রাতের হাসনাহেনা : সমাজকর্মী আসমা ইসলাম চৌধুরী স্মরণে

জিনাত আজম

শনিবার , ৩১ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:০১ পূর্বাহ্ণ
77

আগস্ট মাস বাঙালির অন্তরের রক্তক্ষরণের মাস। এই মাস এলেই আমরা প্রচণ্ড শোকে আচ্ছন্ন হই; কাতর হয়ে পড়ি। জাতির পিতার মর্মান্তিক বিদায় পরিবারসহ, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় নিহতদের সারি।
এবারে সেই সাথে চট্টগ্রাম লেডিস ক্লাবের সকল সদস্য বোনদের হৃদয়ে নতুন রক্তক্ষরণ যোগ হলো। আমাদের সকলের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন সদালাপী, হাস্যময়ী, উদার হৃদয়ের অধিকারীনী একনিষ্ঠ ও নীরব সমাজকর্মী আসমা ইসলামের চির বিদায়। ১৮ আগস্ট মধ্যাহ্নে স্থানীয় সিএসসিআর হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় তাঁর এই বিদায়। এর আগে দিল্লীতে ইসলাম ভাই তাঁকে নিয়ে চিকিৎসা করিয়েছিলেন। মৃদুকণ্ঠে শুধুই জানিয়ে ছিলো লিভারের সমস্যা।
কিন্তু সেই সমস্যাটুকু যে কত গুরুতর ছিলো, তাঁর আকস্মিক বিদায় সেটা আমাদের বুঝিয়ে দিলো।
তার মুখে তেমন সিরিয়াস কিছু নয় শুনে আশ্বস্ত হয়েছিলাম। আজ আসমা নেই; এই কথা বিশ্বাস করতে মন চায় না। তবে এটাই কঠিন সত্যি। আমার সাথে তার সখ্যতা প্রায় চল্লিশ বৎসরের। ১৯৮০ থেকে। বর্তমানে চট্টগ্রাম লেডিস ক্লাবের সব চাইতে প্রবীণ সদস্য ছিলো সে। আমরা প্রায় সমবয়সী। চট্টগ্রাম লেডিস ক্লাবের সুযোগ্যা সহ সভানেত্রী। কথা কম কাজ বেশি। এটাই তাঁর অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। চট্টগ্রামের মেয়ে, সিলেটের বৌ, শ্বশুর বাড়ির লোকজন ও স্বামীর সাথে এমন চমৎকারভাবে সিলেটের ভাষায় কথা বলতো; যা আমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগতো। শ্বশুর বাড়ির সবার সাথে ছিলো তার চমৎকার সখ্যতা। সবার মধ্যমণি ছিলো সে; পরিবারের বড় বৌ। নিঃসন্তান। কিন্তু পরিবারের সব সন্তানদের বড় মা। বৌমাদের শাশুড়ি মা। জা-দেবরদের ভাবী। কোন সম্পর্কেই কখনো এতটুকু চিড় ধরেছে বলে শুনিনি কখনো। সুগৃহিণী অর্থাৎ গৃহকর্মে নিপুণা, চমৎকার রন্ধন পটিয়সী। আরো সৌকর্য্যময় ছিলো তাঁর রান্নার চমৎকার পরিবেশনা। যার জন্য লেডিস ক্লাবে আয়োজিত রান্নার যে কোন প্রতিযোগিতায় পুরস্কারটি উঠতো তাঁর ঝুলিতেই। অত্যন্ত ধর্মপরায়ণা, সদালাপী, মানবদরদী আসমা। কতবার যে হজ আর উমরা করেছে স্বামীর সাথে তার সঠিক হিসাব আমি জানি না। কিন্তু দু’জনা রমজান এলেই চলে যেতেন মহাপ্রভুর সান্নিধ্যে। দু’জনাই ছিলেন আজীবন মানিক জোড়। নিঃসন্তান এই দম্পত্তির মুখে কখনোই আফসোসের কোন কথা শুনিনি চমৎকার বোঝাপড়া। সমাজকর্ম, সংসার, ধর্ম, আত্মীয়তা রক্ষা এসবের পাশাপাশি চমৎকার বাগান করতো আসমা। তারা বারান্দা উঠানে ছাদে গাছের সারি। আম, লিচু, জামরুল, তেঁতুল, করমচা, আঙ্গুর বিভিন্ন সবজি, পান, তেজপাতা, কারিপাতা, ধনিয়াপাতা, পুদিনা কি নেই সেখানে? একই অঙ্গে কতো রূপে সুশোভিত আসমা। ভাবতে আজো বিস্ময় জাগে। একজন মানুষের এতগুণ। সন্তানের জন্য কোন হাহাকার শুনিনি তাঁর মুখে। বরং বলতো-ইসলাম সাহেব বলেছেন, কুসন্তান থাকার চাইতে নিঃসন্তান থাকা অনেক ভালো। হতবাক হয়েছিলাম বৈকি। নিঃসন্তান হওয়ার দায় স্ত্রীর কাঁধে না চাপিয়ে এভাবে উল্টো সান্ত্বনা দেবার মতো স্বামী এই জগৎ সংসারে ক’টা আছে? ইসলাম ভাই এর মুখে আসমার প্রশংসার ফুলঝুরি শোনার সাক্ষী আমার প্রয়াত জীবন সাথী আলী আজম খান স্বয়ং। একজন নারীর জীবনে এর চাইতে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে? আমরা স্বয়ং সম্পূর্ণা।
