রীতা দত্ত : ‘এসো গো জ্বেলে দিয়ে যাও প্রদীপখানি’

অভীক ওসমান

শুক্রবার , ৩১ মে, ২০১৯ at ৭:১২ পূর্বাহ্ণ
64

‘তোমরা যারা বিশেষ তাদের কথা তো মনে রাখবো’ ১৯৭৪ সালের প্রথমার্ধে নিউ ইন্টারমিডিয়েট কলেজের আর্টস ফ্যাকাল্টির প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে কথা দিয়েছিলেন লজিকের তরুণী লেকচারার রীতা দত্ত। তিনি এখন বয়সী, ছাত্র হিসেবে আমরাও বয়সী। একটা পূর্ণাঙ্গ জীবন দিয়ে রীতাদি আমাকে এবং অনেককে মনে রেখেছেন। তার অনেক ছাত্র এখন এমপি, মিনিস্টার, খ্যাতনামা লেখক, আমলা। স্বাধীন বাংলাদেশ আমাদের চোখে সকাল ১১টার রোদের মতো স্বপ্ন, একই সাথে স্বপ্নভঙ্গের ক্ষোভ। অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে পাকিস্তানের সাথে রক্তাক্ত লড়াই করে যে বাংলাদেশ কায়েম হয়েছিল, সেখানে অর্থনৈতিক সমতার কাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হচ্ছিল না। রীতা দত্ত প্রতিভাকে ভালবাসতেন, তিনি মেধাকে ভালবাসতেন, স্টুডেন্ট লিডার, মুজিববাদ, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী, ছাত্র ইউনিয়ন, বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন সবাইকে ভালবাসতেন। ভালোবাসতেন কবি, লেখক, সিলেবাসের বাইরে পড়ুয়া ছাত্রদের।
১.
আমাদের ছিল ৩০০ ছাত্রের সেকশন। আমার রোল নম্বর ২৮২, হেমসেন লেনের বোরকা পরা শ্যামাঙ্গনী তার রোল নম্বর ছিল ২৮৩। আহা কী অনতিতরুণ ভালোলাগা। ক্ষীণাঙ্গী রীতা দত্ত ধৈর্য ধরে ৩০০ জনের রোল কল করতেন। ক্লান্ত হতেন না। লজিক পড়াতেন। চক ডাস্টার ব্যবহার করে আরগুমেন্ট বোঝাতেন। আরগুমেন্ট তো হয় না। জীবনের আরগুমেন্ট তো হয় না। কিন্তু তিনি আমাদের জন্য জ্ঞানার্জনের ও সংস্কৃতি বিকাশের পথ খুলে দিয়েছিলেন। ইন্টারমিডিয়েট কলেজে ছিল তিনটা সংসদ। একটা ছাত্র সংসদ। কলেজে বিজ্ঞানের ছাত্রদের একটা বিজ্ঞান সংসদ ছিল। আর্টসের ছাত্রদের নিয়ে আমরা গড়ে তুলি সাহিত্য সংসদ, এর অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন রীতা দত্ত।
২.
ইন্টারমিডিয়েট কলেজের মূল ভবনে লাইব্রেরি। সেখানেও তার দেখা মিলতো। তিন তলার একটা ছোট রুমে এক অবাঙালি ব্যাচেলর টিচার থাকতেন। সেখানে আমাদের ডেকে চা সিঙ্গারা খাওয়াতেন। তখন মুদ্রাহীন তরুণদের জন্য এটা ছিল এক মধুর আপ্যায়ন। রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন দিদি। তার সাথে মানিক জোড় ইংরেজির লেকচারার স্যুটেড-বুটেড সুদর্শন শিক্ষক অজয় কিশোর হোড়। একবার কাপ্তাইয়ে পিকনিক গেলে অজয় কিশোর হোড় গেয়েছিলেন “কোন এক গাঁয়ের বধূর কথা, শোনাই শোন” এখনও স্মরণে আসে। আমরা তাকেও ভালাবাসতাম।
৩.
