রিজিয়া রহমান

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ২৭ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ
24

তরুণ বয়সে একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি যখন অন্য পড়ার দিকে ঝোঁক বাড়লো তখন প্রধান অবলম্বন ছিল দুটি সাপ্তাহিক সাময়িকী; বিচিত্রা ও সচিত্র সন্ধানী। বেশ ক’টি গ্রন্থ বিপণি থাকলেও ঐ বয়সে স্বভাবতই হাতে পয়সা পাতি থাকার কথা নয়। বাসায় নিয়মিত বিচিত্রা সাময়িকীটি রাখা হতো। দুই ঈদ এবং অন্যান্য জাতীয় দিবসে বিচিত্রার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হতো। দুই ঈদ সংখ্যার অপেক্ষায় থাকতাম রিজিয়া রহমানের লেখা উপন্যাসের আশায়। অনেক ভালোবাসা নিয়ে তাঁর উপন্যাসগুলো পড়তাম আর প্রতিবারই নিত্য নতুন অভিজ্ঞতার স্বাদ পেতাম।
সাধারণত মহিলা কথা সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ঘরোয়া বা পারিবারিক বিষয়কে অবলম্বন করে তাঁদের লেখালেখি আবর্তিত হয়। সামাজিক নানা জটিলতা পারিবারিক নানা ঘাত প্রতিঘাত তাঁদের সাহিত্যের উপজীব্য। তুলনায় রিজিয়া রহমানের রচনা নারীবাদিতা থেকে মুক্ত। এ ধরনের তাঁর কোনো লেখা পড়েছি বলে মনে পড়ে না। তাঁর লেখা বৃহত্তর পরিবেশ ও পরিসরের জাতিক কিংবা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল কেন্দ্র করে রচিত। নারীবাদিতার বিষয়টি রিজিয়ার ‘রক্তের অক্ষর’ উপন্যাসে এলেও তা এসেছে বিশাল এক প্রেক্ষাপটে। যৌনবৃত্তি অবলম্বনে বাধ্য হওয়া নারীদের অসহায়তার পাশাপাশি এই বৃত্তির নেপথ্যের বিবিধ ঘটনা, সামাজিক সংশ্লিষ্টতা ও উপেক্ষার এত বিশ্বাসযোগ্য ও অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ উপস্থাপনা খুব কম লেখাতেই এসেছে।
তেমনি তাঁর আরেকটি উপন্যাস ‘সূর্য সবুজ রক্ত’, যেটির উল্লেখ তাঁর মৃত্যুর পর কোনো পত্র পত্রিকায় কেন যেন দেখলাম না, অসাধারণ একটি সৃষ্টি। চা বাগান নিয়ে এত চমৎকার ডকুমেন্টেশন সমৃদ্ধ উপন্যাস মনে হয় আর লেখা হয় নি।
উপন্যাস ‘বং থেকে বাংলা’ রিজিয়া রহমানের আরেকটি অবিস্মরণীয় কাজ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে রচিত এ উপন্যাসে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণের সংগ্রাম ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি তাদের সহমর্মিতার চিত্রটিও উঠে এসেছে। বাঙালি জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামের ঐতিহাসিক বিবর্তনের আখ্যান ‘বং থেকে বাংলা’।
রিজিয়া রহমান তাঁর লেখায় ঘটনার সংশ্লেষণ বিশ্লেষণের পাশাপাশি অনুপুঙ্খ ডিটেলস ও বিশ্বস্ত ডকুমেন্টেশনের ওপর জোর দিতেন বেশি। ফলে তাঁর গল্প, প্রবন্ধ, শিশু সাহিত্য, উপন্যাস প্রতিটি কেবল মাত্র কথা সাহিত্য হয়ে থেমে থাকে নি, হয়েছে সম্পৃক্ত আখ্যানের দলিল।
বাংলা সাহিত্যে এ রকম বলিষ্ঠ লেখক আরেকজন আমরা পেয়েছিলাম, তিনি মহাশ্বেতা দেবী। নারীসুলভ কমনীয়তাকে অবলীলায় সরিয়ে রেখে দাপটের সঙ্গে কাজ করে গেছেন সমাজ পারিপার্শ্বিকতার নানা বিশৃঙ্খলার বিপক্ষে। মহাশ্বেতা সাহিত্য রচনার পাশাপাশি সমাজ কর্মেও অংশ নিয়েছেন। রিজিয়া রহমান অবশ্য প্রকাশ্যে কম এসেছেন। কিন্তু কলমকে সত্যিকার অর্থেই অস্ত্র করে নিয়েছিলেন। তাঁর লেখাগুলোতে প্রতিবাদের ভাষা সে অর্থে সোচ্চার হয়ে আসেনি বটে, কিন্তু প্রতিটি সমস্যা, অনিয়ম, অনীতি, দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা তিনি পাঠকের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন প্রতিবার।
আমাদের দেশের তাঁত শিল্প নিয়ে তাঁর চমৎকার উপন্যাস ‘আবে রাওয়াঁ’। এই উপন্যাসে তিনি আমাদের বিপর্যস্ত এই শিল্পের অতীত ঐতিহ্য ও বর্তমান সমস্যার চিত্র অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে তুলে এনেছেন।
তেমনি আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে তাঁর আরেকটি অসামান্য উপন্যাস ‘আলবুর্জের বাজ’। অসাধারণ এই উপন্যাসে তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ বিগ্রহ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির মারপ্যাঁচজনিত কারণে সৃষ্ট উদভ্রান্ত এক সময় ও পরিবেশকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ডিটেলস ও ডকুমেন্টেশনের মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করেছেন।
