রুম- মানবিক সম্পর্কের চলচ্চিত্র

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ২০ নভেম্বর, ২০১৮ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ
44

হলিউডের সিনেমা বলতে সাধারণভাবে আমরা বুঝি হাইবাজেটের বিশাল আয়োজনের সব চলচ্চিত্র। জাঁকে জমকে কারো ক্ষমতা নেই তার সাথে পাল্লা দেবার। কারিগরি বৈভবেও সে শীর্ষে। বিশ্বজুড়ে তার বাজার আর কদর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র কলাকুশলীরা হলিউডে একটু খানি সুযোগ পেলেও ধন্য হন। সে তখন থেকে এখনো।
কিন্তু এহেন হলিউডেও স্বল্প বাজেটের স্বল্প আয়োজনের বিকল্পধারার কিছু ছবি তৈরি হয়। এসব ছবি জমকালো ছবিগুলোর প্রখর চাপে অনেকটা ঢাকা পড়ে থাকে। উডি এ্যালেনের ছবিগুলোর কথা এ প্রসংগে আসে।
বিষয় বৈচিত্র্য, কারিগরি প্রয়োগের পরিমিতি, অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়, চিত্রনাট্যের স্বাভাবিক গতিময়তা ও সর্বোপরি অন্তর্নিহিত বার্তা ছবিগুলোকে একটি ভিন্নমাত্রায় পৌঁছে দেয়।
তেমনি একটি স্বল্পালোকিত চলচ্চিত্র ল্যানি আব্রাহাম পরিচালিত ‘রুম’। ২০১৫ সালের ছবিটিকে অনেক সমালোচক ‘পচা টম্যাটো’ বলে অভিহিত করেছেন। এমা ডেনোগের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিটির মর্মস্পর্শী চিত্রনাট্যও এমার করা। এমা ডোনোগ আইরিশ কানাডিয়ান লেখক। মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে লেখালেখিতে তার প্রভুত হাতযশ। এ উপন্যাসটিও পাঠক প্রিয়। জ্যাক নামের পাঁচ বছরের এক ছেলে শিশুর জবানবন্দিতে উপন্যাসটি রচিত। ছবিটিও একই শৈলীতে অর্থাৎ জ্যাকের জবানবন্দিতে চিত্রিত।
ল্যানি আব্রাহামসন যখন ছবিটি করতে যান তখন অনেকেই তাকে নিষেধ করেছিলেন। স্নায়বিক পীড়াদায়ক হতে পারে এই ছিল তাদের আশংকা। কিন্তু সব ধারনাকে উল্টে দিয়ে ছবিটি দর্শকপ্রিয়তা পেয়ে যায়। ১৮ মিলিয়ন ডলার খরচ করে বানানো ছবি আয় করে ৩৭ মিলিয়ন ডলার। মার্কিন দেশের বাইরে কানাডা, আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটেনে ছবিটি দর্শক প্রিয় হয়।
নিউইয়র্ক টাইমস ও ভালচার পত্রিকায় ছবিটির বেশ প্রশংসা করা হয়। ভালচার পত্রিকার রিভিউ বরাবরই চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই পত্রিকায় ডেভিড এডল স্টাইল লেখেন, Room is astonishing. It transmutes a lurid, true crime situation into a fairy in which fairy tales are a source of survival.
