রেলের লোকসান কমানোর পাশাপাশি সুনাম বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে

সোমবার , ৩০ জুলাই, ২০১৮ at ৬:৫৪ পূর্বাহ্ণ
35

বাংলাদেশ রেলওয়ের নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সত্ত্বেও রেল চলছে লোকসানে। এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক আজাদীতে গত ২৪শে জুলাই। এতে বলা হয়েছে, নানা অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম এবং দুর্নীতির ফলে এক বছরেই বাংলাদেশ রেলওয়েকে লোকসান দিতে হয়েছে সাড়ে ১৮শ’ কোটি টাকারও বেশি। রেলের উন্নয়নে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও পরিকল্পিত এবং সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে সব আয়োজনই যেন মুখ থুবড়ে পড়ছে। রেলের কোচ আমদানি করা হলেও ইঞ্জিন আমদানি বন্ধ রয়েছে বহুদিন ধরে। ফলে কোচ এসে অলস পড়ে থাকলেও ইঞ্জিনের অভাবে ট্রেন চালানো দায় হয়ে পড়ছে। প্রতিদিনই ইঞ্জিনের সংকট মোকাবেলা করে কোনো মতে জোড়াতালি দিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। অপরদিকে ট্রেনে উঠে বিভিন্ন বগিতে খালি সিট থাকলেও কাউন্টারে টিকেট না পাওয়ার সেই পুরনো রোগ এখনো সারানো সম্ভব হয়নি। হাজার হাজার মানুষ টাকা দিয়েও টিকেট পান না। অথচ ট্রেন খালি যায়, আর লোকসানের অংকটা কেবলই বাড়তে থাকে। সম্প্রতি রেল সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এমনটাই অভিযোগ ওঠে।’

যেকোনো দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থার অগ্রগতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ যাতায়াতের ক্ষেত্রে রেলের ওপর আস্থা অপরিসীম। পরিবেশবান্ধব, জ্বালানি সাশ্রয়ী নিরাপদ যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে রেল একটি জনপ্রিয় পরিবহন। আমাদের সীমিত সম্পদ, জনসংখ্যার আধিক্য, নিম্ন আয় ও কৃষিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় রেলের গুরুত্ব ব্যাপক। যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করতে, পণ্য পরিবহনে, অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের ব্যাপক প্রসার এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নে রেলকে আধুনিকায়ন ও জনপ্রিয় করে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দু’শ বছরের শাসনকাল থেকে যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে রেলপথ ছিল কেন্দ্রীয় ভূমিকায়। এরই মাঝে ঘটেছে শিল্পায়ন, নগরায়ন, বেড়েছে জনসংখ্যা। তার সাথে সঙ্গতি রেখে বেড়েছে জনগণের চাহিদা, সড়ক পথের ঘটেছে অভূতপূর্ব বিস্তার। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আমাদের শহর জীবন হয়েছে জনাকীর্ণ, অতি যান্ত্রিকতায় পূর্ণ এবং এখানে জনসংখ্যা বেড়েছে অতি মাত্রায়। ফলে সড়ক পথের ওপর পড়ছে অতিরিক্ত চাপ, প্রাইভেট গাড়ির আধিক্যও কম নয়। গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে ঠিক কিন্তু দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে তালে তাল মিলিয়ে।

এ দেশের ৫০ শতাংশ মানুষ বাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে। এই দরিদ্র মানুষগুলোর যোগাযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করাও অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। অন্যদিকে আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায় চলছে জ্বালানি সংকট। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে জ্বালানি একটি বড় সমস্যা এবং তা শুধুমাত্র বর্তমানের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতেও প্রভাব বিস্তার করবে। দেশের জ্বালানির একটা বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে সড়ক পথে চালিত পরিবহনে। উপরন্তু অতিরিক্ত পরিবহন ব্যবহারের কারণে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। আমাদের দেশে সড়ক পথে অধিকাংশ সময় যানজট লেগে থাকে। যে কারণে নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু রেল লাইনে সাধারণত কোনো যানজট থাকে না। সুতরাং নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানো যায়। রেল একটি আরামদায়ক পরিবহন ব্যবস্থা। এর লাইনগুলো সাধারণত মসৃণ। যে কারণে যাতায়াতে ঝাঁকি কম লাগে। কম ঝুঁকিপূর্ণ। রেল যোগাযোগে দুর্ঘটনা, মৃত্যু এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম। সুতরাং জীবনের নিরাপত্তা প্রশ্নেও রেল যোগাযোগে গুরুত্ব প্রদান করা হয়।

কিন্তু সেই রেল যদি বছরে সাড়ে ১৮শ’ কোটি টাকা লোকসান দেয়, তাহলে তা কেবল দুঃখজনক নয়, রীতিমত বেদনাদায়ক। যাত্রীদের হাতে টিকিট না পৌঁছানোর বিষয়টা রেলওয়ের সুনামের জন্য বড় সমস্যা। এতে তাদের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে এ কারণে যে ট্রেন খালি গেলেও যাত্রীরা টিকিট পান না। টিকিটগুলো যায় কোথায়? এমন অভিযোগ অহরহ ও গুরুতর। এ অভিযোগ থেকে রেহাই পেতে হবে রেলওয়েকে। এ জন্য প্রথমেই কাউন্টারে টিকিট পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। রেল ভ্রমণ যেমন জনপ্রিয়, তেমনি রেলের টিকিট প্রাপ্তিকে সহজ করে তুলতে হবে। অনলাইনে টিকিট করার জন্য যে সুবিধা প্রদান করা হয়েছে, তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলতে হয়, তার আয়োজন আরো বৃদ্ধি করতে হবে।

x