রোকেয়ার সেই ‘মহাযুদ্ধ’ এখনো চলছে…

নীপা দেব

শনিবার , ৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৫:৪১ পূর্বাহ্ণ
17

সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও বাড়িতে বড় ভাইদের সহায়তায় পড়ালেখার সুযোগ লাভ করেন বেগম রোকেয়া। শুধু তাই নয়, সাহিত্য চর্চা করার যথেষ্ঠ উপযুক্ত পরিবেশও বেগম রোকেয়া ছোটবেলা থেকেই পেয়েছিলেন। আর তাই- সামাজিক পশ্চাৎপদতা আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, নারী সমাজের বহুমাত্রিক অধিকার আদায় ও নারী শিক্ষার পথ নির্দেশক হতে পেরেছিলেন তিনি।

“আমরা সমাজের অর্ধাঙ্গ, আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কীরূপ? কোনো ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খোঁড়াইয়া-খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা আমাদের লক্ষ্য তাহাই।” -বেগম রোকেয়া

পুরুষশাসিত এই সমাজ ব্যবস্থায় বেশিরভাগ পরিবারে এখনও যখন একটা শিশু জন্মলগ্নের শুরু থেকেই লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হয়ে থাকে। জন্মের পর-পরই লিঙ্গভেদে শিশুটির বেড়ে উঠার প্রতিটা পদক্ষেপে চাপিয়ে দেওয়া হয় সমাজের নানারকম নিয়ম-কানুন। তার হাতে-পায়ে সুকৌশলে পরিয়ে দেওয়া হয় লিঙ্গবৈষম্যের কঠিন শিকল। যে শিশু মেয়ে অর্থাৎ নারী হয়ে জন্ম নেয়; সেই শিশুটির চাল-চলনে, আচার-আচরণে, হাসি-ঠাট্টায়, চিন্তায় সর্বক্ষণ পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ লাগাম পরিয়ে দেয়। তাকে টিপ পরিয়ে, পুতুল খেলিয়ে প্রমাণ করা হয়, সে নারী। ইচ্ছে করলেই সে পুরুষের মতো বেড়ে উঠতে পারবে না। ছেলে শিশুর মতো জোরে কথা বলতে তাকে বারণ করা হয়। তার পোষাক ভিন্ন, খেলনাও ভিন্ন।
বাঙালি মুসলমান সমাজের এই যে নারী-পুরুষের অসঙ্গতি- এর বিরুদ্ধে প্রথম যাঁর কলম সবচেয়ে বেশি সোচ্চার আওয়াজ তুলেছিলো তিনি-ই ছিলেন বেগম রোকেয়া। নারী স্বাধীনতার পক্ষে তাই প্রথম প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরও বেগম রোকেয়াকেই আমরা গণ্য করতে পারি। তিনি বাঙালি মুসলমানদের নব জাগরণের সূচনালগ্নে নারী শিক্ষা ও নারী জাগরণে নেতৃত্ব দেন। উত্তরকালে সকল নারীবাদী সেই দেখানো পথই অনুসরণ করে কেবল সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
আগামীকাল ৯ ডিসেম্বর সেই সাহিত্যিক, শিক্ষানুরাগী, সমাজ-সংস্কারক বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী। ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার পায়রাবন্দ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মৃত্যুবরণ করেন ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায়।
সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও বাড়িতে বড় ভাইদের সহায়তায় পড়ালেখার সুযোগ লাভ করেন বেগম রোকেয়া। শুধু তাই নয়, সাহিত্য চর্চা করার যথেষ্ঠ উপযুক্ত পরিবেশও বেগম রোকেয়া ছোটবেলা থেকেই পেয়েছিলেন। আর তাই- সামাজিক পশ্চাৎপদতা আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, নারী সমাজের বহুমাত্রিক অধিকার আদায় ও নারী শিক্ষার পথ নির্দেশক হতে পেরেছিলেন তিনি।
১৮৯৭ সালে বিহারের ভাগলপুরের এক খানদানি ক্ষয়িষ্ণু মুসলিম পরিবারের কীর্তিমান ও মহাত্মা পুরুষ সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেন রোকেয়ার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সাখাওয়াৎ হোসেন ছিলেন নিজের যোগ্যতা ও গুণেই সমাজে পরিচিত হওয়ার মতো মানুষ। তাঁর কর্মজীবন ছিলো নানা বৈচিত্র্যে মণ্ডিত। সাখাওয়াতের পত্নীপ্রেমও ছিলো প্রগাঢ়। বেগম রোকেয়ার স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য তিনি সম্ভাব্য সব কিছুই করেছিলেন। বিশেষ করে রোকেয়ার মনের গঠন, শিক্ষা ও সাহিত্য চর্চায় স্বামীর ভূমিকার কথা বিশেষভাবে স্মরণ করতেই হয়। স্বামীর যত্নে তিনি ভালো ইংরেজি শিখেছিলেন। রোকেয়ার ভেতরে যে সুপ্তপ্রতিভা ছিলো তার আবিষ্কার ও তা প্রকাশেও স্বামী সাখাওয়াৎ হোসেনের যথেষ্ঠ ভূমিকা ছিল।
