রিফাতের পর আপনি না তো?

মাধব দীপ

মঙ্গলবার , ২ জুলাই, ২০১৯ at ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ
47


“First they came for the Communists,/ and I didn’t speak up,/ because I wasn’t a Communist./ Then they came for the Jews,/ and I didn’t speak up,/ because I was not a Jew./ Then they came for the Catholics,/ and I didn’t speak up,/ because I was a Protestant./ Then they came for me,/ and by that time there was no one/ left to speak up for me.” -Friedrich Gustav Emil Martin Niemoller

ক্রমেই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে কুপিয়ে হত্যার মিছিল। পুড়িয়ে হত্যার মিছিল। জীবনভর পঙ্গুত্ব বরণের হাহাকার। শিক্ষক, লেখক, শিক্ষার্থী, নিরপরাধ পথচারী, সাধারণ মানুষ, ব্লগার, প্রকাশক, বিদেশি নাগরিক, ইমাম, ভিক্ষু, খাদেম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, ধর্মযাজক, শিশু কেউ-ই বাদ যাচ্ছে না! আর এর সঙ্গে ভিতরে-ভিতরে ‘খুন’ হচ্ছি আমরা। আমরা মানে, এই ভূখণ্ডকে যাঁরা ভালোবাসি, তাঁদের সবাই।
ছোটবেলায় পড়তাম- অত্যাচারী চিরকালই ভীরু। এখন দেখছি- অত্যাচারী হয়েও একের পর এক খুন করে দুর্বৃত্তরা আরও বেশি বেপরোয়া, নৃশংস ও দুঃসাহসী হয়ে উঠছে! ছোটোবেলায় পড়তাম- যেমন কর্ম তেমন ফল। এখন দেখছি কোনো খারাপ কর্ম না করেও মানুষ প্রকাশ্য দিবালোকে ‘নাই’ হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় ফুটপাত ধরে হাঁটতে গেলে পেছন থেকে এসে ট্রাক পিষে মারছে। ফ্লাইওভারের গার্ডার ভেঙে পড়ছে, নির্মাণাধীন ভবনের ইট-খোটায় নিরপরাধ পথচারীর প্রাণ যাচ্ছে।
সাহিত্যিক মৈত্রেয়ী দেবী বলেছিলেন, ‘সমাজসেবা অর্থ নিজেরই সেবা। সমাজের মঙ্গল অর্থ নিজেরই মঙ্গল।’ মহৎ এই উক্তি সাধারণভাবে আমরাও জানি এবং বুঝি। কিন্তু যখন দেখি- সমাজের নানা পেশায় থেকে সেবা ও মঙ্গল করার মাধ্যমে যখন একজন মানুষ সমাজের চোখের মণি হওয়ার কথা, তখন সমাজে হয়ে পড়ছেন তিনি বড় একলা মানুষ।
প্রকৃতপক্ষে, লাগাতার বিচারহীনতার সংস্কৃতি ক্রমাগত আমাদেরকে অসুস্থ করে তুলছে। অস্থির করে তুলছে। এই পৈশাচিক কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দুর্বৃত্তরা তাদের রাজত্ব কায়েম করতে চায়। আমাদের চেতনা ও চৈতন্যে ক্রমাগত ভয় ঢুকিয়ে দিতে চায়। কিন্তু, আমি- আমরা- মানে এই সাধারণ মানুষ? কারও সাহস নেই যে চোখের সামনে সংগঠিত কোনো অন্যায়, খুন, হত্যা ইত্যাদিকে বাধা দিই। এমনকি বাধা দিচ্ছিও না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মতো সাহস যে কবেই ভোঁতা হয়ে গেছে! তার বিপরীতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে- ‘এই সমাজে প্রকাশ্যে চুমু খেলে চারপাশের মানুষ চোখ লাল করে তেড়ে আসার মতো করে বাধা দিবে- কিন্তু, চোখের সামনে একটা মানুষকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হলে বাধা দিবে না।’
আমরা আজ এমন আমজনতায় পরিণত হয়েছি যে কিনা বাস ও ট্রেনে চড়তে ভয় পাই! ভাবি- কখন রাজনৈতিক ককটেল আর ঢিল এসে প্রাণ কেড়ে নেয় আমার- কে জানে? কখন দুই বাসের চিপায় পড়ে আমার হাত চলে যায় রাজীবের মতো- কে বলতে পারে? একা একা হাঁটতে ভয় পাই- ভাবি, যদি সন্ত্রাসীর ছোঁড়া গুলি এসে বিদ্ধ হয় আমার বুকে? যদি ফ্লাইওভারের গার্ডার ভেঙে পড়ে হঠাৎ মাথার উপর! আমি আজ সিএনজিচালিত ট্যাক্সি চড়তে ভয় পাই, পাছে কখন এর ফিটনেসহীন সিলিন্ডার ‘বোমা’ হয়ে আমায় উড়িয়ে দেয়- কে জানে? কোন্‌টা ভেজাল ওষুধ আর কোন্‌টা আসল ওষুধ এর কোনো পার্থক্যও আমি করতে পারি না- তাই ভালো হওয়ার জন্য- বাঁচার জন্য- ওষুধ খেতে ভয় পাই।
