রূপা খাতুন, শাহিনুর, এরপর কে…?

মাধব দীপ

শনিবার , ১১ মে, ২০১৯ at ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ
24

আবার চলন্তবাসে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে। আবারও সেই জঘন্য কাণ্ড সংঘটিত হলো। এবারের ঘটনাস্থল কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী। ঢাকা থেকে বাসে বাড়ি ফেরার পথে কটিয়াদীর শাহিনুর আক্তার তানিয়া (২৪) নামের এক নার্স বর্বর কিছু পুরুষের পৈশাচিক নির্মমতার শিকার হল। দেশের সকল মিডিয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে তা প্রচার ও প্রকাশ করল। গত ৬ মে সোমবার রাতে ওই ঘটনা ঘটে। শাহিনুর আক্তার ঢাকার কল্যাণপুরের ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
এই নির্মমতার সাম্প্রতিক বলি হলেন শাহিনুর। তবে, এরপর কে?
মিডিয়ায় প্রকাশ, গত ৬ মে সোমবার রাতে ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের পিরিজপুরগামী ‘স্বর্ণলতা’ পরিবহনের একটি চলন্তবাসে গণধর্ষণের শিকার হন কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে শাহিনুর আক্তার তানিয়া।
বাসের অন্যযাত্রীরা নেমে গেলে বাসের চালক, হেলপারসহ অন্যরা মেয়েটিকে বাসের ভেতরে ধর্ষণের পর হত্যা করে। পরে তাকে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় অভিযুক্ত ধর্ষণকারীরা। সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ভৈরব-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের গজারিয়া জামতলী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট সবাই ধারণা করছেন।
পত্রিকায় আরও প্রকাশ, ক’দিন আগে হত্যাকাণ্ডের শিকার শাহিনুরের মা মারা যায়। বাবার সাথে প্রথম রমজানের রোজা রাখতে সোমবার গ্রামের বাড়িতে আসার জন্য ঢাকার মহাখালী থেকে ‘স্বর্ণলতা’ পরিবহনের বাসে ওঠেন। বাসটি মহাখালী থেকে কটিয়াদী হয়ে পিরিজপুর পর্যন্ত চলাচল করে। বাসের লাস্ট স্টপেজ পিরিজপুর থেকে তার বাড়ির দূরত্ব মাত্র ১০ মিনিটের রাস্তা। শাহিনুর বিকালে বাসে উঠার পর থেকে তার পিতা এবং ভাইদের সাথে মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার কথা হয়। রাত ৮টার দিকে তিনি যখন স্থানীয় মঠখোলা বাজার অতিক্রম করেন তখনও তার পিতাকে ফোনে জানান, আধা ঘণ্টার মধ্যে বাড়ি পৌঁছতে পারবেন।
তার পিতা তখন তারাবির নামাজের জন্য মসজিদে যাচ্ছিলেন। রাত সাড়ে আটটার দিকে বাসটি কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছলে তার ভাইয়ের সাথে মোবাইল ফোনে শাহিনুর জানায়, আর মাত্র পাঁচ-সাত মিনিট লাগবে পিরিজপুর পৌঁছতে।
এদিকে, কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে সমস্ত যাত্রী নেমে যায়। গাড়ির চালক এবং হেলপার কৌশলে বাসস্ট্যান্ড থেকে চার-পাঁচজনকে যাত্রীবেশে গাড়িতে তোলেন। এরপর বাসস্ট্যান্ড পার হয়ে দুই কিলোমিটার দূরবর্তী ভৈবর-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের গজারিয়া জামতলী নামক নিরব জায়গায় তাকে ধর্ষণের পর পৈশাচিক এ হত্যাকাণ্ড ঘটায় অভিযুক্তরা।
এর আগেও আমরা দেখেছি- ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট চলন্ত বাসে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী রূপা খাতুনকে ধর্ষণ শেষে তাঁর ঘাড় মটকে হত্যার ঘটনায় গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও আলোচনায় উঠে এসেছিল। তখন একই কায়দায় রূপা খাতুন নামের ওই তরুণীকে হত্যা করে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর বন এলাকায় ফেলে রেখে গিয়েছিল বাসের চালক, হেলপার ও তাদের অন্যান্য সহযোগীরা। ওই ঘটনায় করা মামলায় গত বছর বাসের চালক ও তার তিন সহযোগীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন টাঙ্গাইলের একটি আদালত।
