রেলওয়েকে লোকসান থেকে বাঁচাতে অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে হবে

বৃহস্পতিবার , ৯ মে, ২০১৯ at ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ
55

প্রতিষ্ঠানের পরিচালন দক্ষতা পরিমাপের একটি মানদণ্ড হলো অপারেটিং রেশিও। মোট পরিচালন ব্যয় রাজস্ব আয়ের যত শতাংশ, সেটিকেই প্রতিষ্ঠানের অপারেটিং রেশিও বলে। অপারেটিং রেশিও যত বেশি হয়, প্রতিষ্ঠানের পরিচালন অদক্ষতা বা লোকসানের মাত্রাও তত বেশি হয়। অর্থাৎ, এ রেশিও ১০০-এর যত কম হবে লাভ হবে তত বেশি। উল্টোভাবে বললে, অপারেটিং রেশিও ১০০-এর যত উপরে থাকবে লোকসানও হবে তত বেশি। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে সংস্থাটির অপারেটিং রেশিও ছিল ১৯৬ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ টাকা আয় করতে গিয়ে রেলওয়ের ব্যয় হচ্ছে ১৯৬ টাকা। যেখানে প্রতিবেশি দেশ ভারতের রেল চলাচল সংস্থার ক্ষেত্রে এ হার ৯৬ শতাংশ। চীনে এ হার ৯৪ শতাংশ, জাপানে ৮৪, যুক্তরাষ্ট্রে ৬৩, পাকিস্তানে ১০৫ ও কানাডায় ৬১ শতাংশ। উল্লেখিত দেশগুলোর রেল চলাচল সংস্থার অপারেটিং রেশিওর মধ্যকার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে বলা যায়, পরিচালন দক্ষতার দিক থেকে অসম্ভব রকম পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সংস্থাটির আয়-ব্যয়ের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এতে ডেপ্রিসিয়েশন বা অবচয় যোগ করা হয়নি। যদিও পরিচালন ব্যয় হিসাব করার অবচয়কে বিবেচনায় নেয়া অপরিহার্য। এক্ষেত্রে অবচয় যোগ করা হলে বাংলাদেশ রেলওয়ের অপারেটিং রেশিও বাড়তো আরো অনেকখানি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর রেলের উন্নয়নে অনেকগুলো প্রকল্প নেয়। লক্ষ্য ছিল উন্নয়ন ও যাত্রীসেবার মান বাড়িয়ে রেলকে লাভজনক করে তোলা। ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৭-১৮ সময়ে ১৪ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকার ৬৪ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে রেলওয়ে। চলমান রয়েছে আরো ৪৮টি প্রকল্প, এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৮ হাজার কোটি টাকা। এত বিপুল পরিমাণ ব্যয়ের পরও পরিচালন অদক্ষতার কারণে লোকসানের ধারা থেকে বের হতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ে। সর্বশেষ গত অর্থবছরেও (২০১৭-১৮) রেলের লোকসান হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়।
উপমহাদেশে রেলযোগাযোগ শুরু হয় বৃটিশ শাসনামলে। তারপর থেকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে রেলওয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশ ভাগ হবার পর পাকিস্তান শাসনামলেও সেই ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ রেলওয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। তবে প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তি আশানুরূপ হচ্ছে না। তারপরও বর্তমান সরকারের আমলে রেল অনেকটা গতিশীল হয়েছে। রেলের উন্নয়নে পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন, রেল বাজেট বৃদ্ধি, রেললাইন, লোকোমোটিভ ও কোচ বাড়ানো সহ হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে এত কিছু করার পরও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। একের পর এক স্টেশন বন্ধ, আয়ুস্কাল পেরিয়ে যাওয়া রোলিং স্টক, লোকবল সংকট, সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছতে না পারা, টিকেট পেতে ভোগান্তি, ছেঁড়া-নোংরা আসন-এমন সব অবস্থা থেকে বের হতে পারছে না রেল কর্তৃপক্ষ। এ সবই ঘটছে পরিচালন অদক্ষতায়। উল্লেখিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের অপারেটিং রেশিও ১৯৬ শতাংশ অর্থাৎ ১০০ টাকা আয় করতে ব্যয় হচ্ছে ১৯৬ টাকা। দেশের বৃহত্তম ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রীয় গণপরিবহন খাতের এ চিত্র হতাশাজনক। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো রেল। অথচ দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অবহেলার শিকার হয়ে আসছিল রেল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হয়ে রেলের দিকে দৃষ্টি ফেরায়, যা দেশবাসীকে খুবই আশান্বিত করে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে। ফলে মানুষ ও পণ্যের চলাচলের জন্য রেলের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। কিন্তু আমাদের রেল চাহিদা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলাতে পারছে না। আমরা মনে করি, জাতীয় স্বার্থেই এখন রেলওয়ে খাতের পুনরুজ্জীবন ঘটানো দরকার। রেল ভ্রমণ তুলনামূলকভাবে নিরাপদও ব্যয় সাশ্রয়ী। প্রতিবেশি ভারতে মাকড়সার জালের মতো ব্যাপক পরিসরে রেল পরিসেবার বিস্তৃতি হয়েছে, যা বাংলাদেশে হয়নি। তবে দেশের যেসব জেলায় রেলপথ রয়েছে সেসব স্থানে সাধারণ মানুষের প্রথম পছন্দ ট্রেন। কিন্তু রেল পরিষেবার আধুনিকীকরণে বাংলাদেশ কচ্ছপগতিতে এগিয়েছে। রেলের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় চালু হওয়ার পর বিদ্যমান সমস্যা ও তদানুযায়ী উন্নয়ন যত দ্রুত হওয়ার কথা ছিল, তত দ্রুত হয়নি। বাংলাদেশের আন্তঃনগর ট্রেনের টিকেটের চাহিদা অনেক বেশি থাকার কারণে টিকেটের কালোবাজারি একটি বড় সমস্যা। কালোবাজারিদের সঙ্গে রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ থাকে বলে প্রায়শ অভিযোগ পাওয়া যায়। কাজেই কালোবাজারি বন্ধ করার পথে বাধাও কম নেই। কয়েক মাস আগে কালোবাজারি বন্ধ করতে রেল কর্তৃপক্ষ নিবন্ধনের মাধ্যমে আন্তঃনগর ট্রেনের টিকেট বিক্রয়ের ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু তাতেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় নি। বরং যাত্রী হয়রানি বেড়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
সন্দেহ নেই, নির্দিষ্ট সময় পরপর সমন্বয়ের মাধ্যমে রেলে ভাড়া সংস্কারে দরকার আছে। তবে তার আগে প্রয়োজন রেলওয়ের দক্ষতা বাড়ানো। স্বীকার করতেই হবে, বর্তমানে নানা কারণে যাতায়াতে সাধারণ মানুষের প্রথম পছন্দ সড়ক-মহাসড়ক। কিন্তু উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলোর যে দশা, তাতে রেলপথ ব্যবহারে মানুষের ঝোঁক বেড়েছে। তা সত্ত্বেও রেলওয়ে যাত্রীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছে না। সেবার মান ও প্রাপ্যতা নিয়ে এখনও অভিযোগ বিস্তর। সেবার মান ছাড়াও রেলচালক ও কর্মচারীদের দক্ষতার প্রশ্নটিও গুরুতর। প্রচুর লোকবল সংকটও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, ট্রেন প্রতি কোচের সংখ্যা বা টার্ন অ্যারাউন্ড ট্রিপ বাড়িয়ে ভাড়া বৃদ্ধি না করেও রেলওয়ের আয় বাড়ানো সম্ভব। রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ জমি উদ্ধার করে সেগুলোর সদ্ব্যবহার করা গেলেও বাড়বে আয়। এক্ষেত্রে আমাদের সামনে ভারতের দৃষ্টান্ত রয়েছে। বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো ঘনিষ্ঠ উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তার মনোভাবও রয়েছে। এরপরও আমরা যদি কোন আগ্রহ না দেখিয়ে রেলওয়েকে ট্র্যাকচ্যুত হতে দিই, তার দায়ভার আমাদের ওপরই পড়বে। পণ্য পরিবহনেও রেল কর্তৃপক্ষের আরো বেশি ভূমিকা পালন করা অত্যাবশ্যক। ভারী পণ্য সামগ্রী পরিবহনে রেল বেশ সুবিধাজনক। এক্ষেত্রে পরিবহন করা পণ্যের নিরাপত্তাসহ তা সময়মতো পৌঁছিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। সড়ক পথ তথা ট্রাক ও লরির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই এক্ষেত্রে আয় বাড়ানো দরকার। রেলের লোকসানের প্রধান কারণ অদক্ষতা, অপচয়, দুর্নীতিসহ সার্বিক অব্যবস্থাপনা। ব্যবস্থাপনা উন্নত করে ও সেবার মান বাড়িয়ে লোকসান কমানো শুধু নয়, রেলকে লাভজনক করা সম্ভব। রেলের বিপুল পরিমাণ ভূসম্পত্তি বেদখল করে আছে, প্রচুর অর্থ পাওনা আছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে। সম্পত্তি উদ্ধার, পাওনা টাকা আদায়, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, পণ্য পরিবহন, বাড়ানোর উদ্যোগ, লোকোমোটিভ ও কোচ তৈরির সক্ষমতা অর্জন এবং পরিচালন ব্যবস্থা যুগোপযোগী করা হলে রেলওয়ে অবশ্যই স্বনির্ভর হবে। তবে বিনা ভাড়ায় যাত্রী চলাচল বন্ধ করা অপরিহার্য। রেলের হিসাবেই বিনা টিকেটে যাত্রী পরিবহন কমিয়ে ১০ শতাংশ আয় বাড়ানো সম্ভব। আয়ের অন্য উৎসগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। রেলের জমিতে বাণিজ্যিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে আয় বাড়ানো যেতে পারে। নতুন নতুন যেসব অর্থনেতিক অঞ্চল গড়ে উঠছে, সেগুলোর সঙ্গে রেল সংযোগ গড়ে তুলে বা বাড়িয়ে পণ্য পরিবহন বাবদ আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এসব বিষয়ে সরকার রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যত দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেবে ততই দেশবাসী ও রেলের জন্য মঙ্গল।

x