ফেয়ারি টেল অর্থাৎ রূপকথা বলার কারণ হলো এই ছবির আখ্যানভাগ অনেকটা এ ধরনের যদিও তা বাস্তবতার ভিত্তিতে রচিত ও চিত্রিত। এমা উপন্যাসটি লিখেছিলেন বাস্তব একটি ঘটনা থেকে। জয় নামের এক যুব মহিলা ও তার শিশুপুত্র জ্যাকের ছয় বছরের অবিশ্বাস্য বন্দী জীবনের শেষে মুক্ত জীবনে ফিরে আসা এবং শিশুটির প্রথম এই পৃথিবীর আলো হাওয়ার সাথে পরিচিত হওয়ার অত্যন্ত মর্মস্পর্শী চিত্রায়ন-‘রুম’।
উচ্ছল তরুণী জয় হঠাৎ করে কিডন্যাপ হয়ে বন্দী হয় এক নির্জন এলাকার পরিত্যক্ত এক রুমে। ছিনতাইকারী লোকটি তাকে ধর্ষণ করে নিয়মিত এবং সেই প্রকোষ্টে বন্দী করে রাখে। রুমটিতে থাকা, খাওয়া, নিত্যকৃত্য সবকিছু। খাবার দাবার পোশাক আশাক সবকিছু লোকটি সরবরাহ করে। বাইরে থেকে সে তালা বন্ধ করে রাখে। এক বছর পর জয়ের একটি পুত্র সন্তান জন্মায়। জয় তার নাম রাখে জ্যাক। ক্রমশঃ জ্যাক পাঁচ বছরের হয়। ছবিটির দৃশ্যায়ন সে সময়টাতে। পাঁচ বছর পর্যন্ত জ্যাকি দুনিয়া মনে করে ঐ ‘রুম’ টাকেই। তার কাছে বিশেষ কোনো খেলনাও নেই। প্রকৃতি বলতে সে বোঝে রুমের ছাদ দিয়ে আসা এক চিলতে রোদ্দুর। রুমটিতে কোন জানালা নেই। দরজাটা সে খুলতেও জানে না। সেটা বাইরে থেকে বন্ধ। ছোট একটা ইঁদুরকে সে মাঝে মধ্যে দেখে। আর দেখে সে লোকটাকে যে তার মায়ের কাছে আসে। সে জানে না লোকটা কে? তার মাও কিছু বলেনি তাকে। লোকটা যখন তার মাকে নির্যাতন করে, সে খুবই কাতর হয়। কিন্তু ভয়ে কিছু করতে পারে না। রুমের এক কোণায় লুকিয়ে থাকে। বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে সে মায়ের কাছে গল্প শোনে। মা জয় এই দুর্দশা থেকে মুক্তির কোনো দিশা না পেয়ে একদিন মা ছেলে মিলে বুদ্ধি আটে। ছোট জ্যাক মরার মতো পড়ে থাকে। মা তাকে শতরঞ্চিডে মুড়ে কান্নাকাটি করতে থাকে এবং লোকটিকে অনুরোধ করে লাশটি যেন দূরে কোথাও ফেলে আসে। জ্যাককে তার মা আগেই শিখিয়ে দিয়েছিল, তাকে বহন করা পিক আপ গাড়িটা কোথাও ধীরগতি হলে সে যেন লাফিয়ে নেমে পড়ে। শতরঞ্চি থেকে এক ফাঁকে সে বের হয়ে নীল আকাশ, সবুজ বনানী, পথ ঘাট মাঠ দেখে অবাক হয়ে পড়ে।
নতুন এক জীবনের মুখোমুখি হয়। জ্যাক লাফিয়ে পড়ে আঘাত পেলে এক পথচারী এগিয়ে আসে। তখন ছিনতাইকারী লোকটি প্রকৃতপক্ষে যে জ্যাকের জন্মদাতা সে পালায়। পথচারীর ডাকে পুলিশ এসে প্রথমে জ্যাক ও পরে তার মাকে উদ্ধার করে এবং হাসপাতালে নিয়ে যায় দুজনকে। জ্যাকের মা জয়ের বাবা ও সৎমায়ের সাথে যোগাযোগ হয়। দেখা যায় জয়ের বাবা ও মা দুজনই বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে বিচ্ছিন্ন। ধীরে ধীরে জ্যাক ও জয় সুস্থ হয়। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে।
একটি রুম ও সামান্য কিছু আউটডোর মিলিয়ে এ ধরনের একটি গল্পের চিত্রায়ন করা খুব দুরুহ। পরিচালক ল্যানি আব্রাহামসন দক্ষতার সাথে সেটা অতিক্রম করতে সমর্থ হয়েছেন। মিডশট ক্লোজ শট ও কম্পোজিট শটের সমন্বয়ে রুম ও হাসপাতাল এর দৃশ্য এবং লংশট ও প্যালিং শটের মাধ্যমে আউটডোর দৃশ্যগুলো চমৎকারভাবে দৃশ্যায়ন করেছেন তিনি চিত্রগ্রাহক ড্যানি কোহেন এর সহযোগিতায়। এমার চিত্রনাট্যও হৃদয়গ্রাহী। ছোট ছোট কিছু উত্তেজনাকর ও সংবেদনশীল মুহূর্ত