অপর্ণা চরণ স্কুল তার জীবন ও সংস্কৃতির ভিত্তিভূমি তৈরি করেছে। শিক্ষা, সঙ্গীত, গার্লস্‌্‌ গাইড সবকিছুই অপর্ণা চরণ। ১৩ জানুয়ারি ২০১৮ সালে অপর্ণা চরণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজের ৯০বছর পূর্তি উপলক্ষে পারিজাত একটি ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। রীতা দত্ত এর সম্পাদক ছিলেন। সম্পাদকীয়তে তিনি গৌরবের সাথে স্মরণ করছেন, ‘১৯২৭ সালে এ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। আমাদের গর্ব বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রথম নারী শহীদ চট্টগ্রামের বীরকন্যা প্রীতিলতা এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন প্রণতি সেন যিনি স্কুলকে গৌরবজনক অবস্থানে নিয়ে এসেছিলেন। অনুমান করা যায় ১৯৫৪ সালে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আমি চতুর্থ শ্রেণিতে এ স্কুলে ভর্তি হই ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে। তারপর টানা সাত বছর এ স্কুলে অধ্যয়ন করেছি এবং শেখার চেষ্টা করেছি যখন যা সুযোগ এসেছে। ক্লাসের পড়ালেখার পাশাপাশি আমার গান শেখা, নাটকে অভিনয়, আবৃত্তি, গাইডিং এ যোগদান (যা এখনো অব্যাহত আছে) সবই এ স্কুল থেকে অর্জন। চারু দিদিমণির কাছ থেকে শিখেছি সেলাই কাজ। চারু দিদিমণি এবং বাসন্তী দিদিমণি গাইডিং এ প্রথম কোম্পানি সর্বোপরি শিখেছি শৃঙ্খলাবোধ, সদাচার আর মানুষকে ভালোবাসার শিক্ষা। (পারিজাত, ২০১৮)
পরে নাসিরাবাদ সরকারি মহিলা কলেজ থেকে ইন্টার ও ডিগ্রি (১৯৬১-৬৫) পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিলোসফিতে মাস্টার্স। শিক্ষকতা জীবনের সূচনা লগ্নে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিকেল সায়েন্সে পুনর্বার মাস্টার্স করেছেন। (নাসিরাবাদ সরকারি মহিলা কলেজ)
৪.
তিনি শিক্ষকতার এ পর্যায়ে নাসিরাবাদ সরকারি মহিলা কলেজেও ছিলেন। সিটি কলেজও পড়িয়েছিলেন। চারুকলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর নিয়েছেন। এখন প্রবর্তক শিশু সদনের ভাইস প্রেসিডেন্ট। রামকৃষ্ণ মিশন সারদা সংঘের সাথে সংশ্লিষ্ট। লেখাটি যখন লিখছি তখন তিনি সারদা সঙ্গীদের নিয়ে ভারত সফরে গেছেন।
৫.
আমি ছাত্রলীগের পাঠচক্র সম্পাদক। পার্টি আমাদের ১০০ বই পড়ার তালিকা দিয়েছিল। রুশ বিপ্লব নিয়ে গত শতাব্দীতে প্রচুর ক্লাসিক সাহিত্য রচিত হয়েছে। তার মধ্যে রীতাদি আমাকে বরিস পলেভয়ের মানুষের মতো মানুষ বইটি পড়তে দিয়েছিলেন। এখনও বইটি আমার প্রিয়তার শীর্ষে। রীতাদি আমাদেরকে রবীন্দ্রনাথ চিনিয়েছিলেন। ফিলোসফি ও পলিটিক্যাল সায়েন্সের ডাবল মাস্টার্সের ছাত্রী। তাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম সাহিত্য পড়েননি কেন। তিনি বলেছিলেন কোন সাবজেক্ট একাডেমিক হলে শ্রদ্ধা হারায়, ভালোবাসা হারায়।’ সেলিব্রেটি শিক্ষক তিনি। শিক্ষার্থীদের অটোগ্রাফ দেওয়ার কথা। কিন্তু তার ঘরে রয়েছে হাজার শিক্ষার্থীর অটোগ্রাফভরা অ্যালবাম।
৬.