লেডিস ক্লাব অন্তঃপ্রাণ আসমা। আর দু’একটি প্রতিষ্ঠানে হয়তো তাঁর নাম ছিলো। কিছু সে এই প্রতিষ্ঠানটিকেই ভালোবেসে গিয়েছে আজীবন। ক্লাবের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিশেষ আপ্যায়নের দায়িত্বে সে ছিলো সদা তৎপর ও অগ্রগামী। কথা কম কাজ বেশি। এটাই তার অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তাঁর কাঁধে বড় বড় অনুষ্ঠানের আপ্যায়নের দায়িত্বগুলো চাপিয়ে আমরা নিশ্চিন্তে থাকতাম। কখনো সে নিরাশ করেনি। যে কোন দুর্যোগে, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড ত্রাণে সর্বদাই উদার হস্ত ছিলো আসমা। কোনদিন কারো সাথে বৈরীতা হয়েছে, বাকবিতণ্ডায় জড়িয়েছে এমন কথা শুনিনি। বক্তব্য দেয়া তাঁর স্বভাবে ছিলো না। কিন্তু ভূষণে, চলনে বলনে সে ছিলো অনবদ্য। বিশেষ করে বাংলা নববর্ষের সাজসজ্জায় এক প্যাঁচে শাড়ি গায়ে দেশী গয়না চুড়ি, পায়ে আলতা, মাথায় ঘোমটা এবং হাতে মোয়া, মুড়ি, নাড়ু, পিঠার ডালায় সজ্জিতা অপরূপা আসমা। পুরস্কারটিও তাঁর হাতেই উঠতো অবলীলায়। লেডিস ক্লাব ফ্রী ক্লিনিকের দায়িত্ব পালন করেছেন বহুদিন।
একদিন লেডিস ক্লাব বালিকা সদনের জন্য আমরা অনুদান সংগ্রহ করছি। এমনি সময় আসমা তার গলার ‘সোনার সেট’ নিয়ে এসে হাজির। ক’জনা পারে এমন উজাড় করে দিতে? এটাই আসমার আসল রূপ। অসাধারণ, অনবদ্য ও বিরল এবং অনুসরণ যোগ্য।
পরিশেষে বলবো-
* নিঃসন্তান হয়েও কিভাবে স্বামী ও তার পরিবারের সবার মধ্যমণি হয়ে থাকা যায়; তার অনন্য উদাহরণ আসমা
* স্নেহ-মায়া-মমতা, আদরে, আপ্যায়নে, দানে, ধ্যানে, কিভাবে সকলকে একটি বন্ধনে অটুট রাখা যায়, তার অনন্য উদাহরণ আসমা।
* বক্তব্যে বড় না হয়েও, সমাজকর্মে ও গৃহকর্মে নিপুণা এবং আচরণে, বন্ধু বাৎসল্যে, মানবপ্রেমী কাউকে যদি দেখতে হয় তাহলে আসমাকেই দেখা দরকার।
* হিংসা বিদ্বেষ ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকেও সমাজের জন্য দুঃখী ও আর্তমানবতার সেবায় নিজকে নিয়োজিত রাখা যায়-তারও অনন্য উদাহরণ আসমা।
আসমা শব্দের অর্থ পবিত্রা। পবিত্রা এই নারী। আমাদের সবার ভালোবাসার আসমা। আজ হারিয়ে গেছে চিরতরে এ চট্টগ্রামের সমাজসেবার অঙ্গন থেকে। আমরা হারালাম এক নিবেদিত প্রাণ নীরব সমাজকর্মীকে। এই শূন্যতা অপূরণীয়।
আসমা-যেনো রাতের হাসনাহেনা। নীরবে, নিভৃতে সৌরভ বিলিয়েই চিরতরের জন্য অনন্তে মিলিয়ে গেলো। অনিন্দ্য সুন্দর মায়াবতী এক ফুল। কেবলি সৌরভ ছড়ায়। চারিদিককে আমোদিত করে।
যতদিন বেঁচে থাকবো, লেডিস ক্লাব থাকবে-আসমা তুমি, তোমার সোনালী স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে চিরসমুজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
মহান স্রষ্টার কাছে তোমার চির শান্তি কামনা করছি। আর তোমার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সবার জন্য শুভ কামনা। আল্লাহ আমাদের শোককে শক্তিতে পরিণত করুন। আমিন।

x