রাষ্ট্রের মুখচ্ছবি

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

শুক্রবার , ১৯ এপ্রিল, ২০১৯ at ৮:০৬ পূর্বাহ্ণ
43

ভারতে গণতন্ত্র আছে বলে লোকপ্রসিদ্ধ রয়েছে, কিন্তু সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আসল চেহারাটা কি তা ধরা পড়ে তার জেলখানাতেই। এটা সব রাষ্ট্র সম্পর্কেই সত্য। কারাগার হচ্ছে রাষ্ট্রের দর্পণ। সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য রাষ্ট্রকে চিনতে হলে তার জেলখানায় যাও, এ খুবই খাঁটি পরামর্শ।
‘মাই ইয়ার্স ইন এন ইন্ডিয়ান প্রিজন’ নাম দিয়ে মেরী টাইলার নামে একজন ইংরেজ মহিলা একটি বই লিখে ওই চেহারাটা তুলে ধরেছেন, জনসমক্ষে। তাঁর এই বই একটি নতুন ‘রবিনসন ক্রুশো’। তফাৎ এই যে, ড্যানিয়েল ডিফোর সেই বিখ্যাত কাহিনীর সবটাই কাল্পনিক, আর মেরী টাইলারের এই নতুন কাহিনীর সবটাই বাস্তবিক। বাস্তবকে তিনি এতটুকু বাড়িয়ে বলেন নি, বরঞ্চ পড়তে পড়তে মনে হয় নিজের ভেতরের অনেক অনুভূতি ও ক্ষোভকে আড়ম্বরহীন সাদামাটা ভাষার শাসনে আটক করে রাখতে চেয়েছেন। ড্যানিয়েল ডিফোরও সাদামাটা, খুবই নিরাভরণ, কিন্তু তাঁর কল্পনাশক্তি ছিল অসাধারণ, যে জন্য ‘রবিনসন ক্রুশো’ যাঁরা পড়েন এক নিঃশ্বাসেই পড়েন। মেরী টাইলার লেখিকা নন, সাধারণ মানুষ, স্কুল শিক্ষিকা, ১৯৭৭ সালে ‘মাই ইয়ার্স ইন এন ইন্ডিয়ান প্রিজন’ যখন লেখেন তখন বয়স সদ্য ত্রিশ পার হয়েছে, তাঁকে বহন করতে হয়েছে অসাধারণ অভিজ্ঞতার এক নির্মম বোঝা। সেই বোঝাই তাঁকে লেখিকা করলো, নইলে তাঁর লিখবার কথা নয়। তাঁর বইও রুদ্ধশ্বাসে পড়লাম আমি, এই সেদিন।
মেরী টাইলার ভারতে এসেছিলেন ব্যক্তিগত কারণে। ১৯৭০ সালে। সে হচ্ছে নকশালবাড়ি আন্দোলনের কাল। তিনি তাঁর বাঙালি স্বামী অমলেন্দু সেনের সঙ্গে দরিদ্র ভারতবাসীর জীবন দেখতে গিয়েছিলেন পশ্চিম বঙ্গ ও বিহারের সীমান্তবর্তী এক গ্রামে। পুলিশ সেই গ্রাম ঘেরাও করে একান্ন জন তরুণ-তরুণীকে চালান দিয়েছিল নকশালী বলে। এই মহিলা তাদের একজন। রটে গেল খবর যে, মারাত্মক এক নেত্রী গ্রেফতার হয়েছে। ইংল্যান্ড থেকে চীন হয়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভারতে এসেছে বিপ্লব করবে বলে। (একজন পুলিশ অফিসার বলেছেন তাঁকে, দু’শ বছর শাসন করেও সখ মেটেনি, আবার এসেছ আমাদের দেশ দখল করতে।)