শুধু কলেজ ক্যাম্পাসে নয়, আমরা তার জলিলগঞ্জের বাসায় চলে যেতাম। বাবার সাথে থাকতেন। টিনশেড বাসা, সামনে নালা। এমনকি ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ছেড়ে চট্টগ্রাম কলেজে যখন পড়ছি। কখনও বন্ধু-বান্ধবী নিয়ে তার বাসায় যেতাম। রাউজানের বিখ্যাত সমাজ হিতৈষী ধর পরিবারের রঞ্জিত ধরের সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয়েছেন। তখন চট্টগ্রাম কলেজের পেছন গেইটের অপজিটে একটা বাসা নিয়েছিলেন। এক দুপুরে গিয়ে আমি হাজির। দিদি টিপিক্যাল নববধূর মতো বললেন “ওদের খেতে দিয়েছিতো তোমাকে বসতে বললাম না। এও কি সম্ভব এই তরুণী তপস্বীনী ঘর বাঁধলেন।
আমাদের অনার্স মাষ্টার্স শেষ হয়, চাকরী হয়। জীবন বহতা নদী। দিদির ঘরে ‘রুরু’ আসলো। রুরু আমাদের সবার প্রিয়। আমরাও তার কাছে প্রিয়। রুরু বড় হয়ে এখন বিদেশে সেটেল্ড। একমাত্র সন্তান রুরুর কথা যখন বলেন, যেন রূপকথার রাজপুত্রের মধুর গল্প শোনাচ্ছেন। রুরু এখন অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। ভ্রমণ ও মা-বাবার মতো বই পড়তে ভালোবাসেন। আমাদের তপস্বীনী পুত্র রুরু। দিদির সাথে রনজিৎ ধর আমাদের খুব ভালবাসতেন। তার মোমিন রোডস্থ সবদর আলী বাস ভবন গলির বাসায় গেছি। আমার প্রতিবেশী রীতা দত্ত এখন মোমিন রোডস্থ জেএম প্যারাডাইস ভবনে থাকেন।
৭.
তার সম্পর্কে কিছু লিখতে চাইলে তিনি চরমভাবে নিরুৎসাহিত করেন। বলেন, গভর্নমেন্ট কলেজে কতজন চাকরি করে গেছেন। লিখলে হাসির খোরাক হয়ে যাবে। অথচ তিনি নিজেও জানেন না এই নগরে এই দেশে এই মমতাময়ী মানবী লাখো শিক্ষার্থীর ‘মেন্টর’ হয়ে রয়েছেন হৃদয়ে। যার ফলে ৪৫ বছর পরেও তাকে স্মরণ-অনুসরণ দুটোই করা হয়।
অতিকথনে বলি, সামজিকতায়-মানবিকতায় সেবায় সাংস্কৃতিক বিকাশে তিনি একমেবাদ্বিতয়ম। সেকেন্ড গড খ্যাত চিকিৎসক ডা. দেবী শেঠীকে জিজ্ঞেস করা হলে- তার অনুপ্রেরণা কি। উত্তরে বলেছেন, মাদার তেরেসা।
মাদার তেরেসা, সিস্টার নিবেদিতা, বেগম রোকেয়া, তারা কি রীতা দত্তের আদর্শ। কল্পনা দত্ত, প্রীতিলতা ওয়েদেদ্দার-তার অন্তরে সংগ্রামের বীজ-বুনে দিয়েছেন। তিনি সংসারী না সন্ন্যাসী, তিনি কি শুভ্রবসনা নান্‌। এই উত্তরগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিনিও দেবেন না। এক আকস্মিক মধ্যাহ্নে আমি তাকে দেখেছি শতবর্ষের সন্ত-বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর বাসায়। তাকে নার্সিং করছেন। নিকট অতীতে আরেক মধ্যাহ্নে তাকে দেখলাম শহীদ মিনারে একাত্তরে জননী রমা চৌধুরীর শবদেহের শ্রদ্ধাঞ্জলির ব্যবস্থাপনায়।
৮.
