রিফাত হত্যা ও মানবিক বোধ

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ২ জুলাই, ২০১৯ at ৬:১২ পূর্বাহ্ণ
24

‘নয়ন বন্ড ০০৭ গ্রুপ’ এমন নাম শুনতেই কম বয়সীদের থ্রিল অনুভূত হওয়ার কথা। এমন দুর্দান্ত ক্ষমতাশালী তো একদিনে জন্মেনি। ক্ষমতার স্বাদ পেতে পেতে পোক্ত হয়েছে। ক্ষমতার আশ্রয় প্রশ্রয়ে বেড়েছে, দৈত্যকার হয়েছে, তারা ইচ্ছে করলেই অনেক কিছু করতে পারে। এমনকি শত শত মানুষের সামনে দিনে দুপুরে যে কাউকে কুপিয়ে হত্যাও করতে পারে। এমন শক্তি রুখে দেওয়ার মত সাধারণ মানুষের সাহস কোথায় ? মানুষ জানে যে এদের ক্ষমতার বলয় কতদূর! অন্যায় হচ্ছে অপরাধ হচ্ছে খুন হচ্ছে মানুষ এগিয়ে আসে না প্রতিরোধ করে না মানুষ যেটা করে সেটা হচ্ছে ছবি তোলে ভিডিও করে, ফেসবুকে লাইভ দেখায় কেউ কেউ একশন ছবির স্যুটিং দেখে! বরগুনার রিফাত নামক হতভাগ্য যুবকটিকে কুপিয়ে মারল দুইজন আর শত শত মানুষ এই দৃশ্য উপভোগ করল। তার বউটা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে চিৎকার করেছে কেউ এগিয়ে আসেনি। দুইজন যুবককে কি একশত মানুষ থামাতে পারত না ? নাকি মানুষের ভেতরের মানবিক বোধটুকু শেষ হয়ে গেছে। কিছুদিন পর পর এমন সব ভয়ংকর ঘটনাগুলো আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় যেন মনে হয় আমরা কোন মগের মুলুকে বসবাস করছি। আইন আছে কি নেই বোঝা যায় না। বিচার তো নেই-ই। বিভীষিকাময় এক একটা রাত পার হতে না হতে দুঃসহ দিনের শুরু! নুসরাতের পোড়া গন্ধে বাতাস এখনও ভারী হয়ে আছে।
অপরাধীদের ভার বহন করার লোক ক্ষমতাবান হওয়াতে তারা ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এই সব বর্বরতা নৃশংসতা মানুষের গা সওয়া হয়ে গেছে। খুন খারাবীর জন্য ফেসবুক গ্রুপ হয়, সিদ্ধান্ত হয় কখন কিভাবে কাকে মারবে। কিরিচ দিয়ে মারবে না রাম দা দিয়ে মারবে! দেশে যত পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ঘটছে তার পেছনে রয়েছে ক্ষমতার ছায়া। যার কারণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে অপেক্ষায় থাকতে হয়, দ্বিধায় থাকতে হয় এই অপরাধীকে ধরা যাবে কিনা। আরও একটা ব্যাপার লক্ষ্য করার মত খুনি আসামিকে ধরতেও প্রধানমন্ত্রীকে নির্দেশ দিতে হয়। প্রধানমন্ত্রীকে কেন নির্দেশ দিতে হয় তা বুঝে উঠতে পারি না। হামলাকারীরা চিহ্নিত অপরাধী। তাদের বিরুদ্ধে সাত আটটি করে মামলা আছে। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করলেও মূল আসামিকে ধরতে পারে নি। হাইকোর্টের একজন বিচারপতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন রাস্তায় প্রকাশ্যে এভাবে কুপিয়ে হত্যা করল অথচ স্ত্রী ছাড়া তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসল না। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল, এটা আমাদের জনগণের ব্যর্থতা। দেশের মানুষ তো এমন ছিল না। সামাজিকতা এখন কোথায় দাঁড়িয়েছে ? আদালত আরও বলেন জনগণকে কি বলবো জনগণের বিষয়ে কি আদেশ দেব ? রাজপথে একজন মানুষকে দিনের বেলায় এভাবে কুপিয়ে মারলো আর পাশের মানুষ সবাই তামাশা দেখছে। পাঁচজন লোকও আসল না বাধা দিতে। বুঝলাম সন্ত্রাসীরা ভয়ঙ্কর। তারপরেও তো মানুষ এগিয়ে আসতে পারত। – সূত্র : মানবজমিন
অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার নৈতিক মনোবল হারানো মানেই বর্বরতা আর অরাজক পরিস্থিতিকে মেনে নেওয়া। দুর্বৃত্তের দাপটের কাছে আত্মসমর্পণ করা। মানুষ কোথায় কার কাছে জিম্মি হয়ে আছে ?
রিফাতের এই হত্যাকাণ্ড ২০১২ সালের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বিশ্বজিৎকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনা মনে করিয়ে দেয়। শুধু সাধারণ মানুষ নয় রিফাত হত্যা ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে উচ্চ আদালতও। একই ঘটনায় খুনিরা যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে সে জন্য পুলিশকে তৎপর থাকার নির্দেশও দিয়েছেন।
দুই মাস আগে রিফাত আর আয়েশার বিয়ে হয়েছে। সাব্বির ওরফে নয়ন আয়শাকে দীর্ঘদিন দিন ধরে উত্ত্যক্ত করছিল। সে বরগুনা কলেজের ছাত্রী। রিফাত তার প্রতিবাদ করাতে তাকে হুমকিও দিয়েছিল প্রাণে মেরে ফেলার। শুধু তাই নয়, আয়শাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল। ঘটনার দিন রিফাত তার স্ত্রীকে কলেজ থেকে আনতে গিয়েছিল। ওখানেই ওঁৎপেতে থাকা খুনিরা রিফাতকে এইভাবে প্রকাশ্যে খুন করলো।
এসব ঘটনা বন্ধ হবে না যদি প্রশাসন শক্ত না হয় এবং আইন প্রয়োগের স্বাভাবিক ব্যবস্থা কার্যকর না হয়। এ অবস্থা থেকে আমাদের বের হওয়া জরুরি।
সত্যিকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সমাজের এই পতন আর ঠেকানো যাবে না।

x