রেলের চার অঞ্চল প্রস্তাবনা এবং সুনীতি ও দুর্নীতি

শনিবার , ৬ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ
61

সম্প্রতি বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল-পশ্চিমাঞ্চলকে সম্প্রসারিত করে চার অঞ্চল করার প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বিকেন্দ্রীকরণ, যাত্রীসেবা ও পণ্য পরিবহন বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে রেলের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে বছরে গড়ে ১০০০ কোটি টাকা লোকসান দেয়। নয়া অঞ্চল করা হলে এই লোকসান দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকবে।’
ব্রিটিশ ভারতের প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর দিয়ে চা রপ্তানির জন্য আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে হেড কোয়ার্টার চট্টগ্রামে স্থাপন করা হয়েছিলো। এই সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সি.আর.বি) ঐতিহ্য নিয়ে গৌরবদীপ্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরেও এই সি.আর.বি তে বাংলাদেশ রেলওয়ে বোর্ড কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল। এমনকি বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য স্বতন্ত্র বাজেট ঘোষণা করা হতো। দোহাজারী-ঘুনধুম হচ্ছে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রেলওয়ে বৈপ্লবিক সংযুক্তি। এর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ।গণমাধ্যম সমূহের সূত্রমতে, রেলওয়েতে বিনিয়োগ গতি বেড়েছে, রেলের গতি বাড়েনি। বিভিন্ন দেশের রেলওয়ের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, পার্শ্ববর্তী ভারতে যাত্রীবাহী ট্রেনের গড় গতি ঘন্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার। চীনেও হাইস্পিড বাদে যাত্রীবাহী সাধারণ ট্রেনের গড় গতি এখন ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটারের ওপরে। অন্যান্য দেশের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় ট্রেন চলছে ঘণ্টায় গড়ে ৮০ কিলোমিটারের ওপরে। পাকিস্তানে এ গতি ৭৫ ও থাইল্যান্ডে ৭০ কিলোমিটারের ওপরে। বাংলাদেশে বিপুল বিনিয়োগের পরও রেলের গতি না বাড়ার কারণ হিসেবে সুষম উন্নয়নের অভাবকেই দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সারা বিশ্বে ব্রড গেজ এমনকি স্ট্যান্ডার্ড গেজ রেলপথ প্রধান হলেও বাংলাদেশে এখনো তা মিটার গেজ নির্ভর। এর ওপর দীর্ঘদিনের পুরনো লাইন, পুরনো ইঞ্জিনের কারণেও কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না রেল। কোচের কারণেও অনেক সময় সর্বোচ্চ গতিতে চলতে পারছে না ট্রেন। যদিও রেলওয়ে সূত্র বলছে, গত ৯ বছরে রেলপথে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর অর্ধেকের বেশি ব্যয় হয়েছে মূলধনি খাতে। চলমান প্রকল্পগুলো শেষ করতে আরো প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। তবে ট্র্যাক নির্মাণের মাধ্যমে নতুন নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হলেও পর্যাপ্ত নতুন ইঞ্জিন না থাকায় চাইলেও সর্বোচ্চ গতিতে ট্রেন চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায়। সূত্রমতে, ২০১৬ সালে রেলওয়ে মাস্টারপ্ল্যানের নথির ভিত্তিতে এইচএম আহসান, এফ রহমান ও টি হায়দার ‘রেল কানেক্টিভিটি ইন বাংলাদেশ : প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার’ শীর্ষক ওই গবেষণায় দেখান, রেলের গড় গতি ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটারের নিচে রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের নথি পর্যালোচনায়ও একই তথ্য পাওয়া যায়।
পূর্বাঞ্চল রেলের সবচেয়ে দ্রুতগতির ট্রেন সোনার বাংলা ও সুবর্ণ এঙপ্রেস। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের দূরত্ব ৩৩০ কিলোমিটার (ট্র্যাক ৩২১ কিলোমিটার হলেও রেলের হিসাবে ৩৩০ কিলোমিটার)। বিরতিহীনভাবে এ পথ পাড়ি দিতে ট্রেন দুটির সময় লাগে ৫ ঘণ্টা ১৫ মিনিট। অর্থাৎ সবচেয়ে ভালো মানের ট্রেন দুটির গতিও ঘন্টায় ৬৫ কিলোমিটারের কম। এ পথে চলাচলকারী অন্যান্য ট্রেন বিবেচনায় নিলে রেলপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে সময় লাগে গড়ে প্রায় ৭ ঘন্টা। এ হিসাবে দেশের প্রধান এ রেলপথেও ট্রেনের গড় গতি এখনো ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটারের নিচে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ঢাকা থেকে রাজশাহীতে আড়াইশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে গড়ে ৬ ঘণ্টার মতো। অর্থাৎ এ রেলপথেও ট্রেনের গড় গতি ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটারের নিচেই। সম্প্রতি বাংলাদেশ রেলওয়ে বিশেষ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল গণমাধ্যমের আলোচনায় এসেছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করছেন রেলওয়ে সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান এ. বি. এম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি। তিনি অতীতে সি.আর.বি’র পার্শ্বস্থ শিরিষতলাকে সাংস্কৃতিক ও পর্যটন স্পটে পরিণত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ খ্যাত কাঠের বাংলোকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন। গত ৩ অক্টোবর ২০১৮ সি.আর.বি’র সাত রাস্তার মোড় থেকে কদমতলী পর্যন্ত সড়ক ও ওয়ানওয়ে উদ্বোধন করেছেন। এতে উপস্থিত ছিলেন রেল পূর্বাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ ফারুক আহমেদ, প্রধান প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জলিল, ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজার ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন ও রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ। উদ্বোধনের সময় সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান কদমতলী রাস্তার বয়লার কলোনি ও আশে-পাশের এলাকা পরিদর্শনকালে অবৈধভাবে গড়ে তোলা রেকের গুদাম, অবৈধ বসতঘর দেখে ভীষণ ক্ষুদ্ধ হন। সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি’র ফলোআপ ও মনিটরিং অত্যন্ত প্রশংসা যোগ্য।এক্ষেত্রে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের ফলে এক মাসে দুই কোটি ত্রিশ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল আসছে। এ প্রেক্ষাপটে সব কোয়ার্টারে আলাদা বিদ্যুৎ মিটার লাগানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সরকারি অন্যান্য অফিসারদের মতো রেলওয়ের স্টাফদের নিজস্ব বিদ্যুৎ মিটার বসাতে হবে। যে সব রেল কর্মচারী অবৈধভাবে রেলওয়ের বসতঘর ভাড়া দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ ফারুক আহমদ এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছেন।
রেলওয়েকে চার ভাগে বিভক্তি করার বিষয়টিকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে এর যাত্রীসেবা ও পণ্য পরিবহন সেবা আরো অধিক হারে বাড়াতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ রেলওয়েতে দুর্নীতি কমানো ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে রেলওয়ের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন সেবা বাড়িয়ে দিলে রাজস্ব বাড়বে লোকসান কমে আসবে। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ব্যবসা বাণিজ্য ও শিল্পায়নে আগ্রহী প্রাইভেট সেক্টরকে প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা দিতে হবে এবং তাদেরকে বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে হয়রানি না করে সার্বিক সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করতে হবে। তা-হলেই একটি যাত্রী ও পরিবহন সেবা বান্ধব অত্যাধুনিক বাংলাদেশ রেলওয়ে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

x