ইন্টারমিডিয়েট কলেজের সুকণ্ঠ লেকচারার বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে জ্ঞানগর্ভ তরুণ কণ্ঠ ভাষণ। এমন কি ধর্মাচারী তিনি, সনাতন ধর্মের কি চমৎকার আধুনিক ব্যাখ্যা দেন। সাহিত্য ইতিহাস ঐতিহ্য পুরান বেদ-গীতা থেকে। সম্পূর্ণ অসম্প্রদায়িক রীতা দত্ত। নেপথ্যে নিজের মুদ্রায় সংবর্ধনা ফুল ক্রেট নেবার যুগে তাকে জেলা প্রশাসন, গার্লস গাইডস বহুজন প্রকৃত সম্মাননা দিতে চেয়েছেন। তিনি নিস্পৃহ দৃঢ়তায় প্রত্যাখ্যান করেছেন।
৯.
দার্শনিক ও চিন্তক হবার যোগ্যতা তার ছিল বা আছে। হয়ে উঠতে পারতেন চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে একজন সরদার ফজলুল করিম। হতে পারতেন রওনক জাহানের মতো রাষ্ট্র বিজ্ঞানী, রাজনীতি বিশ্লেষক। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে তিনি তা হননি। নগরীর শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার শীর্ষজন তিনি। তীব্র তীক্ষ্ণ তরুণ কণ্ঠে বক্তৃতা করেন রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, ঠাকুর রামকৃষ্ণ, সারদা দেবীর উপর। ন্যায় ও সাম্যের আন্দোলন ও সংগ্রামে শিক্ষার্থীদের ভালোবাসছেন। পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন।
ধারণা করা হচ্ছে তিনি স্কুল জীবন থেকে লেখালেখি করতেন। অবসর গ্রহণের পর থেকে এখনো পর্যন্ত লিখে যাচ্ছেন। দর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরক্ত রীতা দত্ত। তার নিখিল জীবনের চিন্তা ও মেধার প্রতিফলন সম্পূর্ণরূপে লেখালেখিতে আলোকসম্পাত হয়নি। গরিষ্ঠ ক্ষেত্রে ফরমায়েশি লেখাই তিনি বেশি লিখেছেন। ফলে ছাত্র ও ভক্তদের তৃষ্ণাটা রয়েই গেল। প্রিয় পাঠক, এবারে আমরা তার লেখালেখির প্রদর্শনী পেশ করবো।
ক. মুক্তিযুদ্ধ ও স্বদেশ ভাবনা
দেশকে স্বদেশ ভাববার যে-প্রক্রিয়ার কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন সেখানে আমাদের পৌঁছতে হবে। তাঁর মতে, ‘দেশে জন্মালেই দেশ আপন হয় না। নিজের সমস্ত ধন-প্রাণ-মন দিয়ে দেশকে যখনই আপন বলে জানতে পারব তখনই দেশ আমাদের স্বদেশ হবে।’ তিনি আরও বলেছেন : ‘মানুষ আপন দেশকে সৃষ্টি করে। আমাদের দেশ মানুষ জন্মাচ্ছে মাত্র, দেশকে সৃষ্টি করে তুলছে না। দেশের অনিষ্টে তাদের প্রত্যেকের মধ্যে অনিষ্টবোধ জাগে না। দেশকে সৃষ্টি করার দ্বারা দেশকে লাভ করার সাধনা আমাদের ধরিয়ে দিতে হবে।’ এই স্বদেশবোধের ভাবনায় আমাদের উজ্জীবিত হতে হবে। (নারীকণ্ঠ বর্ষ-৪, সংখ্যা-২৪, অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৪২৪)
খ. তোমার পতাকা যারে দাও
