরু হলো। ভেবে দেখলেন সারাটা জীবন জুড়ে, পুরোটা ক্যারিয়ারে তিনি কেবল কৃতজ্ঞই রইলেন। গুটিকর নারীর মধ্যে আমি একজন হয়েছি, হতে পেরেছি। পুরুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি। কৃতজ্ঞতায় এতটাই ডুবে ছিলাম যে বহুবার অধিকার আদায়ের সুযোগ পেয়েও সে সুযোগ হাতছাড়া করেছি।
মেয়েদের উদ্দেশ্যে তাঁর বক্তৃতায় তিনি ৪টি কথা বলেছেন।
এক. ব্যর্থতাকে সাফল্যের জ্বালানি হিসেবে দেখ। দুই. নিজ নিজ অবস্থান থেকে নেতৃত্ব দিতে শেখো। তিন. সবাইকে নিয়ে এগোও।… একে অন্যের সাফল্যে অভিনন্দন জানাও। নিজেদের অবস্থান থেকে আওয়াজ তোলো। চার. জগতে নিজের জায়গা নিজেকেই করে নিতে হবে। বললেন, হে আমার নেকড়ের দল, তোমরা জেনে রাখো, সময় হয়েছে নিজেদের বল (ফুটবল) নিজেরাই চেয়ে নেওয়ার। তোমাদের চেয়ে নিতে হবে চাকরির সুযোগ। পদোন্নতির আহ্বান। মাইক্রোফোন। অফিসের বড় পদ। মর্যাদা। নিজের জন্য। সব নারীর জন্য।
(প্রিয় পাঠক, আমাদের নিশ্চয়ই মনে পড়ে যাচ্ছে কলসিন্দুরের ফুটবলের মেয়েদের কথা। বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৯ আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপ ফুটবলে ওদের সাফল্যের কথা। শুধু তাই নয় মনে পড়ছে নারী ক্রিকেট দলের এশিয়া কাপ জয়ের কথা। ওদের দ্বিপক্ষীয় টি-২০ সিরিজ জয়ের কথা এবং দুঃখের সঙ্গে নিশ্চয়ই মনে পড়ছে ওদের পাওনাগণ্ডার কথা।)
শেষকথা: গত ২১ শে জুন (২০১৯) কোলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবী বিদ্যা চর্চা কেন্দ্র আয়োজিত একক বক্তৃতায় আমাদের মালেকা বেগম (সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, লেখক এবং বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের পথিকৃৎদের একজন) নারীর অধিকার রক্ষায় নারী আন্দোলনকে আরও বেগবান করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নারীর অধিকার রক্ষায় আন্দোলনের বিকল্প নেই।

x