অতিনাটকীয়ভাবে তিনি জেলে চলে গেলেন, অভিযোগ কি লিখিতভাবে জানলেন না, প্রতিদিন আশা করলেন মুক্ত হবেন, পাঁচ বছর চলে গেল বিনা বিচারে; তারপর হঠাৎ একদিন দেখেন মহামান্য অতিথির সম্মান পাচ্ছেন, জেল ওয়ার্ডার স্যালুট দিচ্ছে, দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা, বিহারের হাজারীবাগ থেকে ফাস্ট ক্লাস কামরায় ট্রেনে এলেন কলকাতায়, সেখান থেকে বিমানবন্দরে মহামান্য অতিথিদের কক্ষে আতিথেয়তার চূড়ান্ত, হাত মিলিয়ে বিদায় নিলেন পদস্থ কর্মচারীদের কাছ থেকে, তারপরে প্লেন, প্লেনে করে লন্ডন, বিমানবন্দরে নেমে সাংবাদিক সম্মেলন। কোথা থেকে কোথায়। সবটাই অবিশ্বাস্য।
আরো বেশি অবিশ্বাস্য মাঝখানের অভিজ্ঞতা, যেখানে তিনি রবিনসন ক্রুশোর মতো একাকী। বিপজ্জনক, তাই নির্জন প্রকোষ্ঠে থাকেন কখনো, এবং সব সময়েই বিচ্ছিন্ন। স্বামী অমলেন্দু আরেক জেলে, স্বামী চিঠি লেখেন, ইনি সেসব চিঠি পান না। কয়েক শ’ মাইল ট্রেন ভ্রমণ করে স্বামীর আত্মীয়-স্বজন আসেন দেখা করতে, তাতে শ্রম যত হয় সিদ্ধি ততটা হয় না। বিলেত থেকে বাবা টাকা পাঠান, পৌঁছায় না। খবর রটে গেছে বিলেতি কাগজে যে, তাঁর প্রাণদণ্ডাদেশ হয়ে গেছে। সে গুজব বাবা-মা আত্মীয়-স্বজন পড়লে কেমনভাবে নেবেন ভেবে গা কাঁটা দিয়ে ওঠে তাঁর। মা’র বক্ষব্যাধি ছিল, অপারেশন হলো ওই সময়ে। তারপর মা মারাও গেলেন, মেয়ের ওই কারাবন্দী থাকা অবস্থাতেই। জেল অফিসে ডেকে নিয়ে গিয়ে মেরী টাইলারকে সে-খবর যখন দেওয়া হলো, তিনি দেখেন তিনি কাঁদতে পারছেন না, এই ভয়ে যে জেল প্রশাসন তাঁর দুর্বলতা দেখে ফেলবে। ফিরে এসে কেঁদেছেন, সহবন্দী বীণা, হীরা, গোলাপীদের জড়িয়ে ধরে। আর ওই মেয়েরা যারা জেলে এসেছে অপরাধী হিসেবে, খারাপ খারাপ নাম সেইসব অপরাধের, তারা দেখা গেছে অনেক বেশি ভালো মানুষ তথাকথিত ভালো মানুষদের তুলনায়। জেলের ভালো মানুষ কর্মকর্তারা ঘুষ খায়, নিপীড়ন করে; আর এরা এসে দাঁড়ায় পাশে। মেরী টাইলারকে বলেছে এরা, এদেশে তোমার কেউ নেই, না-থাকুক, এই দেখো আমরা আছি, আমরা তোমার বোন, আমরা তোমার মা। এই মেয়েরা নিজেদের ভাগ কেটে রান্না করে খাইয়েছে তাঁকে। সান্ত্বনা দিয়েছে, পরামর্শ দিয়েছে, অসুস্থ হয়ে পড়লে যত্ন নিয়েছে। এর বিপরীতে ব্রিটিশ হাই কমিশনের কর্তাদের দেখা যাচ্ছে মোটেই বুঝতে চাচ্ছে না তাঁদের স্বজাতীয় বন্দিনীর সমস্যাগুলো কি ও কেমন। কল্পনার রবিনসন ক্রুশোর অভিজ্ঞতা বাস্তবের মেরী টাইলার কোথায় পাবেন? কিন্তু তাঁর সঞ্চয়ও কিছু কম নয় তাই বলে।
ভারতবর্ষের প্রতি বিদেশীদের আকর্ষণ পুরোনো ব্যাপার। কেউ আসে ভ্রমণে, অধিকাংশই এসেছে লুণ্ঠনের আশায়, লুণ্ঠনটাই আসল, বাকিটা ছদ্মবেশ। কিন্তু কেউ কেউ, অত্যন্ত নগণ্য তাদের সংখ্যা, এসেছেন অন্য প্রয়োজনে। মানবিক।
