রিজোয়ান রাজন’র মূকাভিনয় সাইলেন্স ইম্পসিবল

মেজবাহ চৌধুরী

বৃহস্পতিবার , ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ
29

রাজপথের মূকাভিনয়ের পথিকৃৎ সংগঠন প্যান্টোমাইম মুভমেন্ট চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে এবং ঢাকার জাতীয় নাট্যশালার স্টুডিও থিয়েটার হলে রিজোয়ান রাজনের একক মূকাভিনয় সাইলেন্স ইম্পসিবল প্রযোজনাটি মঞ্চায়ন করে। প্যান্টোমাইম মুভমেন্ট মূলত: প্রগতিশীল রাজনীতির ধারণাপুষ্ট একটি সংগঠন যেখানে মানুষের অধিকার, মূল্যবোধ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে দলগত উপস্থাপনে অধিক আগ্রহী। তথাপি ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো রাজ ঘোষের দ্য আন সার্টেইন ওয়ার্ল্ড প্রযোজনার মধ্য দিয়ে একক মূকাভিনয় পরিবেশনা শুরু করেছিল। পরবর্তীতে সাইলেন্স ইম্পসিবল তাদের দ্বিতীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিয়মিত চর্চার ক্ষেত্র তৈরিতে একক মূকাভিনয়ের উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিয়ে দেশে মূকাভিনয় জাগরণ এবং ধারাবাহিক চর্চায় সংশ্লিষ্টদের উদ্বুদ্ধ করতে চান।
সাইলেন্স ইম্পসিবল প্রযোজনার কুশীলব রিজোয়ান রাজন বাংলাদেশের মূকাভিনয়ে একটি খুব পরিচিত নাম। দীর্ঘ মূকাভিনয় চর্চায় প্রথমবারের মত একক প্রযোজনা নিয়ে হাজির হলেন দর্শক সম্মুখে। সাইলেন্স ইম্পসিবল মোট সাতটি নক্সা মূকাভিনয় রয়েছে। নক্সা মূকাভিনয়গুলোর রচয়িতা হলেন স্প্যানিশ মূকাভিনেতা কার্লোস মার্টিনেজ, ভারতের মূকাভিনেতা পদ্মশ্রী নিরঞ্জন গোস্বামী, স্বপন সেন গুপ্ত, অঞ্জন দেব এবং বাংলাদেশের জয়নুল আবেদীন জয় ও শিল্পী নিজে। কার্লোস মার্টিনেজ ও নিরঞ্জন গোস্বামীর মূকাভিনয় দুটি ছাড়া বাকীগুলো গল্প থেকে মূকাভিনয় রূপ নির্মাণ করেছেন শিল্পী নিজে। নক্সা মূকাভিনয়গুলো হলো দ্য স্টোন, বেলুন ফ্যান্টাসি, কিলার, স্ট্রগল, ডেথ গেইম, লিচু চোর এবং দ্য ম্যাজিশিয়ান। মূকাভিনয়গুলোতে রাজনীতির কোন জটিল সমীকরণ নাই, আছে শুধু নির্মল বেঁচে থাকার আকুল আকুতি। আছে মানবিকতা ও মূল্যবোধ। মূকাভিনয়গুলো বাস্তবতা আর ফ্যান্টাসির মিশেলে হয়ে ওঠেছে নাটকীয়। মূকাভিনয়ের সহজ, সরল কৌশলগুলোকে শিল্পী রিজোয়ান রাজন মূকাভিনয়ের সার্বজনীনতার আশ্রয়ে উপস্থাপন করেছেন। উপস্থাপনা স্টাইলে রাজন পশ্চিমা ধারণাকে লালন করেছেন সম্পূর্ণভাবেই। এ ব্যাপারে তিনি বলেন আমাদের দল “ মূকাভিনয় চর্চায় আন্তর্জাতিকতায় বিশ্বাসী।” তবে আমরা বাংলার মাটিতে দাড়িয়ে আধুনিক বিশ্বকে দেখতে চাই বাংলার সংস্কৃতিকে ধারণ করে। আমাদের দলীয় প্রযোজনায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছি। বাংলার হাজার বছরের নাট্য ঐতিহ্যকে মূক প্রযোজনায় ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমার প্রস্তুতি চলছে। ঢাকার স্বপ্নদল তাদের জাদুর প্রদীপ প্রযোজনায় বাংলা নাট্যরীতির বর্ণনাত্মক ধারাকে সফলভাবে ব্যবহার করেছেন।”