যানবাহনে সংঘটিত হওয়া উল্লেখযোগ্য ও লোমহর্ষক অসংখ্য ঘটনার মধ্যে কয়েকটি ঘটনার কথা এখানে প্রাসঙ্গিকভাবেই উল্লেখ করা যেতে পারে।
আমরা দেখেছি- নিকট অতীতে যানবাহনে বর্বরোচিত ঘটনার সূত্রপাত ঘটে প্রথম ২০১৩ সালে। ওই বছর মানিকগঞ্জে চলন্ত বাসে ধর্ষণের শিকার হন এক পোশাকশ্রমিক। অবশ্য ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায়, ২০১৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাসচালক দিপু মিয়া ও তাঁর সহকারী কাশেম আলীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। এরপর ২০১৫ সালের মে মাসে কর্মক্ষেত্র থেকে ঘরে ফেরার পথে রাজধানীতে গণধর্ষণের শিকার হন এক গারো তরুণী (২২)। রাজধানীর কুড়িল বাসস্ট্যান্ড থেকে তাঁকে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে ধর্ষণ করে একদল দুর্বৃত্ত। এই তরুণী যমুনা ফিউচার পার্কে একটি পোশাকের দোকানে কাজ করতেন। অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে ধর্ষণের অভিযোগে তিনি ভাটারা থানায় মামলা করেন। ঘটনাটির বিচার চলছে। ২০১৬ এর ৫ জানুয়ারি গভীর রাতে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের নান্দাইল চৌরাস্তায় একটি যাত্রীবাহী বাসের ভেতর ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ধর্ষণের শিকার নারী বাদী হয়ে নান্দাইল মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। ওই বছরের ২০ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্রও জমা দেওয়া হয়। এটারও বিচারকাজ চলছে।
একই বছর বরিশালের নথুল্লাবাদে ‘সেবা পরিবহন’-এর একটি বাসে কুয়াকাটা থেকে আসা দুই বোনকে ধর্ষণ করে গাড়িচালক ও তাঁর সহকারীরা। এ ঘটনায় বরিশাল মহানগর পুলিশের বিমানবন্দর থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ধর্ষণ মামলাটি বর্তমানে সাক্ষ্যের জন্য আদালতে আছে। ওই মামলার সব আসামি কারাগারে রয়েছে।
এ জঘন্য বর্বরতা বাদ নেই ট্রাক কিংবা নৌপথেও! ২০১৭ এর ২ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জে চলন্ত ট্রাকে ১৫ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে ট্রাকের চালক ও হেলপার। এ ঘটনার মামলার দুই আসামি বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালের মে মাসে গাজীপুরের কালীগঞ্জে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক নারী শ্রমিক নৌকায় ধর্ষণের শিকার হয়ে মামলা করেন।
কিন্তু কেন হচ্ছে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি? এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবহন মালিকেরা যানবাহনকে নিরাপদ করে তোলার ক্ষেত্রে কি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে? কিংবা কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের আচরণগত প্রবণতার দিকটি কি কখনো বিবেচনায় রাখা হয় বা হচ্ছে? নারী-পুরুষ সমান বা নারীর প্রতি সবসময় সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারে কি তাদেরকে কখনো বা কোনোসময় কাউন্সেলিং করা হয় বা হয়েছে? রাষ্ট্রযন্ত্র কি এক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না কিংবা কখনো রেখেছে?
উপরন্তু, যারা ধরা পড়ছে পুলিশের হাতে কয়জনেরইবা শাস্তি নিশ্চিত করতে পেরেছে বিচার ব্যবস্থা? কয়টি বিচারইবা যথাসময়ে সম্পন্ন হয়েছে? কয়জন ভিকটিমকেইবা সমাজ বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করেছে? এক্ষেত্রে মিডিয়ার সামাজিক ভূমিকাও কি মিডিয়া পালন করেছে ঠিকমত? মিডিয়া কি অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত ফলো-আপ রিপোর্ট অব্যাহত রেখেছে? সমাজের যাঁরা জনপ্রতিনিধি আছেন- তাঁরাও কি বিষয়গুলো নিয়ে সোচ্চার ভূমিকা রেখেছেন? অনেকক্ষেত্রে তো আবার রক্ষককেই ভক্ষক হয়ে ওঠতে দেখছি!