একজন লাতিন দার্শনিক বলেছিলেন, ‘আমাদের স্বপ্ন দেখতেই হবে, কেননা স্বপ্ন না দেখলে আমরা কখনো জেগে উঠতে পারব না।’ ইদানীংকালে আমাদের জেগে ওঠা তরুণ প্রজন্মকে দেখে আমরা গভীর আশান্বিত হয়েছি- এরাই যে আদর্শের জন্য আমাদের সুমহান মুক্তিযুদ্ধ, সেই আদর্শগুলো বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর আর তাদের চালিকাশক্তি হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আমাদের তরুণরা প্রতিভাদীপ্ত দ্যুতি ছড়ানো হীরের টুকরা। কিছুটা অস্থির তবে আদর্শিক এবং জিগীষাতুর। একটি সার্থক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন ও পালন, সকল ধরনের বৈষম্যের অবসান এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চায় তাদের উপর দিলাম আমাদের সকল নির্ভরতার চাবি। (চট্টগ্রাম একাডেমি স্বাধীনতার বইমেলা’১৮)
গ. এসো গো জ্বেলে দিয়ে যাও প্রদীপখানি
ধর্মাচারি রীতা দত্ত লিখছেন, গীতায় বলা হয়েছে, ‘নয়মাত্মা বলহীনের লভ্য।’ দুর্গাপূজা সেই শক্তিরই পূজা। পূজা-উপাসনার মূল তত্ত্বই হলো আত্মজাগরণ, আত্মবিশ্লেষণ। পূজার প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের মনুষ্যত্বের উদ্বোধনের অঙ্গীকার, এর প্রতিটি মন্ত্রে আমাদের ব্যক্তি জীবনের মঙ্গলবার্তা উচ্চারিত। দুঃখের বিষয়, আমরা কজনই বা এ-কথা বুঝতে চেষ্টা করি! এ-শতকে আমরা এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছি যেখানে মানুষ আছে, মনুষ্যত্ব নেই, বাহুবল আছে, চরিত্রবল নেই, পরিশীলিত জীবনচর্চা আছে, কিন্তু কোনও মহৎ জীবনদর্শন সেই, চিৎকার আছে, চিন্তা নেই, আস্ফালন আছে, কিন্তু আনন্দ নেই। উন্নত বুদ্ধির জোরে অসম্ভবকে সম্ভব করেছি, কিন্তু সেই সঙ্গে অন্তরশক্তির মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা করিনি। অটুট নৈতিক সংকল্পে মনুষ্যত্বের ফসল ফলাতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি আমাদের আচরণে, চিন্তায়, চেতনায়। এর ফলে এক নিঃশব্দ পশ্চাদপসরণ ঘটে চলেছে পশুত্বের দিকে। (নারীকণ্ঠ, বর্ষ-৬, সংখ্যা-২৯, নভেম্বর-ডিসেম্বর ২০১৮)
ঘ. এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে
সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ। তিনি “গজদন্ত মিনারের” কবি ছিলেন না । নিরন্তর কাব্য সাধনা ও সৌন্দর্য সুধা পান করে তিনি দিন কাটান নি। তাঁর বিপুল পরিমাণ রচনা ও সৃষ্টিকর্মের মধ্যেও দেশের তথ্য সারা বিশ্বের মানুষের দুঃখ দুর্দশা ও তার যাবতীয় সমস্যাবলী নিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করেছেন, এত কথা বলেছেন যে ভাবলে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। তাঁর স্বদেশ ও বিশ্ব ভাবনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাধারণ মানুষ। দেশের নিরন্ন গরীব চাষী ও শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ কষ্ট, শোষণ, অত্যাচারের প্রতিবাদ সারাজীবন তাঁঁর কন্ঠে যে ভাবে ধ্বনিত হয়েছে তার তুলনা নেই। মানুষই ছিল তার