রিকশা আমার কাছে কৌতূহল-উদ্দীপক

নাজলী লায়লা মনসুর

মঙ্গলবার , ৭ মে, ২০১৯ at ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ
31



দীর্ঘ উনিশ বছর পর এই প্রদর্শনী। এত দীর্ঘ বিরতির কারণ কী ? পূর্ব-ভাবনার পূর্ব-প্রস্তুতি সম্পর্কে একটু জানতে চাই একটা একক চিত্র প্রদর্শনী করতে বিশেষ করে বড় কোনো গ্যালারিতে প্রায় ত্রিশ-চল্লিশটা ছবির দরকার পড়ে , আমি খুব ধীর গতির চিত্রকর।এত ছবি জমে থাকে না। অনেক ছবি বিভিন্ন মিউজিয়াম,প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে গেছে। তাই একক চিত্র প্রদর্শনী করার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ঢাকার চারুকলা প্রতিষ্ঠান কলাকেন্দ্রের পরিচালক দেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের একজন ওয়াকিলুর রহমান। তাঁর কেন্দ্রে সাধারণত ভিন্ন ধরনের প্রদর্শনী করে থাকেন , তিনি একটি প্রদর্শনী গত ফেব্রুয়ারি মাসে আয়োজন করেছিলেন। আমি যে একটি ছবি আঁকার জন্য দীর্ঘদিনের ভাবনাচিন্তাকে কাগজে ড্রইং বা স্কেচে এঁকে খসড়া তৈরি করি সেই টুকরো কাগজগুলো দিয়েই তিনি এই প্রদর্শনী কিউরেট করেন। মানে একটি পরিপূর্ণ চিত্রকর্মের পেছনের গল্পগুলোকে সাজিয়ে পরিবেশন করেন। আঠারটি ফ্রেমে মূল পেইন্টিং এর ফটোগ্রাফ ও তার সাথে ঐ ছবির জন্য করা খসড়াগুলি প্রদর্শিত হয়। ওয়াকিল তাঁর অনেক প্রদশর্নী চট্টগ্রামেও প্রদর্শন করার ব্যাবস্থা করেন। আমারটাও সেভাবে চারুকলা ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথভাবে করার উদ্যগ নেন। ইন্সটিটিউটের পরিচালক ও শিক্ষকরাও আগ্রহী ছিলেন। রশিদ চৌধুরী আর্ট গ্যালারিটি বেশ বড় এবং এখানকার ছাত্ররা আমার মূল কাজ দেখেনি তাই উভয়পক্ষের চাহিদায় আমার সংগ্রহে যেসব ছবি ছিল, একেবারে শুরুর সময় যেমন ১৯৮৭ থেকে বর্তমান সময় মানে ২০১৬ পর্যন্ত , সেগুলিও ঐ আঠারটি প্যানেলের সাথে এখানে প্রদর্শিত হলো। তাই পরিকল্পনা না করেও চারুকলা ইনস্টিটিউটের আগ্রহী কিছু শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রী যারা ঐ আঠারটি প্যানেল ছাড়াও আমার প্রায় আরো আঠারটি মূল চিত্রকর্মকে রশীদ চৌধুরী আর্ট গ্যালারির দুটি তলায় পরিপাটি করে ডিসপ্লের কঠিন কাজটি করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা না প্রকাশ করলেই নয়।
কাকতালীয়ভাবে উনিশ বছর পর বেশ একটি প্রদর্শনীর আয়োজন হলো। এভাবে না হলে হয়তো আরো অনেকদিন পর হত। কলাকেন্দ্রে যে প্রদর্শনী হয়েছিল তার ক্যাটালগে পূর্ব-ভাবনা নামটি ঐ উদ্দেশ্যেই দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ একটি ছবি আঁকার পূর্বে যে ভাবনা তার প্রতিরূপ।

আপনার ছবিগুলো বিমূর্ত নয়, আবার একেবারে মূর্ত-ও বলা চলে না। মূর্ত ছবিগুলোর গল্পে একধরনের ফ্যান্টাসি লক্ষ করা যায়। শিল্পের এই মূর্ত-বিমূর্তর রূপকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন।