আমি সেই মানুষে ইতোমধ্যে পরিণত হয়েছি- যে পরিবারসহ রেস্টুরেন্টে যেতে ভয় পাই, কখন কী হয়- কে জানে? আমি কাজে বাসার বাইরে গেলে মা এমনভাবে আমার ফেরার অপেক্ষায় থাকে যে- মনে হয় আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। জানে না তার সন্তান ফিরতে পারবে কিনা। দুর্বৃত্তের ছোঁড়া গুলিতে আমার পেটের বাড়ন্ত সন্তান সিসিইউতে ভর্তি হয়। আমরা রাস্তার পাশে দুর্বৃত্তের হাতের চাপাতিতে লাশ হতে থাকা মানুষের করুণ দৃশ্য উপভোগ করি, ভিডিও করি। আবার ‘হায়’ ‘হায়’ রবও তুলি। অথচ, ভাবি না- আমার পরণিতিও এমন হতে পারে- যেকোনো সময়- যেকোনো দিন। তবুও রক্তাক্ত মানুষটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সাহস করতে পারি না। পাছে- আমাকে যদি জীবনভর পুলিশি হয়রানির মধ্যে পড়তে হয় এই ভয়ে। আহারে ভয়! আহারে পুলিশতন্ত্র! তাই আমি সেই মানুষে পরিণত হচ্ছি যে মানুষের চোখের সামনে কোনো খুন হলে নির্লিপ্ত থাকে এই ভেবে যে- আমার তো কিছু হচ্ছে না!
আমরা আবার সেই মানুষ হয়ে উঠছি- যারা আবার খুব তাড়াতাড়িই পরিস্থিতির সাথে ‘ইউজ টু’ হয়ে যাচ্ছি। কোনো একটা ঘটনা ঘটলো, চ্যানেল বদলে-বদলে সারারাত ধরে দেখলাম, বিরক্তি ঝাড়লাম, ক্ষোভ ঢাললাম সোশ্যাল মিডিয়ায়। পরদিন পত্রিকা পড়লাম, কিছু ম্যাসেজ দিলাম, কিছু কল করলাম- তারপর ভাবলাম- আমার কিছু হয়নি- আমার নিকটাত্মীয় কারও কিছু হয়নি- সুতরাং চুপ থাকাই শ্রেয় এই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দুর্যোগে। আর এরপর সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করি আমার ও আমার আপনজন কারও কিছু হয়নি বলে। এরপর পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করার পরিবর্তে এর সাথে এডজাস্ট হয়ে যাই।
আবার আশ্চর্য গতিতে, বহুমাত্রিক কারণে আমাদের সমাজবোধ ভাঙছে। সমাজ ভাঙছে। মূল্যবোধ ভাঙছে। আমরা ভাঙছি। সামাজিক মানুষ দিনকে দিন একাকি মানুষে পরিণত হচ্ছে। আজ যারা ওইসব হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত- তারাওতো কোনো না কোনো নারীর সন্তান। কারও ভাই। কারও ছেলে। কারও প্রিয়তম। মানুষ হয়ে মানুষ হত্যা- এরচেয়ে বড় বর্বর কাণ্ড আর কী হতে পারে? প্রতিশোধপরায়ণতা কি মানবিক অধিকারের চেয়ে বড়? জীবন ধারণের অধিকারের চেয়ে বড়? এটা তাহলে কোন্‌ শিক্ষা- কেমন শিক্ষা? কিসের লাভ? কিসের লোভ? ঘাতকরা মোটর সাইকেলে চড়ে, আধুনিক সময়ের মোবাইল প্রযুক্তি ব্যবহার করে একমিনিটেরও কম সময়ে নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করে যায়। অন্তরের দিক দিয়ে যে তারা কতোটা পশ্চাৎপদ, অমানবিক ও পশুতুল্য- সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যেখানে বাঁচার অধিকার মানুষের প্রথম ও প্রধান ন্যায্য অধিকার। যখন সেই অধিকার কেউ কেড়ে নেয় এবং আমি, আমরা এমনকি রাষ্ট্রযন্ত্র এর কঠোর বিহিত করতে অক্ষম হই তখন আমাদের সাথে সেই রাষ্ট্রযন্ত্রও কি দায় কখনও কোনোভাবে এড়াতে পারে?
আমরা কি এর জবাব দিতে প্রস্তুত হবো না? আমি, আপনি, আমরা কি মৃত্যুর প্রতীক্ষাতেই থাকবো? আমার কেউ মারা পড়লে তবেই কি এসবের প্রতিবাদে নামবো? কেবল তখনই প্রতিবাদটুকু আমার কাছে জায়েজ মনে হবে? রাষ্ট্রের কাছে জায়েজ মনে হবে? এটা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। হতে পারে না। এমনটা ভাবা যায় না। কারও হাতের রিমোটে আমার মৃত্যু লেখা থাকবে- এমনটা মানা যায় না।

x