আরেকজন মেরী, মেরী কারপেন্টার- চারবার এসেছিলেন ভারতবর্ষে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে। তাঁর ওপর প্রভাব পড়েছিল তাঁর পিতৃবন্ধু রাজা রামমোহন রায়ের। ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে তাঁর অত্যন্ত অধিক কৌতূহল ছিল, ওদিকে উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদের তখন উন্মেষকাল, মেরী কার্পেন্টার সেই উন্মেষের পক্ষে কাজ করেছেন। ভারতবর্ষে এসে তিনি এর কারাগারগুলো ঘুরে ঘুরে দেখেছেন, কেননা তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল কারা-সংস্কারের। বিলেতে ফিরে গিয়ে মেরী কার্পেন্টার বই লিখেছিলেন ‘সিক্স মানথস ইন ইন্ডিয়া’ নামে। বড় বই, দুই খণ্ডে।
মেরী কার্পেন্টারের কয়েক বছর পরে এসেছিলেন আরেক মহিলা, মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল, ভগিনী নিবেদিতা নামে যিনি অধিক পরিচিত। তাঁর ওপরে প্রভাব পড়েছিল অপর একজন বিখ্যাত ভারতীয়ের, স্বামী বিবেকানন্দের। মার্গারেট নোবেলের অনুপ্রেরণাটি ছিল আধ্যাত্মিক, তিনি কলকাতায় এলেন, ব্রহ্মচার্য গ্রহণ করলেন, নাম হলো তাঁর ভগিনী নিবেদিতা। পরে, বিংশ শতাব্দীতে যখন সন্ত্রাসবাদের শুরু তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি, অত্যন্ত প্রত্যক্ষভাবে।
ভগিনী নিবেদিতা মারা যান ১৯১২ সালে, মেরী টাইলার কলকাতায় আসেন আরো অনেক পরে, ৫৮ বছর পরে, ১৯৭০ সালে। একাল সম্পূর্ণ ভিন্ন কাল। আধ্যাত্মিকতার নয়, জাতীয়তাবাদের সংগ্রামের নয়। একালে স্বাধীন ভারতের দরিদ্র মানুষ লড়াই করেছে তাদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য, তাদের সঙ্গে মুখোমুখি দ্বন্দ্ব তাই রাষ্ট্রযন্ত্রের। মেরী টাইলার তাঁর পূর্বসূরি দু’জনের মতো অত্যন্ত বিশিষ্ট মানুষদের প্রভাবে পড়েননি, তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল অমলেন্দু সেন নামে কলকাতার এক ইঞ্জিনিয়ারের। মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে অমলেন্দু তখন পড়াশোনা করছেন পশ্চিম জার্মানিতে, সেখানে মেরী গিয়েছিলেন বেড়াতে। দু’জনের পরিচয় হয়েছে হঠাৎ করে, এবং জেনেছেন তাঁরা যে তাঁদের মধ্যে গভীর ঐক্য রয়েছে দৃষ্টিভঙ্গির। মেরী টাইলার ইংরেজ জাতির সাম্রাজ্যবাদী গৌরবে আস্থা হারিয়েছিলেন আগেই, উত্তর লন্ডনের যে-স্কুলে পড়াতেন তিনি সেখানে নানা জাতির ছেলেমেয়েদের দেখে বিদেশ সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল মনের ভেতর। অমলেন্দুকে দেখা গেল গভীরভাবে দেশপ্রেমিক। জাতীয়তাবাদী নয়, দেশপ্রেমিক। পশ্চিমে থাকলে বেশ ভালো থাকতে পারতেন তিনি বৈষয়িকভাবে, সেই মোহ ছিন্ন করে ফিরে এলেন কলকাতায়। কলকাতা-লন্ডনে চিঠির আদান-প্রদান হয়েছে, অমলেন্দু বলেছেন, এসো, ভারতবর্ষ দেখে যাও। সেই ডাকেই ভারতে আসা মেরী টাইলারের। কাজটা তাঁর বাবা-মা পছন্দ করেননি। তবু যখন যাবেনই তখন বাবা বলেছেন, ভারতে তোমার নানা অভিজ্ঞতা হবে, দেখো জড়িয়ে পড়ো না, দূরে থেকো। এই সতর্কবাণী অপ্রয়োজনীয় প্রমাণিত হয়নি। কেননা মেরী টাইলার জড়িয়ে পড়েছিলেন।
