রুপালি গিটারে নীরবতা, মুগ্ধতা

ঋত্বিক নয়ন

বুধবার , ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ
367

আর মূর্ছনায় ভাসবে না রূপালি গিটার। ছয়টি তারে লুকিয়ে থাকা কষ্ট, হাসি-কান্না, দুঃখ-সুখ, ভালোবাসা বেজে উঠবে না সুরে সুরে। গিটারের প্রতি আইয়ুব বাচ্চুর ভালোবাসার কথা জানেন অনেকেই। মৃত্যুর আগে দৈনিক আজাদীর সাথে আলাপচারিতায় তিনি বলেছিলেন, গান নয়, গিটার আমাকে ঘরছাড়া করেছিল। গিটারের জন্যই সঙ্গীতযুদ্ধে নেমেছিলাম। সত্তরের দশকে আমি ভাড়ায় গিটার বাজাতে যেতাম। গিটারটাও ভাড়া নিয়ে যেতাম। ওই সময় ডিসকো কোম্পানির একটি গিটার আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে ৩০ টাকা দিনপ্রতি ভাড়ায় গিয়ে শো করতাম। ভাড়া হিসেবে ৩০ টাকা দেয়ার পর আরো ৫০ থেকে ৬০ টাকা রয়ে যেত। এটা দিয়েই দিন চালাতাম। আমার নিজের ৪৮টা দেশি-বিদেশি গিটার আছে। কিন্তু সেই ভাড়া খাটা গিটারের দিনগুলোর কথা আজও জীবন্ত হয়ে আছে আমার মনে।
একাধারে গায়ক, গীতিকার, সুরকার এবং প্লেব্যাক শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু তার গানের কথার মতোই চলে গেছেন বহুদূরে। তাকে হাসতে দেখেছেন, গাইতে দেখেছেন। শেষে তিনি দেখালেন নীরবতা। তিনি বলেছিলেন, আমি যাব চলে দূরে, বহুদূরে, গান শুধু রবে আমার স্মৃতি নিয়ে।
ঠিক তাই। তাঁর গানের মাঝেই তিনি বেঁচে থাকবেন। আর রূপালি গিটারের যাদুকর আইয়ুব বাচ্চুকে বাঁচিয়ে রাখতে তাঁর স্মৃতিধন্য চট্টগ্রাম নগরীর প্রবর্তক মোড়ে নির্মিত হয়েছে ‘রূপালি গিটার’। আজ বুধবার সন্ধ্যায় সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন প্রবর্তক মোড়ের গোলচত্বরে স্থাপিত প্রয়াত ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চুর রূপালি গিটারের প্রতীক আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করবেন।
সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিকল্পনাবিদ রেজাউল করিম রেজা জানান, আইয়ুব বাচ্চুর স্মৃতি সংরক্ষণ ও তার সমপর্কে তরুণ প্রজন্মকে জানানোর লক্ষে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ প্রবর্তক মোড় চত্বরে তার ঐতিহাসিক রূপালি গিটারের আদলে রূপালি গিটারের একটি প্রতীক বসানো হয়েছে। এখানে আইয়ুব বাচ্চুর ছবি থাকবে। তার সমপর্কে তরুণ প্রজন্ম অনেক কিছু জানতে পারবে।
মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন আইয়ুব বাচ্চুর জানাজায় অংশ নিয়ে বলেছিলেন, আইয়ুব বাচ্চুর স্মৃতি সংরক্ষণে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সেই প্রতিশ্রুতি রাখতে গিয়ে প্রবর্তক মোড় গোলচত্বরে আইয়ুব বাচ্চু স্মরণে তার ব্যবহার করা রূপালি গিটারের প্রতীক উপস্থাপনের উদ্যোগ নেন তিনি।
গতকাল বিকেলে প্রবর্তক মোড়ে গিয়ে ১৮ ফুট উচ্চতার গিটারটির দিকে তাকিয়ে থাকা একদল কিশোরকে দেখা যায়। তাদের একজনের কাঁধে ব্যাগসমেত গিটার শোভা পাচ্ছিল। সমিত নামের কিশোরটি জানান, আমার গিটার লেসনে প্রথম যে গানটি তুলেছিলাম সেটি হলো বসের (আইয়ুব বাচ্চু) সেই তুমি। তিনি বলেন, আজ বস নেই, এই গিটারটি দেখে মনে হচ্ছে বস যেন গিটার হাতে আমাদের পাহারা দিচ্ছেন। তিনি ভুল ধরিয়ে দেবেন।
সাড়ে চার ফুট বেদীর উপর গিটারটি স্থাপন করা হয়েছে। স্টিলের পাতে তৈরি গিটারটিতে ৬টি তার রয়েছে। এতদিন ঢাকা পড়েছিল। গত সোমবার আবরণ খুলে ফেলতেই দৃশ্যমান রূপালি গিটারটি অদ্ভুত মুগ্ধতা সৃষ্টি করেছে। চলাচলরত মানুষকে বাধ্য করছে ফিরে চাইতে।
গিটারকে সঙ্গী করে দেশ হতে দেশান্তরে ছুটে বেড়িয়েছেন এ ক্ষণজন্মা সঙ্গীত তারকা। উপহার দিয়ে গেছেন একে একে কালজয়ী সব গান। কলকাতা থেকে নিউইয়র্ক, সিডনি থেকে সাইপ্রাস কত শহরেই না মাতিয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু। কিন্তু পৃথিবীর কোনো শহর তাঁকে টানেনি। ২০১৭ সালের ২০ মে দৈনিক আজাদীকে তিনি বলেছিলেন, চট্টগ্রাম আমার নাড়ি পোঁতা শহর। এই শহরে আমার মা ঘুমিয়ে আছেন। এই শহরেই আমি ফিরে আসব। বছর না পেরুতেই আইয়ুব বাচ্চুর কথা সত্যি হলো। আইয়ুব বাচ্চু তার শহরে ফিরে এসেছেন ঠিকই, তবে নিথর দেহে।
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর ঢাকায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তারকাসুলভ লেবাস ছেড়ে ফিরে আসেন মায়ের কোলে। ২০ অক্টোবর স্টেশন রোডের নগর বাইশ মহল্লা চৈতন্য গলি কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয় এ কিংবদন্তিকে।

x