রোকেয়ার নারী মুক্তির যে ভাবনা-চিন্তা তারও সমর্থক ছিলেন সাখাওয়াৎ। এ বিষয়ে বেগম রোকেয়া নিজেও বলেছেন, ‘আমার শ্রদ্ধেয় স্বামী অনুকূল না হইলে আমি কখনোই প্রকাশ্য সংবাদপত্রে লিখিতে সাহসী হইতাম না’। সাখাওয়াৎ হোসেনও একজন অত্যন্ত দিলখোলা প্রাণবন্ত মানুষ ছিলেন। নারী শিক্ষার একান্ত পক্ষপাতী ছিলেন। অথচ বর্তমান সময়ে পৃথিবী যখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে, তখনও দেখি স্বামীদের উদার মন-মানসিকতার অভাবে নারীদের সুপ্তপ্রতিভা আবিষ্কার ও প্রকাশ হয় না। নারীরা তাই পারছে না, তাদের চিন্তার স্বাধীনতার আত্মপ্রকাশ ঘটাতে। এদিক দিয়ে সাখাওয়াৎ হোসেন ব্যতিক্রম ছিলেন বলেই বেগম রোকেয়ার সাথে-সাথে তাঁর স্বামীর নামটিও ‘নারী-মুক্তি আন্দেলন’র যুক্ত হয়ে গেছে।
সংগঠিত নারীবাদী আন্দেলন বলতে যা বোঝায় তা বেগম রোকেয়াই তাঁর সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ একাকীই আরম্ভ করেন। তখনকার সমাজবাস্তবতায়- মুসলিম নারীসমাজের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ ছিল অশিক্ষা ও অবরোধপ্রথা। এ-ব্যাপারে মুসলিম পুরুষসমাজ এগিয়ে আসেনি, নারীরাও সংগঠিত আন্দোলন করতে পারেনি। বেগম রোকেয়া তাঁর শেষনিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত নারীসমাজের শিক্ষা এবং সার্বিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় বালিকা বিদ্যালয় পরিচালনা করেন। পাশাপাশি লেখনী হাতে তুলে নেন। এ-সময় জাতীয় স্বাধীনতার আন্দোলন বেগবান হয়। অবশ্য, সে আন্দোলনে পুরুষদের পাশাপাশি হিন্দুনারীরাও যথেষ্ট সংখ্যায় অংশগ্রহণ করেন; কিন্তু মুসলিম নারীরা এক্ষেত্রে একেবারেই পিছিয়ে ছিলেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, এদেশের নারীবাদী আন্দোলনের তৃতীয় পর্যায়ে (১৯৪৭-৭০) এসে ধীরে-ধীরে নারীবাদী চিন্তার প্রসার ঘটতে থাকে; নারীরা চাকরি ছাড়াও রাজনীতিতে অংশ নিতে থাকেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নারীরা এমনকি যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরই (চতুর্থ পর্যায়) বলতে গেলে এদেশে তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক উভয় দিক থেকেই নারীবাদ সংগঠিত হতে শুরু করে। বলতে গেলে- বেগম রোকেয়াকেই এদেশের নারীবাদী আন্দোলনের পথিকৃতের মর্যাদা দেওয়া হয়। বিশেষ করে- অবরোধ-প্রথার বিরুদ্ধে তিনি সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন। তিনি তাঁর অধিকাংশ লেখার মধ্যে কোনো না কোনোভাবে এই প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তাঁর অবরোধবাসিনী গ্রন্থটি অবরোধ-প্রথার কুফল নিয়ে রচিত। কিন্তু তিনি উগ্রপন্থা অবলম্বন করেননি। তাঁর পর্যবেক্ষণ হচ্ছে- ‘আমাদের ত বিশ্বাস যে- অবরোধের সহিত উন্নতির বেশি বিরোধ নাই। উন্নতির জন্য অবশ্য উচ্চশিক্ষা চাই। অবরোধ-প্রথা স্বাভাবিক নহে। কেননা পশুদের মধ্যে এ নিয়ম নাই। মনুষ্য ক্রমে সভ্য হইয়া অনেক অস্বাভাবিক কাজ করিতে শিখিয়াছে। ঐরূপ মানুষের ‘অস্বাভাবিক’ সভ্যতার ফলেই অন্তঃপুরের সৃষ্টি…।’