মানুষের দুর্দশা ও দারিদ্র্য তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। আর ছিল অমলেন্দুর প্রস্তাব, এখানে আমাদের সঙ্গে থেকে যাও। মেরী টাইলারের পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ মোটেই সহজ ছিল না। এপারে ওপারে দুই মেরুর দূরত্ব। তবু থাকবারই সিদ্ধান্ত নিলেন মেরী টাইলার। অমলেন্দুর পরিবারের সঙ্গে হৃদ্যতা জন্মে গেছে তাঁর ইতিমধ্যেই। বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গেও। অমলেন্দু বড় চাকরি নিতে পারতেন কলকাতার বাইরে গিয়ে, ভারতেই। কিন্তু তিনি কলকাতাতেই রয়ে গেছেন, সেই বিলাসবিমুখতা বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল মেরী টাইলারকে। আড়ম্বরহীন এক অনুষ্ঠানে বিয়ে হয়েছিল তাঁদের। তারপরে ওই গ্রাম দেখতে যাওয়া, এবং কারাগারে একটানা পাঁচ বছর- বিনা বিচারে।
মেরী টাইলারের ভারত মোটেই আধ্যাত্মিক নয়, একেবারেই ইহজাগতিক, মূলত তা কারাগারের। না, কারাগারের বিষয়ে তাঁর আদৌ কোনো আগ্রহ ছিল না, বিন্দুমাত্র নয়। সেটা ছিল অপর মেরীর, মেরী কার্পেন্টারের, রামমোহনের ওপর যিনি বই লিখেছেন, ভারতবর্ষে এসে যিনি কারাগারে কারাগারে ঘুরেছেন সংস্কারের সুপারিশ করবেন বলে, অথচ অদৃষ্টের পরিহার এমনি যে, মেরী টাইলারকে কারাগার সম্পর্কে প্রত্যক্ষ বাস্তবিক অভিজ্ঞতা লাভ করতে হলো। এ কারাগার মেরী কার্পেন্টার দেখেননি, বহিরাগত কোনো পরিদর্শকের পক্ষেই একে দেখা সম্ভব নয়, দেখতে হলে ভেতরে থাকতে হয়, রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে- মেরী টাইলার তাই ছিলেন। রাজনৈতিক মহিলা বন্দীদের অন্তত দু’জনকে দেখেছেন তিনি, জয়প্রকাশ নারায়ণের ইন্দিরাবিরোধী আন্দোলনের সময়। কারাগার তাঁদের জন্য দ্বিতীয় গৃহ, খাটমশারি, সেবা-যত্ন, খাবার-দাবার সবই পান উৎকৃষ্ট রকমের, কারো সঙ্গে মেশেন না, সাধারণ কয়েদীদের সঙ্গে কথাবার্তা নেই, যাবার সময় সঙ্গে করে অব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে যান বেঁধেসেধে। মেরী টাইলারের জেল রবিনসন ক্রুশোর দ্বীপের মতোই। সেখানে স্বাভাবিক জীবনযাপনের কোনো উপকরণই নেই, বলতে গেলে। চৌকি নেই, মশারি নেই, জুতো নেই। জামা-কাপড় পাওয়া যায় না। খাদ্যের বরাদ্দ সামান্য, তাও চুরি হয়ে যায় মাঝপথে। পড়বার বই