আমার ছবি অসম্ভব মূর্ত অর্থাৎ প্রতিটি বস্তু বা জিনিস এখানে মূর্তিমান। তবে বাস্তবভাবে হয়তো সাজানো নয়। আমি মনে করি আমার সাথে সর্বক্ষণ আমার চিন্তা, ভাবনা, কল্পনা যেগুলি দেখা যায় না তা যুক্ত থাকে। আমি যখন আমার ভাবনাকে আঁকতে যাই তখন তার সাথে কল্পনা, আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা এ-সবই যুক্ত হয়ে ব্যক্ত হয়। সেজন্য হয়তো বাস্তবতা থেকে তা একটু আলাদা হয়ে যায়। এটা কিন্ত সব মানুষের ক্ষেত্রেই হয়।

এবারের কাজগুলোতে লে-আউট/স্টাডি মূল পেইন্টিং এর সাথে জুড়ে দিয়ে সমস্ত মিলে একটি পেইন্টিং এর মর্যাদা দিয়েছেন। এই নিরীক্ষা কি নতুন? এটার পেছনে কী ধরনের ভাবনা কাজ করেছে।

এবারের কাজগুলির বিন্যাস সম্পূর্ণভাবে ওয়াকিলের করা। তবে এরকম লে আউট/ স্টাডি দিয়ে এর আগে বাংলাদেশে আর কোনো প্রদর্শনী হয়েছে বলে আমার জানা নাই। এই ধরনের বিন্যাসের মাধ্যমে একজন শিল্পীর মূল শিল্পকর্মটি সম্পাদনের আগে কতভাবেই যে তার ভাবনাকে বিন্যস্ত করার প্রস্তুতি নেন তার একটি পরিচয় পাওয়া যায়।

শিল্পী রশিদ চৌধুরীও মূর্তজা বশীরকে আপনি গুরু হিসেবে মানেন। প্রযুক্তির এই সময়ে দাঁড়িয়ে গুরু-শিষ্যের ভক্তি-ভালোবাসা-শ্রদ্ধা-বিশ্বাসের এই সম্পর্ক এখন আর সেভাবে দেখতে পাওয়া যায় না। শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে একজন শিল্পীর জীবনে এর অবদান কতখানি?

এখন দেখা যায় কিনা জানি না । তবে গুরু পাওয়া বা শিষ্য হওয়া হয়তো ব্যক্তিবিশেষে বিভিন্নরকম হতে পারে। আমি যেহেতু আর্ট কলেজে পড়াশোনা করিনি বা ডিগ্রি নেইনি তাই আমি তাঁদেরকে ভীষণভাবে অনুসরণ করেছি। তা না হলে শুধুমাত্র মাস্টার্স- এর দুই বছরের চারুকলার শিক্ষা পেয়ে শিল্পী হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্ভব হতো না।

এই দুইজন শিল্পী আপনার চিত্রকলায় ও বাস্তবজীবনে ঠিক কীভাবে প্রভাবিত করেছে?

উনাদের কাছ থেকে শিল্পের ইতিহাস, ব্যাকরণ, বিভিন্ন মাধ্যমের ব্যবহার ও উৎকর্ষ, শিল্প রচনার ভাবনাগত উপস্থাপন, সবকিছুই তো শিখেছি। এছাড়া এমন কিছু পরামর্শ তাঁরা আমাকে দিয়েছেন যা হয়তো ব্যবহার করি বলে মানুষের কাছে আমার ছবি দর্শনীয় হয়। এছাড়া জীবন সম্পর্কে উনাদের নিজস্ব দর্শন ছিল তা জেনেছি। যা আমার বাস্তব জীবনে কাজে লেগেছে।

আপনার ছবিতে পরাবাস্তবতা ও প্রখর বাস্তবতার সন্ধান একইভাবে পাই। নারীর প্রতি সহিংসতা, সামাজিক বৈষম্য, পরিবার, প্রেম সবই একটা কেমন স্বপ্ন ও জাগরণের মধ্যবর্তী প্রক্রিয়া মনে হয়। এই প্রক্রিয়াটাকে আপনি নিজে কীভাবে অনুভব করেন। অনূভূতির এমন একটা অংশে মার্ক শাগালের কাজের সাথে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়… কোনোভাবে তার কাজ দ্বারা কি প্রভাবিত?

