রুখতে হবে অপসংস্কৃতি

সঞ্জয় চৌধুরী

শনিবার , ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৪:৩২ পূর্বাহ্ণ
18

সংস্কৃতি হচ্ছে জাতির মনন ও কর্মের ব্যঞ্জনাময় অভিপ্রকাশ। এটি এমন একটি আলোকচ্ছটা যে আলোয় চেনা যায় জাতির স্বরূপকে। প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব একটা সংস্কৃতি রয়েছে। এই সংস্কৃতির গ্রহণযোগ্যতা তথা সৌন্দর্যের প্রতিফলনের মধ্যেই জাতি বিশ্বে পরিচয় লাভ করে। তাই বলা যায় কোনো জাতি তার দীর্ঘদিনের জীবনযাপনের ভেতর দিয়ে যে মানবিক মূল্যবোধ সুন্দর ও কল্যাণের পথে এগিয়ে নিয়ে যায় তাই সংস্কৃতি। জীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করাই সংস্কৃতির মূলমন্ত্র। এই সংস্কৃতির মধ্যে আছে যেমন সামগ্রিকতার সমানাধিকার, তেমনি আছে তার কৃতিত্বময়তার দিক। যে জাতি জীবিত আছে সে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি করে চলেছে একটি জীবন্ত সংস্কৃতির বহমান ধারা। যেমন বিশ্বের ইতিহাসে বাঙালি একটি ব্যতিক্রমী জাতি। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের জন্ম হয়। সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে আমরা ঠিক করে নিই আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়। এই আত্মপরিচয়ের ঠিকানা খোঁজে বাঙালি আজ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়ে আমাদের পক্ষে এই অর্জন সম্ভবপর হয়েছে। বাঙালির সংস্কৃতি অহংকারের এবং মানবতার সংস্কৃতি। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সহ নানাজাতি, বর্ণ এবং সম্প্রদায়ের লোকজনের সহঅবস্থানের মাধ্যমে এক অনন্য ভাবধারায় প্রবাহিত আমাদের সংস্কৃতি। এই বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষার জন্য একাত্তরে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন ত্রিশ লাখ শহীদ। বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে সংস্কৃতির নানা উপকরণ। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মানুষের আচার, রীতিনীতি, মূল্যবোধ, ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য, কৃষি, ঐতিহ্য, সামাজিক সম্পর্ক, মনন, চিন্তা ও কর্মসহ সবকিছুই মানবিক, সুষ্ঠু, সুন্দর এবং সমৃদ্ধ জীবন যাপনের পাথেয়। বর্তমান যুগ বিশ্বায়নের যুগ। গোটা বিশ্বকে যখন একটি গ্রাম হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে তখন কোনো জাতির পক্ষেই তার নিজস্ব সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে রাখা সম্ভব নয়। এক দেশের সাথে অন্যদেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক তথা জীবন ধারণের নানা উপকরণের অবাধ আদানপ্রদানের মতোই প্রতিনিয়ত সাংস্কৃতিক বিষয়াবলীর লেনদেন ঘটছে। তবে এক্ষেত্রে কোনো জাতি যদি তার নিজস্ব সংস্কৃতিকে অবহেলা করে, তবে সেই জাতির পক্ষে কোনো কিছুই শুভ এবং কল্যাণকর হবে না। নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা না করলে ভিনদেশি সংস্কৃতি মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। আমরা বাঙালি জাতি আজ অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলেছি, যার ফলে সমাজে অনাকাঙ্ক্ষিত নানা ঘটনাই ঘটছে। তবে সামাজিক মাধ্যমের যুগে অনেক কিছু যোগ হবে, তবে তা যেন আমাদের নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে হয়, সেইদিকে যথেষ্ট সচেতন হতে হবে। নিজস্ব সংস্কৃতিকে মনে প্রাণে ধারণ করাই প্রকৃত গৌরব। আর এই গৌরব অর্জনের জন্য আমাদের সন্তানদের ছোটবেলা থেকে সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ করে দিতে হবে। স্বাধীনতার সাতচল্লিশ তম বছরে এসে আমরা কি এখনো আমাদের সন্তানদের সেই সুযোগটুকু করে দিতে পেরেছি? নিশ্চয়ই না। হয়তো বা আর্থিকভাবে সচ্ছল যে পরিবারগুলো জেলা সদরে অবস্থান করছেন সে পরিবারের সন্তানগুলো জেলা শিল্পকলা একাডেমীর মতো সরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহে সংস্কৃতি চর্চার সুযোগটুকু গ্রহণ করতে পারছে। যেখানে আমাদের দেশে অনেক লোক এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে এবং যারা মফস্বলে বসবাস করছেন ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সেক্ষেত্রে ঐ লোকগুলো তাদের সন্তানদের সংস্কৃতি চর্চার সুযোগটুকু করে দিতে পারছেন না। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে জেলা শিল্পকলা একাডেমীর মত এ রকম কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে হয়তো বা মফস্বলে বসবাসকারীরা তাদের সন্তানদের এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংস্কৃতি চর্চার সুযোগটুকু করে দিতে পারতেন। এছাড়া ওয়ার্ড কিংবা ইউনিয়ন ভিত্তিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় যদি কিছু সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র গড়ে উঠত তাহলে ঐখানে বস্তিবাসী থেকে করে শুরু করে সর্বস্তরের সবাই সংস্কৃতি চর্চার সুযোগটুকু ফিরে পেতে পারত তা আমি বিশ্বাস করি। আশা করি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাস ও কুসংস্কার মুক্ত বাংলাদেশ গঠনে আরো একটি ধাপ সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এ ব্যাপারে আমি পূর্ণ আশাবাদ ব্যক্ত করি। অন্যদিকে অসুন্দরভাবে বাঁচার নামই অপসংস্কৃতি। এই অপসংস্কৃতি বর্তমান প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই ধ্বংসের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তাদেরকে নিজস্ব সংস্কৃতির শেকড় সন্ধানে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আমরা আমাদের উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার যদি সংরক্ষণ করতে পারি তাহলে অপসংস্কৃতি রোধ করা সম্ভব হবে। আমাদের কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, জারিসারি, ভাটিয়ালি লোকগাঁথা তথা লোকসংস্কৃতির বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। সুন্দর জীবনযাপন ও সুস্থ বিনোদনের জন্য বর্তমান প্রজন্মকে দেশীয় সংস্কৃতির কাছে যেতে হবে, তা নাহলে তাদেরকে সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সাথে সম্পর্ক শূন্য অপসংস্কৃতির উত্তাল তরঙ্গে ভেসে ভেসে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হতে হবে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তাদেরকে সংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণে সক্ষম করে তুলতে হবে। তাদের মাঝে থাকতে হবে নৈতিক উৎকর্ষের দৃষ্টান্ত। তাহলে তারা অপসংস্কৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। এই অপসংস্কৃতি রোধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও অপরিসীম। শিক্ষকদের এ ব্যাপারে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে। এ ছাড়া ব্যান্ড সংগীত কিংবা পপ সংগীতের পাশের মঞ্চে ফরিদা পারভীনের লালনগীতির সুরধ্বনি যেন বর্তমান প্রজন্মকে উদ্বেলিত করে আমাদের সেই সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে।

এভাবে অপসংস্কৃতি রোধে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এ ধরনের স্বদেশি সংস্কৃতি চর্চার পদক্ষেপ নিতে হবে। আর এই পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আমরা সংস্কৃতিকে ধারণ করে অপসংস্কৃতিকে মূল উৎপাটন করবো সেদিন আর বেশী দূরে নয়। পরিশেষে আমি শুধু এটুকু বলবো আপন গৌরবে বেড়ে উঠুক আমাদের বর্তমান প্রজন্ম এবং আপন মহিমায় বিকশিত হউক বাঙালি

সংস্কৃতি।

লেখক : শিক্ষক, সানোয়ারা উচ্চ বিদ্যালয়

x