নেই, লিখবার কাগজ নেই, পায়খানা তো ঘরের ভেতরেই। নর্দমা থেকে ভগ ভগ করে গন্ধ বের হয় সর্বক্ষণ। মেরী টাইলারের ভেঙে পড়বার কথা ছিল। বিনা অপরাধে গ্রেফতার হয়েছেন, প্রথমে আশা ছিল দু’চার দিনের ভেতরেই ছাড়া পেয়ে যাবেন। সেই আশা বিশেষ পুলিশ বাহিনীর লোকেরা জেলের ভেতর এসে সযত্নে ভেঙে দিয়ে গেছে, চুরমার করে। তারা বলেছে, অমলেন্দুর যে ফাঁসি হচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মেরীর শাস্তি হবে কম করে হলেও বিশ বছরের। কোনো দিন যদি তিনি ছাড়াও পান তবে কলকাতায় আর যেতে পারছেন না। যে-গন্ধ তাঁর গায়ে লেগেছে তাতে কলকাতায় থাকা অসম্ভব। তাহলে উপায়? উপায়ও তারা বাৎলে দিয়েছে। স্বীকারোক্তি দিতে হবে। কিসের স্বীকারোক্তি? কি তাঁর অপরাধ? মেরী টাইলার খুঁজে পাননি। তাহলে আরেক পথ রয়েছে। আলাদা করে তাঁর জন্য বিচারের ব্যবস্থা করা। সেই উদ্দেশে আবেদন করতে হবে। তিনি খালাস হবেন, এবং ভারত ছেড়ে স্বেচ্ছায় চলে যাবেন। মেরী টাইলার এ আলাদা বিচারেও সম্মত হতে পারেননি। তাঁর মনে হয়েছে পুলিশের ওই প্রস্তাবে রাজি হলে তাঁর সহবন্দীদের প্রতি কেবল বিশ্বাসঘাতকতা নয়, তাদের ক্ষতি করা হবে। রাজি না হওয়ায় পচতে হয়েছে জেলে। বছরের পর বছর গেছে, বিচার হয়নি। পাঁচ বছর পরে অত আড়ম্বর করে হঠাৎ যে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হলো সে কোনো অলৌকিক কারণে নয়। একেবারেই বাস্তবিক ঘটনাসমূহের টানাপোড়েনে। আসামীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছিল না। যে জন্য পরে, সাত বছর পরে কাউকে, কাউকে নয় বছর পরে বেকসুর খালাস করে দিতে হয়েছে। কেবল চারজনের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল সাত বছর করে জেলের, ততদিনে তাদের সাত বছর জেল খাটা সারা হয়ে গিয়েছিল, তাই তাদেরকেও ছেড়ে দিতে হয়েছে। হ্যাঁ, নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছিল না তা সত্যি, কিন্তু আরো অন্তত চার বছর অনায়াসে জেলে থেকে যেতে পারতেন মেরী টাইলার, সেটা পারলেন না তার কারণ হচ্ছে বিলেতে তাঁর আপনজনেরা ইতিমধ্যে হট্টগোল সৃষ্টি করেছিলেন, তাঁর কারাবাসের ঘটনার ওপর চোখ পড়েছিল এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের, খোঁজ নিচ্ছিলো ব্রিটিশ সরকার; সেই কারণেই মামলা তুলে নেওয়া, স্যালুট দিয়ে বিদায় করে দেওয়া।