এমনকি- মেয়েদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখার যে ‘ভাইরাস’ এই পুরুষশাসিত সমাজের অস্থিমজ্জায় মিশে আছে- তা দূর করার ক্ষেত্রে ছোটো-বড় সকল স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোইবা কী ভূমিকা রাখছে?
যদি প্রশ্ন করি, গত এক দশক ধরে কতোসংখ্যক ধর্ষণ কিংবা নারী নির্যাতন মামলা ঝুলে আছে দেশের বিভিন্ন আদালতে? তার মধ্যে মাত্র কতো শতাংশের বিচার সম্পন্ন হয়েছে? দ্রুত বিচারের মাধ্যমে কয়জন অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে? এর জবাব দেওয়া কি খুব সহজ হবে?
তার উপর, আমরা তো জানি-ই, এই দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার দরুণ নারীকে বারংবার আদালতে হাজিরা দিয়ে ধর্ষণের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে হয় আসামি পক্ষের কৌঁসুলির জেরায়। তখন নারী যে কতোটা মানসিক যন্ত্রণায় থাকেন তার হিসেবে কে রাখে?
অনেককেই আবার ধর্ষণের ঘটনায় প্রথমেই আঙুল তুলেন ধর্ষিতা নারীর দিকে। কেন তিনি রাতে বাইরে গিয়েছিলেন? কিন্তু তাঁরা ভুলে যান- আজ শিক্ষিত মহিলাদের বাইরে বের হতে হয় নানা কাজকর্মে। জীবিকার তাগিদে দুটো বাড়তি রোজগারের আশায় অনেক নারীকে কাজ করতে হয় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। চড়তে হয় গণপরিবহনে। কিন্তু তার জন্য তাঁকে কি যৌন নিগ্রহের শিকার হতে হবে? এজন্য কি তাঁকে ধর্ষণ করে তাঁর ঘাড় মটকে হত্যা করা হবে? কে দেবে এসবের জবাব? কে??
যাই হোক, ফিরে আসি গত ৬ মে-এর ঘটনায়। ইতোমধ্যে, কিশারগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন যে- ময়নাতদন্তে মেয়েটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করার আলামত পাওয়া গেছে।
বিচারহীনতার এই সময়ে কিংবা ধীরলয়ে হাতেগোনা গুটিকয়েক ধর্ষণজনিত ঘটনার বিচার পাবার এই দিনে- আশার কথা হচ্ছে- শাহিনুরকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত বাসচালক ও হেলপারসহ পাঁচজনের আটদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। রিমান্ড মঞ্জুর করা আসামিরা হলেন- ধর্ষণ ও হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মো. নূরুজ্জামান, মো. লালন মিয়া, সন্দিগ্ধ আসামি মো. রফিকুল ইসলাম রফিক, মো. খোকন মিয়া ও মো. বকুল মিয়া। কিশোরগঞ্জের ২নং জুডিশিয়াল আদালতের সম্মানিত বিচারক আল-মামুন ৮ মে বুধবার বিকেলে এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এখন দেখা যাক- কী হয়? তবে এটা বুঝতে পারছি- যতো দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব ঘটনার অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা যাবে- ততো দ্রুত শাহিনুর, রূপা খাতুনদের আত্মা শান্তি পাবে- আর আমরা পাবো স্বস্তি। কিন্তু এটা সত্যি যে- শাহিনুরদেরকে আমরা আর ফিরে পাবো না। কিন্তু, নতুন করে আমরা যাতে আর কোনো শাহিনুরকে না হারাই- কোনো রূপা খাতুনকে না হারাই- তার জন্যই অতিদ্রুত দেশবাসীর সামনে এসবের প্রত্যেকটির বিচার নিশ্চিত করতে হবে। নইলে, এই পাশবিকতার রেশ টেনে ধরার আর কোনো পথ খোলা থাকবে ?

x