বেগম রোকেয়ার নারীমুক্তির চিন্তা ছিল বাস্তবতা-নির্ভর। তবে তাত্ত্বিক ভাবনাও তাঁর মধ্যে পরোক্ষভাবে নিহিত ছিল। এসব দিক থেকে আমেরিকার নারীবাদী আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর মিল রয়েছে। সেখানে যেমন ১৯৬৬ সালে ‘ন্যাশনাল অরগানাইজেশন অব উইমেন’ গঠনের মধ্য দিয়ে নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হয়, এখানে তেমনই বেগম রোকেয়া ১৯০৯ সালে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ এবং ১৯১৬ সালে ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’ বা ‘নিখিল বঙ্গ মুসলিম মহিলা সমিতি’ গঠন করেন তাঁর আন্দোলনের প্রসার ও বাস্তব রূপদান কামনায়। বেগম রোকেয়ার নারীচিন্তার গতিপ্রকৃতি ও তাঁর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারি, তিনি নারী ও পুরুষের মধ্যকার জীববৈজ্ঞানিক পার্থক্যকে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর লেখার সার ছিলো- “পুরুষকেন্দ্রিক মূল্যবোধ এবং বিশ্বাসের ওপর গড়ে ওঠা সামাজিক ও রাজনৈতিক পদ্ধতি ও কাঠামো থেকে মুক্ত হয়ে নারীকে অনন্য নারী পরিচয়ে পরিচিত হতে হবে। যেসব যুক্তি ও বিষয়কে অবলম্বন করে নারীকে অবনমিত ও বন্দি জীবনযাপনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে সেগুলোকে শনাক্ত ও দূর করতে হবে, যেনো নারী- পুরুষের সমানাধিকার অর্জন করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে।” রোকেয়ার মতে- ‘আমরা পুরুষের ন্যায় সুশিক্ষা ও অনুশীলনের সম্যক সুবিধা না পাওয়ায় পশ্চাতে পড়িয়া আছি। সমান সুবিধা পাইলে আমরাও কি ম্রেষ্ঠত্ব লাভ করিতে পারিতাম না? আশৈশব আত্মনিন্দা শুনিতেছি, তাই এখন আমরা অন্ধভাবে পুরুষের শ্রেষ্ঠতা স্বীকার করি, এবং নিজেকে অতি তুচ্ছ মনে করি।’
মাঝে-মাঝে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে- বেগম রোকেয়ার স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিতে আজও আমরা পারিনি কেনো? আজও যখন দেখি- শিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়েও অনেক নারী নিজের অধিকারটুকুও আদায় করতে পারছেন না, তখন ভীষণ কষ্ট হয়। নারীরা আজও মানুষ হয়ে বেড়ে উঠতে পারছে না। নারীর এখনো পুরুষতান্ত্রিকতার পাতানো ফাঁদে আটকা পড়ে আছে। শিক্ষিত হয়েও নারীরা নিজেদের আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারছে না। পুরুষতান্ত্রিকতার গোলক ধাঁধাঁর মধ্যে আটকে আছে তাদের জীবন। নারী জানে না, কখন পাবে সে মুক্তি? এমনকি যখন দেখি- বাংলাদেশের নারীরা বাংলাদেশের সমাজে জন্মগ্রহণ করে এই দেশের আলো-বাতাসে বেড়ে উঠে, দেশের প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করবার পরও তারা বেগম রোকেয়া, নূরজাহান বেগম, সুফিয়া কামাল, নীলিমা ইব্রাহীম, তসলিমা নাসরিন, সেলিনা হোসেন-এর লেখা এবং তাদের নারীবাদী আদর্শের সাথে পরিচিত নয়- তখন সেই দুঃখ রাখার জায়গা পাই না।
সবশেষে বলবো- ফ্রান্সের মহিলা দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ারের মাইলস্টোনগ্রন্থ ‘দ্য সেকেন্ড সেঙ’ (নিজ ভাষায় ১৯৪৯ সালে এবং ইংরেজি অনুবাদ ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয়), সমানাধিকারমূলক নারীবাদী ধারণার প্রবর্তক আমেরিকান নারীনেত্রী বেটি ফ্রিড্যানের ‘দি ফেমিনাইন মিসটিক’ (প্রকাশ সাল ১৯৬৩), মেরিওলস্টেনক্রাফটের ‘দ্যা ভিনডিকেশন অব উইমের রাইটস’ ইত্যাদি গ্রন্থেরই অনুরণন যেনো রোকেয়ার লেখালেখিতে। আর, তাইতো বর্তমান আধুনিক নারী সমাজ সৃষ্টিতে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের অবদান অসামান্য হয়ে আমাদের সমানে ধরা দেয়। মাত্র বায়ান্ন বছর বয়সে নারী জাগরণের অগ্রদূত এই মহিয়সী নারী আমাদের ছেড়ে ‘চলে গেলেও’ যতোদিন না নারী-পুরুষ সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে পৃথিবীতে ততোদিন পর্যন্ত রোকেয়ার অভাব বোধ আমরা করতেই থাকবো। এই অনিবার্য বাস্তবতার কারণেই হয়তো প্রথাবিরোধী সাহিত্যিক হুমায়ূন আজাদ বলেছিলেন- ‘পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে রোকেয়ার আন্দোলন একটি মহাযুদ্ধের নাম, যা এখনো চলছে।’
৯ ডিসেম্বর এই মহিয়সী নারীর জন্ম ও মৃত্যুদিনে তাঁর প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

x