জেলে গিয়ে মেরী টাইলার কারাবিধির খোঁজ করেছিলেন, যাতে তিনি বুঝতে পারেন কি তাঁর কর্তব্য, কতটুকু তাঁর প্রাপ্য। বলা বাহুল্য, সেই বিধি কেউ তাঁকে দেখাতে পারেনি। কারা প্রশাসন তাহলে চলছে কি করে? চলছে তার আপন নিয়মে। অথবা চলছে সেই নিয়মে যে-নিয়মে রাষ্ট্র চলছে। নিয়মটা আর কিছুই নয়, শোষণ। বড় মাছ ছোট মাছদের ধরে ধরে খাবে, এই নিয়ম জেলের বাইরে যেমন ভেতরেও তেমনি, এক ও অভিন্ন। কয়েদীদের মধ্যে থেকে বাছাই করে কাউকে কাউকে সর্দার করা হয়েছে। তাকে তখন পায় কে, সঙ্গে সঙ্গে জালেমের ভূমিকা নিয়ে নেয়, কর্মকর্তাদের একজন হয়ে যায় সে, বিনাদ্বিধায়। আর আছে ঘুষ। কয়েদীরা ঘুষ দেয় কর্মচারীদের, আর কিছু না থাক, খাবারের রেশন তো আছে, তার অংশবিশেষ নিয়ে নিতে গররাজি হয় না জেল প্রশাসকেরা। ওয়ার্ডার ঘুষ দেয় হেডওয়ার্ডারকে। হেডওয়ার্ডার তার উপরওয়ালাকে। নইলে বদলি করে দেবে, কে জানে হয়তো-বা চাকরিই থাকবে না। জেল সুপার ঘুষ দেন মন্ত্রীকে। ইনকাম বলতে মেরী টাইলার আয় বোঝায় বলেই এতকাল জানতেন, এখানে এসে জানলেন, ইনকাম মানে হচ্ছে অবৈধ আয়। একজন মহিলা ওয়ার্ডার কেঁদে কেঁদে বলেছে মেরী টাইলারকে, হেডওয়ার্ডার তার কাছে ঘুষ চায়। না, টাকা নয়, অন্য কিছু। শোষণের নানা চেহারা। একটি চেহারা বর্ণ-বিভেদ। জেলখানায় দেখেছেন তিনি সম্প্রদায়ের চেয়ে জাতি বড়, আর জাতি অর্থ হচ্ছে সোজাসুজি বর্ণ। হিন্দু-মুসলমান এক হয়ে যেতে পারে, গেছেও, দেখেছেন তিনি; কিন্তু উচ্চবর্ণ এক হয়নি নিম্নবর্ণের সঙ্গে । মেরী টাইলারের জাতি ছিল না, শ্রেণিও ছিল না, না-থাকায় তিনি এক হয়ে যেতে পেরেছিলেন সাধারণ কয়েদীদের সঙ্গে। তাঁরাই তাঁকে বাঁচিয়েছে, নিঃসঙ্গতার পীড়া থেকে।
এই যে বিরাট অমানবিক যন্ত্র শোষণের, এর সঙ্গে ব্যক্তি পেরে উঠবে কেন? ব্যক্তি কেবলি ছোট হয়ে যায়। শুধু নৈতিকভাবে নয়, এমনকি দৈহিকভাবেও। কারাগারের মেয়েদের মধ্যে মেরী টাইলারকে মনে হতো দৈত্য- যেমন দৈর্ঘ্যে, তেমনি প্রস্থে, অথচ দৈর্ঘ্যে তিনি মাত্র পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি, ওজনে একশ’ বার পাউন্ড। মেরী টাইলার ভগিনী নিবেদিতা নন। তিনি যোগ দেননি কোনো সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে। অথচ না যোগ দিয়েও জড়িয়ে পড়েছিলেন, হাজার হাজার তরুণ-তরুণীদের মতো। এ নিয়ে ওই যন্ত্রের প্রতি তিনি কোনো ক্ষোভ প্রকাশ করেননি, যে জন্য গোটা বইটিই একটা ধিক্কার ধ্বনিতে পরিণত হয়েছে, কেবল ভারতের নয়, তৃতীয় বিশ্বের সেইসব দেশের শোষণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই যেখানে মানুষ লাঞ্ছিত হয় মানুষের হাতে। রবিনসন ক্রুশো লড়েছিলেন বিরূপ প্রকৃতির বিরুদ্ধে, মেরী টাইলারের বই বলছে তৃতীয় বিশ্বে মানুষ লড়ছে বিরূপ আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। বড়ই ভয়ংকর সে লড়াই।

x