ছোট ছোট দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে তিনি গেঁথেছেন। চমৎকার কিছু মন্তাজ রয়েছে ছবিতে। যেমন ছাদের চিলতে কাচে জমে থাকা জলের বুদ্বুদের সাথে জ্যাকের ক্লান্ত মনের মন্তাজ, খেলনা গাড়িটার চাকাগুলো খুলে ফেলার মন্তাজ, পিক আপে ছোট একটি পাতা হাতে পেয়ে প্রকৃতিকে প্রথম চেনার দৃশ্যটির মন্তাজ। এরকম ছোট ছোট প্রচুর মন্তাজ ছবির সম্পাদনাকে সমৃদ্ধ করেছে, যদিও তা চিত্রনাট্যেরই কারণে। সম্পাদনা করেছেন নাথান নুজেন্ট। স্টিফেন রনিক্‌্‌স কৃত সংগীতও শ্রুতিনন্দন।
সংলাপের মধ্য দিয়েও চিত্রনাট্যকার ছবিটিকে যথেষ্ট সংবেদনশীল করে তুলতে সমর্থ হয়েছেন। যেমন জ্যাক পুলিশকে জানায়, তাদের রুমে কোনো জানালা নেই, সে বাসাকে বলে রুম। সে বলে ছাদ দিয়ে আসা একটু সূর্যালোক ছাড়া আর কিছু দেখেনি। বলে মা ছাড়া কাউকে সে চেনে না, কারো সাথে কথা বলেনি কখনো, দরজা আছে একটা, কিন্তু সেটা সে ও তার মা খুলতে পারে না। হাসপাতালে সুস্থ স্বাভাবিক হওয়ার পর সে তার মাকে বলে, সে জানতো ঐ রুমটাই বুঝি পৃথিবী, এখন সে নতুন এক পৃথিবীকে দেখছে, সেখানে সে বাস করে মেঘের সাথে, গাছের সাথে, পাখীর সাথে, আকাশের সাথে আর জানালার সাথে, যে জানালা তাদের রুমে ছিল না।
ছবির শিল্প নির্দেশনা বাস্তব সম্মত। যেমন ছবিটি যখন শুরু হয় তখন শিশু জ্যাকের বয়স পাঁচ। পাঁচ বছরে তার চুল মেয়েদের মতো অনেক লম্বা হয়ে পড়ে। সে যখন প্রথম বাইরে আসে, তখন পুলিশ অফিসারের সাথে সাবলীলভাবে কথা বলতে পারে না, কারণ এতদিন সে মা ছাড়া আর কারো সাথে স্বচ্ছন্দে কথা বলেনি, হাসপাতাল বা মায়ের বাড়িতে সে জানলা দেখলেই ছুটে যায়, কারণ এতদিন সে কোনো জানালা দেখেনি।
জ্যাকের মা জয়ের বাবা ও মা দুজনেই বিবাহ বিচ্ছেদগ্রস্ত। এরা জ্যাককেও তেমনভাবে মেনে নিতে পারে না। জয় একজন সিংগেল মাদার। এ নিয়ে মেয়ের সাথে, স্ত্রীর সাথে জয়ের বাবার অনেক দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্ব জয়ের মা, সৎমা ও বাবার মধ্যেও। এর মধ্যে দিয়ে ঔপন্যাসিক চিত্রনাট্যকার এমা ডোনোগ এবং পরিচালক ল্যানি আব্রাহামসন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা দিতে পেয়েছেন।
সুস্থ ও স্বাভাবিক হওয়ার পর জয় তার শিশুপুত্র জ্যাককে নিয়ে তাদের ছয় ও পাঁচ বছরের বাসস্থান সেই ‘রুমে’ আবার যায় শেষবারের মতো। জ্যাক বলে মা দরজাটা খোলা রেখে রুমকে বিদায় বলো। কারণ দরজা না থাকলে সেটা কোনো রুমই নয় মা।
রুম ছবির অভিনয়াংশ সমৃদ্ধ। বিশেষ করে মা জয়ের চরিত্রে-ব্রিয়ে ল্যারসন এবং শিশুপুত্র জ্যাকের চরিত্রে জ্যাকব ট্রাম্বলে মর্মস্পর্শী অভিনয় করেছেন।
ছবিটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তেমনভাবে প্রদর্শিত হয়নি। বিভিন্ন উৎসবে অনেকভাবে পুরস্কৃত হয়েছে এ ছবি। ২০১৬ সালের অস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পান ব্রিয়ে ল্যারসন। শ্রেষ্ঠ পরিচালকের মনোনয়ন পেয়েছিলেন ল্যানি আব্রাহামসসন।
(কৈফিয়ৎ : রুম নিয়ে এতদিন পরে লেখার কারণ, ছবিটি আমি দেখেছি সম্প্রতি। আপনারা ইতোমধ্যে হয়তো অনেকেই দেখেছেন। যারা দেখেননি দেখে নিতে পারেন। তেমনি আরেকটি ছবি ‘লায়ন’। এটি নিয়েও লেখার ইচ্ছে রইল)

x