রিজোয়ান রাজনের প্রদর্শিত মূকাভিনয়গুলোর মধ্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লিচু চোর কবিতার মূকাভিনয়টি শিশুতোষ সারল্য এবং আনন্দ বেদনার এক দৃশ্যকাব্য। এখানে শিল্পী কিশোর বয়সের দূরন্তপনা, ঘুড়ি ওড়ানো, অপরের বাগানের লিচু চুরি করা ইত্যাদি বিষয়কে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। গল্পের শেষে ধরা পড়া এবং শাস্তি পাওয়ার মধ্য দিয়ে নৈতিকতা তুলে ধরা হয়েছে। স্ট্রাগল মূকাভিনয়টি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার ও জীবন সংগ্রামকে উপজীব্য করে এক আলেখ্য। এখানে হতভাগ্যবাবা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে দিনশেষে ঘরে ফিরে দেখে তার শিশু আর বেঁচে নাই। মৃত শিশুর নিথর দেহ আর বাবার আর্তনাদ যেন একাকার হয়ে দর্শক হৃদয়েও ঝাকুনি দিয়ে যায়। সাইলেন্স ইম্পসিবল এর অন্যরকম ভাল লাগা একটি পরিবেশনা হলো দ্য ম্যাজিশিয়ান। একজন ম্যাজিশিয়ান দর্শকদের জাদু দেখাতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হয়। ব্যর্থতাগুলোই দর্শকদের আনন্দের খোরাক হয়। পরিশেষে ম্যাজিশিয়ান তার সহযোগীকে শূন্যে ভাসাতে সফল হলেও আর নীচে নামিয়ে আনতে পারে না। বরং তার সহযোগী শূন্য থেকে ক্রমেই উর্দ্ধকাশে মিলিয়ে যায়। প্রাণান্তকর চেষ্টা করেও ম্যাজিশিয়ান ব্যর্থ হয় সহযোগীকে নামাতে। ব্যর্থ ম্যাজিশিয়ান চোখের জল মুছে শূন্যে হাত নেড়ে বিদায় জানান তার দীর্ঘদিনের সহযাত্রী সহযোগীকে। এভাবেই প্যান্টোমাইম মুভমেন্ট প্রযোজনা সাইলেন্স ইম্পসিবল এর সমাপ্তি ঘটে। শিল্পীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম একক চর্চায় এলেন কেন? রিজোয়ান রাজন বলেন বিশ্বব্যাপী মূকাভিনয়ের একক ধারাটি বেশ গতিশীল। প্রযোজনা নিয়ে খুব সহজেই মুভ করা যায়। ঘরের মধ্যেই মহড়া করা যায় পরিবারের সহযোগিতায়। মঞ্চে একা অভিনয় করলেও চার/পাঁচজনের টীম কাজ করে সমগ্র প্রযোজনাটিকে ঘিরে। তবে খুব চ্যালেঞ্জিং মঞ্চে দীর্ঘ সময় অভিনয় করা। আমি এই কাজটির সাথে ক্রমেই একাত্ম হয়ে ওঠছি। আগামীতে আরও স্বত:স্ফূর্ততা নিয়ে মঞ্চে হাজির হবো। শিল্পী রিজোয়ান রাজন এভাবেই নিজেকে তুলে ধরলেন অকপটে । প্রযোজনাটি দর্শক সারিতে বসে উপভোগ করেছেন নাট্যজন ঝুনা চৌধুরী। তিনি রাজনের অভিনয়ের প্রশংসা করে বলেছেন অভিনয়ের পরিমিতিবোধ, গল্প নির্মাণ, দর্শকের সাথে সংযোগ সব মিলে মেধাবী অভিনয় দেখলাম। স্বপ্নদলের নাট্যকর্মী ও অধ্যাপক জুয়েনা শবনম লিখি বলেন অনেকদিন পর একটি চমৎকার মূকাভিনয় প্রযেজানা দেখে মনে হলো জীবনের না বলা কথাগুলো কত সহজে মূকাভিনয়ে বলা যায়। প্রকৃত অর্থে না কথা বলার এই শিল্পটি যুগে যুগে এভাবেই তার শিল্পের সৌন্দর্য বিলিয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে আর সার্বজনীনতার মুগ্ধতা ছড়িয়েছে মঞ্চ থেকে রাজপথে।
প্যান্টোমাইম মুভমেন্টের এই প্রযোজনাটি বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশানের সহযোগিতায় মঞ্চস্থ হয়। প্রযোজনার শুরুতে ফেডারেশানের চেয়ারম্যান জাহিদ রিপন উপস্থিত সকলকে স্বাগত জানান এবং প্রযোজনা শেষে শিল্পীকে ফুলেল শুভেচ্ছা প্রদান করেন।

x