এর উত্তর বোধ হয় আগেই দিয়েছি। মানুষ যখন ভাবে তখন কিন্তু চিন্তাটা পরিষ্কারভাবে বা বাস্তবভাবে না। তার ভিতর অবশ্যই অবাস্তব ইচ্ছাগুলি ঢুকে পড়ে ফলে আমার চিন্তাকে যখন আমি আঁকছি সেখানে ঐ অবাস্তব ভাবনা বা কল্পনা এমনকী পুরানো স্মৃতিও জুড়ে যাচ্ছ। আসলে তো আমরা জেগে জেগে স্বপ্ন দেখি, সেই স্বপ্নটার চেহারা যদি আঁকি তা বাস্তবেরই প্রতিরূপ । শাগাল আমার ভীষণ প্রিয় শিল্পী। তবে তাঁর ভাবনা অনেক স্বাপ্নিকভাবে প্রকাশিত।

আরবান ফোক আর্ট (যেমন: রিকশা পেইন্টিং) এর একটা রূপ দেখতে পাই আপনার পেইন্টিং-এ। এটি কি সচেতনভাবেই বা কীভাবে এটি আপনার ভেতরে এল?

রিক্সা আমার কাছে কৌতূহলের। মধ্যবিত্ত মানুষেরাই এই সস্তা বাহনটিতে চড়ে এবং তাদের আর কোনো উপায়ও নাই, অতএব রিক্সাটি যে কোনরকমই হতে পারত। আমাদের দেশের রিক্সা পা থেকে মাথা পর্যন্ত ডেকোরেটিভ। পেইন্টিং, প্লাস্টিক এর এপ্লিক, মেটালের কাজ, কি নাই? এতে বোঝা যায় আমাদের সাধারণ মানুষের কিন্তু এক ধরনের শিল্পবোধ আছে। সেটা অন্যান্য দেশ থেকে ভিন্নরকম। আমার ছবিতে আমি সবসময় চেয়েছি আমার দেশের গন্ধ থাকুক। তাই রিকশা আর্ট থেকে আমি রঙ বা লাইনের ব্যাপার যেমন নিয়েছি তেমনি রিকশার যাত্রীরাও আমার ছবির বিষয়বস্তু হয়েছে ।

গল্পের একটা আবহ পাওয়া যায় আপনার ছবিতে। একই সাথে চরিত্রগুলোর অভিব্যাক্তি এবং ক্যানভাসের চারপাশ জুড়ে যে নান্দনিকতা সেখানে কবিতার স্বাদ পাওয়া যায়। সাহিত্য থেকে চিত্রকলায় রসদ নেন?

আমি একেবারেই সাহিত্যের পাঠক নই। তবে কখনো যদি কিছু পড়ি তা খুবই মনোযোগের সাথে পড়ি। আসলে কবিতায় অনেক সিম্বলিক ইমেজ পাওয়া যায়। ঐ ইমেজগুলিকে আমি কাজে লাগাই, ছবির বিষয়বস্তু নির্বাচনে।

আপনার বিভিন্ন ছবির ক্ষেত্রে এ সমস্ত রসদ বা উপকরণগুলোর উৎস মূলত আর কী কী ?

সব তো বলা যাবে না। কোনো একসময় গবেষকদের খুঁজে বের করার সুযোগ রাখতে হবেনা !

দেশের বাইরে কোন কোন শিল্পীর কাজ আপনাকে অনুপ্রাণিত করে?

আমার ছবির মূল প্রেরণা হচ্ছে অজন্তার গুহাচিত্র, মুঘল মিনিয়েচার, রাজপুতচিত্র ইত্যাদি। তবে পশ্চিমা শিল্পীদের কাজ থেকেও অনেক কিছুই নিয়েছি। মার্ক শাগাল,দিয়েগো রিভেরা, গঁগ্যা, পিকাসো, রুশ, ডেভিড হক্‌িন প্রমুখ। এদের ছবি আমাকে অনেক অনুপ্রেরণা দেয়।

সাধারণ মানুষের জীবন থেকে একজন শিল্পীর জীবন কী আলাদা? হলে কোথায় আলাদা?

সবাই কিন্তু শিল্পী। অধিকাংশ সংবেদনশীল মানুষ তার ভাবনাচিন্তাকে কোনো না কোনো মাধ্যমে প্রকাশ করেন তাই সাধারণ মানুষকে আমার থেকে আলাদা করে দেখি না।

পরবর্তী কাজের পরিকল্পনা কী?

এখনো কোনো পরিকল্পনা নেই। কাজের ভাবনা যখন আসবে তখন মাথার ভিতর পরিকল্পনা দানা বাঁধতে শুরু করবে।

x