আরাধ্য দেবতা। মানুষই তাঁর তীর্থ। তিনি ছিলেন গভীর মানবতাবোধে তাড়িত, কোন গণ্ডিবদ্ধ ধর্ম দিয়ে প্রতারিত নন। রবীন্দ্রনাথ আজীবন মানুষকে ধর্মীয় রঙে রঞ্জিত করে দেখেন নি। কোলকাতায় একবার হিন্দু মুসলমানদের দাঙ্গা হয়েছিল। সে সময় কবি জোড়াসাঁকোতে ছিলেন। ভীতসন্ত্রস্ত মুসলমানরা তাঁর বাড়িতে প্রাণভয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। সে সময় গভীর মনোকষ্টে কবি লিখেছিলেন, “এই মোহমুগ্ধ ধর্ম বিভীষিকার চেয়ে নাস্তিকতা অনেক ভালো।” কবিতায় তিনি লিখেছেন, “হে ধর্মরাজ, ধর্মের বিকাশ নাশি, ধর্ম মূঢ়জনে বাঁচাও আসি।” সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষ তিনি প্রকাশ করেছেন এভাবে, “মানুষ খাটো হয় তখন যখন সে অন্যের সাথে মিলিত হতে পারে না। পরস্পর মিলিয়া যে মানুষ, সে মানুষই পুরো মানুষ। একলা মানুষ টুকরো মাত্র”। তিনি পেয়েছিলেন মানব ধর্মের নির্যাস। (দৈনিক আজাদী, শুক্রবার , ১০ মে, ২০১৯)
ঙ. মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য
মাত্র ২২ বছর তাঁর সৃষ্টিকাল। এ সময়ের মধ্যে মননশীলতার এমন কোন দিক নেই যেখানে তাঁর প্রতিভার স্ফূরণ ঘটেনি। কবিতা, গান, প্রবন্ধ, উপন্যাস, অভিভাষণ, সাংবাদিকতা, অভিনয়, কণ্ঠশিল্প। কোথায় নেই তিনি? যদিও তাঁর ব্যাপ্তি কবিতা ও গানে বেশি। মানুষকে ভালোবেসেই তাঁর সৃষ্টি কর্ম। তাঁর জীবন বন্দনা, দেশ বন্দনা, শক্তি বন্দনা, সর্বোপরি মানব বন্দনা সব মিলেমিশে একাকার হয়ে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে স্পর্শ করেছে। যে কোন লেখক তাঁর সমসাময়িক কালের পরিস্থিতিকে ফুটিয়ে তোলেন তাঁর লেখায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দেশের সমস্যা, সঙ্কট নজরুলের সৃষ্টির মধ্যে বিধৃত হয়েছে। যেখানে অন্যায় দেখেছেন, অবিচার, বঞ্চনা দেখেছেন সেখানে তাঁর লেখনী সোচ্চার হয়েছে, তিনি তীব্র প্রতিবাদী হয়েছেন। বিস্ময়কর প্রতিভা তাঁর। তাঁর সাহিত্য কীর্তি বিস্ময়কর। বাংলা সাহিত্যে আর কোন কবি এমন বিদ্রোহাত্মক ভাব ফুটিয়ে তুলতে পারেন নি। দেশের জন্য, মানুষের জন্য এমন বিদ্রোহ আর কে করেছিল? কে অসংকোচ প্রকাশের এমন দুরন্ত সাহস দেখিয়েছেন, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে এমন উদ্বেলিত হয়েছেন কে? পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচন, শেকলকে বিকল করার মন্ত্র, পদাঘাতে তালা ভাঙবার আহ্বান, বন্দিশালায় আগুন জ্বালাবার আদেশ আর কে দিতে পারেন নজরুল ছাড়া? জাহান্নামের আগুনে বসে এমন পুষ্পের হাসি আর কে হাসতে পেরেছেন? আবার পাশাপাশি মানুষের সুকুমার বৃত্তি-প্রেম, বিরহ দেশ বন্দনা, প্রকৃতি বন্দনা তাঁর লেখায় স্থান পেয়েছে। বিদ্রোহী কবিতার একটি পংক্তি, ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য’ তাঁর সমস্ত সাহিত্য-কীর্তির নির্যাস। তিনি লিখেছেন, আমার সুর সুন্দরের জন্য, আর তরবারি সুন্দরের অবমাননা করে যে অসুর, সে অসুরের জন্য। (দৈনিক আজাদী, ২৯ মার্চ, ২০১৯)