বৈশ্বিক চিন্তা চেতনায় সমৃদ্ধ মননশীলতায় পরিপূর্ণ এই কথাশিল্পী কল্পনা শক্তির অপরিসীম ক্ষমতার পাশাপাশি অর্জন করতে পেরেছিলেন পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের অসাধারণ ক্ষমতা। এই ক্ষমতার গুণে ঘরকে যেমন বাইরে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন, তেমনি বাহিরকে ঘরে আনতে পেরেছিলেন।
ডিটেলস ও ডকুমেন্টেশনের কথা বার বার বলার কারণ, এই দুটি বিষয় রিজিয়া রাহমানের সৃষ্টিশীলতার মূল উপাদান এবং এর সঙ্গে যুক্ত ছিল তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার শক্তি। কিন্তু এতকিছুর নেপথ্যে যে জিনিসটির প্রয়োজন সেটি হলো গবেষণা। প্রচুর পড়াশোনা করতেন তিনি। তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাতকারে তিনি এ বিষয়ে সব সময় বলতেন। তাঁর পড়াশোনার ক্ষেত্র ছিল সুবিস্তৃত পরিধির এবং অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ। তাঁর প্রত্যেকটি লেখা পড়লেই বোঝা যায় অত্যন্ত গবেষণালব্ধ সেসব রচনা।
একুশে পদকসহ আরো কয়েকটি পদক পুরস্কারে ভূষিত হলেও এ কথাটি সত্যি, যথাযথ সম্মান তিনি পাননি। পদক পুরস্কারতো স্বাভাবিক ব্যাপার একজন সৃষ্টিশীল মানুষের স্বীকৃতির জন্যে। কিন্তু সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সাম্মানিক পদমর্যাদার একটা ব্যাপার আছে যা এ ধরনের শিল্পী সাহিত্যিকদের পৃথিবীর সব দেশেই প্রদান করা হয়ে থাকে।
এ প্রজন্ম রিজিয়া রহমানকে চেনেন না। এ প্রজন্মের পাঠকও তাঁর লেখা পড়ে নি। দোষটা পূর্ববর্তী প্রজন্মের। রিজিয়া রহমানের লেখা পাঠ্যবইতে অন্তর্ভুক্ত হয় নি। তাঁর লেখা বইগুলোও নতুন করে মুদ্রিত হয় নি। অবশ্য তিনিও দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি করছিলেন না। সব মিলে তিনি সাধারণ পাঠকের অগোচরেই চলে গিয়েছিলেন। এটা তাঁর চাইতেও আমাদের জন্যে দুঃখজনক।
রিজিয়া রহমান লিখে গেছেন তাঁর আত্মজীবনী ‘নদী নিরবধি’। অত্যন্ত সুলিখিত এই গ্রন্থে অনেক কথাই তিনি অকপটে বলে গেছেন সচরাচর যা দেখা যায় না। প্রচার প্রচারণার অলক্ষ্যেই থাকতে পছন্দ করতেন। মৃত্যুর পর মরদেহ নিয়ে মাতামাতি করতে নিষেধ করে গিয়েছিলেন। যে কারণে অত্যন্ত সাধারণভাবে ১৭ আগস্ট তাঁকে দাফন করা হয়। সে অনুষ্ঠানে শিল্প সাহিত্য জগতের হাতে গোনা কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। যদিও রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক জ্ঞাপন করেছেন দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রয়াণে।
রিজিয়া রহমানের জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর কলকাতার ভবানীপুরে। পৈতৃক বাড়ি কলকাতার কাশিপুর থানার নওবাদ গ্রামে। চিকিৎসক পিতা আবুল খায়ের মোহাম্মদ সিদ্দিক ও গৃহিণী মাতা মরিয়ম বেগমের সঙ্গে দেশ ভাগের পর ফরিদপুরে চলে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির স্নাতক ও স্নাতকোত্তর রিজিয়া সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মীজানুর রহমানের সঙ্গে বিয়ের পর অনেকদিন বেলুচিস্তানে ছিলেন। এই অভিজ্ঞতার ফসল উপন্যাস ‘বং থেকে বাংলা’।
দীর্ঘদিন ধরে নানা অসুখে ভুগছিলেন। গত বছর আক্রান্ত হন ক্যান্সারে। একমাত্র পুত্র আবদুর রহমান মাকে সব সময় আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন। তিনি কর্পোরেট কর্মকর্তা এবং উচ্চ শিক্ষিত। রিজিয়া রহমান মোটামুটি দীর্ঘজীবন পেয়েছেন। এটা আনন্দের। তবে শেষ জীবন সুস্থতায় কাটাতে পারেন নি। ১৬ আগস্ট ২০১৯ এই মহীয়সী লেখকের জীবনাবসান ঘটে।
রিজিয়া রহমানের পেশা জীবনের শুরু ত্রিভুজ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে। জাতীয় জাদুঘরের পরিচালনা বোর্ডের ট্রাস্টি ও জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের কার্যপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেছেন। ছিলেন বাংলা একাডেমির কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে রিজিয়া রহমানের অবদান অবশ্যই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁর সাহিত্যের প্রচার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া অবশ্যই জরুরি। তেমনি বর্তমান প্রজন্মের কাছে অনুরোধ তাঁরা যেন তাঁদের পূর্ববর্তী ও অগ্রবর্তী এই সাহিত্য স্রষ্টাকে জানতে ও বুঝতে আগ্রহী হন। আর দেশের প্রকাশকদের কাছে অনুরোধ রিজিয়া রহমানের সাহিত্যের পুনর্মুদ্রণের। অনুরোধ শিক্ষালয়গুলোর কাছে তাঁর সাহিত্যকে পাঠ্য ও গবেষণার অন্তর্ভুক্ত করে তোলার ক্ষেত্রে উদ্যোগী হওয়ার জন্যে।

x