চ. বুকরিভিউ : গাধাকাহিনি
তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় কালো রং এর মহিমা বুঝাবার জন্য তাঁর “কবি” উপন্যাসে লিখেছেন,“কালো যদি মন্দ হয় কেশ পাকিলে কান্দ কেন”? প্রচলিত কথা,“কালো জগতের আলো”, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘কৃষ্ণকলি”কবিতায় লিখেছেন “কালো সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ”তবে কালো রং নিয়ে মাঝে মাঝে বিড়ম্বনায় পড়ার বিষয় তিনি উল্লেখ করে লিখছেন,বিড়ম্বনায় পড়ে যাই সাদা হয়ে যাওয়া কালো চুল নিয়ে । অবশ্য কলপের বদৌলতে এখন মাথায় কালো চুল খুব দেখা যায় না। রাস্তায় সচরাচর মা মেয়েকে একসাথে দেখে বুঝবার কোন উপায় নেই কে মা, কে মেয়ে। সবার মাথা “চির হরিৎ অঞ্চলে” পরিণত হয়েছে। লেখকের আরেকটি সরস রচনা ”আনন্দ”। “আনন্দ” শব্দটি আপেক্ষিক। আনন্দের অনুভূতি সবার এক রকম নয়। আমরা নানাভাবে আনন্দ পাই।কেউ গান শুনে আনন্দ পায়, কেউ কবিতা পাঠে আনন্দ পায়, কেউ ভালো খাওয়া দাওয়া পেলে আনন্দ পায়। কেউ অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায়। কি বিচিত্র মানুষের আনন্দানুভূতি! কেউ কষ্টে পড়লে অন্যরা হেসে কুটি কুটি হয়, সমাজে এ ধরনের বহু ঘটনা ঘটে থাকে। লেখক উল্লেখ করেছেন তাঁর জীবনের অনুরূপ একটি ঘটনা। একবার তিনি বাসে সিট না পেয়ে হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে তিনি সামনের দিকে উপর হয়ে পড়ে গেলেন। বাসের যাত্রীরা সবাই হেসে উঠলো। তিনি যে কষ্ট পেলেন সে বিষয়ে তাদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। এই হলো আমাদের মানবিকতা ! (দৈনিক আজাদী, ১২ এপ্রিল, ২০১৯)
১০.
আচার অনুষ্ঠানের ভিড়ে, পথ চলিতে। মোমিন রোড, কদম মোবারক, জামাল খান, প্রেস ক্লাব, শিল্পকলা, মুসলিম হল, বইমেলা সকাল কি দুপুর তরুণ রাতে রীতা দত্তের সাথে দেখা হয়। “কি ওসমান, কেমন আছো”। আজো সতেজ সবুজ, আজো সুকণ্ঠী কুশল বিনিময়ে। তোমার বউ, ছেলেরা কেমন আছে। দিদি, সময়টা বড়ো নিষ্ঠুর। সময় বয়সী হয়ে যায়। কিন্তু ভালোবাসার কণ্ঠ থাকে তরুণ। ঐ যে আমি আপনার সাথে স্টেজে থাকলে বলি, “রীতা দত্ত, আমার মাতৃরূপেন সংস্থিতা…”।
আপনার ভালোবাসাকে, আপনার অন্তর্গত সংগ্রামী চারিত্র শত প্রণাম। শেখর দস্তিদারের শবদেহ দর্শনে দেওয়ানজী পুকুরপারে সকালে ফুল নিয়ে হাজির আমাদের দিদি। শেখর তার ছাত্র ছিল না, ছিল কলিগ। এইভাবে মানুষের জন্ম-মৃত্যু-আনন্দ-বেদনার সাথে ও সংগঠন সংস্কৃতির সাথে এখনও তার সহযোগ। এই মানব যাত্রা চলেছে শাশ্বত মানবতা অর্জনের অভিমুখে।

x